শনিবার, আগস্ট ৮, ২০২০

গর্ভবতী মায়ের এবং গর্ভজাত শিশুর করোনা ঝুঁকি, সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু ?

গর্ভবতী মায়ের এবং গর্ভজাত শিশুর করোনা ঝুঁকি, সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু ?

image_pdfimage_print

করোনা মহামারীতে গর্ভবতী মায়েরা কতটুকু আক্রান্ত? নবজাতকদেরই বা কি অবস্থা? করোনা ভাইরাস কি আক্রান্ত মা থেকে গর্ভজাত শিশুকে সংক্রমিত করতে পারে?

আমার এখনকার গবেষণার বিষয় হল গর্ভবতী মায়েদের প্ল্যাসেন্টা বা গর্ভফুলে ভাইরাসের সংক্রমণ এবং তা কিভাবে প্রেগন্যান্সিতে বিরূপ প্রভাব ফেলে তা পরীক্ষা করা। এই গবেষণার জন্য আমি প্ল্যাসেন্টা থেকে টিস্যু নিয়ে তার উপরে মেটাজেনোমিক এবং ট্রান্সক্রিপ্টমিক জীন সিকুএন্সিং (NGS RNA-seq) করে ভাইরেসের উপস্থিতি এবং তার ফলে সৃষ্ট বিরূপ প্রভাব নির্ণয়ের চেষ্টা করি।

সংগত কারণেই এই করোনা মহামারীতে আমাদের মনে প্রশ্ন আসতেই পারে যে করোনা ভাইরাস গর্ভবতী মা এবং তাদের গর্ভের শিশুকে কিভাবে প্রভাবিত করছে।

যেহেতু নোভেল করোনা ভাইরাসটি একদম নতুন তাই এটা গর্ভবতী মহিলাদের কিভাবে এবং কততুকু ক্ষতি করে আমাদের খুব একটা জানা নেই। এটা জানার জন্য দরকার গবেষণা। এই বিষয়ে গবেষণার জন্য আমরা দুইটা গ্রান্ট অ্যাপ্লিকেশন জমা দিয়েছি। টাকা পেলে নতুন গবেষণা শুরু হবে। এই গবেষণার প্রস্তাবে আই.সি.ডি.ডি.আর,বি ও থাকছে আমাদের সাথে।

পূর্ববর্তী গবেষণা থেকে জানা যায় যে অন্যান্য ভাইরাস যেমন সাইটোমেগালো ভাইরাস (CMV), হারপিস ভাইরাস (HSV), জিকা ভাইরাস (Zika), এইচ.আই.ভি ভাইরাস (HIV) ইত্যাদি যখন গর্ভবতী মায়েদেরকে আক্রান্ত করে তখন তা মায়ের গর্ভফুলকেও সংক্রমিত করতে পারে। এমন কি, কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই ভাইরাসগুলো গর্ভফুল ভেদ করে গর্ভজাত শিশুকে আক্রান্ত করে। এই ধরনের সংক্রমণে গর্ভের শিশুর বৃদ্ধি সাংঘাতিক ভাবে বাধাগ্রস্থ হয় (IUGR), শিশু প্রিম্যাচিউর হয়ে জন্ম নিতে পারে (Preterm birth), এবং কখনো কখনো মা ও শিশুর মৃত্যু পর্যন্তও হতে পারে।

গর্ভকালীন সময়ে মহিলাদের শরীরে এক বিশেষ ধরনের শরীরবৃত্তিও এবং রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটে। আর এর ফলেই গর্ভবতীদের ভাইরাস সংক্রমণ হওয়ার প্রবনতা একজন সাধারন সুস্থ মানুষের চেয়ে অনেকগুন বেড়ে যায়। এছাড়াও গর্ভকালীন সময়টাতে মায়ের শরীরে ভিটামিন-ডি সহ অন্যান্য অনেক প্রয়োজনীয় ভিটামিন এবং মিনারেলের (micronutrients) ঘাটতি দেখা দেয়। আর এসব কারনেই গর্ভবতী মায়েদেরকে কোভিড-১৯ রোগে ‘হাই-রিস্ক গ্রুপ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বাংলাদেশে এখন করোনা মহামারী চলছে। করোনা আক্রান্তের সংখ্যা হুহু করে বেড়েই চলছে প্রতিদিন। করোনা টেস্ট করলেই প্রতি ৫ জনে ১ জনের শরীরে ভাইরাসের সংক্রমণ পাওয়া যাচ্ছে। এমত অবস্থায় অনেক গর্ভবতী মহিলাই যে করোনায় আক্রান্ত হবে তা সহজেই অনুমান করা যায়।

তাহলে এ সময়টাতে কিভাবে তাদের প্রসবের ব্যবস্থা করা হচ্ছে? এন্টিন্যাটাল চেক আপ এবং ডেলিভারীর সময়টাতে প্রতিটি গর্ভবতী মাকে কী রুটিনলি করোনা পরিক্ষা করানো হচ্ছে?

করোনা নিয়ে চার দিকে অনেক আলোচনা হলেও গর্ভবতী মায়েদের উপর এই ভাইরাসের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে তেমন একটা আলোচনা হচ্ছে না!

আমেরিকার নিউ ইয়র্ক শহরে মার্চ-মে মাসে যখন করোনা মহামারী চলছিল তীব্রভাবে তখন ডেলিভারীর জন্য হাসপাতালে ভর্তি হওয়া গর্ভবতী মায়েদের শতকরা ১৪ জনের শরীরেই করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ পাওয়া যায়। তবে মজার ব্যাপার হলো, সংক্রমিতদের ভিতরে ৯০% ই ছিল অ্যাসিম্পটমেটিক কোভিড। অর্থাৎ ভর্তির সময় তারা রোগের কোন লক্ষণ প্রকাশ করেনি। করোনা সংক্রমণের কারনে মা বা শিশু মৃত্যু হার খুব একটা বেশী পরিলক্ষিত হয়নি যদিও। তবে ঐ সময়টাতে কোভিড মায়েদের ডেলিভারীতে নেয়া হয়েছিল সর্বাচ্চ সতর্কাবস্থা।

এই মাসের ৮ তারিখে (৮ জুন) BMJ জার্নালে একটা গবেষণা পত্র প্রকাশিত হয়। গবেষণাটি করা হয় যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন হাসপাতালে মার্চ-এপ্রিল মাসে ভর্তি হওয়া ৪২৭ জন করোনা আক্রান্ত গর্ভবতী মায়েদের উপর। এদের ভেতরে প্রায় ৭০% মহিলাই ছিলেন ওবেস বা মোটা। ১০% গর্ভবতীর চিকিৎসায় আই.সি.ইউ (ICU) সাপোর্ট দেয়া হয়ে ছিল। প্রায় ২২% গর্ভবতী মহিলা প্রিম্যাচিউর বাচ্চা প্রসব করেছিল এবং এদের ভিতরে ৫ জন (১%) মহিলা মারা গিয়েছিল। আরেকটি ব্যপার এখানে লক্ষনীয় যে, করোনায় আক্রান্ত ৪২৭ জনের ভেতরে ২৩৩ জনই (৫৭%) ছিল এশিয়ান এবং কালো এথনিক সংখ্যালঘু গৌত্রের। জন্ম নেয়া নবজাতকদের ভেতরে শতকরা ৫ ভাগ বাচ্চার করোনা পজিটিভ পাওয়া যায়।

২৬ মার্চ JAMA Pediatric জার্নালে প্রকাশিত একটা রিপর্টে দেখা যায় যে চীনে ৩৩ জন করোনায় আক্রান্ত গর্ভবতী মায়ের প্রসব করা ৯% নবজাতকই করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত। সাম্প্রতিক বেশ কয়েকটি গবেষণা থেকে জানা যায় যে করোনা ভাইরাস বস্তুত গর্ভাবস্থায় আক্রান্ত মায়ের কাছ থেকে গর্ভের বাচ্চাকেও আক্রান্ত করতে পারে। অর্থাৎ এই ভাইরাসের placental vertical transmission এর প্রবনতা রয়েছে।

গর্ভের বাচ্চার করোনা ভাইরাস সংক্রমণ কতোটুকু সুদুর প্রসারী খারাপ প্রভাব ফেলবে তা এখনও অজানা। তবে উপরোল্লিখিত যুক্তরাজ্যের গবেষণা থেকে দেখা যায় যে কোভিডে আক্রান্ত মায়েদের কাছ থেকে জন্ম নেয়া বাচ্চাদের অনেকেই (২২%) প্রিম্যাচিউর বাচ্চা এবং এদের ভেতরে বেশির ভাগেরই জন্মের পরে নিওনেটাল সাপোর্ট লেগেছিল। এছাড়া প্রসবকালীন সময় শিশু মৃত্যুর হারও কিছুটা বাড়িয়ে দেয় এই গর্ভকালীন করোনা ইনফেকশন।

সুতরাং এই মহামারীর সময়টাতে গর্ভবর্তী মা ও নবজাতকের নিরাপদ স্বাস্থ রাক্ষায় কিছু পদক্ষেপ নেয়া জরুরী:

(১) কনসেপশনের পর থেকেই গর্ভবতী মায়েদেরকে বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে যাতে তাদের করোনা ইনফেকশন না হয়।

(২) প্রতিটি গর্ভবতী মায়ের এন্টিনেটাল চেক-আপে করোনা টেস্ট অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

(৩) করোনা পজেটিভ গর্ভবতীদের স্পেশাল কেয়ারের আওতায় আনতে হবে।

(৪) করোনা পজেটিভ কোভিড মায়েদের প্রসবের সময় পর্যাপ্ত কোভিড ম্যানেজমেন্ট ব্যাবস্থা এবং প্রয়োজনে ICU ব্যাবস্থা রাখতে হবে।

(৫) কোভিড মা থেকে জন্ম নেয়া প্রতিটি নবজাতকের RT-PCR করোনা টেস্ট বাধ্যতামূলক করতে হবে।

আশার কথা হল করোনা ইনফেকশন গর্ভবতী মা বা নবজাতকের উপর খুব বেশী হারে তেমন মারাত্মক কোন ক্ষতি সাধন করে না। তবে একটু সাবধান হলে করোনার হাত থেকে মা এবং নবজাত শিশুকে রক্ষা করা সম্ভব।

FavoriteLoadingপ্রিয় পোস্টের তালিকায় নিন।

About The Author

মন্তব্য করুন