অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন ট্রায়ালের অযাচিত কিছু ভুল বিলম্বিত করছে এর চূড়ান্ত অনুমোদন

৮ ডিসেম্বর ২০২০ দিনটি দুটি কারনে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এক, এই দিনটিতেই সকল ধাপের ট্রায়াল এবং আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ফাইজারের নবউদ্ভাবিত করোনা ভ্যাকসিনটি জনসাধারনের মাঝে দেয়া শুরু হল। যুক্তরাজ্যের কোভেন্ট্রিতে সকাল ৭ টায় ৯১ বছরের মার্গারেট কিনান নামক এক বৃদ্ধাকে ভ্যাকসিন প্রদানের মাধ্যমে শুরু হল করোনা মহামারী দমনের বিশ্বব্যাপী প্রচেষ্টা।
দুই, এই দিনটিতে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনিকার ভ্যাকসিনটির ফেইজ-৩ ট্রায়ালের ফলাফল প্রকাশিত হল বিখ্যাত জার্নাল ল্যানসেটে। পৃথিবীতে এই প্রথম মানুষের উপর ট্রায়ালে প্রমানিত হল যে অ্যাডিনোভাইরাস ভেক্টর-নির্ভর ভ্যাকসিন কার্যকরী। এছাড়াও অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনই সর্বপ্রথম করোনা ভ্যাকসিন যার ফেইজ-৩ ট্রায়ালের ফলাফল কোন বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশিত হল। এর আগে ফাইজার, মর্ডানা, রাশিয়ার গ্যামালেয়া এবং চীনের সিনোভ্যাক প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে তাদের ভ্যাকসিনগুলোর ফেইজ-৩ ট্রায়ালের অন্তর্বর্তীকালীন ফলাফল ঘোষনা করেছে। তবে কেউ এখনও তাদের পূর্ণ ফলাফল কোন জার্নালে প্রকাশ করেনি।
কি আছে অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের ল্যানসেট পেপারটিতে? ফলাফল কি আশাব্যঞ্জক?
এই পেপারটিতে অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের ফেইজ-৩ ট্রায়ালের প্রথম অন্তর্বর্তীকালীন ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। যুক্তরাজ্য, ব্রাজিল এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় চলমান প্রায় ২৩ হাজার ভলান্টিয়ারের তথ্য উপাত্ত পর্যালোচনা করে ভ্যাকসিনটির নিরাপত্তা বা সেইফটি প্রফাইল নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে ভ্যাকসিনটির কার্যকারীতা বা এফিকেসি নির্ধারনের জন্য শুধুমাত্র যুক্তরাজ্য ও ব্রাজিলের মোট ১১,৬৩৬ জন ভলান্টিয়ারের তথ্য উপাত্ত পর্যালোচনা করা হয়েছে।
ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা যায় যে দুটি পূর্ণ ডোজ বা স্ট্যান্ডার্ড ডোজ (৫০ বিলিয়ন ভাইরাস পার্টিকেল) টিকা দেয়াতে ভ্যাকসিনটির কার্যকারীতা ৬২ শতাংশ।অন্যদিকে, প্রথমে অর্ধেক ডোজ বা লো-ডোজ (২২ বিলিয়ন ভাইরাস পার্টিকেল) এবং পরে পূর্ণ ডোজ টিকা দিলে এর কার্যকারীতা পাওয়া যায় ৯০ শতাংশ। গড়ে অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনটির কার্যকারীতা দাড়ায় ৭২ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি একশ জনকে ভ্যাকসিন দিলে গড়ে ৭২ জন কোভিড আক্রান্ত থেকে রক্ষা পায়।
এছাড়াও ভ্যাকসিন গ্রহিতাদের ভেতরে কারোরই সিভিয়ার কোভিড হয়নি, অথবা তারা কেউই অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়নি। ভ্যাকসিন গ্রহিতাদের ভেতরে কেউ মারাও যায়নি। অর্থাৎ অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন সিভিয়ার কোভিড থেকে মানুষকে রক্ষা করে শতভাগ। এই ট্রায়ালে যারা কন্ট্রোল গ্রুপে ছিল, অর্থাৎ যারা প্ল্যাসিবো বা ডামি ভ্যাকসিন পেয়েছিল, তাদের ভেতরে দশ জন কোভিডে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। এদের ভেতরে দুইজন আক্রান্ত হয়েছিল সিভিয়ার কোভিডে যার ভেতরে একজনের মৃত্যু হয়।
অন্যদিকে, অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন অ্যাসিম্পটোম্যাটিক করোনা ইনফেকশনও প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়েছে। এই প্রতিরোধক ক্ষমতাটি মূলত পরিলক্ষিত হয় ভ্যাকসিনের অর্ধেকডোজ/পূর্ণডোজ টিকাতে। টিকাটির দুটি পূর্ণডোজ যেখানে অ্যাসিম্পটোম্যাটিক ইনফেকশন প্রতিরোধ করে মাত্র ৪ শতাংশ, সেখানে অর্ধেকডোজ/পূর্ণডোজ টিকা ইনফেকশন প্রতিরোধ করে প্রায় ৬০ শতাংশ। অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের এই সক্ষমতাটি সংক্রমণ বিস্তার রোধে বেশ কার্যকরী ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছ। ফাইজার বা মর্ডানার ভ্যাকসিনের এ ধরনের সংক্রমণ বিস্তার রোধের সক্ষমতা এখনও প্রমানিত হয়নি।
সব কিছুর বিচারে অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের ফেইজ-৩ ট্রায়ালের ফলাফল বেশ ভাল মনে হলেও এখনও বেশ কিছু প্রশ্ন এবং জটিলতা রয়ে গেছে। আর এই কারনেই ভ্যাকসিনটির আন্তর্জাতিক বাজারে অনুমোদনে কিছুটা বিলম্ব হতে পারে। গত দু’ সপ্তাহ ধরে ব্রিটিশ রেগুলেটরি বডি (এমএইচআরএ) অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের সকল ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফলাফল রোলিং রিভিউয়ের মাধ্যমে পর্যালোচনা করছে। এখনও বোঝা যাচ্ছে না যে তারা ভ্যাকসিনটিকে ইমারজেন্সি ব্যাবহারের অনুমোদন দিবে কিনা। যদি দিয়েও দেয়, তা হবে মূলত যুক্তরাজ্যের জন্য। যুক্তরাষ্ট্রের রেগুলেটরি বডি এফডিএ এবং বিশ্ব স্বাস্থ সংস্থা কিছুটা ইংগিত দিয়েছে যে অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের ফেইজ-৩ ট্রায়ালের অন্তর্বর্তীকালীন ফলাফল আপাতত অনুমোদন দেয়ার জন্য পর্যাপ্ত নয়।
__________________________________________
ড. খোন্দকার মেহেদী আকরাম,
এমবিবিএস, এমএসসি, পিএইচডি,
সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট,
শেফিল্ড ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাজ্য।



এফডিএ এবং ডাব্লিএইচও কেন বলছে যে অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের অন্তর্বর্তীকালীন ফলাফল পর্যাপ্ত নয়?

(১) অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের পূর্বপরিকল্পিত দুটি পূর্ণডোজ কার্যকারীতা দেখিয়েছে মাত্র ৬২ শতাংশ। স্বাভাবিকভাবেই এই সংখ্যাটি আশাব্যঞ্জক নয়। আর একারনেই অক্সফোর্ড বা অ্যাস্ট্রাজেনিকা সাধারনের মাঝে এই ডোজ প্রয়োগে আগ্রহী নয়।
(২) ফেইজ-৩ ট্রায়ালের সময় ভুলবশত ১,৩৬৭ জনকে প্রথমে দেয়া হয় অর্ধেকডোজ ভ্যাকসিন এবং দ্বিতীয় বারে দেয়া পূর্ণডোজ ভ্যাকসিন। সমসংখ্যক ভলান্টিয়ারকে অন্তর্ভূক্ত করা হয় কন্ট্রোল গ্রুপে, যাদের দেয়া হয় মেনিনজাইটিসের ভ্যাকসিন। প্রটোকল অনুযায়ী দুই ডোজের মধ্যে সময়ের ব্যবধান থাকার কথা ১ মাস বা ৪ সপ্তাহ। কিন্তু সরবরাহ বিলম্বিত হওয়ার কারনে, বাস্তবে এই গ্রুপের ৫৩ শতাংশ ভলান্টিয়ারকে এই ডোজ দুটো দেয়া হয় ৩ মাসেরও বেশী সময়ের ব্যবধানে। মাত্র ১ শতাংশেরও কম ভলান্টিয়ারকে প্রথম এবং দ্বিতীয় ডোজ টিকা দেয়া হয় ২ মাস ব্যবধানে। এভাবে লম্বা সময়ের ব্যবধানে প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ দেয়ায় ভ্যাকসিনটির কার্যকরীতা পাওয়া যায় ৯০ শতাংশ। কিন্তু এই ট্রায়াল থেকে কোন ভাবেই বলা যাবেনা যে টিকার এই ডোজ দুটি যদি প্রটোকল অনুযায়ী ১ মাস ব্যবধানে দেয়া হত তাহলে ভ্যাকসিনটির কার্যকারীতা কত শতাংশ হত? তাদেরই দুটি পূর্ণডোজ পাওয়া অন্য গ্রুপের ট্রায়ালে দেখা যায় যে দুই ডোজের মধ্যবর্তী সময় কমে আসলে টিকার কার্যকারীতাও কিছুটা কমে যায়। সুতরাং এই ট্রায়াল থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়না যে ৪ সপ্তাহের ব্যবধানে ভ্যাকসিন দিলে তা কতটুকু কার্যকর হবে। আর এ কারনেই অক্সফোর্ড এবং অ্যাস্ট্রাজেনিকাকে এই ট্রায়ালটি আবার করতে হবে।
(৩) শুধু তাই নয় এই অর্ধেকডোজ/পূর্ণডোজ ট্রায়াল গ্রুপের ভলান্টিয়ারদের কারও বয়সই ৫৫ বছরের বেশী ছিল না। একারনেই এই ডোজে ভ্যাকসিনটি ৬০-৮০ বছরের বৃদ্ধদের উপর কতটুকু কার্যকর তা রয়ে গেছে অজানা। যেহেতু বৃদ্ধরাই করোনা আক্রান্ত হলে মারা যায় বেশী, তাই তাদের জীবন রক্ষার জন্যই ভ্যাকসিন বেশী প্রয়োজন। ব্রিটেনে প্রথম ধাপে ভ্যাকসিন দেয়াই হবে ৮০ বছরের বেশী বয়সের মানুষদের। সুতরাং অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন প্রকৃতপক্ষেই বৃদ্ধদের সুরক্ষা দেয় কিনা তা দেখার জন্য অ্যাস্ট্রাজেনিকাকে আবারও ৭০-৮০ বছরের বৃদ্ধদের উপর বাড়তি একটি ট্রায়াল করতে হবে।
(৪) ফেইজ-৩ ট্রায়ালে ভ্যাকসিনের কার্যকারীতার সার্বজনীনতা দেখা হয়। অর্থাৎ ভ্যাকসিনটি বিভিন্ন এথনিক সম্প্রদায়, যেমন শ্বেতাংগ, কৃষ্ণাঙ্গ এবং এশিয়ানদের উপর সমভাবে কার্যকর কিনা তা দেখা হয়। অক্সফোর্ডের ট্রায়ালে এই অর্ধেকডোজ/পূর্ণডোজ গ্রুপে এথনিক ডাইভারসিটি ছিল মাত্র ৮ শতাংশ এবং ৯২ শতাংশই ছিল ব্রিটিশ শ্বেতাংগ। ফাইজার বা মর্ডানার ক্ষেত্রে এই এথনিক ডাইভারসিটি ছিল প্রায় ৩০-৪০ শতাংশ।
(৫) একটা ভ্যাকসিনকে আপামোর জনসাধারনের উপর প্রয়োগের জন্য অনুমোদন পেতে হলে, এটা দেখাতে হয় যে ভ্যাকসিনটি সকল বয়স এবং সকল গৌত্রের মানুষের উপর কার্যকরী। একারনেই অ্যাস্ট্রাজেনিকা এখন এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে সামনে রেখে নতুন করে আরেকটি ফেইজ-৩ ট্রায়াল চালাবে খুব শীঘ্রই। নতুন ট্রায়াল ছাড়া তাদের ভ্যাকসিনটি এফডিএ এবং ডাব্লিউএইচও এর অনুমোদন নাও পেতে পারে।
(৬) ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে ভুল ওষুধ বা ভুল ডোজ প্রয়োগের কোন অবকাশ নেই। তবুও কেন অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের ট্রায়ালে ১৩ শ জনের উপরে ভুল করে পূর্ণ ডোজের পরিবর্তে অর্ধেক ডোজ প্রয়োগ করা হল? এর ব্যাখ্যায় ল্যানসেট পেপারটিতে বলা হয়েছে যে এই ভুলটি হয়েছে উৎপাদিত ভ্যাকসিনের পরিমাপ নির্নয়ের পদ্ধতিগত ত্রুটির কারনে। অ্যাস্ট্রাজেনিকার ট্রায়ালে ব্যবহৃত ভ্যাকসিন প্রস্তুত করা হয় দুটি থার্ড-পার্টি কোম্পানি থেকে। এদের মধ্যে একটি হল যুক্তরাজ্যের কিলি ইউনিভার্সিটির কোবরা বায়োলজিকস্ এবং আরেকটি ইতালির অ্যাডভেন্ট। এদের ভেতর একটি কোম্পানি তাদের উৎপাদিত ভ্যাকসিনের প্রতি ডোজে ভাইরাসের সংখ্যা পরিমাপ করেছিল স্পেকট্রোফটোমেট্রির মাধ্যমে। পরবর্তিতে দেখা যায় এই পদ্ধতিতে যেই পূর্ণ ডোজে ৫০ বিলিয়ন ভাইরাস পার্টিকেল নির্নীত হয়েছে, পিসিআর টেস্টে দেখা যায় সেখানে আসলে রয়েছে ২২ বিলিয়ন ভাইরাস পার্টিকেল! আর এভাবেই একটি ভুল পদ্ধতির কারনে হাজার খানেক ভলান্টিয়ারকে পূর্ণ ডোজ ভেবে অর্ধেক ডোজ ভ্যাকসিন দেয়া হয়েছে। পরবর্তিতে অবশ্য এই ত্রুটি রেগুলেটরি বডিকে অবহিত করা হয়েছে এবং ডোজ পরিমাপের পদ্ধতি পিসিআর স্থির করা হয়েছে, কারন পিসিআরই সবচেয়ে সঠিক ভাবে ভ্যাকসিনের ভাইরাসের পরিমান নির্নয় করতে পারে।
এখন আরেকটি প্রশ্ন সবার সামনে। তা হল কেন সমপরিমানে দুই ডোজ ভ্যাকসিন দেয়াতে ভ্যাকসিনের কার্যকারীতা কমে যায়, কিন্ত প্রথমে কম ডোজ দিলে কার্যকারীতা বাড়ে?
অক্সফোর্ডের চ্যাডক্স-১ ভ্যাকসিনটি একটি অ্যাডিনোভাইরাস ভেক্টর ভিত্তিক ভ্যাকসিন। এক্ষেত্রে শিম্পাঞ্জির অ্যাডিনোভাইরাসের ভেতরে করোনাভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনের জীন প্রবেশ করিয়ে দেয়া হয়। এখানে জীবিত অ্যাডিনোভাইরাস জীনটির বাহক হিসেবে কাজ করে। ভ্যাকসিন হিসেবে এই রুপান্তরিত অ্যাডিনোভাইরাসকে যখন মাংসপেশিতে ইনজেকশনের মাধ্যমে প্রবেশ করানো হয় তখন ঐ অ্যাডিনোভাইরাস শরীরে গিয়ে স্পাইক প্রোটিন তৈরী করে। পরবর্তীতে যার বিপরীতে আমাদের ইমিউন সিস্টেম প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলে। আর এভাবেই রুপান্তরিত অ্যাডিনোভাইরাস আমাদের ইমিউন সিস্টেমকে করোনাভাইরাসের বিপরীতে ট্রেইন-আপ করে।
তবে এক্ষেত্রে আরেকটি ঘটনাও ঘটে সমান্তরালে। আমাদের ইমিউন সিস্টেম অ্যাডিনোভাইরাসের বিপরীতেও রোগপ্রতিরোধী ব্যবস্থা গড়ে তোলে। একে বলে ‘এন্টি-ভেক্টর ইমিউনিটি’। এই ইমিউনিটি নিরীহ ভেক্টর-ভাইরাসকে খারাপ জীবানু ভেবে ধ্বংস করে ফেলে! আর এতে করে প্রথম ডোজে সমস্যা না হলেও পরবর্তী ডোজে রুপান্তরিত অ্যাডিনোভাইরাসটি অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে। একারণেই এন্টি-ভেক্টর ইমিউনিটি এধরনের ভাইরাল ভেক্টর ভিত্তিক ভ্যাকসিনের জন্য একটা বড় অন্তরায়।
এ সমস্যা এড়াতেই কিন্তু অক্সফোর্ড তাদের ভ্যাকসিনে মানুষের অ্যাডিনোভাইরাস ব্যবহার না করে, ব্যবহার করেছে শিম্পাঞ্জির অ্যাডিনোভাইরাস। কারণ আমাদের শরীরে সাধারনত শিম্পাঞ্জি অ্যাডিনোভাইরাসের বিপরীতে কোন ইমিউনিটি থাকেনা। তবে ভ্যাকসিনের মাধ্যমে প্রথম ডোজ অ্যাডিনোভাইরাস প্রবেশ করানোতে আমাদের ইমিউন সিস্টেম এই শিম্পাঞ্জি অ্যাডিনোভাইরাসের বিপরীতেও ইমিউনিটি তৈরী করতে পারে। সেক্ষেত্রে প্রথমে বেশী ডোজের ভাইরাস প্রবেশ করালে শরীরে শক্তিশালী এন্টি-ভেক্টর ইমিউনিটি তৈরী হতে পারে, যা পরবর্তিতে দ্বিতীয় ডোজের ভাইরাসকে নিস্ক্রিয় করে ফেলতে পারে। তবে প্রথমে কম ডোজ দিলে দুর্বল এন্টি-ভেক্টর ইমিউনিটি তৈরী হয় যা হয়তো দ্বিতীয় ডোজের অ্যাডিনোভাইরাস ভেক্টরকে তেমন প্রভাবিত নাও করতে পারে। ল্যানসেট পেপারটিতে এরকম ঘটনা অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের বেলায় ঘটছে বলেই কিছুটা ধারনা দিয়েছে। এর স্বপক্ষে এখনও অবশ্য কোন পরীক্ষালব্ধ প্রমান নেই।
এযাবৎ চালানো ফেইজ-১/২/৩ ট্রায়ালে ভ্যাকসিনটির তেমন মারাত্মক কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হয়নি এবং ভ্যাকসিনটি নিরাপদ হিসেবেই বিবেচিত হয়েছে। তবে সামনে এসেছে দুইটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন:
(১) অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনটি কি বৃদ্ধদের উপর কার্যকরী?
(২) ভ্যাকসিনটি কি সকল বর্ণ এবং গৌত্রের মানুষের উপর সমভাবে কার্যকরী?
অর্ধেকডোজ/পূর্ণডোজ ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে এ দুটো প্রশ্নের উত্তর এখনও অজানা। সমগ্র বিশ্বের মানুষের জন্য ভ্যাকসিনটিকে সার্বজনীন করতে হলে এই প্রশ্নগুলির উত্তর জানা একান্তই জরুরী। আর এ কারনেই এসবের যথাযথ উত্তর ছাড়া ভ্যাকসিনটি অত সহজে এফডিএ বা ডাব্লিউএইচওর অনুমোদন পাবে না।
এটা অনুধাবন করতে পেরেই অ্যাস্ট্রাজেনিকা এখন তাদের ভ্যাকসিনটির অর্ধেকডোজ/পূর্ণডোজের নতুন ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল করার কথা ভাবছে। এই ট্রায়ালটি হবে আন্তর্জাতিক পরিসরে। এ মাসের শেষে বা আগামী বছরের প্রারম্ভেই ট্রায়াল শুরু হওয়ার কথা। অনুমান করা যায় যে এই নতুন ট্রায়ালটি সম্পন্ন হতে প্রায় তিন মাস সময় লাগবে। অতএব, বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশে ভ্যাকসিনটি পেতে হয়তো পূর্বনির্ধারিত সময়ের চেয়ে তিন মাস বেশী সময় লাগবে। অর্থাৎ বাংলাদেশে ভ্যাকসিনটি হয়তো আগামী বছরের মে-জুনের দিকে আসতে পারে। তবে কিছুটা দেরি হলেও অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন আসবে, এবং তা মানব সভ্যতায় আশির্বাদ হয়েই আসবে। এ আশাটুকু করা যেতেই পারে।
__________________________________________
ড. খোন্দকার মেহেদী আকরাম,
এমবিবিএস, এমএসসি, পিএইচডি,
সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট,
শেফিল্ড ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাজ্য।



বাংলাদেশে করোনার দ্বিতীয় ওয়েভ: অবস্থান এখন সূচনালগ্নে

বাংলাদেশে করোনার দ্বিতীয় ওয়েভ শুরু হয়ে গেছে, এটা নিয়ে অনিশ্চয়তার আর কোন অবকাশ নেই। তথ্য উপাত্তের দিকে তাকালেই এটা পরিস্কার বোঝা যায়। তবে মহামারীর ওয়েভ প্যাটার্ন বুঝতে গেলে ওয়েভ সমন্ধে একটা সাধারন ধারনা থাকা দরকার।

                                                 গ্রাফে সংক্রমণের ওয়েভ প্যাটার্ন

(১) মহামারীর ওয়েভ বা ঢেউ হচ্ছে সংক্রমণ বিস্তারের একটি ভিজুয়াল রিপ্রেজেন্টেশন বা চিত্র, যা থেকে তথ্যের দিকে না তাকিয়ে শুধু গ্রাফ বা চিত্রের দিকে তাকিয়েই বলে দেয়া যায় একটা নির্দিস্ট সময় ভাইরাসের সংক্রমণ বাড়ছে নাকি কমছে।
(২) প্রতিদিন কয়জন করে নতুন রোগী সনাক্ত হচ্ছে এইটার উপর ভিত্তি করে যে গ্রাফ অঙ্কন করা হয়, তা দিয়ে ওয়েভের ধরনটি বোঝা যায়। ওয়েভ প্রকাশের গ্রাফে সংক্রমণের সংখ্যা অবশ্যই লিনিয়ার বা প্রকৃত সংখ্যা হতে হবে, লগে রুপান্তরিত সংখ্যা দিয়ে ওয়েভ বোঝা যাবে না।
(৩) সুতরাং কোন গ্রাফে সংক্রমণের ওয়েভ প্যাটার্ন বুঝতে হলে প্রথমে লক্ষ্য করুন গ্রাফটি কী ‘লিনিয়ার স্কেলে’ নাকি ‘লগারিদমিক স্কেলে’ আছে?
(৪) একটি মহামারীর ওয়েভে তিনটি অংশ থাকে: আপ স্লোপ বা উন্নতির ঢাল, পিক বা চূড়া এবং ডাউন স্লোপ বা অবনতির ঢাল।
(৫) প্রতিদিন যখন সংক্রমণের সংখ্যা বাড়তে থাকে তখন তা তৈরী করে ওয়েভের ‘উন্নতির ঢাল’। এভাবে বাড়তে বাড়তে একটা সময় গিয়ে সংক্রমণ আর বাড়ে না, তখন এটাকে বলা হয় চূড়া। এর পর প্রতিদিন সংক্রমণের সংখ্যা আবার কমতে থাকে যা তৈরী করে ওয়েভের ‘অবনতির ঢাল’। এভাবেই তৈরী হয় মহামারীর একটি পূর্ণ ওয়েভ।
(৬) এবার দেখা যাক যুক্তরাজ্যের করোনা মহামারীর ওয়েভের দিকে (চিত্র-১)। এখানে প্রথম এবং দ্বিতীয় ওয়েভ ভাল ভাবেই দৃশ্যমান। প্রথম ওয়েভটি শুরু হয় মার্চের মাঝামাঝিতে এবং শেষ হয় জুলাইয়ের মাঝামাঝিতে। এরপর দ্বিতীয় ওয়েভ শুরু হয় আগস্টের শেষে যা পিকে পৌঁছে মধ্য নভেম্বরে। এরপর শুরু হয় দ্বিতীয় ওয়েভের অবনতির ঢাল। যার কারন হচ্ছে ২ নভেম্বর থেকে ২ ডিসেম্বর পর্যন্ত লকডাউন।
(৭) এবার তাকাই যুক্তরাষ্ট্রের দিকে (চিত্র-২)। যুক্তরাষ্ট্রে করোনার তিনটি ওয়েভ দৃশ্যমান। প্রথম ওয়েভেটি বিস্তৃত মধ্য মার্চ থেকে মধ্য জুন পর্যন্ত। দ্বিতীয় ওয়েভের শুরু হয় ১৮ জুনে এবং শেষ হয় ৯ সেপ্টেম্বর। তৃতীয় ওয়েভটি শুরু হয় অক্টোবরের শুরুতে যা এখন চূড়ার দিকে ধাবিত হচ্ছে। এই তৃতীয় ওয়েভেই এযাবৎকালের সর্বচ্চ দৈনিক মৃত্যু ৩,১০০ জন রেকর্ড করা হয়েছে ৪ ডিসেম্বর!
(৮) এবার আসি বাংলাদেশে। অনেকেই বলছে যে বাংলাদেশ করোনার প্রথম ওয়েভেই শেষ হয়নি, তাহলে দ্বিতীয় ওয়েভ আসলো কোথা থেকে? বাংলাদেশে প্রথম ওয়েভের সূচনা ১০ এপ্রিল (চিত্র-৩)। এর পর থেকে প্রতিদিন সংক্রমণের সংখ্যা বাড়তে তাকে সমানুপাতিক হারে, যা পিক বা চূড়ায় পৌঁছে ২ জুলাই এবং তার পর থেকে সংক্রমণ ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে। সেপ্টেম্বরের শেষে গিয়ে সংক্রমণের এই ক্রমাবনতি স্থিতিশীল অবস্থায় পৌঁছে। আর এভাবেই প্রথম ওয়েভটি সম্পন্ন হয়। এরপর অক্টোবরের শেষ থেকে সংক্রমণের সংখ্যা আবার ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে এবং সূচনা করে দ্বিতীয় ওয়েভটির। বাংলাদেশে করোনা মহামারীটি এখন দ্বিতীয় ওয়েভের ‘উন্নতির ঢালে’ অবস্থান করছে। ঠিকমত টেস্টের সংখ্যা বাড়ানো গেলে হয়ত দ্বিতীয় ওয়েভটি পরিস্কারভাবে বোঝা যাবে।
(৯) অন্যদিকে, ইন্ডিয়াতে কিন্তু মহামারীটি এখনও প্রথম ওয়েভেই সীমাবদ্ধ রয়েছে (চিত্র-৪)।
অতএব অনেকটা নির্ভরশীলতার সাথে বলা যায় যে বাংলাদেশে এখন করোনা মহামারীর দ্বিতীয় ওয়েভের সূচনালগ্নে রয়েছে। তবে, করোনা মহামারীতে একদম টিপিক্যাল ওয়েভ প্যাটার্ন অনেকটা অনুপস্থিত!
__________________________________________
ড. খোন্দকার মেহেদী আকরাম,
এমবিবিএস, এমএসসি, পিএইচডি,
সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট,
শেফিল্ড ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাজ্য।



পর্ব : ১ ভুল ডোজ এখন ‘লাকি ডোজ’,কবে পাচ্ছি অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন

সঠিক ডোজের কার্যকারিতা ৬২ শতাংশ। আর ভুল ডোজের কার্যকারিতা ৯০ শতাংশ। ফলে ভুল ডোজ এখন ‘লাকি ডোজ’!

ঘটনাটি ঘটেছে অক্সফোর্ড এবং অ্যাস্ট্রাজেনেকার যৌথ উদ্যোগ করোনাভাইরাস ভ্যাকসিনের তৃতীয় ধাপের ট্রায়ালের ক্ষেত্রে। যদিও মানুষের শরীরে ভ্যাকসিন ট্রায়ালের ক্ষেত্রে ভুলের সুযোগ নেই বলে মনে করেন ড. খোন্দকার মেহেদী আকরাম। ড. আকরাম বর্তমানে ব্রিটেনের দ্য ইউনিভার্সিটি অব শেফিল্ডের জ্যেষ্ঠ গবেষক হিসেবে কর্মরত।

বায়ো মেডিকেল সাইন্স গবেষক ব্রিটিশ-বাংলাদেশি এই বিজ্ঞানী গত বৃহস্পতিবার টেলিফোনে দ্য ডেইলি স্টারকে বলছিলেন, ‘এক ডোজ স্ট্যান্ডার্ড ভ্যাকসিনে ৫০ বিলিয়ন ভাইরাস থাকে। ভ্যাকসিন গ্রহীতার শরীরে কম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং এই ভ্যাকসিনে ভাইরাসের সংখ্যা পরিমাপ করতে গিয়েই ভুলের বিষয়টি ধরা পড়েছে। অ্যাস্ট্রাজেনেকার বিজ্ঞানীরা নয়, ভুল ধরেছেন অক্সফোর্ডের বিজ্ঞানীরা। তারা দেখতে পেয়েছেন, প্রতি ডোজে যেখানে থাকার কথা গড়ে ৫০ বিলিয়ন ভাইরাস, সেখানে রয়েছে ২৫ বিলিয়ন ভাইরাস। মানুষের শরীরে ওষুধ বা ভ্যাকসিন ট্রায়ালের ক্ষেত্রে ভুল করার কোনো অবকাশ নেই। এখানে বাঁচা-মরার প্রশ্ন। অ্যাস্ট্রাজেনেকা যে ভুল করেছে তা কোনো বিবেচনাতেই করার সুযোগ নেই। এর জন্য অ্যাস্ট্রাজেনেকার জবাবদিহি করা উচিত। ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রক সংস্থা এমএইচআরএ থেকে অনুমতি নিয়েছিল পূর্ণ ডোজ করে ব্যবহারের। অর্ধেক ডোজ দেওয়া হয়েছে সম্পূর্ণ ভুলবশত, যা অনুমোদনের শর্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।’

অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিনের প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের ট্রায়াল অত্যন্ত সন্তোষজনক ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সমস্যাটা হয়েছে তৃতীয় ধাপের ট্রায়ালে। তৃতীয় ধাপের ট্রায়াল চলছিল ব্রিটেন, ব্রাজিল, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র এবং দক্ষিণ আফ্রিকায়। তৃতীয় ধাপের ফলাফল পর্যালোচনা করেছে ব্রিটেন এবং ব্রাজিলের ট্রায়ালের ডেটার ওপর ভিত্তি করে। এই ট্রায়ালে ভলান্টিয়ারের সংখ্যা ছিল প্রায় ২৪ হাজার। প্রথমদিন এক ডোজ এবং ২৮ দিন পর আরেক ডোজ দেওয়ার কথা। কিন্তু কিছু ভলান্টিয়ারকে প্রথম ডোজ দেওয়ার পরে তারা বুঝতে পারেন কোথাও ভুল হয়েছে। তারা লক্ষ্য করেন ব্রিটেনের ২,৭৪১ জন ভলান্টিয়ারকে প্রথমে পূর্ণ এক ডোজের পরিবর্তে অর্ধেক ডোজ ভ্যাকসিন দেওয়া হয়। তারা সঙ্গে সঙ্গে এ বিষয়টি এমএইচআরএ নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে বিষয়টি জানায়। এমএইচআরএ তখন দ্বিতীয় ডোজটি পূর্ণ ডোজে (Full dose) ট্রায়াল অব্যাহত রাখার নির্দেশনা দেয়। তার মানে তৃতীয় ধাপের ট্রায়ালে ২,৭৪১ জনকে দেওয়া হয়েছে দেড় ডোজ ভ্যাকসিন এবং অন্য প্রায় নয় হাজার জনকে দেওয়া হয়েছে দুই ডোজ। ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা গেল, পূর্ণ দুই ডোজ প্রাপ্তদের ক্ষেত্রে কার্যকারিতা ৬২ শতাংশ। আর দেড় ডোজ প্রাপ্তদের ক্ষেত্রে কার্যকারিতা ৯০ শতাংশ। এ কারণেই ভুল ডোজকে বলা হচ্ছে “লাকি ডোজ”।’

‘লাকি ডোজ’র কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় দেখা দেওয়ার ব্যাখ্যা দিয়ে ড. আকরাম বলছিলেন, ‘২,৭৪১ জনের ক্ষেত্রে ডাইভারসিটি ছিল না। মানে এথনিক মাইনরিটি, কৃষ্ণাঙ্গ, এশিয়ান, আফ্রিকান ছিল না। যেখানে ডাইভারসিটি থাকার কথা ৩৩-৪০ শতাংশ। অন্যান্য ভ্যাকসিন যেমন ফাইজার বা মডার্নার ক্ষেত্রে যা আছে ৪০ শতাংশ। বয়সের বিষয়টিও এ ক্ষেত্রে ঠিক নেই। দেড় ডোজ প্রাপ্ত ভলান্টিয়ারদের বয়স ছিল ১৮-৫৫ বছর। বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে ভ্যাকসিনের এই দেড় ডোজ প্রয়োগ করা হয়নি।’

‘এ কারণে এ ফলাফল থেকে বলা যায় না যে, বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে এই ডোজ কার্যকর হবে। যেখানে ফাইজার ও মডার্নার ভ্যাকসিন ৬০, ৭০ বা ৮০ বছর বয়স্কদের ক্ষেত্রেও কার্যকর। অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন ফুল ডোজে অর্থাৎ এক ডোজ এক ডোজ করে পূর্ণ দুই ডোজের ট্রায়াল হয়েছে ৮,৯০০ জনের ওপর। আর হাফ ডোজ ও ফুল ডোজ মানে দেড় ডোজে ট্রায়াল হয়েছে মাত্র ২,৭৪১ জনের ওপর। এত কম সংখ্যক ভলান্টিয়ারের ওপর চালানো এই হাফ ডোজ/ফুল ডোজের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে ভ্যাকসিনটির অনুমোদন না পাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।’

অক্সফোর্ডের এই ভ্যাকসিনের তৃতীয় ধাপের ট্রায়াল সম্পন্ন হওয়ার পর আবার সবকিছু নতুন করে ভাবতে হচ্ছে।

‘অ্যাস্ট্রাজেনেকার সিইও বলেছেন, তৃতীয় ধাপের ট্রায়াল তারা আবার নতুন করে শুরু করবে। তৃতীয় ধাপের ট্রায়াল যেসব দেশে চলছিল, সেখানে তারা নতুন করে তৃতীয় ধাপের ট্রায়াল শুরু করবে। সিইও তার বক্তব্যে দেশের নাম উল্লেখ না করলেও বোঝা গেছে যে, আন্তর্জাতিকভাবে তারা ফ্রেশ ট্রায়াল শুরু করবে। হাফ ডোজ, ফুল ডোজের ট্রায়াল নতুন করে শুরু করলে কত সময় লাগবে বলা মুশকিল’, বলছিলেন এই ব্রিটিশ-বাংলাদেশি বিজ্ঞানী।

ড. আকরাম বলেন, ‘তৃতীয় ধাপের ট্রায়াল তারা শুরু করেছিল গত ২৭ জুন। সেই হিসেবে শেষ করতে সময় লাগলো প্রায় সাড়ে চার মাস। সিইওর বক্তব্য থেকে বুঝতে পারছি নতুন করে শুরু করা ট্রায়ালে আগের চেয়ে সময় কম লাগবে। তারা নতুন করে হাফ ডোজ, ফুল ডোজ ট্রায়ালের অনুমতি নেবে এমএইচআরএ থেকে। নতুন করে শুরু করলে আমার ধারণা- দুই থেকে তিন মাসের মতো সময় লাগবে। কারণ হাফ ডোজ, ফুল ডোজের ২,৭৪১ জনের ট্রায়ালের ফল তাদের হাতে আছে। এখন সম্ভবত আরও আট হাজারের ওপর ট্রায়াল করবে। এখানে তারা ডাইভারসিটি ও বয়সের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করবে।’

ট্রায়াল জটিলতায় আটকে গেলেও অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই বাংলাদেশি-ব্রিটিশ এই বিজ্ঞানীর।

তিনি বলছিলেন, ‘এখন পর্যন্ত যে ট্রায়াল হয়েছে এবং তৃতীয় ধাপের ট্রায়াল সম্পন্ন হলে, আমার ধারণা অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা সন্তোষজনকই পাওয়া যাবে। ফাইজার বা মডার্নার মতো কার্যকারিতা যদি ৯০-৯৫ শতাংশের ওপরে নাও হয়, ৮০-৮৫ শতাংশ কার্যকর হবে বলে মনে করছি। যদি এমন ফল পাওয়া যায় তবে ভাবার কারণ নেই যে, ফাইজারের ভ্যাকসিনের চেয়ে অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন খারাপ। ৫০ শতাংশ কার্যকর হলেই এফডিএ, সিডিসি সেই ভ্যাকসিনকে কার্যকর হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। যেমন: প্রতিষ্ঠিত ফ্লু ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা কিন্তু ৫০-৬০ শতাংশ, যা নিয়মিত ব্যবহৃত হচ্ছে।’

পর্ব : ২ ভুল ডোজ এখন ‘লাকি ডোজ’,কবে পাচ্ছি অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন

__________________________________________

ড. খোন্দকার মেহেদী আকরাম,
এমবিবিএস, এমএসসি, পিএইচডি,
সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট,
শেফিল্ড ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাজ্য।

 




পর্ব : ২ ভুল ডোজ এখন ‘লাকি ডোজ’,কবে পাচ্ছি অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন

ব্রিটেনের এমএইচআরএ অনেকটা এফডিএ’র কাউন্টার পার্ট হিসেবে পরিচিত। অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিনের তৃতীয় ধাপের যে ট্রায়াল সম্পন্ন হয়েছে, সেটি এমএউচআরএ এখন পর্যালোচনা করছে। অনুমতি দেবে কি না, তা হয়তো আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে জানা যাবে।

ড. আকরামের পর্যালোচনা, ‘অনুমতি দেবে কি না জানি না। যদি ধরে নেই অনুমতি দেবে, তবে সেটি দেবে শুধু ব্রিটেনের জন্য। ভারত, ব্রাজিল বা অন্য দেশের জন্য নয়। ভারত বা ব্রাজিল অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিনের ট্রায়াল করছে, উৎপাদন করবে। কিন্তু তারা অনুমোদন দিতে পারবে না। তারা তখনই অনুমোদন পাবে, যখন ডব্লিউএইচও অনুমোদন দেবে। ট্রায়ালের বর্তমান ফলাফলকে ডব্লিউএইচও ও এফডিএ সন্তোষজনক মনে করছে না। তারা ইতোমধ্যে সেই ইঙ্গিত দিয়েছে।’

‘ভারতে সেরাম যে ভ্যাকসিন উৎপাদন করবে, ডব্লিউএইচও অনুমোদন না দিলে ভারত নিজ দেশে বা অন্য কোথাও তা বিপণন করতে পারবে না। তার মানে বাংলাদেশও ভ্যাকসিন পাবে না, পেতে দেরি হবে। ডব্লিউএইচও আবার আস্থা রাখে এফডিএ’র ওপর। এফডিএ অনুমোদন দিলে ডব্লিউএইচও সাধারণত অনুমোদন দিয়ে দেয়।’

কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান অনুমোদনের আগেই ভ্যাকসিন উৎপাদন শুরু করেছে। এ বিষয়ে ড. আকরাম বলছিলেন, ‘কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন অনুমোদন পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যাতে বাজারে নিয়ে আসা যায়, সে কারণে অনুমোদনের আগেই অনেকে ভ্যাকসিন উৎপাদন করে মজুদ করেছে। অনুমোদন না পেলে ভ্যাকসিন ধ্বংস করে ফেলবে। ভারতে সেরাম যেমন কাগজপত্র প্রস্তুত করে রেখেছিল। কারণ তারা নিশ্চিত ছিল যে, অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন অনুমোদন পেতে যাচ্ছে। কিন্তু ট্রায়ালের ভুল ও নতুন ট্রায়ালের বিষয়টি সামনে আসায় সবকিছুই অনিশ্চিত হয়ে গেছে।’

‘এমএইচআরএ’র অনুমোদন মানে শুধু ইউকেতে অনুমোদন, ইউরোপেও নয়। ফাইজারের ৮ লাখ ডোজ ভ্যাকসিন ইউকে দু-একদিনের মধ্যে পেয়ে যাবে। আগামী সপ্তাহের মাঝামাঝিতে ভ্যাকসিনেশন শুরু করতে পারবে। সমস্যা হচ্ছে ফাইজারের ভ্যাকসিন মাইনাস ৮০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হয়। এই সংরক্ষণ ব্যবস্থা শুধু ইউকের বড় বড় হাসপাতালে আছে। সারাদেশে যে সেবা কেন্দ্রগুলো থেকে মানুষ চিকিৎসা সেবা পেয়ে থাকে, সেসব জায়গায় মাইনাস ৮০ ডিগ্রিতে সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেই। এই ব্যবস্থা ইউরোপের কোনো দেশেই সর্বত্র নেই’, বলছিলেন ড. আকরাম।

ফাইজার, মডার্না ও অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন ছাড়াও আলোচনায় আছে রাশিয়ার একটি ও চীনের দুটি ভ্যাকসিন। রাশিয়া ও চীনের ভ্যাকসিন বিষয়ে ড. আকরামের পর্যালোচনা, ‘তৃতীয় ধাপের ট্রায়াল ছাড়া ভ্যাকসিন অনুমোদন দেওয়া যায় না। রাশিয়া তার ভ্যাকসিন তৃতীয় ধাপের ট্রায়াল সম্পন্ন না করেই অনুমোদন দিয়েছিল। এজন্য তারা সংবিধান পরিবর্তন করে নিয়েছে। নিজ দেশে প্রয়োগ করতে শুরু করেছে। রাশিয়া আন্তর্জাতিক বাজারেও তার ভ্যাকসিন নিয়ে আসতে চায়। সে কারণে ৪০ হাজার মানুষের ওপর তৃতীয় ধাপের ট্রায়াল শুরু করেছে। এর মধ্যে ২০ হাজার মানুষের ওপর প্রয়োগ করা ফলে তারা দেখিয়েছে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা ৯২ শতাংশ। রাশিয়ার ভ্যাকসিন অনেকটা অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিনের মতো। রাশিয়া ব্যবহার করেছে মানুষের অ্যাডিনো ভাইরাস আর অক্সফোর্ড ব্যবহার করেছে শিম্পাঞ্জির অ্যাডিনো ভাইরাস।’

‘চীনও তার সিনোভ্যাক ভ্যাকসিন তৃতীয় ধাপের ট্রায়াল না করেই নিজ দেশের জনগণকে দিতে শুরু করে। চীন তার আরেকটি ভ্যাকসিন ক্যানসিনোবায়ো তৃতীয় ধাপের ট্রায়াল না করেই প্রয়োগ করেছে আর্মির ওপর। তবে, চীন সিনোভ্যাক ভ্যাকসিনের তৃতীয় ধাপের ট্রায়াল শুরু করেছে। সিনোভ্যাকের তৃতীয় ধাপের ট্রায়াল বাংলাদেশে হওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত হয়নি। মধ্যপ্রাচ্য, তুরস্ক, ব্রাজিলে তাদের ভ্যাকসিনটির তৃতীয় ধাপের ট্রায়াল চলছে’, বলছিলেন ড. আকরাম।

তিনি বলেন, ‘ভ্যাকসিন তো আসবেই। তবে ইউকেতে ফাইজারের ভ্যাকসিন অনুমোদন পাওয়া ছাড়া, পৃথিবীর আর কোনো ভ্যাকসিন কোথাও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এখনো অনুমোদন পায়নি।’

পর্ব : ১ ভুল ডোজ এখন ‘লাকি ডোজ’,কবে পাচ্ছি অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন

__________________________________________

ড. খোন্দকার মেহেদী আকরাম,
এমবিবিএস, এমএসসি, পিএইচডি,
সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট,
শেফিল্ড ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাজ্য।

 




২ ডিসেম্বর ২০২০ দিনটি ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে

আজ যুক্তরাজ্যে বিশ্বের প্রথম ফাইজারের তৈরী করোনা ভ্যাকসিনটির অনুমোদন দেয়া হল। মাত্র ১০ মাসের ভেতর ফাইজার এবং বায়োন্টেক তাদের এমআরএনএ ভ্যাকসিন তৈরী করে দেখাল যে একাডেমিকস, ইন্ডাস্ট্রি এবং সরকারের সম্মিলিত প্রয়াসে এবং বিজ্ঞানের যথাযথ প্রয়োগে ১০ বছরের কাজ ১০ মাসে করা সম্ভব!
(১) প্রায় ৪০ হাজার ভলান্টিয়ারের উপর চালানো ফেইজ-৩ ট্রায়ালে ফাইজারের ভ্যাকসিনটি ৯৫ শতাংশ কোভিড-১৯ প্রতিরোধে সক্ষম হয়েছে।
(২) ভ্যাকসিনটির ২১ দিন অন্তর দুইটি ডোজ দেয়ার ৭ দিন পর থেকেই তা কোভিড-১৯ থেকে সুরক্ষা দেয়।
(৩) ভ্যাকসিনটির ট্রায়ালে প্রায় ৪০ শতাংশ এথনিক ডাইভারসিটি ছিল। অর্থাৎ এটা বিভিন্ন গোত্রের মানুষের উপর সমানভাবে কার্যকরী। ফাইজারের ভ্যাকসিনটি বৃদ্ধদের উপরও কার্যকরী।
(৪) ব্রিটেনে আগামী সপ্তাহ থেকে ভ্যাকসিন প্রয়োগ শুরু হবে। প্রথম চালানে যুক্তরাজ্য ৮ লক্ষ ডোজ ভ্যাকসিন পাবে ফাইজারের কাছ থেকে যা দিয়ে ৪ লক্ষ মানুষকে ভ্যাকসিন দেয়া যাবে।
(৫) সর্বপ্রথম ভ্যাকসিন দেয়া হবে কেয়ার হোমে থাকা বৃদ্ধ এবং তাদের সেবায় নিয়োজিত স্টাফদের। এরপর দেয়া হবে ৮০ বছর বয়েসের বৃদ্ধ এবং স্বস্থসেবা কর্মীদের।
(৬) ফাইজারের কাছ থেকে যুক্তরাজ্য ৪০ মিলিয়ন ডোজ ভ্যাকসিন আগাম ক্রয় করে রেখেছে।
(৭) এই ভ্যাকসিনটি প্রস্তুত হচ্ছে বেলজিয়ামে এবং সেখান থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তা সরবরাহ করা হবে বিশেষ প্লেনে।
(৮) এক প্লেন ভর্তি ফাইজার ভ্যাকসিন যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছেছে গত সপ্তাহে। আমেরিকাতেও ভ্যাকসিন প্রয়োগ শুরু হবে দু সপ্তাহের ভেতরেই।
(৯) তবে, ফাইজারের ভ্যাকসিনটি ৯৫ শতাংশ কার্যকরী হলেও আমরা কিন্তু এখনও জানি না যে এই কার্যকারীতা কতদিন স্থায়ী হবে। এবং যদিও ভ্যাকসিনটি এখনও স্বল্পমেয়াদী তেমন কোন মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করেনি, এর দির্ঘমেয়াদী কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে কিনা তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে অন্তত আরও দুই বছর।
__________________________________________

ড. খোন্দকার মেহেদী আকরাম,
এমবিবিএস, এমএসসি, পিএইচডি,
সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট,
শেফিল্ড ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাজ্য।



পর্ব – ২: অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন সত্তর শতাংশ কার্যকরী হলেও প্রশ্ন রয়ে গেছে বেশ কয়েকটি!

এখন দেখা যাক, কেন সমপরিমানে দুই ডোজ ভ্যাকসিন দেয়াতে ভ্যাকসিনের কার্যকারীতা কমে যায়, কিন্ত প্রথমে কম ডোজ দিলে কার্যকারীতা বাড়ে?
অক্সফোর্ডের চ্যাডক্স-১ ভ্যাকসিনটি একটি অ্যাডিনোভাইরাস ভেক্টর ভিত্তিক ভ্যাকসিন। এক্ষেত্রে শিম্পাঞ্জির অ্যাডিনোভাইরাসের ভেতরে করোনাভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনের জীন প্রবেশ করিয়ে দেয়া হয়। এখানে জীবিত অ্যাডিনোভাইরাস জীনটির বাহক হিসেবে কাজ করে। ভ্যাকসিন হিসেবে এই রুপান্তরিত অ্যাডিনোভাইরাসকে যখন মাংসপেশিতে ইনজেকশনের মাধ্যমে প্রবেশ করানো হয় তখন ঐ অ্যাডিনোভাইরাস শরীরে গিয়ে স্পাইক প্রোটিন তৈরী করে। পরবর্তীতে যার বিপরীতে আমাদের ইমিউন সিস্টেম প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলে। আর এভাবেই রুপান্তরিত অ্যাডিনোভাইরাস আমাদের ইমিউন সিস্টেমকে করোনাভাইরাসের বিপরীতে ট্রেইন-আপ করে।
তবে এক্ষেত্রে আরেকটি ঘটনাও ঘটে সমান্তরালে। আমাদের ইমিউন সিস্টেম অ্যাডিনোভাইরাসের বিপরীতেও রোগপ্রতিরোধী ব্যবস্থা গড়ে তোলে। একে বলে ‘এন্টি-ভেক্টর ইমিউনিটি’। এই ইমিউনিটি নিরীহ ভেক্টর-ভাইরাসকে খারাপ জীবানু ভেবে ধ্বংস করে ফেলে! আর এতে করে প্রথম ডোজে সমস্যা না হলেও পরবর্তী ডোজে রুপান্তরিত অ্যাডিনোভাইরাসটি অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে। একারণেই এন্টি-ভেক্টর ইমিউনিটি এধরনের ভাইরাল ভেক্টর ভিত্তিক ভ্যাকসিনের জন্য একটা বড় অন্তরায়।

এ সমস্যা এড়াতেই কিন্তু অক্সফোর্ড তাদের ভ্যাকসিনে মানুষের অ্যাডিনোভাইরাস ব্যবহার না করে, ব্যবহার করেছে শিম্পাঞ্জির অ্যাডিনোভাইরাস। কারণ আমাদের শরীরে সাধারনত শিম্পাঞ্জি অ্যাডিনোভাইরাসের বিপরীতে কোন ইমিউনিটি থাকেনা। তবে ভ্যাকসিনের মাধ্যমে প্রথম ডোজ অ্যাডিনোভাইরাস প্রবেশ করানোতে আমাদের ইমিউন সিস্টেম এই শিম্পাঞ্জি অ্যাডিনোভাইরাসের বিপরীতেও ইমিউনিটি তৈরী করতে পারে। সেক্ষেত্রে প্রথমে বেশী ডোজের ভাইরাস প্রবেশ করালে শরীরে শক্তিশালী এন্টি-ভেক্টর ইমিউনিটি তৈরী হতে পারে, যা পরবর্তিতে দ্বিতীয় ডোজের ভাইরাসকে নিস্ক্রিয় করে ফেলতে পারে। তবে প্রথমে কম ডোজ দিলে দুর্বল এন্টি-ভেক্টর ইমিউনিটি তৈরী হয় যা হয়তো দ্বিতীয় ডোজের ভাইরাসকে তেমন প্রভাবিত নাও করতে পারে। এরকম ঘটনা অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের বেলায় ঘটছে কিনা তা সম্ভবত পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। গবেষণার ফলাফল কোন জার্নালে প্রকাশিত হলে আসল ঘটনাটা উন্মোচিত হবে।

এধরনের এন্টি-ভেক্টর ইমিউনিটির সমস্যা এড়াতে রাশিয়ার স্পুটনিক-৫ ভ্যাকসিনে ব্যবহার করা হয়েছে দুই ডোজের জন্য দুই ধরনের অ্যাডিনোভাইরাস। প্রথম ডোজে ব্যবহার করা হয়েছে বিরল প্রজাতির অ্যাডিনোভাইরাস-২৬ (অ্যাড-২৬) এবং দ্বিতীয় ডোজে সাধারন প্রজাতির অ্যাডিনোভাইরাস-৫ (অ্যাড-৫)। গ্যামালেয়া ইনিস্টিটিউটের দাবী অনুযায়ী এভাবে দুই ধরনের ভাইরাস ব্যবহারে তাদের ভ্যাকসিন বেশী দিন কার্যকরী থাকে। আর এ কারনেই হয়তো তাদের স্পুটনিক-৫ ভ্যাকসিনের কার্যকারীতা কোভিডের ক্ষেত্রে দেখা গেছে ৯০ শতাংশেরও উপরে।
সংখ্যাগত দিক দিয়ে অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন তুলনামূলকভাবে কিছুটা কম কার্যকরী হলেও, অনেক দিক দিয়েই এই ভ্যাকসিনটি হতে পারে গোটা বিশ্বের জন্য কল্যানময়। যেমন:
(১) তিন দেশ মিলিয়ে দশ হাজারের উপরে যারা অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন গ্রহন করেছে তাদের ভেতরে কেউই সিভিয়ার কোভিডে আক্রান্ত হয়নি বা হাসপাতালে ভর্তি হয়নি। অর্থাৎ ভ্যাকসিনটি জীবন রক্ষাকারী। এটা একটা বিশাল কৃতিত্ব।
(২) এই ভ্যাকসিনটি উৎপাদন করা সহজ এবং সময়ও লাগে কম। অ্যাস্ট্রাজেনিকা আগামি বছরের ভেতরে প্রায় তিন বিলিয়ন বা তিনশ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন তৈরী করবে বিভিন্ন দেশে তাদের পার্টনার কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে। অক্সফোর্ড/অ্যাস্ট্রাজেনিকা কোভ্যাক্স অ্যালায়েন্সের সাথে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এই মর্মে যে তারা আগামী বছরের ভেতরেই বিশ্বের নিন্ম ও মধ্য আয়ের দেশগুলোর জন্য ১০০ কোটি ভ্যাকসিন সরবরাহ করবে।
(৩) অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন সংরক্ষন এবং সরবরাহ করা যাবে রেফ্রিজারেটরের তাপমাত্রায় (৪-৮ ডিগ্রি সে.)। অর্থাৎ বাংলাদেশসহ অন্যান্য সকল নিন্ম ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে কোল্ড চেইনে কোন প্রকার পরিবর্তন ছাড়াই এই ভ্যাকসিন প্রদান সম্ভব হবে। অন্যদিকে, ফাইজার এবং মর্ডানার ভ্যাকসিন যেহেতু সংরক্ষন এবং সরবরাহ করতে হয় হিমাংকের নিচের তাপমাত্রায় (-৭০ ডিগ্রি সে.), তাই বাংলাদেশের জন্য এই ধরনের ভ্যাকসিন ততোটা উপযোগী নয়।
(৪) দামের দিক দিয়েও এই ভ্যাকসিন এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সাশ্রয়ী ভ্যাকসিন। এক ডোজ অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের দাম পরবে মাত্র ৪ ডলার বা ৩৫০ টাকা। অন্যদিকে ফাইজারের ভ্যাকসিনের দাম ধরা হয়েছে ২০ ডলার এবং মর্ডানার ৩৪ ডলার।
(৫) অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের সাফল্য বাংলাদেশর জন্য সুখবর এবং স্বস্তির ব্যপার। বাংলাদেশ সরকার ইন্ডিয়ার সেরাম ইন্সটিটিউটের কাছ থেকে তিন কোটি ডোজ ভ্যাকসিন পাবে ৬ মাসে। পাকা চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে এই মর্মে। আগামী বছরের প্রথমার্ধেই হয়তো এই ভ্যাকসিন পাওয়া যাবে।
অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের ফেইজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল এখনও চলমান বিভিন্ন দেশে। আরো নতুন ফলাফল আসবে অচিরেই। তখন হয়তো ভ্যাকসিনটির কার্যকারীতার উপর আরো বিস্তারিত ধারনা পাওয়া যাবে। তবে এখনকার ফলাফলের উপর ভিত্তি করেই বিশ্বব্যাপী ভ্যাকসিনটির ইমারজেন্সি প্রয়োগের জন্য আবেদন করা হবে যুক্তরাজ্য, ব্রাজিল, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপে। ডিসেম্বরেই যুক্তরাজ্যে ৪০ লক্ষ ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হবে স্বাস্থ্যকর্মী এবং ৮০ বছরের বৃদ্ধদের মধ্যে।
পর্ব – ১: অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন সত্তর শতাংশ কার্যকরী হলেও প্রশ্ন রয়ে গেছে বেশ কয়েকটি!
ড. খোন্দকার মেহেদী আকরাম,
এমবিবিএস, এমএসসি, পিএইচডি,
সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট,
শেফিল্ড ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাজ্য।



পর্ব – ১: অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন সত্তর শতাংশ কার্যকরী হলেও প্রশ্ন রয়ে গেছে বেশ কয়েকটি!

গতকাল ২৩ নভেম্বর অতি প্রতিক্ষিত অক্সফোর্ড ও অ্যাস্ট্রাজেনিকার যৌথ উদ্যগে তৈরী করোনা ভ্যাকসিনটির ফেইজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অন্তর্বর্তীকালীন ফলাফল প্রকাশিত হল। ভ্যাকসিনটি কোভিড-১৯ থেকে গড়ে ৭০ শতাংশ প্রতিরক্ষা দিতে সক্ষম হয়েছে।
অন্তর্বর্তীকালীন ফলাফলটি পর্যালোচনা করা হয়েছে যুক্তরাজ্য, ব্রাজিল এবং দক্ষিণ আফ্রিকার প্রায় ২৪ হাজার ভলান্টিয়ারের উপর চালানো ফেইজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের উপর। ভলান্টিয়ারদের মধ্যে অর্ধেককে দেয়া হয়েছে ২৮ দিন অন্তর দুই ডোজ চ্যাডক্স-১ কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন এবং বাকি অর্ধেককে দেয়া হয়েছে মেনিনজাইটিস ভ্যাকসিন (কন্ট্রোল গ্রুপ)। ভ্যাকসিন দেয়ার পরে ভলান্টিয়ারদের মধ্যে ১৩১ জন কোভিডে আক্রান্ত হয়েছে।
ট্রায়ালটিতে কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনের দুই ধরনের ডোজ ব্যবহার প্রয়োগ করা হয়েছে। একটি হচ্ছে স্ট্যান্ডার্ড প্রাইম-বুস্ট ডোজ, যেখানে প্রথম এবং দ্বিতীয় ডোজে একই পরিমান (৫০ বিলিয়ন ভাইরাস পার্টিকেল) ভ্যাকসিন দেয়া হয়েছে। আরেকটি হল হাফ-প্রাইম এন্ড স্ট্যান্ডার্ড-বুস্ট ডোজ, যেখানে প্রথমে দেয়া হয়েছে অর্ধেক ডোজ ভ্যাকসিন (২৫ বিলিয়ন ভাইরাস পার্টিকেল) এবং ২৮ দিন পর দেয়া হয়েছে পূর্ণ ডোজ ভ্যাকসিন।
ভলান্টিয়ারদের ভেতরে বেশিরভাগকেই দেয়া হয়েছে স্ট্যান্ডার্ড প্রাইম-বুস্ট ডোজ ভ্যাকসিন যা কোভিড-১৯ থেকে প্রতিরক্ষা দিয়েছে মাত্র ৬২ শতাংশ। অন্যদিকে, প্রথমে অর্ধেক ডোজ এবং পরে পূর্ণ ডোজ ভ্যাকসিন দেয়া হয়েছে মাত্র ৩ হাজার ভলান্টিয়াকে যা কোভিড থেকে প্রতিরক্ষা দিয়েছে প্রায় ৯০ শতাংশ (বিবিসি নিউজ)। অনেকেই এই ৯০ শতাংশ প্রতিরক্ষাকে বেশ ফলাও করে প্রচার করছেন। কিন্তু এটা খেয়াল রাখতে হবে যে এই ৯০ শতাংশ প্রতিরক্ষার হিসেবটা কষা হয়েছে মাত্র ৩ হাজার ভলান্টিয়ারের উপর। ভ্যাকসিনের ফেইজ-৩ ট্রায়ালে এই সংখ্যাটি নগন্য। সুতরাং অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের গড় ৭০ শতাংশ কার্যকারীতা নিয়েই আমাদের আপাতত সন্তষ্ট থাকতে হবে যতক্ষন না আরো নতুন ফলাফল হাতে আসছে।
দুটি পূর্ণ ডোজ ভ্যাকসিন দেয়াতে ভ্যাকসিনটির কার্যকারীতা এতটা কমে গেল কেন, সেটা কিন্তু আসলেই চিন্তার বিষয়। পূর্বে প্রায় এক হাজার জনের উপর ভ্যাকসিনটির যে ফেইজ-১/২ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল করা হয়েছিল, সেখানে মাত্র ১০ জনের উপর প্রয়োগ করা হয়েছিল সমপরিমান দুই ডোজ ভ্যাকসিন (প্রাইম-বুস্ট)। বাকি সবাইকে দেয়া হয়েছিল এক ডোজ করে কোভিড বা মেনিনজাইটিস ভ্যাকসিন (ল্যানসেট, ২০ জুলাই ২০২০)। ওই ১০ জনের ফলাফলের উপর ভিত্তি করেই কিন্তু পরবর্তিতে ফেইজ-৩ ট্রায়ালে দুই ডোজের প্রাইম-বুস্ট রেজিম ব্যবহার করা হয়! যার ফলাফল হচ্ছে ভ্যাকসিনটির ৬২ শতাংশ কার্যকারীতা।
অন্যদিকে, ফেইজ-৩ ট্রায়ালে যে প্রথমে অর্ধেক ডোজ এবং ২৮ দিন পরে পূর্ণ ডোজ ভ্যাকসিন রেজিম ব্যাবহার করা হয়েছে তার কোন প্রকাশিত ফলাফল আমরা জানি না। ফেইজ-১/২ ট্রায়ালে এমন কোন ডোজ ব্যবহার করা হয়নি। তবে ফেইজ-৩ ট্রায়ালে এসে কেন একটি ছোট গ্রুপের উপর এই ডোজ ব্যবহার করা হল তা এখনও অপরিস্কার। ফেইজ-৩ ট্রায়াল থেকে এটা বোঝা যায় যে ভ্যাকসিন ট্রায়ালের প্রাথমিক টার্গেট ছিল স্ট্যান্ডার্ড প্রাইম-বুস্ট রেজিম, যা থেকে অবশ্য আশানুরূপ ফলাফল পাওয়া যায়নি। তবে ভাল ফলাফল (৯০ শতাংশ কার্যকারীতা) পাওয়া গেছে ছোট্ট গ্রুপ থেকে পাওয়া ফলাফলে!
সুতরাং রেগুলেটরি বডিকে এখন ঐ তিন হাজার জনের ছোট্ট সাব-গ্রুপের উপর চালানো ফলাফলের ভিত্তিতেই ইমারজেন্সি ভ্যাকসিন প্রয়োগে ডোজ নির্ধারণ করতে হবে। অক্সফোর্ড ট্রায়ালে অংশগ্রহনকারীদের ভেতর কোভিডে আক্রান্ত হওয়া সম্ভাবনা হচ্ছে প্রতি ২০০ জনে ১ জন (কোহর্ট প্রিভ্যালেন্স)। সেক্ষেত্রে ৩ হাজার জনে কোভিডে আক্রান্ত হতে পারে মাত্র ১৫ জন। এখন এই ১৫ জন কোভিড আক্রান্তের উপর ভিত্তি করেই কিন্তু অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের ডোজ নির্ধারণ হবে, মোটেও ২৪ হাজার জন থেকে প্রাপ্ত ফলাফলের উপর ভিত্তি করে নয়! এছাড়াও কোভিড আক্রান্তের সংখ্যা ৬০ জনের কম হলে ভ্যাকসিনের কার্যকারীতা নির্নয় করা অতটা সহজ নয়। সেক্ষেত্রে প্রাপ্ত ফলাফল ভ্রান্ত হতে পারে। আশাকরা যায়, অক্সফোর্ডের পরবর্তী ধাপের ফলাফল পর্যালোচনায় আরো বেশী সঠিক তথ্যটি পাওয়া যাবে।
আমরা যদি ফাইজার, মর্ডানা বা স্পুটনিক-৫ ভ্যাকসিনগুলির সাম্প্রতিক ফেইজ-৩ ট্রায়ালের অন্তর্বর্তীকালীন ফলাফলের দিকে তাকাই তাহলে কি দেখা যায়? ত্রিশ এবং চল্লিশ হাজার ভলান্টিয়ারের উপর চালানো মর্ডানা এবং ফাইজার/বায়োন্টেকের এমআরএনএ ভ্যাকসিনটির কার্যকারীতা পরিলক্ষিত হয় ৯৫ শতাংশ, যেখানে কোভিডে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৯৫ এবং ১৬৪ জন। অন্যদিকে, বিশ হাজার ভলান্টিয়ারের উপর চালানো রাশিয়ার স্পুটনিক-৫ ভ্যাকসিনটির কার্যকারীতার প্রদর্শিত হয় ৯২ শতাংশ যেখানে কোভিডে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৩০ জন। আর অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের কার্যকারীতা ৯০ শতাংশ নির্নীত হয়েছে তিন হাজার জনের ফলাফল পর্যালোচনায়।
অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের ট্রায়ালে যেহেতু দুই ধরনের ডোজিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে এবং যেহেতু এ থেকে প্রাপ্ত ফলাফলের তারতম্য ৪৫ শতাংশ (৬২% বনাম ৯০%), তাই এই দুইটি ভিন্নধর্মী ফলের গড় করা আদৌ সমীচীন কিনা তা ভেবে দেখার দরকার আছে (Skewed data)। সেক্ষেত্রে ভ্যাকসিনটির গড় কার্যকারীতা ৭০ শতাংশ বলাটা অনেকটা দূষণযুক্ত?
পর্ব – ২: অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন সত্তর শতাংশ কার্যকরী হলেও প্রশ্ন রয়ে গেছে বেশ কয়েকটি!
ড. খোন্দকার মেহেদী আকরাম,
এমবিবিএস, এমএসসি, পিএইচডি,
সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট,
শেফিল্ড ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাজ্য।



পর্ব – ২: করোনাভাইরাসের দ্রুত বিস্তারের রহস্যটা কি?

গবেষণায় দেখা গেছে নোভেল করোনাভাইরাস যখন কোষের ভেতরে বংশ বৃদ্ধি করে তখন তার স্পাইক প্রোটিনটি ফিউরিনের বিক্রিয়াতে প্রি-অ্যাকটিভেটেড বা প্রাক-সক্রিয় হয়ে উঠে। এর ফলে নতুন তৈরী হওয়া করোনাভাইরাস খুব সহজে এবং দ্রুত গতিতে নতুন কোষকে সংক্রমণ করতে পারে। অন্যদিকে, সার্স ভাইরাসের এস-১/এস-২ ক্লিভেজ অংশটিতে ফিউরিন এনজাইমটি কোন বিক্রিয়া করেনা। ফলে রিপ্লিকেশনের সময় সার্স ভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনটি প্রি-অ্যাকটিভেটেড হয়না। বিজ্ঞানীদের ধারনা স্পাইক প্রোটিনের এই প্রি-অ্যাকটিভেশনের তারতম্যের কারনেই নোভেল করোনাভাইরাস সার্স ভাইরাসের চেয়ে এত দ্রুত এবং কার্যকর ভাবে এক কোষ থেকে আরেক কোষ এবং একজন থেকে আরেকজনে ছড়িয়ে পরছে (PNAS, মে ২০২০)।
এছাড়াও অতিসম্প্রতি জার্মানির টেকনিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক নিউরোপিলিন-১ নামের আরেকটি রিসিপ্টরের সন্ধান পেয়েছে যা নোভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এবং বিস্তারকে ত্বরান্বিত করে। এ বছরের ২০ অক্টোবর সাইন্স জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাপত্রটিতে দেখা যায় কোষের বহিরাবরনে থাকা নিউরোপিলিন-১ রিসিপ্টরটি ফিউরিন এনজাইম কর্তৃক খন্ডিত স্পাইক প্রোটিনের এস-১/এস-২ ক্লিভেজ অংশের সাথে এক ধরনের বন্ধন সৃস্টি করে, আর এই বন্ধন সৃস্টির মাধ্যমে নিউরোপিলিন-১ রিসিপ্টর ভাইরাসটিকে টেনে এসিই-টু রিসিপ্টরের কাছে নিয়ে যায় এবং ভাইরাসটিকে কোষের অভ্যন্তরে প্রবেশে সহায়তা করে। আমাদের শ্বাস যন্ত্রের এপিথেলিয়াল কোষে সাধারাণত এসিই-টু রিসিপ্টরের সংখ্যা অনেক কম থাকে, তবে নিউরোপিলিন-১ রিসিপ্টর থাকে পর্যাপ্ত। আর এভাবেই নিউরোপিলিন-১ রিসিপ্ট মূলত করোনাভাইরাসকে তার কাংক্ষিত এসিই-টু রিসিপ্টরটি খুঁজে পেতে সাহায্য করে।
গবেষণায় দেখা গেছে আমাদের নাকের মিউকাস ঝিল্লির কোষে এবং ঘ্রান আহরনের নার্ভে (অলফেক্টরি নার্ভ) পর্যাপ্ত পরিমানে নিউরোপিলিন-১ রিসিপ্টর থাকে। নাসারন্ধ্র হচ্ছে আমাদের শ্বাসযন্ত্রে করোনাভাইরাস প্রবেশের প্রধান পথ। আর এই প্রবেশ পথেই থাকে নিউরোপিলিন-১ রিসিপ্টরের আধিক্য। এতে করে ভাইরাস আমাদের নিশ্বাসের সাথে নাকে প্রবেশ করে খুব সহজেই আটকে যায় নাকের মিউকাস ঝিল্লির কোষে এবং সেখানে বংশ বিস্তার করে। বংশ বিস্তারের পরে ভাইরাস ছড়িয়ে পরে ফুসফুসে এবং কাশি বা হাঁচির সাথে বাতাসে, যা পরবর্তিতে অন্য মানুষকে আক্রান্ত করে। এধরনের ঘটনা পূর্বের সার্স ভাইরাসের ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হয়নি। সুতরাং বিজ্ঞানিদের ধারনা নিউরোপিলিন-১ রিসিপ্টর হচ্ছে দ্বিতীয় প্রধান পন্থা যার মাধ্যমে নোভেল করোনাভাইরাস এত দ্রুত গোটা বিশ্বব্যাপি ছড়িয়ে পরেছে।
করোনাভাইরাস শুধু ফুসফুসেই সংক্রমণ করেনা; বরং তা মস্তিস্কেও আক্রান্ত করতে পারে। ভাইরাসটি কিভাবে মস্তিস্কে প্রবেশ করে তা এখনও ঠিক পরিস্কার না। তবে ধারনা করা হয় নাকের মিউকাস ঝিল্লিতে উন্মুক্ত থাকা অলফেক্টরি নার্ভের মাধ্যমে ভাইরাসটি ব্রেইনে প্রবেশ করে থাকতে পারে। এবং এক্ষেত্রেও নিউরোপিলিন-১ রিসিপ্টর একটি মোক্ষম ভুমিকা পালন করে। বর্তমানে বিজ্ঞানীরা এই নিউরোপিলিন-১ রিসিপ্টরকে টার্গেট করে করোনার বিপরীতে ওষুধ প্রস্তুতির চিন্তাভাবনা করছেন। কোন রাসায়নিক মলিকিউল বা মনোক্লোনাল এন্টিবডি দিয়ে নিউরোপিলিন-১ রিসিপ্টরকে ব্লক করার মাধ্যমে করোনাভাইরাসকে কোষে প্রবেশে বাঁধা প্রদানের মাধ্যমে করোনা সংক্রমণ রোধ করা যেতে পারে।
এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী দেখা যায় যে নোভেল করোনাভাইরাসের রিসিপ্টর বাইন্ডিং ডোমেইনের এসিই-টু রিসিপ্টরের প্রতি অতি আসক্তি, এস-১/এস-২ ক্লিভেজ অংশটির অত্যাধিক সক্রিয়তা এবং নিউরোপিলিন-১ রিসিপ্টরের সাথে বন্ধন সৃস্টির সক্ষমতাই ভাইরাসটিকে এত দ্রুত বিস্তারে সহায়তা করছে। ভাইরাসের এসব অংশকে টার্গেট করে বিজ্ঞানীরা ওষুধ এবং ভ্যাকসিন প্রস্তুত করছেন। সম্প্রতি রিসিপ্টর বাইন্ডিং ডোমেইনকে টার্গেট করে একধরণের মনোক্লোনাল এন্টিবডি থেরাপী তৈরী করা হয়েছে যা ফেইজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে বেশ কার্যকরী ফলাফল দেখিয়েছে। এছাড়াও বেশীরভাগ করোনা ভ্যাকসিনও তৈরী করা হয়েছে ভাইরাসের এ অংশটিকে লক্ষ্য করে।
পর্ব – ১: করোনাভাইরাসের দ্রুত বিস্তারের রহস্যটা কি? 
ড. খোন্দকার মেহেদী আকরাম,
এমবিবিএস, এমএসসি, পিএইচডি,
সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট,
শেফিল্ড ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাজ্য।



পর্ব – ১: করোনাভাইরাসের দ্রুত বিস্তারের রহস্যটা কি?

সার্স ভাইরাস (SARS-Cov) এবং নোভেল করোনাভাইরাস (SARS-Cov-2) একই গোত্রের ভাইরাস হওয়ার সত্বেও নোভেল করোনাভাইরাসটি কেন এত দ্রুত গতিতে গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়লো, তা এখনও রয়ে গেছে অনেকটাই অজানা। ২০০৩ সালে সার্স মহামারীতে বিশ্বব্যাপি মোট আক্রান্ত হয়েছিল মাত্র ৮ হাজার এবং মারা গিয়েছিল প্রায় ৮০০ জন। অন্যদিকে আজকের পরিসংখান অনুযায়ী (৫ নভেম্বর ২০২০) নোভেল করোনাভাইরাসে গোটা বিশ্বে সংক্রমিত হয়েছে প্রায় ৪ কোটি ৮০ লক্ষ মানুষ এবং মারা গেছে ১২ লক্ষের উপরে। বর্তমানে নোভেল করোনাভাইরাসের রিপ্রোডাকশন রেট (R0) বা একজন থেকে অন্যজনে সংক্রমণের হার হচ্ছে ২-৩.৬ অর্থাৎ, করোনাভাইরাস একজন থেকে সর্বোচ্চ সাড়ে তিন জনের মাঝে ছড়াতে পারে। সার্স ভাইরাসের ক্ষেত্রে এই রিপ্রোডাকশন রেট ছিল ২-৩।
এখানেই শেষ নয়। করোনা মহামারীর প্রথম ঢেউয়ের তান্ডব শেষ না হতে হতেই গোটা ইউরোপ জুড়ে শুরু হয়েছে মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউ। দ্বিতীয় ঢেউয়ে সংক্রমণের তীব্রতা প্রথম ঢেউয়ের চেয়েও অনেক বেশী বলে মনে হচ্ছে। উত্তর আমেরিকা, ল্যাটিন আমেরিকা এবং ভারতে করোনাভাইরাসের বিস্তার কোনভাবেই কমছে না। বিশ্বব্যাপি করোনাভাইরাসের উপর গবেষণাও অব্যাহত রয়েছে বিস্তর। মহামারীর শুরু থেকেই বিজ্ঞানীরা বোঝার চেস্টা করছেন নোভেল করোনাভাইরাসের গঠন, এর সংক্রমণ ও বংশবিস্তার পদ্ধতি, এবং এর জেনেটিক মিউটেশন বা রূপান্তর।
জেনেটিক সিকুয়েন্সের দিক দিয়ে নোভেল করোনাভাইরাসের সাথে সার্স ভাইরাসের সাদৃশ্য রয়েছে প্রায় ৮০ শতাংশ। তবে গঠনগত দিক দিয়ে এই দুটি ভাইরাসের মিল রয়েছে আরো বেশী। দুটি ভাইরাসই খোলকে মোড়া (enveloped) আরএনএ ভাইরাস। দুটি ভাইরাসই পোষক দেহের কোষকে সংক্রমণের জন্য ব্যবহার করে তাদের খোলকে থাকা প্রধান একটি প্রোটিন ‘স্পাইক প্রোটিন’। এই স্পাইক প্রোটিনের মাধ্যমেই ভাইরাসদুটি মানুষের শ্বাসযন্ত্র ও অন্যান্য অঙ্গের কোষের গায়ে থাকা এসিই-টু রিসিপ্টরের সাথে আটকে যায় এবং পরবর্তিতে কোষের ভেতরে প্রবেশ করে রিপ্লিকেশন বা বংশ বিস্তার করে। সার্স এবং নোভেল করোনাভাইরাসের বংশ বিস্তার পদ্ধতি অনেকটা একই রকম। তবে পার্থক্য রয়েছে স্পাইক প্রোটিনের গঠন, রিসিপ্টরের সাথে এর বন্ধন সৃস্টি, আসক্তি এবং কোষের ভেতরে এর প্রবেশ করার প্রক্রিয়ায়। বিজ্ঞানীদের ধারনা এই পার্থক্যগুলোর কারনেই নোভেল কররেনাভাইরাসটি এর পূর্বসূরি সার্স ভাইরাসের চেয়ে এত দ্রুত সংক্রমণ বিস্তারে সক্ষম।
স্পাইক প্রোটিন হচ্ছে করোনাভাইরাসের কোষকে সংক্রমণ করার মোক্ষম হাতিয়ার। এই প্রোটিনটির দুইটি অংশ। একটি অংশকে বলে এস-১ সাবইউনিট এবং আরেকটি অংশকে বলে এস-২ সাবইউনিট। প্রোটিনের এই দুটি সাবইউনিট পরস্পর সুংযুক্ত থাকে একটি ছোট্ট প্রোটিন অংশ দিয়ে, যাকে বলে এস-১/এস-২ ক্লিভেজ। স্পাইক প্রোটিনের সবচেয়ে কার্যকরী এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশটি হচ্ছে রিসিপিটর বাইন্ডিং ডোমেইন (RBD), যা অবস্থান করে এস-১ সাবইউনিটের একদম শেষ প্রান্তে। এই রিসিপ্টর বাইন্ডিং ডোমেইনের মাধ্যমেই স্পাইক প্রোটিন তথা ভাইরাসটি এর রিসিপ্টরের সাথে বন্ধন সৃস্টি করে। এবং এই ডোমেইনটি খুবই ইমিউনোজেনিক; অর্থাৎ ভাইরাস মানব শরীরে প্রবেশ করার পর শরীরের ইমিউন সেলগুলি এই আরবিডি ডোমেইনের বিপরীতে ইমিউন রিঅ্যাকশন শুরু করে। অন্যদিকে, স্পাইক প্রোটিনের এস-২ সাবইউনিটের শেষ প্রান্তটি প্রথিত থাকে ভাইরাসের এনভেলপ বা খোলকের ভেতরে।

সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে নোভেল করোনাভাইরাসের রিসিপ্টর বাইন্ডিং ডোমেইনের এসিই-টু রিসিপ্টরের প্রতি আসক্তি পূর্ববর্তী সার্স ভাইরাসের চেয়ে অনেক বেশি। তবে ত্রিমাত্রিক ক্রিস্টাল স্ট্রাকচার অ্যানালাইসিসে দেখা যায় যে নোভেল করোনাভাইরাসের রিসিপিটর বাইন্ডিং ডোমেইন অংশটি বেশিরভাগ সময়ই পূর্ণ বা আংশিক বন্ধ অবস্থায় থাকে, যেখানে সার্স ভাইরাসে তা থাকে সবসময় খোলা বা উন্মুক্ত। আর সম্ভবত এর ফলেই নোভেল করোনাভাইরাস শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে ফাঁকি দিয়ে সহজেই কোষের মধ্যে প্রবেশ করে এবং সংক্রমণ ঘটায়। এসিই-টু রিসিপ্টর ছাড়াও কোষের গায়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিন ‘টাইপ-টু ট্রান্সমেমব্রেন সেরিন প্রোটিয়েজ’ (TMPRSS2) থাকে যা রিসিপিটর বাইন্ডিং ডোমেইনকে সক্রিয় করার মাধ্যমে ভাইরাসকে কোষের ভেতরে প্রবেশ করতে সাহায্য করে। এই সেরিন প্রোটিয়েজটি অবশ্য সার্স এবং নোভেল করোনাভাইরাস উভয়ের ক্ষেত্রেই একই ভাবে কাজ করে।
তবে, এই দুটি ভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনে সবচেয়ে বড় পার্থক্যটি পাওয়া গেছে এস-১/এস-২ ক্লিভেজ অংশটিতে। নোভেল করোনাভাইরাসের এই অংশটি প্রো-প্রোটিন কনভার্টেজ এনজাইমের বিক্রিয়ার জন্য বেশ উপযোগী স্থান। যে এনজাইমটি এই অংশের উপর বিক্রিয়া করে স্পাইক প্রোটিনটিকে উদ্দিপ্ত বা সক্রিয় করে সেই এনজাইমটিকে বলে প্রো-প্রোটিন কনভার্টেজ ফিউরিন, বা সংক্ষেপে ফিউরিন। এই ফিউরিন মানব কোষে থাকে পর্যাপ্ত পরিমানে।

পর্ব – ২: করোনাভাইরাসের দ্রুত বিস্তারের রহস্যটা কি?

ড. খোন্দকার মেহেদী আকরাম,
এমবিবিএস, এমএসসি, পিএইচডি,
সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট,
শেফিল্ড ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাজ্য।



ফাইজারের করোনা ভ্যাকসিন নব্বই শতাংশ কার্যকরী, তবে এখনও প্রশ্ন রয়ে গেছে অনেক!

৯ নভেম্বর ২০২০ দিনটি মানব ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে দীর্ঘ দিন। করোনাভাইরাসের মহামারীতে গোটা বিশ্ব যখন দিশেহারা ঠিক তখনই ফাইজার এবং বায়োন্টেক নিয়ে এলো শুভ সংবাদ, ঘোষনা দিলো যে তাদের উদ্ভাবিত এমআরএনএ ভ্যাকসিনটি করোনা প্রতিরোধে ৯০ শতাংশেরও বেশী কার্যকরী! আর এই ফলাফলটি এসেছে ছয়টি দেশে চালানো তাদের ভ্যাকসিনটির ফেইজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অন্তর্বর্তীকালীন ফলাফল পর্যালোচনার প্রেক্ষিতে।
এই ট্রায়ালে অংশগ্রহনকারী ৪৩,৫০০ জন ভ্যাকসিন এবং প্ল্যাসিবো (ডামি ভ্যাকসিন) গ্রহীতার মধ্যে কোভিডে আক্রান্ত হয়েছে মাত্র ৯৪ জন। আসল ভ্যাকসিন এবং প্ল্যাসিবো গ্রহীতাদের ভেতরে সংক্রমিতের হিসেব কষে দেখা গেছে যে প্রতি ১০০ জন ভ্যাকসিন গ্রহিতার ভেতরে ৯০ জনই রয়ে গেছে করোনা সংক্রমণ থেকে মুক্ত। সাধারনত কোন ভ্যাকসিন যদি ৭০-৭৫ শতাংশ সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারে তাহলে তাকেই কার্যকর ভ্যাকসিন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
করোনা ভ্যাকসিন নিয়ে বিজ্ঞানীরা প্রথম দিকে বেশ অনিশ্চয়তার ভিতরে ছিলেন। এত অল্প সময়ে একটি কার্যকরী এবং নিরাপদ ভ্যাকসিন তৈরী করার কোন ইতিহাস আমাদের নেই। বিশ্বব্যাপী ব্যাপক প্রানহাণী, সময় স্বল্পতা এবং মহামারীর তীব্রতার কথা চিন্তা করে, বিজ্ঞানীমহল একমত হয়েছিলেন যে, যদি কোন ভ্যাকসিন ৫০ শতাংশও কার্যকরী হয় তাহলে সেই ভ্যাকসিনকে বিশেষ বিবেচনায় জনসাধারনে প্রয়োগের অনুমতি দেয়া হবে। সেখানে ফাইজারের ভ্যাকসিনটির ৯০ শতাংশ কার্যকারীতা সবাইকে অবাক করে দিয়েছে। ফাইজার আবার তাদের ভ্যাকসিনটির ফেইজ-৩ ট্রায়ালের চূড়ান্ত পর্যায়ের ফলাফল পর্যালোচনা করবে যখন ভ্যাকসিন গ্রহীতাদের ভেতরে ১৬৪ জন করোনায় আক্রান্ত হবে। ধারনা করা হচ্ছে চূড়ান্ত পর্বের ফলাফল পর্যালোচনায় ভ্যাকসিনটির কার্যকারীতা ৯০ শতাংশ থেকে কিছুটা কমে যেতে পারে।
কোম্পানীটি আশা করছে এ বছরের শেষ নাগাদ তারা ৫ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন প্রস্তুত করতে সক্ষম হবে, যা থেকে যুক্তরাজ্য পাবে ১ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন এবং বাকীটা পাবে যুক্তরাষ্ট্র; কারণ এ দেশ দুটি ভ্যাকসিনের জন্য অগ্রীম টাকা দিয়ে রেখেছে। আগামী বছরের পুরোটা সময় জুড়ে ফাইজার/বায়োন্টেক আরো ১৩০ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন উৎপাদন করবে গোটা বিশ্বের জন্য। ফাইজারের এই খবরে আমাদের ভেতর যেমন উৎসাহ এবং আশার সঞ্চার হয়েছে, তেমনি কোম্পানীটির শেয়ারের দামও এক লাফে উঠে গেছে শীর্ষে!
একটা বিষয় কিন্তু এখানে লক্ষনীয়, ফাইজার তাদের ভ্যাকসিনটির শুধু কার্যকারীতার ফলাফল প্রকাশ করেছে। তবে ফলাফলের আরেকটি খুবই গুরত্বপূর্ণ অংশ অর্থাৎ ভ্যাকসিনটির সেইফটি বা নিরাপত্তার বিষয়টি এখনও রয়ে গেছে অজানা। যদিও তারা বলেছে যে তাদের ভ্যাকসিনটি কোন প্রকার মারাত্মক বিরূপ প্রভাব প্রদর্শন করেনি, তবে এ ব্যাপারে এর চেয়ে বেশী তারা কিছু বলেনি। এর অবশ্য কারনও আছে। নিয়ম অনুযায়ী একটা ভ্যাকসিন প্রয়োগের পর থেকে কমপক্ষে ২ মাস অপেক্ষা করতে হয় কোন প্রকার বিরূপ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখার জন্য। ফাইজারকে এই তথ্য আহরনের জন্য আরো ২ সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হবে। আশাকরা হচ্ছে নভেম্বরের শেষেই এই ফলাফল তারা ঘোষনা করবে। আর এর মাধ্যমেই সম্পন্ন হবে ভ্যাকসিনটির অন্তর্বর্তীকালীন ফলাফলের পূর্ণ বিবরনী।
এছাড়াও ভ্যাকসিনটির কার্যকরীতার ব্যাপারে আরো বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনও রয়ে গেছে অজানা। যেমন:
(১) ভ্যাকসিন ট্রায়ালে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৯৪ জন কোভিডে আক্রান্ত হয়েছেন। তবে ভ্যাকসিন গ্রহীতাদের কতো জনের করোনাভাইরাস সংক্রমণ হয়েছে, ট্রায়ালটিতে তা দেখা হয়নি। করোনা সংক্রমণ এবং কোভিড কিন্তু এক নয়। একজন মানুষ যখন করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়ে রোগের লক্ষন প্রকাশ করে তখন তাকে বলা হয় কোভিড। কিন্তু একজন যদি করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয় কিন্ত রোগের কোন লক্ষন প্রকাশ না করে তখন তাকে বলে অ্যাসিম্পটোমেটিক সংক্রমণ। এ ধরনের অ্যাসিম্পটোমেটিক রোগীরা লক্ষন প্রকাশ না করলেও ভাইরাসের বিস্তার ঘটায় একজন কোভিড রোগীর মতই সমান তালে। ফাইজারের ভ্যাকসিনটি ৯০ শতাংশ কোভিড থেকে সুরক্ষা দিলেও তা কত ভাগ অ্যাসিম্পটোমেটিক সংক্রমণ প্রতিরোধ করে তা রয়ে গেছে অজানা। একটা ভ্যাকসিন যদি অ্যাসিম্পটোমেটিক সংক্রমণ কার্যকরভাবে প্রতিরোধ না করতে পারে তাহলে সেই ভ্যাকসিন দিয়ে কিন্তু মহামারী নিয়ন্ত্রনে আনা দুস্কর।
(২) আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ফাইজারের ভ্যাকসিনটি কি বৃদ্ধ মানুষের উপর কার্যকরী? এর উত্তরটা এখনও অজানা। কোভিডে কিন্তু বৃদ্ধরাই মারা যাচ্ছে সবচেয়ে বেশী। একটা ভ্যাকসিন যদি ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ মানুষের উপর কার্যকর না হয় তাহলে কিন্তু ঐ ভ্যাকসিন দিয়ে করোনায় গড় মৃত্যুহার তেমন একটা কমিয়ে আনা যাবে না। অক্সফোর্ড এবং অ্যাস্ট্রাজেনিকা কিন্তু ফেইজ-২ ট্রায়ালের মাধ্যমে দেখিয়েছে যে তাদের তৈরী চ্যাডক্স-১ (কোভিশিল্ড) ভ্যাকসিনটি বৃদ্ধ মানুষের উপরে সমানভাবে কার্যকর।
(৩) এছাড়াও ভ্যাকসিনটি কতদিন পর্যন্ত করোনা সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা দিবে তাও রয়ে গেছে ভবিষ্যত গবেষণার বিষয়।
(৪) ভ্যাকসিনটি যেহেতু একদম নতুন এবং অপরীক্ষিত প্লাটফর্মে তৈরী তাই এর দীর্ঘমেয়াদী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কি হতে পারে তা সম্পূর্ণ অজানা।
ফাইজারের ভ্যাকসিনটি একটি এমআরএনএ প্লাটফর্মে তৈরী ভ্যাকসিন যা উৎপাদনের পর থেকেই সংরক্ষন করতে হয় হিমাংকের অতি নিন্ম তাপমাত্রা –৭০ ডিগ্রী সেলসিয়াসে। এই তাপমাত্রায় সংরক্ষন এবং সরবরাহ না করতে পারলে, ভ্যাকসিনের মূল উপাদান নিউক্লিক এসিড খুব তারাতারি ভেঙ্গে যায় এবং এতে করে ভ্যাকসিনটির কার্যকারীতা নস্ট হয়ে যায়। অনেকেই তাপমাত্রার এই সংবেদনশীলতাকে ভ্যাকসিন সরবরাহে প্রধান অন্তরায় হিসেবে দেখছেন। ভ্যাকসিন সরবরাহের জন্য এ ধরনের অতি শীতল (-৭০ ডিগ্রী) ধারক পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশের ভ্যাকসিন কোল্ড চেইন সিস্টেমেই নেই। সে ক্ষেত্রে এ ধরনের কোল্ড চেইন ব্যাবস্থা বাংলাদেশ বা ভারতের মত উন্নয়নশীল দেশগুলোতে না থাকাই স্বাভাবিক।
ভ্যাকসিন সর্বরাহে এই প্রতিবন্ধকতাকে মাথায় রেখে ফাইজার তৈরী করেছে এক বিশেষ ধরনের ‘শীতল বাক্স’ বা ‘কুল বক্স’। ৫ হাজার ভ্যাকসিন ভায়াল ধারন ক্ষমতার এই কুল বক্সের আঁকার হবে একটি ছোট সাইজের স্যুটকেসের সমান যার ভেতরে অতি শীতল তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রন করা হবে ড্রাই আইসের ব্লক দিয়ে। এই কুল বক্সে এক নাগারে ১০ দিন -৭০ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ৫ হাজার ভায়াল ভ্যাকসিন সংরক্ষন এবং সরবরাহ করা যাবে কোন প্রকার ফ্রিজার বা বিশেষ কন্টেইনার ছাড়াই। এতে করে আঞ্চলিক কেন্দ্র থেকে কুল বক্সের মাধ্যমে ভ্যাকসিন সরবরাহ করা হবে দেশের প্রত্যন্ত আঞ্চলে। সুতরাং দেশের প্রচলিত কোল্ড চেইনে এই কুল বক্স অন্তর্ভুক্তিকরণের মাধ্যমে এমআরএনএ ভ্যাকসিন প্রদান সম্ভবপর হবে। আর এই কুল বক্স পুনঃব্যবহার যোগ্য, অর্থাৎ ড্রাই আইস দিয়ে এই বিশেষ কুল বক্স ব্যবহার করা যাবে বারবার।
সব কিছু মিলিয়ে বলা যায় ফাইজারের ভ্যাকসিনটি এই মহামারীতে আশাজাগানিয়া এবং আশীর্বাদ স্বরূপ। তবে ভ্যাকসিনটির সুদূরপ্রসারী কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে কিনা তা সাবধানতার সাথে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। বাংলাদেশের ভ্যাকসিন কোল্ড চেইনে পরিবর্তন আনার এখনই উপযুক্ত সময়। দেশে একটি কেন্দ্রীয় ড্রাই আইস কারখানা এবং -৮০ ডিগ্রী স্টোরেজ গড়ে তোলার উদ্যগ সরকারকে এখনই নিতে হবে। ভ্যাকসিন বিশ্বে পরিবর্তনের জোয়ার এসেছে। এই পরিবর্তনের সাথে বাংলাদেশকেও খাপ খাইয়ে নিতে হবে।

ড. খোন্দকার মেহেদী আকরাম,
এমবিবিএস, এমএসসি, পিএইচডি,
সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট,
শেফিল্ড ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাজ্য।



অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন আসছে ডিসেম্বরেই!

অবশেষে সকল অপেক্ষার পালা শেষ করে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং অ্যাস্ট্রাজেনিকার যৌথ উদ্যগে তৈরী করোনা ভ্যাকসিন চ্যাডক্স-১ (কোভিশিল্ড) সর্বসাধারনে প্রয়োগের জন্য বাজারে আসছে এই ডিসেম্বরেই। গতকাল এমনটিই ইংগিত দিয়েছেন অক্সফোর্ডের গবেষকগণ। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেল্থ সার্ভিসের (এনএইচএস) প্রধান দেশটির সকল হাসপাতাল এবং জিপি সার্ভিসকে ক্রিসমাসের আগেই ভ্যাকসিন প্রয়োগের সকল প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন।
এই বছরে প্রথম চালানে ৪০ লক্ষ ডোজ ভ্যাকসিন সরবরাহ করতে পারবে অ্যাস্ট্রাজেনিকা। ব্রিটিশ সরকার এরই মধ্যে কোম্পানিটির সাথে ১০ কোটি ভ্যাকসিন ডোজের চুক্তি করে ফেলেছে। তবে অ্যাস্ট্রাজেনিকা প্রথম পর্যায়ে যুক্তরাজ্যকে সরবরাহ করবে ৩ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন, যা দিয়ে দেশটির দেড় কোটি দূর্বল এবং ঝুঁকিপূর্ণ বৃদ্ধ মানুষদের রক্ষা করা হবে। পরবর্তী ৭ কোটি ডোজ সরবরাহ করা হবে দ্বিতীয় চালানে। অ্যাস্ট্রাজেনিকা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ৪০ কোটি এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সাথে ৪০ কোটি ভ্যাকসিন ডোজের চুক্তিতেও আবদ্ধ যা তারা সরবরাহ করবে আগামী বছরের পুরোটা সময় ধরে।
বর্তমানে অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন তাদের ফেইজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালাচ্ছে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ইন্ডিয়ায়। ফেইজ-৩ ট্রায়াল সম্পন্ন হতে সময় লাগবে ২ বছর। তবে বর্তমানকার করোনা পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে ট্রায়ালের মধ্যবর্তী ফলাফল পর্যালাচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অক্সফোর্ড এবং অ্যাস্ট্রাজেনিকা। গত তিন সপ্তাহ ধরে ইউরোপের রেগুলেটরি বডি (ইউরোপিয়ান মেডিসিন এজেন্সি) অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের ফেইজ-৩ ট্রায়ালের রোলিং রিভিউ শুরু করে দিয়েছে। রিভিউ ত্বরান্বিত করতে যুক্তরাজ্য তাদের নিজ দেশের রেগুলেটরি বডির (এমএইচআরএ) মাধ্যমেও ভ্যাকসিন ট্রায়ালের ফলাফল রিভিউ করছে। এই রিভিউতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে ফাইজারের এমআরএনএ ভ্যাকসিন ট্রায়ালকেও। তবে রেলিং রিভিউ রিপোর্ট প্রথমে পাওয়া যাবে অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন ট্রায়ালের এ মাসেই।
পূর্ববর্তী ১৮ থেকে ৫৫ বছর বয়সের ভলান্টিয়ারদের উপর চালানো ফেইজ-২ ট্রায়ালে অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন বেশ আশানুরূপ ফলাফল দেখিয়েছিল। আর গত মাসের ব্রিফিংয়ে দেয়া দ্বিতীয় ধাপের ফেইজ-২ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে তারা দেখিয়েছে যে তাদের ভ্যাকসিনটি বৃদ্ধ বয়েসের (৬৫+ বছর) মানুষের উপরও বেশ ভালভাবেই ইমিউনোজেনিক রেসপন্স ঘটাতে সক্ষম এবং এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও অপেক্ষাকৃত অনেক কম। অর্থাৎ এই ভ্যাকসিনটি বৃদ্ধ জনগোষ্ঠির উপরও বেশ কার্যকরী।
অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন যখন মোটামুটি প্রস্তুত ঠিক সে সময়টিতে বাংলাদেশ সরকার চুক্তিবদ্ধ হল ইন্ডিয়ার সেরাম ইনিস্টিটিউটের সাথে। তারা বাংলাদেশে বেক্সিমকোর মাধ্যমে অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন সরবরাহ করবে। প্রথম পর্যায়ে ৬ মাসে বাংলাদেশ পাবে ৩ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন যা সর্বপ্রথম দেয়া হবে দেশের দেড় কোটি স্বাস্থকর্মী এবং বৃদ্ধ মানুষকে। সেরাম ইনিস্টিটিউট নিন্ম এবং মধ্য আয়ের দেশগুলির জন্য ভ্যাকসিন প্রস্তুত করবে।
বাংলাদেশ সরকারের এই সিদ্ধান্তটি বেশ প্রশংসার দাবী রাখে। সরকার দেশের মানুষের জন্য এমন একটি ভ্যাকসিন বেছে নিল যা তৈরী করছে স্বনামধন্য অ্যাস্ট্রাজেনিকা এবং যার সৃস্টি হয়েছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপিঠ অক্সফোর্ড এবং ভ্যাকসিনের সূতিকাগার জেনার ইন্সটিটিউটে। এছাড়াও ভ্যাকসিনটি বাংলাদেশের ইপিআই টিকাদান কর্মসূচির কোল্ড চেইন সিস্টেমের সাথে মানানসই। প্রায় ৫০০ টাকা মূল্যের এই ভ্যাকসিনটি ৪ থেকে ৮ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রায় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পরিবহন এবং বিতরন করা যাবে। বেশ কিছুদিন আগে আমি একটি ভ্যাকসিনের তালিকা করেছিলাম। সেই তালিকায় সবার উপরে ছিল অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন এবং সর্বনিন্মে ছিল সিনোভ্যাকের ভ্যাকসিন। সরকার সিনোভ্যাকের ভ্যাকসিনের সাথে কোন প্রকার ট্রায়াল বা ক্রয় করার চুক্তি না করে অত্যাধিক বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছে।
তবে এসব কিছুর পরেও কয়েকটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে, আর তা হল:
(১) বাংলাদেশ কবে নাগাদ অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন পাবে তা কিন্তু এখনও অজানা। সরকার আজ যে চুক্তি করলো এ ধরনের চুক্তি যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র সহ অনেক দেশ বিভিন্ন কোম্পানির সাথে অনেক আগেই করেছে।
(২) ভারতের করোনা পরিস্থিতি খুবই নাজুক, সেক্ষেত্রে সেরাম ইনিস্টিটিউট হয়তো সর্বপ্রথম ভারতের ভ্যাকসিন চাহিদা মেটাতেই হিমশিম খাবে। তাহলে আমাদেরকে তারা কিভাবে পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন সরবরাহ করবে, সেই ব্যাপারটা পরিস্কার হওয়া দরকার। ভ্যাকসিন একটি বায়োলজিক প্রডাক্ট, এর কাঁচামাল তৈরী হতে হবে সেরাম ইনিস্টিটিউটেই, সেক্ষেত্রে বেক্সিমকো হয়তো শুধু ফিল-ফিনিশ করবে। বায়োলজিক প্রডাক্ট প্রস্তুতি একটি সময় সাপেক্ষ ব্যাপার।
(৩) বাংলাদেশর উচিত হবে আরও দু’ একটি কোম্পানির সাথে ভ্যাকসিনের ব্যাপারে চুক্তিবদ্ধ হওয়া, যেমন ফাইজার বা রাশিয়ার গ্যামালিয়া ইনিস্টিটিউট। স্পুটনিক-৫ ভ্যাকসিনটি লাইয়োফিলাইজড ভ্যাকসিন যা বাংলাদেশের কোল্ড চেইনের তাপমাত্রার সাথে মানানসই।
(৪) একাধিক উৎসের ভ্যাকসিন ছাড়া আমাদের এই বৃহৎ জনগোষ্ঠির জন্য পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন সরবরাহ করা কোনভাবেই সম্ভব নয়।
(৫) আমরা কিন্তু এখনো জানিনা যে অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিনটি আদৌ কার্যকরী কি না। কারন ভ্যাকসিনটির ফেইজ-৩ ট্রায়ালের ফলাফল এখনও প্রকাশিত হয়নি!

ড. খোন্দকার মেহেদী আকরাম,
এমবিবিএস, এমএসসি, পিএইচডি,
সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট,
শেফিল্ড ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাজ্য।