রবিবার, অক্টোবর ২৫, ২০২০

করোনা ভ্যাকসিন দৌড়ে কে আছে কোন অবস্থায়?

করোনা ভ্যাকসিন দৌড়ে কে আছে কোন অবস্থায়?

image_pdfimage_print

গত বছরের ডিসেম্বরে চীনের উহান শহরে বাঁদুর থেকে আবির্ভূত হওয়া করোনাভাইরাসটি নয় মাসে ছড়িয়ে পরেছে ২১৩ টি দেশে, সংক্রমিত করেছে ২ কোটি ৮৬ লক্ষ মানুষকে এবং মৃত্যু ঘটিয়েছে নয় লক্ষের উপরে। ১৯১৮ সালের ভয়াবহ ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারীরপর এতবড় মহামারী এই প্রথম। গত দেড় মাস ধরে বিশ্বব্যাপী প্রতিদিন গড়ে নতুন করে করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে আড়াই লক্ষ মানুষ আর তা থেকে মারা যাচ্ছে প্রতিদিন সাড়ে পাঁচ হাজার করে (ওয়ার্ল্ডওমিটার, ১২ সেপ্টেম্বর)। করোনা মহামারীর এপিসেন্টার বা কেন্দ্র ইউরোপ আমেরিকা ঘুরে এখন শক্ত অবস্থান নিয়েছে ল্যাটিন আমেরিকা এবং দক্ষিণ এশিয়ায়।

গত এক সপ্তাহে ব্রাজিলে সংক্রমণ এবং মৃত্যু হার কিছুটা কমতে শুরু করলেও, আমাদের পড়শী দেশ ইন্ডিয়াতে করোনা সক্রমণ বেড়েই চলেছে সমানুপাতিক হারে। প্রতিদিন নতুন রোগী সনাক্তের দিক দিয়ে ইন্ডিয়া এখন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে বিশ্বে প্রথম। মোট মৃত্যু সংখ্যার দিক দিয়ে আমরা চীনকে ছাড়িয়ে গেছি দুদিন আগেই। আর এতো অপ্রতুল টেস্ট করার পরও বাংলাদেশের করোনা আক্রান্তের সংখ্যা এখন চীনের চার গুন। মোট আক্রান্তের দিক দিয়ে এশিয়ায় আমাদের অবস্থান এখন তৃতীয়। বর্তমানে মৃত্যুহার পূর্বের চেয়ে কিছুটা কমে আসলেও, সংক্রমণের হার এখনও উর্ধগতি। বিজ্ঞানীদের ধারণা এই করোনাভাইরাস সহসাই আমাদের ছেড়ে যাবে না। ফ্লু ভাইরাসের মতোই রয়ে যাবে আমাদের মাঝে। সুতরাং এই ভাইরাসকে মোকাবিলা করে জীবনযাপন স্বাভাবিক করতে হলে এখন দরকার একটি নিরাপদ এবং কার্যকরী ভ্যাকসিন।

একটা ভ্যাকসিন কাজ করে কিভাবে?

একটা কার্যকরী ভ্যাকসিন আমাদের শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে প্রস্তুত করে রাখে এমন ভাবে যাতে করে শরীরে কোন ভাইরাস বা অন্যান্য জীবাণু প্রবেশ করা মাত্রই তা নিস্ক্রিয় হয়ে যেতে পারে। ভ্যাকসিনের মাধ্যমে কোন নির্দিস্ট জীবাণুর বিরুদ্ধে এই রোগপ্রতিরোধী ক্ষমতা তৈরী হয় দুই ভাবে:
(১) জীবাণুটির বিরুদ্ধে নিউট্রালাইজিং এন্টিবডি তৈরী করে এবং
(২) টি-সেল (একধরনের শ্বেত কনিকা) কে যথাযথ ট্রেইনিং বা প্রস্তুতিকরণের মাধ্যমে।
আধুনিক বিজ্ঞানমতে যে ভ্যাকসিনটি এ দুটি প্রক্রিয়াকে একই সাথে উজ্জিবিত করতে পারবে সেই ভ্যাকসিনটি হতে পারে সবচেয়ে কার্যকরী এবং দিতে পারে দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষা।

গবেষণা থেকে জানা যায় করোনাভাইরাসের সংক্রমণে শরীরে যে নিউট্রালাইজিং এন্টিবডি তৈরী হয় তা তিন থেকে চার মাসের ভেতরেই প্রায় নিঃশেষ হয়ে যায়! তবে এন্টিবডি কমে গেলেও শরীরে থেকে যায় ঐ ভাইরাস বিরোধী মেমোরি টি-সেল (CD4+ এবংCD8+ T cells) যারা করোনাভাইরাসকে সনাক্ত করতে পারে এবং বি-সেলকে সক্রিয় করার মাধ্যমে নিউট্রালাইজিং এন্টিবডিতৈরী (CD4+ T cell কর্তৃক) ও সরাসরি ভাইরাস সংক্রমিত কোষকে ধ্বংস করতে পারে (CD8+ T cell কর্তৃক)। এ কারনেই ভ্যাকসিন বিশেষজ্ঞগণ মোটামুটি একমত যে করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিনকে কার্যকরী এবং দীর্ঘস্থায়ী হতে হলে ভ্যাকসিনটিকে ভাইরাস নিউট্রালাইজিং এন্টিবডি তৈরীর পাশাপাশি টি-সেল রেসপন্সও ঘটাতে হবে। বর্তমানে আধুনিক ভ্যাকসিনগুলোর ডিজাইনও তাই করা হচ্ছে এই দুইটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বিবেচনা করে।

ভ্যাকসিনের কার্যকরীতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ পদ্ধতি:

একটা ভ্যাকসিন কতটুকু নিরাপদ এবং কার্যকরী তা দেখার জন্য তিনটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল করা হয়। প্রথম ধাপের (ফেইজ-১) ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল করা হয় স্বল্পসংখ্যক (২৫-১০০ জন) সুস্থ্য প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের উপর। এই ধাপের ট্রায়ালে দেখা হয় প্রয়োগকৃত ভ্যাকসিনটি শরীরে কোনরূপ ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে কি না এবং কতটুকু ইমিউন রেসপন্স করে। দ্বিতিয় ধাপের(ফেইজ-২) ট্রায়াল করা হয় অপেক্ষাকৃত অধিক সংখ্যক (১০০-৫০০ জন) সুস্থ্য ভলান্টিয়ারের উপর। এই ধাপে নির্ধারণ করা হয় ভ্যাকসিনটির কার্যকরী ডোজ এবং তা শরীরে কতটুকু নিউট্রালাইজিং এন্টিবডি এবং টি-সেল বা ইমিউন সেল রেসপন্স ঘটাতে পারে। ভ্যাকসিন শরীরে কোনো পার্শপ্রতিক্রিয়া করে কিনা তা নিবিঢ়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয় কমপক্ষে দেড় মাস।

এই দুটো ধাপে সন্তোষজনক ফলাফল পাওয়া গেলে শুরু করা হয় শেষ ধাপের (ফেইজ-৩) ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল। এই ধাপের ট্রায়ালটি করা হয় বৃহৎ পরিসরে ১০-৩০ হাজার সুস্থ্য বিভিন্ন বয়সের এবং গোত্রের মানুষের উপর। এই ট্রায়ালটি হতে হবে রেন্ডমাইজড প্ল্যাসিবো-কন্ট্রোল্ড ডাবল-ব্লাইন্ড ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল (RCT), যেখানে ট্রায়ালে অংশগ্রহনকারী অর্ধেকের শরীরে দেয়া হয় ভ্যাকসিন এবং বাকী অর্ধেককে দেয়া হয় প্ল্যাসিবো (নকল বা ডামি ভ্যাকসিন)। এরপর তাদেরকে মুক্তভাবে চলাফেরা করতে দেয়া হয় জনমানুষের ভেতরে, যেখানে করোনা মহামারী চলমান। ট্রায়ালটি চলতে পারে ৩ থেকে ৬ মাস বা তারও বেশি সময় ধরে। ট্রায়াল শেষে দেখা হয় আসল ভ্যাকসিন গ্রহীতাদের ভেতরে কতজন করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছে। ভ্যাকসিনগ্রহীতাদের ভেতরে যদি ৫০-৭০ শতাংশ করোনা থেকে মুক্ত থাকে তাহলে ধরে নেয়া হয় যে ভ্যাকসিনটি কার্যকরী। এই ফলাফলের পরেই সাধারণত একটা নতুন ভ্যাকসিন সর্বসাধারণে প্রয়োগের অনুমতি দেয়া হয়।

ভ্যাকসিন উৎপাদনে কে আছে কোন অবস্থানে?

চলতি বছরের শুরুতেই চীন নোভেল করোনাভাইরাসটির জেনম সিক্যুয়েন্স করে ফেলে তড়িৎ গতিতে এবং তা উন্মুক্ত করে দেয় সবার জন্য। এই সিক্যুয়েন্সকে ভিত্তি করে বছরের শুরু থেকেই কয়েকটি দেশ ভ্যাকসিন তৈরীর কাজে নেমে পরে সর্বশক্তি নিয়ে; যার মধ্যে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জার্মানী এবং রাশিয়া অগ্রগামী। পরবর্তীতে এদের সাথে যুক্ত হয় ফ্রান্স, ইন্ডিয়া, ইতালি, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও কিউবা। বাংলাদেশের একমাত্র কোম্পানি গ্লোব বায়োটেক তাদের ভ্যাকসিন উদ্ভাবন প্রক্রিয়া শুরু করে মার্চের শুরুতে। ভ্যাকসিন উৎপাদন একটি জটিল এবং লম্বা প্রক্রিয়া, যেখানে সফলতার হার মাত্র ৬-৭ শতাংশ। ভ্যাকসিনদৌড়ে এখন পর্যন্ত অংশ নিয়েছে মোট ১৩১ টি ভ্যাকসিন, যার মধ্যে ৯৩ টি রয়েছে ল্যাবরেটরি পর্যায়ে এবং ৩৮ টি রয়েছে বিভিন্ন ধাপের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে থাকা ভ্যাকসিনগুলোর মধ্যে শেষ ধাপ বা ফেইজ-৩ ট্রায়ালে রয়েছে অক্সফোর্ডের চ্যাডক্স-১, মর্ডানার এমআরএনএ ভ্যাকসিন, জার্মানির বায়োন্টেক (ফাইজার), চীনের সিনোভ্যাক, সিনোফার্ম ও ক্যানসিনোবায়ো এবং রাশিয়ার স্পুটনিক-৫ ভ্যাকসিন (নিউ ইয়র্ক টাইমস ভ্যাকসিন ট্র্যাকার)। অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন তাদের ফেইজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শেষ করবে সেপ্টেম্বরে এবং অক্টোবরেই তারা ভ্যাকসিনটি বাজারে আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অন্য দিকে মর্ডানা এবং সিনোভ্যাক তাদের ভ্যাকসিন এ বছরের শেষে বা আগামী বছরের প্রথমে বাজারে আনতে পারে। রাশিয়ার স্পুটনিক-৫ এবং চীনের ক্যানসিনোবায়ো ও সিনোভ্যাক ভ্যাকসিন ফেইজ-৩ ট্রায়াল না করেই নিজনিজ দেশের জনসাধারণের উপর প্রয়োগ করা শুরু করেছে!

কোন ভ্যাকসিন কতটুকু কার্যকরী?

করোনা প্রতিরোধে এবার বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান একদম নতুন ধরণের ভ্যাকসিন প্রস্তুত করছে যেগুলি পূর্বে কখনো ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়নি। এর ভেতরে এমআরএনএ ভ্যাকসিন এবং অ্যাডিনোভাইরাস ভেক্টর ভ্যাকসিন উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও ভ্যাকসিন তালিকায় রয়েছে সনাতন পদ্ধতিতে তৈরী ইনেক্টিভেটেড এবং প্রোটিন/পেপ্টাইড ভ্যাকসিন।

অ্যাডিনোভাইরাস ভেক্টর ভ্যাকসিন:

ভ্যাকসিন তৈরীর এই পদ্ধতিতে রিকম্বিনেন্ট টেকনোলজির মাধ্যমে অ্যাডিনোভাইরাসের মধ্যে করোনাভাইরাসের স্পাইকপ্রোটিনের জিন প্রবেশ করিয়ে দেয়া হয়। এতে করে অ্যাডিনোভাইরাসটি যখন টিকার মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে, তখন আমাদের ইমিউন সিস্টেম এই ভাইরাসটিকে করোনাভাইরাস হিসেবে চিহ্নিত করে এর বিপরীতে রোগপ্রতিরোধ ব্যাবস্থা গড়ে তোলে, যা পরবর্তিতে আমাদেরকে আসল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা দেয়।

অক্সফোর্ড এবং অ্যাস্ট্রাজেনিকার যৌথ উদ্যোগে উদ্ভাবিত চ্যাডক্স-১ ভ্যাকসিন তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে শিম্পাঞ্জি অ্যাডিনোভাইরাস ভেক্টর। ভ্যাকসিনটির প্রি-ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালানো হয় ইঁদুর এবং বানরের উপর। এতে দেখা যায় যে ভ্যাকসিনটি ইঁদুরের রক্তে পর্যাপ্ত পরিমান নিউট্রালাইজিং এন্টিবডি (IgG) তৈরী করতে এবং ভাইরাস বিরোধী টি-সেল রেসপন্স ঘটাতে পারে (নেচার, ২০ জুলাই)। পরবর্তিতে ভ্যাকসিনটির ফেইজ-১/২ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালানো হয় যুক্তরাজ্যের ৫ টি হাসপাতালে ১,০৭৭ জন ভলান্টিয়ারের উপর। ফলাফলে দেখা যায় প্রথম ডোজ দেয়ার ১৪ দিন পর ভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনের বিপরীতে পর্যাপ্ত পরিমান টি-সেল তৈরী হয়েছে রক্তে এবং ২৮ দিন পরে দ্বিতীয় ডোজ দেয়ায় ১০০% টিকা গ্রহিতার রক্তেই নিউট্রালাইজিং এন্টিবডি তৈরী হয়েছে যার টাইটার কনভালেসেন্ট প্লাজমায় প্রাপ্ত এন্টিবডি টাইটারের সমান (ল্যানসেট, ২০জুলাই)। অক্সফোর্ড এখন তাদের ভ্যাকসিনটির ফেইজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালাচ্ছে ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইন্ডিয়া, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের ৪০ হাজার ভলান্টিয়ারের উপর।

চীনের ক্যানসিনোবায়ো ভ্যাকসিনটিও তৈরি করা হয়েছে অ্যাডিনোভাইরাস ভেক্টর ব্যাবহার করে, তবে এক্ষেত্রে তারা ব্যাবহার করছে হিউম্যান অ্যাডিনোভাইরাস-৫ (অ্যাড-৫)। এই ভ্যাকসিনটির ফেইজ-১ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালানো হয় ১০৮ জনভলান্টিয়ারের উপর। ফলাফল অনেকটা অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের মতই। এক ডোজ ভ্যাকসিন দেয়ার ১৪ দিন পরেই রক্তে পর্যাপ্ত পরিমান ভাইরাস বিরোধী টি-সেল তৈরী হয়, আর ২৮ দিনের ভেতরে রক্তে তৈরী হয় ভাইরাস নিউট্রালাইজিং এন্টিবডি (ল্যানসেট, ২২ মে)। এই ভ্যাকসিনটি এখন তাদের ফেইজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালাচ্ছে সৌদি আরব এবং পাকিস্তানে।

অন্যদিকে, রাশিয়ার স্পুটনিক-৫ ভ্যাকসিনটিতে ব্যাবহার করা হয়েছে দুইটি হিউম্যান অ্যাডিনোভাইরাস ভেক্টর অ্যাড-৫ ওঅ্যাড-২৬। ২১ দিন ব্যবধানে দেয়া দুই ডোজের ভ্যাকসিনে প্রথম ডোজে ব্যাবহার করা হয়েছে অ্যাড-২৬ নামক বিরল প্রজাতির অ্যাডিনোভাইরাস এবং দ্বিতীয় ডোজে ব্যবহার করা হয়েছে সাধারন অ্যাড-৫ জাতের অ্যাডিনোভাইরাস।

ভ্যাকসিনটির ফেইজ-১/২ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালান হয় ৭৬ জন ভলান্টিয়ারের উপর এবং তার পূর্ণ ফলাফল প্রকাশিত হয় ল্যানসেট জার্নালে। ট্রায়ালে দেখা যায় প্রথম ডোজ টিকা দেয়ার ২৮ দিনের ভেতরেই শতভাগ ভ্যাকসিন গ্রহীতার রক্তে পর্যাপ্ত নিউট্রালাইজিং এন্টিবডি তৈরী হয়, এবং দুই ডোজ ভ্যাকসিন দেয়ার পরে সবার শরীরেই টি-সেল রেসপন্স হয় (ল্যানসেট, ৪সেপ্টেম্বর)। রাশিয়া এখন তাদের ভ্যাকসিনটির ফেইজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালাচ্ছে নিজ দেশের প্রায় ৪০ হাজার ভলান্টিয়ারের উপর।

উপরল্লেখিত ভ্যাকসিনগুলোতে কিছু সাধারন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও পরিলক্ষিত হয়েছে। যেমন ভ্যাকসিন পরবর্তী গা ব্যাথা, জ্বর, মাথাব্যাথা, টিকার স্থানে ব্যাথা ইত্যাদি। তবে কোন ভ্যাকসিনই তেমন কোন মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সৃস্টি করেনি।

এ ধরনের অ্যাডিনোভাইরাস ভেক্টর ভ্যাকসিনগুলোর একটা বড় সমস্যা হচ্ছে এন্টি-ভেক্টর ইমিউনিটি। অ্যাডিনোভাইরাস খুব সাধারন একটা ভাইরাস এবং এটা প্রতিনিয়ত আমাদের শরীরে ঠান্ডা সর্দি-জ্বর করে থাকে। আর এ কারনেই আমাদের শরীরেঅনেক ক্ষেত্রেই এই ভাইরাসটির বিপরীতে ইমিউনিটি বা এন্টিবডি তৈরী হয়ে থাকে। কারো শরীরে যদি ভ্যাকসিন দেয়ার আগেই অ্যাডিনোভাইরাসের বিপরীতে এন্টিবডি টাইটার বেশী থাকে সেক্ষেত্রে এ ধরনের ভ্যাকসিনের কার্যকারীতা অনেকটাই হ্রাস পেতে পারে।

এরকম সমস্যা এড়ানোর জন্যই অক্সফোর্ড মানুষের অ্যাডিনোভাইরাস ব্যবহার না করে ব্যবহার করেছে শিম্পাঞ্জির অ্যাডিনোভাইরাস। আর রাশিয়া হিউম্যান অ্যাডিনোভাইরাস ব্যবহার করলেও এক্ষেত্রে তারা বেছে নিয়েছে বিরল প্রজাতির অ্যাডিনোভাইরাস (অ্যাড-২৬) যার বিপরীতে আমাদের শরীরে ইমিউনিটি খুবই কম। আর এর ফলেই স্পুটনিক-৫ ভ্যাকসিনটির কার্যকরীতায় এন্টি-ভেক্টর ইমিউনিটি তেমন কোন বিরুপ প্রভাব ফেলবে না।

এমআরএনএ ভ্যাকসিন:

এমআরএনএ করোনা ভ্যাকসিন আরেকটি আলোচিত ভ্যাকসিন। আমেরিকার মর্ডানা এবং জার্মানির বায়োন্টেক/ফাইজারতৈরী করছে এই নতুন ধরনের ভ্যাকসিনটি। মর্ডানা তাদের ভ্যাকসিনটির প্রি-ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা চালায় বানরের উপর। ভ্যাকসিন প্রয়োগে বানরের শরীরে পর্যাপ্ত পরিমান নিউট্রালাইজিং এন্টিবডি ও টি-সেল এর উপস্থিতি নির্ণীত হয় (নিউ ইংল্যান্ডজার্নাল অব মেডিসিন, ২৮ জুলাই)। এরপর তারা ভ্যাকসিনটির ফেইজ-১ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালায় ৪৫ জন ভলান্টিয়ারের উপর। ভ্যাকসিনের দুটি ডোজ ভাইরাসের বিরুদ্ধে নিউট্রালাইজিং এন্টিবডি তৈরী করে পর্যাপ্ত। এছাড়াও ভ্যাকসিনটি সফল টি-সেল রেসপন্স ঘটাতে সক্ষম হয় (নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন, ১৪ জুলাই)। বায়োনটেকের চালানো ফেইজ-১ ক্লিনিক্যালট্রায়ালও আশানুরুপ ফলাফল প্রদর্শন করে যেখানে ভ্যাকসিনটি শরীরে নিউট্রালাইজিং এন্টিবডি তৈরী এবং টি-সেল রেসপন্স ঘটাতে সক্ষম হয় (medRxiv, ২০ আগস্ট এবং ফাইজার ডট কম)। মর্ডানা এবং ফাইজার এখন তাদের ভ্যাকসিনের ফেইজ-২/৩ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ৩০ হাজার ভলান্টিয়ারের উপর।

কিল্ড বা ইনেক্টিভেটেড ভ্যাকসিন:

এই পদ্ধতিতে করোনা ভাইরাসকে কেমিক্যালের মাধ্যমে নিষ্ক্রিয় করে ভ্যাকসিন হিসেবে ব্যাবহার করা হয়। ভ্যাকসিন তৈরীর এইপদ্ধতিটি একটি প্রাচীন পদ্ধতি এবং বর্তমানে ব্যবহৃত অনেক ভ্যাকসিনই এই পদ্ধতিতে তৈরি। চীনের সিনোভ্যাকের করোনাভ্যাকএবং সিনোফার্ম ভ্যাকসিনদুটি এই পদ্ধতিতে তৈরি।

সিনোভ্যাক তাদের ভ্যাকসিনের প্রি-ক্লিনিক্যাল স্টাডি চালায় ইঁদুর এবং বানরের উপর। ভ্যাকসিনটি ইঁদুর এবং বানরের রক্তেপর্যাপ্ত পরিমান নিউট্রালাইজিং এন্টিবডি তৈরি করে, তবে তা টি-সেল রেসপন্স ঘটাতে ব্যর্থ হয় (সাইন্স, ৩ জুলাই)! এরপর ভ্যাকসিনটির ফেইজ-২ ট্রায়াল চালানো হয় ৬০০ জন ভলান্টিয়ারের উপর। ভ্যাকসিনটি ৯৫ শতাংশ টিকা গ্রহীতার রক্তে নিউট্রালাইজিং এন্টিবডি তৈরী করতে সমর্থ হয় তবে সেই এন্টিবডি টাইটার ছিল কনভালেসেন্ট প্লাজমায় প্রাপ্ত নিউট্রালাইজিং এন্টিবডি টাইটারের চেয়ে যথাক্রমে ২.৫ থেকে ৭ গুন কম। এই ট্রায়ালটিতে টি-সেল রেসপন্স পর্যবেক্ষণ করা হয়নি (medRxiv, ১০ আগস্ট)।

অন্যদিকে সিনোফার্ম তাদের ভ্যাকসিনটির ফেইজ-১/২ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালায় যথাক্রমে ৯৬ এবং ২২৪ জন ভলান্টিয়ারের উপর। দুই ডোজ ভ্যাকসিন প্রয়োগের ১৪ দিন পরেই রক্তে তৈরী হয় পর্যাপ্ত ভাইরাস নিউট্রালাইজিং এন্টিবডি। এই ট্রায়ালে দেখা যায় ১০০% ভ্যাকসিন গ্রহীতার শরীরে নিউট্রালাইজিং এন্টিবডি তৈরী করতে হলে প্রয়োজন হয় ২৮ দিন অন্তর ৩ ডোজ ভ্যাকসিন। দুই ডোজে শুধুমাত্র ৮৬% মানুষের দেহে এন্টিবডি তৈরী হয় (JAMA জার্নাল, ১৩ আগস্ট)। সিনোভ্যাক বা সিনোফার্মকোন ভ্যাকসিনই টি-সেল রেসপন্স ঘটাতে পারেনি, তার কারন হল ইনেক্টিভেটেড বা কিল্ড ভ্যাকসিন টি-সেল মেডিয়েটেড ইমিউন রেসপন্স করাতে অক্ষম।

প্রোটিন ভ্যাকসিনঃ

সম্প্রতি আলোচিত আরেকটি ভ্যাকসিন হচ্ছে আমেরিকার নোভাভ্যাক্স। এটি একটি রিকম্বিনেন্ট স্পাইক প্রোটিন ভ্যাকসিন, যেখানে এই প্রোটিনটি তৈরী করা হয়েছে মথের শরীরে। এই প্রোটিনটি ম্যাট্রিক্স-এম অ্যাডজুভেন্টের সাথে মিশিয়ে মাংসপেশিতে দেয়া হয় ভ্যাকসিন আকারে। নোভাভ্যাক্সের ফেইজ-১ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালানো হয়েছে ১৩১ জন ভলান্টিয়ারের উপর। ২১দিন অন্তর দুই ডোজ ভ্যাকসিন যথেস্ট পরিমান নিউট্রালাইজিং এন্টিবডি তৈরী করে, রক্তে যার টাইটার ছিল কনভালেসেন্ট প্লাজমার নিউট্রালাইজিং এন্টিবডির ৪ গুন বেশী। ভ্যাকসিনটি টি-সেল রেসপন্স ঘটাতেও সক্ষম হয়েছে শতভাগ (medRxiv, ৬আগস্ট)।

সুতরাং দেখা যায় উপরল্লেখিত ভ্যাকসিনগুলোর ভেতরে সিনোভ্যাক এবং সিনোফার্ম ভ্যাকসিন দুটি ছাড়া বাকী সব ভ্যাকসিনই কাজ করে নিউট্রালাইজিং এন্টিবডি এবং টি-সেল অ্যাকটিভেশনের মাধ্যমে। সেই বিচারে অক্সফোর্ড, মর্ডানা, স্পুটনিক-৫, বায়োনটেক, ক্যানসিনোবায়ো অথবা নোভাভ্যাক্স ভ্যাকসিনগুলো বেশি কার্যকরী হবে বলে মনে হয়। তবে শুধুমাত্র ফেইজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের পরেই নিশ্চিত করে বলা যাবে কোন ভ্যাকসিনগুলো প্রকৃতভাবেই কার্যকরী।

গ্লোব বায়োটেকের ভ্যাকসিন এখন কোন অবস্থায়?

বাংলাদেশের গ্লোব বায়োটেক মার্চের শুরুতে তাদের ভ্যাকসিন প্রজেক্ট শুরু করে এবং জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে তাদের ভ্যাকসিনের প্রথম সাফল্য প্রেসব্রিফিংয়ের মাধ্যমে সবাইকে অবহিত করে। ৫ টি খরগোশের উপর চালানো প্রি-ক্লিনিক্যাল ভ্যাকসিন টেস্টে তারা আশাব্যাঞ্জক ফলাফল পেয়েছে। এর পরে তারা শুরু করে ইঁদুরের উপর তাদের ভ্যাকসিনের কন্ট্রোলড এনিম্যাল ট্রায়াল। টিভি এবং খবরের কাগজ থেকে জানা যায় যে তারা এ মাসের মাঝামাঝিতে এনিম্যাল ট্রায়াল শেষ করবে এবং এই ট্রায়ালে তারাআশাব্যঞ্জক ফলাফল পেয়েছে। এখন তাদের প্ল্যান অক্টোবরের শুরুতেই তাদের ভ্যাকসিনের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু করা। যদিও এখনো তারা তাদের পরীক্ষানিরীক্ষার কোনো ফলাফল কোথাও প্রকাশ করেনি। গ্লোব বায়োটেক দাবি করছে আগামী ৩ মাসে তারা তিনটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সম্পন্ন করবে এবং ভ্যাকসিনটি বাজারে নিয়ে আসতে পারবে ডিসেম্বরে অথবা জানুয়ারিতে! তবে তিন মাসে কিভাবে তিনটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সম্পন্ন করা যায় সেটা আমার কাছে বোধগম্য নয়। ফেইজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে ভলান্টিয়ার থাকতে হবে অন্তত ২০-৩০ হাজার এবং সময় লাগবে কমপক্ষে ৩ মাস। এছাড়াও আরেকটি সমস্যা হতে পারে ফেইজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ক্ষেত্রে। নভেম্বর-ডিসেম্বরের দিকে আমাদের দেশে করোনা সংক্রমণ অনেক কমে যেতে পারে।একটা এলাকায় সংক্রমণ খুব কমে গেলে সেখানে ভ্যাকসিনের ফেইজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল করা সম্ভব না। এমনটি ঘটেছে চীন এবং যুক্তরাজ্যে। আর এ কারণেই তারা তাদের ফেইজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালাচ্ছে অন্যান্য দেশে। এমন ঘটনা ঘটলে গ্লোব অবশ্য ইন্ডিয়াতে তাদের ট্রায়াল চালাতে পারে। এটা অবশ্য একটা অনুমান মাত্র।

যে কারনে হঠাৎ করে বন্ধ হয়েছিল অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন ট্রায়াল!

হঠাৎ করেই ৮ সেপ্টেম্বর অ্যাস্ট্রাজেনিকা তাদের অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনটির তিনটি দেশে পরিচালিত ফেইজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের সকল কার্যক্রম সাময়ীক ভাবে স্থগিত করলো। কারন যুক্তরাজ্যের ভ্যাকসিন গ্রহীতাদের মধ্যে একজন হঠাৎ মারাত্মক ভাবে অসুস্থ হয়ে পরেছে। কারণ অনুসন্ধান চালানোর জন্য তাদেরকে ট্রায়াল বন্ধ রাখতে হবে।

৮ সেপ্টেম্বরের নিউইয়র্ক টাইমস থেকে জানা যায় যে ঐ মারাত্মকভাবে অসুস্থ ভ্যাকসিন গ্রহীতাটি আসলে ট্রান্সভার্স মায়েলাইটিসে আক্রান্ত। এটা একধরণের মারাত্মক স্পাইনাল কর্ড বা মেরুরজ্জুর প্রদাহ জনিত সমস্যা। ট্রান্সভার্স মায়েলাইটিস বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে ভাইরাস ইনফেকশনের কারনে হয়ে থাকে। অসুখটা তীব্র এবং মারাত্মক হলেও স্টেরয়েড চিকাৎসার মাধ্যমে সারিয়ে তোলা সম্ভব। এধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ১৭ হাজার ভ্যাকসিন গ্রহীতাদের ভেতরে এই প্রথম দেখা দিল। পরবর্তীতে নিরপেক্ষ সেইফটি কমিটির তদন্তে দেখা যায় যে ঐ ট্রান্সভার্স মায়েলাইটিসের সাথে ভ্যাকসিনটির সরাসরি কোন সম্পর্ক নাই। এর ফলশ্রুতিতে ১২ সেপ্টেম্বর থেকে ভ্যাকসিনটির ট্রায়াল আবার শুরু হয়েছে।

যথাযথ ফেইজ-৩ ট্রায়াল ছাড়া নতুন ভ্যাকসিন বিপদজনক:

তৃতীয় ধাপের ট্রায়ালের একদম শেষ পর্যায়ে এসে হঠাৎ অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন থমকে দাঁড়িয়েছিল অনাকাংখিত এক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারনে! এ কারনেই একটা নিরাপদ ভ্যাকসিন উৎপাদনে বড় পরিসরে ফেইজ-৩ ট্রায়াল খুবই জরুরী। অনিরাপদ ভ্যাকসিন ভালোর চেয়ে ক্ষতিই করে বেশী। ভ্যাকসিনে ব্যবহার করা হয় জীবানু, জীন অথবা প্রোটিন। এগুলো সবই জৈবিক ভাবেসক্রিয় যা পরীক্ষা করে না ব্যবহার করলে শরীরে গিয়ে নতুন রোগ সৃষ্টি করতে পারে।

অতীতে দেখা গেছে তরিঘরি করে উৎপাদিত কিছু পোলিও ভ্যাকসিন প্রায় ৭০ হাজার শিশুর শরীরে মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার সৃস্টি করেছিল এবং এতে অনেক শিশু মারাও গিয়েছিল। এত কিছুর পরেও দেখা যাচ্ছে বিলিয়ন ডলারের বাজার ধরতে রাশিয়া বা চীন রিসার্চ এথিক্স এবং নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই কোন প্রকার ফেইজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ছাড়াই অপরীক্ষিত ভ্যাকসিন প্রয়োগ করছে তাদের সাধারন জনগনের উপর। নিজ দেশের নিরিহ মানুষগুলোকে বানাচ্ছে গিনিপিগ! এভাবে ভ্যাকসিন প্রয়োগে কোনো প্রকার দুর্ঘটনা ঘটলে তা মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে গোটা টিকাদান কর্মসূচির উপর। সাধারণ মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলবে ভ্যাকসিনের উপর। এটা কোনো ভাবেই কাম্য নয়। আমরা সবাই একটি নিরাপদ ভ্যাকসিন চাই। তবে সেই ভ্যাকসিনটিকে আসতে হবে যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং নিয়মতান্ত্রিক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের মধ্যদিয়েই।

FavoriteLoadingপ্রিয় পোস্টের তালিকায় নিন।

About The Author

মন্তব্য করুন