রবিবার, অক্টোবর ২৫, ২০২০

ইঁদুরে সফল, মানুষে ব্যবহার সাত মাসের আগে নয়! (পর্ব – ২)

ইঁদুরে সফল, মানুষে ব্যবহার সাত মাসের আগে নয়! (পর্ব – ২)

image_pdfimage_print

ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের কার্যকরণ

একটা নতুন ভ্যাকসিনের প্রাথমিক কাজ শুরু হয় ল্যাবরেটরিতে। এ ধাপে উদ্ভাবিত ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা বোঝার জন্য পরীক্ষা করা হয় প্রাণীর ওপর। একে বলে প্রি-ক্লিনিক্যাল স্টাডি। ভ্যাকসিনটি এ ধাপে পাস করলে তাকে অনুমোদন দেয়া হয় মানুষের ওপর ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের। গ্লোব বায়োটেক এ ধাপটি মাত্র শেষ করল সেপ্টেম্বরে। তারা এখন ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অনুমোদন প্রাপ্তির অপেক্ষায়।

একটা ভ্যাকসিন কতটুকু নিরাপদ ও কার্যকর তা দেখার জন্য তিনটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল করা হয়। প্রথম ধাপের (ফেজ-১) ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল করা হয় স্বল্পসংখ্যক (২৫-১০০ জন) সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওপর। এ ধাপের ট্রায়ালে দেখা হয় প্রয়োগকৃত ভ্যাকসিনটি শরীরে কোনোরূপ ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে কিনা এবং কতটুকু ইমিউন রেসপন্স করে। দ্বিতীয় ধাপের (ফেজ-২) ট্রায়াল করা হয় অপেক্ষাকৃত অধিক সংখ্যক (১০০-৫০০ জন বা তারও বেশি) সুস্থ ভলান্টিয়ারের ওপর। এ ধাপে নির্ধারণ করা হয় ভ্যাকসিনটির কার্যকরী ডোজ এবং তা শরীরে কতটুকু নিউট্রালাইজিং অ্যান্টিবডি এবং টি-সেল বা ইমিউন সেল রেসপন্স ঘটাতে পারে। ভ্যাকসিন শরীরে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া করে কিনা তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয় কমপক্ষে দেড় মাস। ফেজ-১/২ ট্রায়াল দুটি এক সঙ্গে চালালেও তা দুই-তিন মাসের আগে শেষ করা সম্ভব নয়।

এ দুটো ধাপে সন্তোষজনক ফলাফল পাওয়া গেলে শুরু করা হয় শেষ ধাপের (ফেজ-৩) ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল। এ ধাপের ট্রায়ালটি করা হয় বৃহৎ পরিসরে কমপক্ষে ২০-৩০ হাজার সুস্থ বিভিন্ন বয়সের ও গোত্রের মানুষের ওপর। এ ট্রায়ালটি হতে হবে রেন্ডমাইজড প্ল্যাসিবো-কন্ট্রোল্ড ডাবল-ব্লাইন্ড ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল, যেখানে ট্রায়ালে অংশগ্রহণকারী অর্ধেকের শরীরে দেয়া হয় ভ্যাকসিন এবং বাকি অর্ধেককে দেয়া হয় প্ল্যাসিবো (নকল বা ডামি ভ্যাকসিন)। এরপর তাদের মুক্তভাবে চলাফেরা করতে দেয়া হয় জনমানুষের ভেতরে, যেখানে করোনা মহামারী চলমান। ট্রায়ালটি চলতে পারে কমপক্ষে তিন থেকে ছয় মাস বা তারও বেশি সময় ধরে। ট্রায়াল শেষে দেখা হয় আসল ভ্যাকসিন গ্রহীতাদের ভেতরে কতজন করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছে। ভ্যাকসিন গ্রহীতাদের ভেতরে যদি ৫০-৭০ শতাংশ করোনা থেকে মুক্ত থাকে তাহলে ধরে নেয়া হয় যে ভ্যাকসিনটি কার্যকর। এ ফলাফলের পরেই সাধারণত একটা নতুন ভ্যাকসিন সর্বসাধারণে প্রয়োগের অনুমতি দেয়া হয়। ফেজ-৩ ট্রায়ালে অংশগ্রহণকারী ভলান্টিয়ারদের মনিটর করা হয় দুই বছর।

ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে সময় লেগেছে কার কতদিন?

গ্লোব বায়োটেকের দাবি তারা অক্টোবর-নভেম্বর-ডিসেম্বরে তিনটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সম্পন্ন করবে। কিন্তু এত দ্রুত কীভাবে তারা সবগুলো ট্রায়াল শেষ করবে তার কোনো বিস্তারিত রূপরেখা নেই। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে এগিয়ে থাকা অন্য কোম্পানিগুলোর সময় লেগেছে কার কত দিন? তারাও কি সবাই তিন মাসে তাদের ভ্যাকসিনগুলোর তিনটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শেষ করতে পেরেছে?

ভ্যাকসিন দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা অক্সফোর্ড/অ্যাস্ট্রাজেনেকা তাদের ভ্যাকসিনটির কাজ শুরু করে জানুয়ারিতে। তিন মাসের ভেতরে তারা তাদের প্রি-ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা শেষ করে তার ফলাফল জমা দেয় মে মাসে নেচার জার্নালে। তারা ফেজ-১/২ ট্রায়ালের জন্য ২৩ এপ্রিল থেকে ২১ মে পর্যন্ত ১,০৭৭ জন ভলান্টিয়ারকে ভ্যাকসিন দেয় এবং তাদের পর্যবেক্ষণ করে আরো দুই মাস। অর্থাৎ তাদের ফেজ-১/২ ট্রায়ালে সময় লাগে প্রায় তিন মাস (ল্যানসেট, ২০ জুলাই)। এরপর তারা ফেজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু করে ২৭ জুন। অ্যাস্ট্রাজেনেকার দাবি এবং ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল অ্যানালিস্ট এয়ারফিনিটির হিসাব অনুযায়ী অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনটির ফেজ-৩ ট্রায়ালের মধ্যবর্তী ফলাফল হাতে আসবে অক্টোবরে (ব্লমবার্গ, ৩ সেপ্টেম্বর)। তারা আশা করছে যে তাদের ভ্যাকসিনটি বাজারে আসবে এ অক্টোবরের শেষ নাগাদ। সুতরাং অক্সফোর্ডের তিনটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শেষ করতে সময় লাগবে কমপক্ষে ছয়-সাত মাস।

মডার্না তাদের ভ্যাকসিনটির ফেজ-১ ট্রায়াল শুরু করে মার্চে এবং এর ফলাফল ঘোষণা করে মে মাসে। তারা ফাইজারের ভ্যাকসিনের সঙ্গে প্রত্যেকে ৩০ হাজার করে ভলান্টিয়ারের ওপর ফেজ-৩ ট্রায়াল শুরু করে জুলাইয়ের শেষে। এয়ারফিনিটির হিসাব অনুযায়ী উভয় কোম্পানিই তাদের ফেজ-৩ ট্রায়ালের মধ্যবর্তী ফলাফল হাতে পেতে পারে নভেম্বরে। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে মডার্না ও ফাইজার তাদের তিনটি ফেজের ট্রায়াল শেষ করতে (মধ্যবর্তী) সময় নেবে আট মাস, যার মধ্যে ফেজ-৩-এই লাগবে চার মাস।

অন্যদিকে সিনোভ্যাক তাদের ভ্যাকসিনটির ফেজ-২ ট্রায়াল শুরু করে এপ্রিলের শেষে এবং ১০ হাজার ভলান্টিয়ারের ওপর ফেজ-৩ ট্রায়াল শুরু করে জুলাইয়ের শেষের দিকে। এয়ারফিনিটির অ্যানালাইসিস অনুযায়ী তারা তাদের ফেজ-৩ মধ্যবর্তী ফলাফল হাতে পেতে পারে নভেম্বরের শেষ নাগাদ। অর্থাৎ তিনটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শেষ করতে (অন্তর্বর্তীকালীন ফলাফল) সিনোভ্যাকের ন্যূনতম সময় লাগবে সাত মাস (ব্লুমবার্গ, ৩ সেপ্টেম্বর)। একইভাবে জনসন অ্যান্ড জনসনের ভ্যাকসিনটির ফেজ-৩-এর মধ্যবর্তী ফলাফল পেতে সময় লাগবে চার মাস।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে এত দ্রুততার মাঝেও তিনটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল মাঝপথে শেষ করে তার ফলাফল পেতে ভ্যাকসিন তৈরিতে অতি অভিজ্ঞ কোম্পানিগুলোরও সময় লাগবে গড়ে সাত-আট মাস, যেখানে শুধু ফেজ-৩ ট্রায়ালেই সময় লাগে চার মাস। তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন এসে যায় ভ্যাকসিন তৈরিতে একেবারেই নতুন গ্লোব বায়োটেক কীভাবে তাদের ভ্যাকসিনটির তিনটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল তিন মাসের ভেতর শেষ করবে?

এছাড়া বাংলাদেশে ফেজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য একটি সমস্যা দেখা দিতে পারে। আমাদের দেশে এখন করোনা সংক্রমণের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এভাবে কমতে থাকলে ডিসেম্বরের দিকে দেশে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা অনেক কমে যাবে। এটা আমাদের জন্য সুখের খবর, কিন্তু ভ্যাকসিনের ফেজ-৩ ট্রায়ালের জন্য খারাপ খবর। সংক্রমণ কমে গেলে ফেজ-৩ ট্রায়ালে সময় লাগে বেশি (ব্লুমবার্গ, ৩ সেপ্টেম্বর)। সংক্রমণ যদি একদমই না থাকে বা খুব কমে যায় তাহলে সে স্থানে ফেজ-৩ ট্রায়াল করা যায় না। এমনটি ঘটেছে চীনে। তারা এখন বাধ্য হয়ে অন্য দেশে তাদের ভ্যাকসিনগুলোর ট্রায়াল করছে।

কবে আসতে পারে গ্লোবের ভ্যাকসিন বাজারে?

সুতরাং সবকিছুর বিবেচনায় আমার মনে হয়, তিন মাসে যথাযথভাবে সব নিয়ম মেনে ভ্যাকসিনের তিনটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সম্পন্ন করা কখনই সম্ভব নয়। গ্লোব বাদে ওপরে যে কোম্পানিগুলোর নাম উল্লেখ করা হয়েছে তারা সবাই নিয়মিত ভ্যাকসিন তৈরি করে। ভ্যাকসিনের জন্য তাদের অবকাঠামো ও প্রডাকশন লাইন সবই প্রস্তুত ছিল। তার পরও তাদের তিনটি ট্রায়ালে সময় লাগবে আট মাস। সেক্ষেত্রে একটি নতুন কোম্পানির অপেক্ষাকৃত বেশি সময় লাগবে এটাই স্বাভাবিক। গ্লোব বায়োটেক মাত্র তাদের প্রি-ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা শেষ করল। ভ্যাকসিন উৎপাদনে পাড়ি দিতে হবে দীর্ঘ অনিশ্চিত এক পথ, যেখানে সফল হওয়ার সম্ভাবনা মাত্র ৫-৬ শতাংশ। সবকিছু ধনাত্মকভাবে চললে এবং খুব ত্বরিত গতিতে ট্রায়াল তিনটি চালালেও আগামী বছরের মে-জুনের আগে গ্লোবের ভ্যাকসিন বাজারে আসার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।

ইঁদুরে সফল, মানুষে ব্যবহার সাত মাসের আগে নয়! (পর্ব – ১)

FavoriteLoadingপ্রিয় পোস্টের তালিকায় নিন।

About The Author

মন্তব্য করুন