রবিবার, অক্টোবর ২৫, ২০২০

ইউরোপে করোনা মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউ; দক্ষিণ এশিয়াতেও কী তা অবশ্যম্ভাবী?

ইউরোপে করোনা মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউ; দক্ষিণ এশিয়াতেও কী তা অবশ্যম্ভাবী?

image_pdfimage_print

যারা মহামারীর সেকেন্ড ওয়েভ বা দ্বিতীয় ঢেউ কি এটা জানেন না, অথবা এটা যে এই করোনা মহামারীতেও হতে পারে তা মানতে নাড়াজ, আজকের লেখাটি তাদের জন্য!

মহামারীর প্রথম ভাগে এক বা একাধিক জনগোষ্ঠিতে প্রথমে সংক্রমণের সংখ্যা হুহু করে বাড়তে থাকে এবং দেড় থেকে দুই মাসের ভেতরে সংক্রমণের সংখ্যা একটা চূড়ায় পৌঁছে যায়- এটাকে বলে পিক। এরপর সংক্রমণের সংখ্যা আবার ক্রমান্নয়ে কমতে থাকে। এবং একটা সময় মনে হয় নতুন করে আর কোন সংক্রমণ হচ্ছে না, এবং রোগীর সংখ্যা বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই আক্রান্ত জনগোষ্ঠিটিতে একেবারে শূন্যের কোঠায় নেমে যায়। মনে হয় যেন মহামারী শেষ! সংক্রমণের এই উঠা নামায় পরিসংখ্যানের গ্রাফে যে ধনাত্মক ঢেউয়ের সৃস্টি হয় তাকে বলে মহামারীর ফার্স্ট ওয়েভ। ঐতিহাসিক ভাবে দেখা যায় যে মহামারীর সময় প্রথম ওয়েভের ২ থেকে ৩ মাস পর আবারও ঐ সংক্রমণের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় এবং প্রথম ওয়েভের মত সংক্রমণের দ্বিতীয় ওয়েভ তৈরী হয়। দুক্ষজনক হলেও সত্য যে দ্বিতীয় ওয়েভ কখনও কখনও প্রথম ওয়েভের চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে। আবার এই ওয়েভ দুইয়ের অধিকও হতে পারে।

পরিসংখ্যানের তথ্য থেকে এটা এখন নিশ্চিত যে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রথম ওয়েভের পর এই হেমন্তের শুরুতেই দ্বিতীয় ওয়েভ দেখা দিয়েছে। কোন কোন দেশে সংক্রমণের এই দ্বিতীয় ওয়েভ প্রথম ওয়েভের চেয়েও বৃহৎ আকৃতি ধারণ করেছে। বিশেষজ্ঞগণের ধারনা করোনা সংক্রমণ এই শীতে আবার নতুন করে মারাত্মক আঁকার ধারণ করতে পারে।

ইউরোপের প্রথম যে দেশটিতে পরিস্কার ভাবে মহামারীর দ্বিতীয় ওয়েভ পরিলক্ষিত হয়েছে সেটা হল স্পেন। দেশটিতে মহামারী শুরু হয় মার্চের শুরুতে যেখানে এযাবৎ করোনায় আক্রান্ত হয়েছে ৫ লক্ষ ৩৪ হাজার এবং মারা গেছে ২৯ হাজার ৫০০ জন। সংক্রমণের প্রথম ওয়েভ পিকে উঠে ২০ মার্চ এবং ঐ সপ্তাহটিতে প্রতিদিন গড়ে নতুন সংক্রমণ সনাক্ত হয় প্রায় সাড়ে ৮ হাজার। এরপর মার্চের শেষের দিকে তড়িৎ গতিতে সংক্রমণের হার কমতে থাকে, যা সর্বনিন্মে পৌঁছায় জুনের মাঝামাঝিতে, যখন প্রতিদিন নতুন রোগী সনাক্ত হয় ২৫০ জনের মত। এরপর হঠাৎ জুলাইয়ের মাঝামাঝিতে সংক্রমণের সংখ্যা বাড়তে থাকে সমানুপাতিক হারে যা দ্বিতীয় ওয়েভের পিকে পৌঁছে আগস্টের ২৬ তারিখে, যখন প্রতিদিন গড়ে ৭,৫০০ জন নতুন রোগী সনাক্ত হয়। এরপর হঠাৎ করে সংখ্যাটি আবার নিন্মগামী হতে শুরু করে। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে গড়ে ৩,২০০ জন নতুন রোগী সনাক্ত হয়েছে।

স্পেনের পরে করোনা নতুন করে মাথাচাড়া দিয়েছে ফ্রান্সে। দেশটিতে মহামারীর প্রথম ওয়েভের পিক ছিল ১ এপ্রিলে যখন প্রতিদিন গড়ে নতুন সংক্রমণ সনাক্ত হয় সাড়ে ৪ হাজারের মত। এরপর মে’র শেষে প্রথম ওয়েভের সমাপ্তি ঘটে। কিছুটা স্বস্তিতে থাকে দেশটির জনগন জুন এবং জুলাই মাসটাতে। এরপরই আবার সেই ভীতি! আগস্টের প্রথম থেকেই প্রতিদিন নতুন সংক্রমণের সংখ্যা বাড়তে থাকে তড়তড় করে। দ্বিতীয় ওয়েভ তার চূড়ার দিকে ধাবিত হয় এবং ৪ সেপ্টেম্বরের নতুন রোগী সনাক্ত হয় একদিনে প্রায় ৯ হাজার, যা কিনা প্রথম ওয়েভের পিকের চেয়ে দ্বিগুন! এবং সংখ্যাটি ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ছে। তবে আশ্চর্যজনক ব্যাপার হল, দ্বিতীয় ওয়েভে সংক্রমণ বাড়লেও মৃত্যুহার কমে গেছে অনেক। প্রথম ওয়েভের পিকে যখন প্রতিদিন মারা যেত গড়ে ৯৭৫ জন সেখানে এখন দ্বিতীয় ওয়েভ চলাকালীন সময়টিতে প্রতিদিন গড়ে মারা যাচ্ছে মাত্র ১৩ জন।

স্পেনেও এমনটি পরিলক্ষিত হচ্ছে। এখানে প্রথম এবং দ্বিতীয় ওয়েভে প্রতিদিন নতুন সংক্রমণের হার অনেকটা সমান হলেও, মৃত্যুহারে রয়েছে ব্যাপক তারতম্য। প্রথম ওয়েভের পিক সময়টিতে প্রতিদিন করোনাতে মারা যেত গড়ে ৮৬০ জন, আর এখন দ্বিতীয় ওয়েভে প্রতিদিন মারা যাচ্ছে ৬০ জন।

গ্রীসের চিত্র অবশ্য একটু ভিন্ন। মহামারীর শুরু থেকে ইউরোপের ভিতরে কম আক্রান্তের দেশগুলোর ভেতরে গ্রীস একটি। ২৮ ফেব্রুয়ারি গ্রীসে প্রথম করোনা সংক্রমণ সনাক্ত হয়। এরপর থেকে আজ (৮ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত দেশটিতে করোনায় আক্রান্ত হয়েছে প্রায় ১২ হাজার এবং মারা গেছে ২৯০ জন। এখানে মহামারীর প্রথম ওয়েভের পিক ছিল এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ যেখানে প্রতিদিন গড়ে ৯০ জন নতুন রোগী সনাক্ত হয়। আগস্টের শেষে সংক্রমণ দ্বিতীয় ওয়েভের চূড়ায় পৌঁছে যেখানে প্রতিদিন গড়ে নতুন সংক্রমণের সংখ্যা দাড়ায় ২২৮ জন। এক্ষেত্রেও দ্বিতীয় ওয়েভে সংক্রমণ বেশী হলেও মৃত্যুহার কিন্তু অপেক্ষাকৃত অনেক কম।

এই মহামারীতে ইউরোপের ভিতরে সবচেয়ে খারাপভাবে আক্রান্ত দেশটি হল যুক্তরাজ্য। এ পর্যন্ত এখানে করোনায় মারা গেছে ৪১ হাজার ৫০০ জনের উপরে। দেশটিতে প্রথম ওয়েভ শেষ হতে না হতেই এখন আবার দ্বিতীয় ওয়েভের দিকে ধাবিত হচ্ছে! গত ৬ সেপ্টেম্বর একদিনে প্রায় ৩ হাজার নতুন করোনা সংক্রমণ চিহ্নিত হয়েছে। বর্তমানে মৃতের সংখ্যা দৈনিক গড়ে ৮ জন। তবে ২-৩ সপ্তাহ পরে প্রকৃতভাবে বোঝা যাবে নতুন সংক্রমণ থেকে মৃত্যুহার বাড়ছে কি না।

আপাত দৃস্টিতে মনে হচ্ছে যে করোনা মহামারীর দ্বিতীয় ওয়েভে ভাইরাস সংক্রমণ থেকে মৃত্যুহার কম।

অতীতের দিকে তাকালে দেখা যায় ১৯১৮ সালে সংঘঠিত হওয়া স্প্যানিশ ফ্লু (ইনফ্লুয়েন্জা) মহামারীতে সংক্রমণের তিনটি ওয়েভ ছিল। ১৯১৮ এর জুনে শুরু হওয়া মহামারীটির সমাপ্তি ঘটে ১৯১৯ এর এপ্রিলে, যাতে গোটা পৃথিবীর এক তৃতিয়াংশ মানুষ আক্রান্ত হয় এবং মারা যায় প্রায় ৫ কোটি মানুষ। এই মহামারীতে কিন্তু সংক্রমণের দ্বিতীয় ওয়েভটা (অক্টোবর-নভেম্বর) ছিল সবচেয়ে বেশী মারাত্মক। বেশীর ভাগ মানুষ মারাই গিয়েছিল এই দ্বিতীয় ওয়েভে।

অন্যদিকে ২০০৯ এর এপ্রিলে আমেরিকাতে শুরু হওয়া এইচ-১এন-১ (H1N1) ইনফ্লুয়েন্জা (সোয়াইন ফ্লু) মহামারীটি ছড়িয়ে পরে সাড়া বিশ্বে যা থেকে এক বছরে মারা যায় প্রায় ২ লক্ষ ৮৪ হাজার মানুষ (WHO, CDC website)। এই মহামারীটিতে ছিল মূলত দুইটি বড় ওয়েভ। একটি ওয়েভ বসন্তে এবং আরেকটি হেমন্তে। দুটি ওয়েভেই উল্লেখযোগ্য রকমের মৃত্যুহার পরিলক্ষিত হয়। অতএব, দেখা যায় যে ভাইরাসের প্রকারভেদের উপর কোন একটা মহামারীর ওয়েভের সংখ্যা এবং তার তিব্রতা নির্ভর করে।

এবার একটু দৃষ্টি দেয়া যাক করোনা মহামারীর নতুন এপিসেন্টার দক্ষিণ এশিয়ার দিকে। এ অঞ্চলে ভারত সবচেয়ে বেশী আক্রান্ত দেশ। এ দেশটিতে সংক্রমণ এবং মৃত্যু উভয়ই বাড়ছে সমানুপাতিক হারে। প্রথম ওয়েভ এখনও পিকে পৌঁছেনি। তার ভেতরেই গত ৬ সেপ্টেম্বর এক দিনে নতুন সংক্রমণ সনাক্ত হয়েছে ৯০ হাজারের উপরে এবং মারা গেছে প্রায় ১ হাজার। ভারতে কবে প্রথম ওয়েভ সম্পন্ন হবে তা বলা কঠিন। দ্বিতীয় ওয়েভ কবে আসবে সেই প্রশ্নটা করাই অবান্তর। তবে দ্বিতীয় ওয়েভ আসবে এটা বলা যায়।

মোট করোনা আক্রান্তের বিচারে বিশ্বে বাংলাদেশর অবস্থান এখন ১৫ তম এবং এশিয়ার ভেতরে তৃতীয়। এখন পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে ৩ লক্ষ ২৯ হাজার মানুষ যার ভেতরে মারা গেছে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ জন। বাংলাদেশে গত তিন মাস যাবত টেস্টের সংখ্যা খুবই অপ্রতুল। এই রকম তথ্য থেকে কোন প্রকার ভবিষ্যতবণী করা কঠিন। তবুও ওয়ার্ল্ডোমিটারের ডাটা থেকে বোঝা যায় যে বাংলাদেশের করোনা মহামারীর প্রথম ওয়েভের পিক ছিল ২ জুলাই এবং ঐ দিনের নতুন সনাক্তের সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৮০০ জন। এরপর থেকে ধীরেধীরে প্রতিদিনের নতুন সংক্রমণ কমতে থাকে। অবশ্য গত তিন মাসে করোনা থেকে প্রতিদিন মৃত্যু সংখ্যা রয়েছে অপরিবর্তিত (দিনে গড়ে ৩৫ জন)। এ থেকেই কিছুটা আন্দাজ করা যায় বাংলাদেশের ডাটা কতটা অনির্ভরযোগ্য।

অন্যদিকে, পকিস্তানের প্রথম ওয়েভ কিন্তু পরিস্কার ভাবেই শেষ হয়েছে। পাকিস্তানের প্রথম ওয়েভের পিক ছিল ১৮ জুন এবং ঐ দিন নতুন সংক্রমণ সনাক্তের সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ৭০০ জন, বর্তমানে যা নেমে হয়েছে ৪৪০ জন। বর্তমানে দৈনিক মৃত্যু গড়ে ৪ জন যা প্রথম ওয়েভের পিক সময়টাতে ছিল গড়ে ১৩৭ জন। আগামী ২ মাসের ভেতরে হয়তো পাকিস্তানে মহামারীর দ্বিতীয় ওয়েভ দেখা দিলেও দিতে পারে।

ইউরোপের দ্বিতীয় ওয়েভের মৃত্যুহার দেখে এটা অনুমান করা যায় যে আমাদের দক্ষিণ এশিয়ায় যদি মহামারীর দ্বিতীয় ওয়েভ আসেও তাহলে তা থেকে মৃত্যুহার প্রথম ওয়েভের চেয়ে কম হবে। অন্তত এতটুতু আশা করা যেতে পারে। অবশ্য দ্বিতীয় ওয়েভে মৃত্যুহার কম হওয়ার পেছনে বৈজ্ঞানিক কিছু কারনও রয়েছে। যেমন:

(১) ভাইরাসের মিউটেশন: জেনেটিক সিকুয়েন্স করে দেখা গেছে যে বর্তমান সময়ে (২১ মার্চের পর থেকে) যে করোনাভাইরাস দিয়ে সংক্রমণ হচ্ছে তার স্পাইক প্রোটিনের এস-১ ডোমেইনে একটা পয়েন্ট মিউটেশন হয়েছে (D614G)। এর ফলে পরিবর্তিত জীনটি অ্যাসপারটিক এসিডের পরিবর্তে তৈরী করছে গ্লাইসিন। আর এর ফলে স্পাইক প্রোটিনের এস-১ ও এস-২ ডোমেইন দুটি ভিন্ন ভাবে কাজ করছে। ফলশ্রুতিতে এখনকার করোনাভাইরাসটি একজন থেকে আরেকজনে দ্রুত ছড়াচ্ছে, কিন্তু সংক্রমিত এক কোষ থেকে আরেক কোষে বিস্তারলাভ করতে পারছেনা সহজেই। অর্থাৎ ভাইরাসটি দ্রুত ছড়াচ্ছে কিন্তু মারাত্মক রোগ করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

(২) চিকিৎসার উন্নতি: মহামারীর প্রথমদিকে ডাক্তাররা বুঝে উঠতে পারছিলনা যে কিভাবে কোভিডের চিকিৎসা করতে হয়। বর্তমানে চিকিৎসার প্রভূত উন্নতি হয়েছে। এখন ডাক্তারা অনেকটা বুঝে গেছে রোগটির ধরন। গবেষণাও হয়েছে অনেক। সময়মত অক্সিজেন, স্টেরয়েড, এন্টিকোয়াগুলেন্ট এবং প্লাজমা থেরাপী দেয়াতে সিভিয়ার কোভিড থেকে জীবন বাঁচানো যাচ্ছে অনেক রোগীর।

আশাকরা যায় অতিসত্তর একটা কার্যকরী ভ্যাকসিন আবিস্কৃত হলে করোনাভাইরাসকে পরাস্ত করা কোন ব্যাপারই হবে না।

[তথ্যসুত্র: ওয়ার্ল্ডোমিটার ৮ সেপ্টেম্বর, সেল জার্নাল ২০২০, স্ক্রিপ্স রিসার্চ ২০২০, নেচার জার্নাল ৮ সেপ্টেম্বর, সিডিসি ডট ওআরজি, হিস্ট্রি ডট কম]

FavoriteLoadingপ্রিয় পোস্টের তালিকায় নিন।

About The Author

মন্তব্য করুন