শুক্রবার, জুন ১৮, ২০২১

পর্ব – ২: অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন সত্তর শতাংশ কার্যকরী হলেও প্রশ্ন রয়ে গেছে বেশ কয়েকটি!

পর্ব – ২: অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন সত্তর শতাংশ কার্যকরী হলেও প্রশ্ন রয়ে গেছে বেশ কয়েকটি!

image_pdfimage_print
এখন দেখা যাক, কেন সমপরিমানে দুই ডোজ ভ্যাকসিন দেয়াতে ভ্যাকসিনের কার্যকারীতা কমে যায়, কিন্ত প্রথমে কম ডোজ দিলে কার্যকারীতা বাড়ে?
অক্সফোর্ডের চ্যাডক্স-১ ভ্যাকসিনটি একটি অ্যাডিনোভাইরাস ভেক্টর ভিত্তিক ভ্যাকসিন। এক্ষেত্রে শিম্পাঞ্জির অ্যাডিনোভাইরাসের ভেতরে করোনাভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনের জীন প্রবেশ করিয়ে দেয়া হয়। এখানে জীবিত অ্যাডিনোভাইরাস জীনটির বাহক হিসেবে কাজ করে। ভ্যাকসিন হিসেবে এই রুপান্তরিত অ্যাডিনোভাইরাসকে যখন মাংসপেশিতে ইনজেকশনের মাধ্যমে প্রবেশ করানো হয় তখন ঐ অ্যাডিনোভাইরাস শরীরে গিয়ে স্পাইক প্রোটিন তৈরী করে। পরবর্তীতে যার বিপরীতে আমাদের ইমিউন সিস্টেম প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলে। আর এভাবেই রুপান্তরিত অ্যাডিনোভাইরাস আমাদের ইমিউন সিস্টেমকে করোনাভাইরাসের বিপরীতে ট্রেইন-আপ করে।
তবে এক্ষেত্রে আরেকটি ঘটনাও ঘটে সমান্তরালে। আমাদের ইমিউন সিস্টেম অ্যাডিনোভাইরাসের বিপরীতেও রোগপ্রতিরোধী ব্যবস্থা গড়ে তোলে। একে বলে ‘এন্টি-ভেক্টর ইমিউনিটি’। এই ইমিউনিটি নিরীহ ভেক্টর-ভাইরাসকে খারাপ জীবানু ভেবে ধ্বংস করে ফেলে! আর এতে করে প্রথম ডোজে সমস্যা না হলেও পরবর্তী ডোজে রুপান্তরিত অ্যাডিনোভাইরাসটি অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে। একারণেই এন্টি-ভেক্টর ইমিউনিটি এধরনের ভাইরাল ভেক্টর ভিত্তিক ভ্যাকসিনের জন্য একটা বড় অন্তরায়।

এ সমস্যা এড়াতেই কিন্তু অক্সফোর্ড তাদের ভ্যাকসিনে মানুষের অ্যাডিনোভাইরাস ব্যবহার না করে, ব্যবহার করেছে শিম্পাঞ্জির অ্যাডিনোভাইরাস। কারণ আমাদের শরীরে সাধারনত শিম্পাঞ্জি অ্যাডিনোভাইরাসের বিপরীতে কোন ইমিউনিটি থাকেনা। তবে ভ্যাকসিনের মাধ্যমে প্রথম ডোজ অ্যাডিনোভাইরাস প্রবেশ করানোতে আমাদের ইমিউন সিস্টেম এই শিম্পাঞ্জি অ্যাডিনোভাইরাসের বিপরীতেও ইমিউনিটি তৈরী করতে পারে। সেক্ষেত্রে প্রথমে বেশী ডোজের ভাইরাস প্রবেশ করালে শরীরে শক্তিশালী এন্টি-ভেক্টর ইমিউনিটি তৈরী হতে পারে, যা পরবর্তিতে দ্বিতীয় ডোজের ভাইরাসকে নিস্ক্রিয় করে ফেলতে পারে। তবে প্রথমে কম ডোজ দিলে দুর্বল এন্টি-ভেক্টর ইমিউনিটি তৈরী হয় যা হয়তো দ্বিতীয় ডোজের ভাইরাসকে তেমন প্রভাবিত নাও করতে পারে। এরকম ঘটনা অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের বেলায় ঘটছে কিনা তা সম্ভবত পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। গবেষণার ফলাফল কোন জার্নালে প্রকাশিত হলে আসল ঘটনাটা উন্মোচিত হবে।

এধরনের এন্টি-ভেক্টর ইমিউনিটির সমস্যা এড়াতে রাশিয়ার স্পুটনিক-৫ ভ্যাকসিনে ব্যবহার করা হয়েছে দুই ডোজের জন্য দুই ধরনের অ্যাডিনোভাইরাস। প্রথম ডোজে ব্যবহার করা হয়েছে বিরল প্রজাতির অ্যাডিনোভাইরাস-২৬ (অ্যাড-২৬) এবং দ্বিতীয় ডোজে সাধারন প্রজাতির অ্যাডিনোভাইরাস-৫ (অ্যাড-৫)। গ্যামালেয়া ইনিস্টিটিউটের দাবী অনুযায়ী এভাবে দুই ধরনের ভাইরাস ব্যবহারে তাদের ভ্যাকসিন বেশী দিন কার্যকরী থাকে। আর এ কারনেই হয়তো তাদের স্পুটনিক-৫ ভ্যাকসিনের কার্যকারীতা কোভিডের ক্ষেত্রে দেখা গেছে ৯০ শতাংশেরও উপরে।
সংখ্যাগত দিক দিয়ে অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন তুলনামূলকভাবে কিছুটা কম কার্যকরী হলেও, অনেক দিক দিয়েই এই ভ্যাকসিনটি হতে পারে গোটা বিশ্বের জন্য কল্যানময়। যেমন:
(১) তিন দেশ মিলিয়ে দশ হাজারের উপরে যারা অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন গ্রহন করেছে তাদের ভেতরে কেউই সিভিয়ার কোভিডে আক্রান্ত হয়নি বা হাসপাতালে ভর্তি হয়নি। অর্থাৎ ভ্যাকসিনটি জীবন রক্ষাকারী। এটা একটা বিশাল কৃতিত্ব।
(২) এই ভ্যাকসিনটি উৎপাদন করা সহজ এবং সময়ও লাগে কম। অ্যাস্ট্রাজেনিকা আগামি বছরের ভেতরে প্রায় তিন বিলিয়ন বা তিনশ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন তৈরী করবে বিভিন্ন দেশে তাদের পার্টনার কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে। অক্সফোর্ড/অ্যাস্ট্রাজেনিকা কোভ্যাক্স অ্যালায়েন্সের সাথে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এই মর্মে যে তারা আগামী বছরের ভেতরেই বিশ্বের নিন্ম ও মধ্য আয়ের দেশগুলোর জন্য ১০০ কোটি ভ্যাকসিন সরবরাহ করবে।
(৩) অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন সংরক্ষন এবং সরবরাহ করা যাবে রেফ্রিজারেটরের তাপমাত্রায় (৪-৮ ডিগ্রি সে.)। অর্থাৎ বাংলাদেশসহ অন্যান্য সকল নিন্ম ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে কোল্ড চেইনে কোন প্রকার পরিবর্তন ছাড়াই এই ভ্যাকসিন প্রদান সম্ভব হবে। অন্যদিকে, ফাইজার এবং মর্ডানার ভ্যাকসিন যেহেতু সংরক্ষন এবং সরবরাহ করতে হয় হিমাংকের নিচের তাপমাত্রায় (-৭০ ডিগ্রি সে.), তাই বাংলাদেশের জন্য এই ধরনের ভ্যাকসিন ততোটা উপযোগী নয়।
(৪) দামের দিক দিয়েও এই ভ্যাকসিন এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সাশ্রয়ী ভ্যাকসিন। এক ডোজ অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের দাম পরবে মাত্র ৪ ডলার বা ৩৫০ টাকা। অন্যদিকে ফাইজারের ভ্যাকসিনের দাম ধরা হয়েছে ২০ ডলার এবং মর্ডানার ৩৪ ডলার।
(৫) অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের সাফল্য বাংলাদেশর জন্য সুখবর এবং স্বস্তির ব্যপার। বাংলাদেশ সরকার ইন্ডিয়ার সেরাম ইন্সটিটিউটের কাছ থেকে তিন কোটি ডোজ ভ্যাকসিন পাবে ৬ মাসে। পাকা চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে এই মর্মে। আগামী বছরের প্রথমার্ধেই হয়তো এই ভ্যাকসিন পাওয়া যাবে।
অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের ফেইজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল এখনও চলমান বিভিন্ন দেশে। আরো নতুন ফলাফল আসবে অচিরেই। তখন হয়তো ভ্যাকসিনটির কার্যকারীতার উপর আরো বিস্তারিত ধারনা পাওয়া যাবে। তবে এখনকার ফলাফলের উপর ভিত্তি করেই বিশ্বব্যাপী ভ্যাকসিনটির ইমারজেন্সি প্রয়োগের জন্য আবেদন করা হবে যুক্তরাজ্য, ব্রাজিল, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপে। ডিসেম্বরেই যুক্তরাজ্যে ৪০ লক্ষ ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হবে স্বাস্থ্যকর্মী এবং ৮০ বছরের বৃদ্ধদের মধ্যে।
ড. খোন্দকার মেহেদী আকরাম,
এমবিবিএস, এমএসসি, পিএইচডি,
সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট,
শেফিল্ড ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাজ্য।
FavoriteLoadingপ্রিয় পোস্টের তালিকায় নিন।

About The Author

মন্তব্য করুন