শুক্রবার, জুন ১৮, ২০২১

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হলো রোগের জাদুঘর

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হলো রোগের জাদুঘর

image_pdfimage_print
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হলো রোগের জাদুঘর। এখানে কঠিন ও দুস্প্রাপ্য রোগীরা আসেন। যে রোগ লাখে একটা হয় , সেটাও এখানে পাওয়া যায়।
আমাদের ওয়ার্ডে আমরা পেলাম এক মিলিয়ারি টিউবারকিউলোসিস এর রোগী। যক্ষা তার ফুসফুসে অসংখ্য সাদা সাদা ছিদ্রের মতো ছায়া ফেলেছে এক্সরের ছবিতে।
এখন কোভিড ১৯ এ কারো কারো এমন ছবি আমরা পাচ্ছি।
অধ্যাপক নেসারউদ্দিন আহমেদ তাকে স্ট্রেপটোমাইসিন ইঞ্জেকশন দিতে বললেন। রোগীর রক্তে হিমোগ্লোবিন খুব কম । আমরা তাকে রক্ত দিলাম। পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করলাম। আমেরিকা থেকে আইভি নিউট্রিশন আমদানী হতো তখন। চাঁদা তুলে সেটাও দিয়েছিলাম পুয়োর ফান্ড থেকে। এটা আমাদের দেয়া টাকা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও দয়ালু মানুষের দানের টাকায় চলতো। আমি এটার পরিমানও বাড়িয়ে ফেলেছিলাম বন্ধু বান্ধব থেকে শুরু করে যতো মামা চাচা আছে সবার পেছনে লেগে থেকে। ওয়ার্ডে একটা হুইল চেয়ার নিয়ে এসেছিলাম রোটারী ক্লাবের টাকায় যাতে হুইল চেয়ারের জন্য এদিক সেদিক টানাটানি না লাগে।
রোগী এফডিসির লাইটম্যান ছিলেন। ইবনে মিজান , দেলোয়ার জাহান ঝন্টু থেকে শুরু করে কাজী জহির আর এহতেশামের গল্প করেন। নানা রকম ছবির নাম বলেন। বলেন রাজা রাজড়ার ছবিতে নাচ গান থাকে , লাইট বেশী লাগে। কারন এগুলো বেশীর ভাগ এফডিসির মধ্যেই শ্যুটিং হয়। আর্ট ফিল্মে লাইট কম লাগে। তাই তিনি আর্ট ফিল্ম বেশী ভালোবাসেন না। কাজ কম, টাকা কম।
রোগী ইঞ্জেকশন দেবার সময় চিৎকার করে, ব্যাথার অভিযোগ করে। নার্সরা তাকে ইঞ্জেকশন দিতে চায় না। বলে রোগী কো অপারেট করে না। আমি নিজহাতে তাকে ইঞ্জেকশন দিতাম। রোগী তখন কোন ব্যাথার কথা বলে না। কোন চিৎকার চেচামেচিও করে না।
একদিন আমার অফ ডে। আমি ছিলাম না। রোগী ইঞ্জেকশন নেবে না বলে গোঁ ধরেছে। আমি ছাড়া সে ব্যাথা পায়।
আমি কারণটা জানতাম। যতোক্ষন ধীরে ধীরে আমি ইঞ্জেকশন দিতাম, ততোক্ষন আমি তার সাথে গল্প করতাম। কথা বলতাম। শুরুতেই বলতাম , ব্যাথা পেলে আমাকে বলবেন। শেষ করে হাত ধরে বলতাম ব্যাথা পান নাই তো?
গল্পের মধ্যে রোগী ব্যাথার দিকে মন দেয়ার সময় পেতো না। নিজেই নানারকম গল্প আমাকে শোনাতো। কোন এক ছবিতে জাভেদ উপর থেকে লাফ দিয়ে ঘোড়ার পিঠে চড়বে। যতোবার সে ঘোড়ার পিঠে নামে ততোবার ঘোড়া হাঁটু ভেঙ্গে বসে পড়ে। আমাকে বলে স্যার, ঘোড়ারও তো খাবার লাগে , এটা লোকে বোঝে না। যেমন বোঝে না নায়ক নায়িকা ছাড়াও সবার খাবার লাগে। আমাদেরও । লাইটম্যানদের কথা কে ভাবে? সে রাজ্জাক সাহেবের খুব প্রশংসা করতো। তিনি নাকি সবার খোঁজ নিতেন। আমি এসবের সত্য মিথ্যা জানি না। তবে তাকে গল্প ধরিয়ে দিলেই সে গল্প করতো আর আমার ব্যাথামুক্ত সুঁই তাকে ঔষধ দিতো।
একদিন আবার আমার অফ ডে। পরদিন গিয়ে দেখি রোগীর বেড শূণ্য। আমি জানতে চাওয়ার আগেই নার্স বলে – ডক্টর , রোগী কি আপনার আত্মীয় ছিলো?
আমি বললাম না।
বললো গতরাতে রোগী এক্সপায়ার করেছে । তবে খারাপ হয়ে যাওয়ার সময় আপনার কথা বলছিলো। বলছিলো আমার ডাক্তারকে ডাকেন।
আমি স্বভাবতই মনখারাপ করে কিছুক্ষন বসে থেকেই আবার আমার বেডগুলির রোগীদের ফলোআপ শুরু করলাম। স্যার রাউন্ডে আসার আগে সব ফাইল আপডেটেড থাকতে হবে । আমি জানি এই রোগী নিয়ে সপ্তাহ শেষে ক্লিনিকাল ডিসকাশন হবে। সেটা আমি সমন্বয় করি। ওয়ার্ডের নোটিস বোর্ডের একটাকে জার্নাল ক্লাব নাম দিয়ে সেখানে জার্নাল থেকে ফটোকপি করা ভালো ভালো আর্টিকল পিন করি আমি । সেগুলো নিয়ে স্যার , জাকির ভাই, ওয়াদুদ ভাই কথা বলেন। আমার কতো কাজ। পরের ব্যাচের ক্লাসের জন্য ওয়ার্ডের রোগীদের বেছে রাখি।
কিন্তু এই এফডিসির লাইটম্যানকে আমি ভুলি নাই। রোগী ব্যাথা পাবেই এই ইঞ্জেকশনে। আমি ইঞ্জেকশন দেবার সময়ও সে ব্যাথা পেতো। আমার সাথে গল্পের কারণে ব্যাথার কথা বলতে ভুলে যেতো।
নার্সরা কেবল ইঞ্জেকশন দিয়ে যান। গল্প করার সময় কই। তাদের সংখ্যা ডাক্তারের অর্ধেক এই দেশে। তাই ডাক্তার যদি তিনজন রোগী দেখে , নার্স সেবা করে ছয় জনের। আমি যার যেভাবে দরকার সেভাবে কথা বলতাম। রোগী এই এমপ্যাথি, এই সামান্য কিছু বিষয়ে সহানুভূতি চায়।
প্রতিটি রোগী আলাদা মানুষ। কেউ ধনী কেউ গরীব কেউ নেতা কেউ লাইটম্যান। ধনী আশা করেন তার সাথেই গল্প করবে ডাক্তার। ডাক্তার তার সাথে গল্প করবে যার দরকার। এই লাইটম্যান দরিদ্রতম ছিলেন। তাকেই আমি সবচেয়ে বেশী সময় দিতাম। কারন তার জন্য সেটা দরকার। তার অসুখ ভয়ংকর ছিলো। বাঁচবেন কিনা সেটা অনিশ্চিত ছিলো। কিন্তু জীবনের শেষে এসে তিনি আমাদের ওয়ার্ডে আমাদের দেবার সাধ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ যত্ন পেয়েছিলেন।
ধনী দরিদ্র নয়, ক্ষমতাবান ক্ষমতাহীণ নয়, ধর্ম নয়, জাতি নয়, শত্রু নয় মিত্র নয়, আগে যার যতোটুকু সেবা দরকার সে ততোটুকু পাবে। বিচার আচার করার কাজ ডাক্তারের না। তার কাজ মানুষের জীবনের যত্ন নেয়া।
এটাই ছিল আমাদের সিনিয়রদের নির্দেশ ও উপদেশ।
সেই লাইটম্যান, তিনি মমতার মধ্যে এই পৃথিবী থেকে চলে গিয়েছিলেন।
ডাক্তার কেবল মানুষকে বাঁচায় না তার মৃত্যুকেও সহজ ও কম কষ্টকর করে।
আমি খুব কৃতজ্ঞ যে আমি সারাজীবন সেরা চিকিৎসকদের আমার শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলাম। তারা কেবল আর শিক্ষক থাকেন নাই আমার বন্ধু ও ভাই বোনেও পরিনত হয়েছেন।
Abdun Noor Tushar 
FavoriteLoadingপ্রিয় পোস্টের তালিকায় নিন।

About The Author

মন্তব্য করুন