শনিবার, আগস্ট ৮, ২০২০

করোনা ভাইরাস সংক্রমণ ফুসফুসে ক্ষতি সাধন করে কতটুকু?

করোনা ভাইরাস সংক্রমণ ফুসফুসে ক্ষতি সাধন করে কতটুকু?

image_pdfimage_print

এই মহামারীতে প্রশ্নটা সবার মনে আসাটাই স্বাভাবিক। আর যারা করোনা ভাইরাসে সবেমাত্র আক্রান্ত হয়েছেন, অথবা যারা কোভিড থেকে আরগ্য লাভ করেছেন তারা হয়তো চিন্তিত তাদের ফুসফুসের অবস্থা নিয়ে। আজকের এই লেখাটা তাদের জন্যই।

দীর্ঘদিন না হলেও, বেশ কয়েক বছর আমি গবেষণা করেছি ফুসফুস নিয়ে। ফুসফুসের ডেভেলপমেন্ট (Akram et al, Nature Communications, 2019), ভাইরাস সংক্রমণে ফুসফুসের ইমিউনিটি (Akram et al, Mucosal Immunity, 2018), ফুসফুসের ক্ষত এবং ফুসফুসের ফাইব্রোসিস (Akram et al, European Respiratory Journal, 2013), ফুসফুসের ক্ষত নিরাময়ে স্টেম সেলের কার্যকারীতা (Akram et al, Respiratory Research, 2013) সহ আরো বেশ কিছু গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছি ফুসফুসের উপর। এছাড়াও ফুসফুসের রিজেনারেশন এবং স্টেমসেল থেরাপী নিয়ে একটি বইয়ের অধ্যয় (Akram et al, Springer 2013) এবং একটি রিভিউ প্রকাশ করেছি (Akram et al, Int J of Molecular Science, 2016). সুতরাং পেশাগত কারনেই ফুসফুস এবং ভাইরাসের প্রতি আমার আগ্রহ প্রবল। আর এ কারনেই বেশ কিছুদিন হল করোনা ভাইরাস নিয়ে ফেইসবুকে লেখালিখি করছি এবং আপনাদের সাথে শেয়ার করছি।

ফুসফুস হলো আমাদের শ্বাসতন্ত্রের প্রধান অঙ্গ, যেটা দিয়ে আমাদের রক্তে অক্সিজেন প্রবেশ করে আর রক্ত থেকে দূষিত কার্বনডাই অক্সাইড শরীর থেকে বের হয়ে যায়। এই গ্যাস আদান-প্রদানের জন্য একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ফুসফুসের সার্ফেস এরিয়া (alveolar surface area) একটা টেনিস কোর্টের আয়তনের সমান! ফুসফুসের এত বড় একটা অংশ সম্পূর্ন ভাবে উন্মুক্ত থাকে বাইরের পরিবেশের সাথে আমাদের শ্বাসনালী দিয়ে! আর এর ফলে ফুসফুস প্রতিনিয়ত দূষিত পরিবেশের ক্ষতিকর মাইক্রোপার্টিক্যাল, এবং জীবাণু যেমন, ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের সংস্পর্শে আসে। তবে আমাদের শ্বাসনালী এবং ফুসফুসের এই বৃহৎ উন্মুক্ত অংশটি বিভিন্ন ধরনের রোগপ্রতিরোধক প্রোটিনে তৈরী একটা মিউকাসের আবরনে ঢাকা থাকে। এই মিউকাস আবরনটি কোষে থাকা একধরণের সিলিয়া সন্চালনের মাধ্যমে সর্বদা ফুসফুসের ভেতর থেকে বাইরের দিকে সন্চালিত হয় (Mucocilliary function).

শ্বাসের মাধ্যমে যখন ভাইরাস বা কোন জীবাণু আমাদের ফুসফুসে প্রবেশ করে, তা প্রথমে আটকা পরে এই মিউকাস আবরনে এবং বেশীর ভাগ ক্ষেত্রই এই ভাইরাস বা অন্যান্য জীবাণু আমাদের ফুসফুসকে আক্রান্ত করে না। তবে কখনও কখনও কিছু ভাইরাস এই মিউকাস আবরন ভেদ করে ফুসফুসের কোষকে সংক্রমিত করে এবং ফুসফুসের বায়ু প্রকোষ্ঠ বা alveoli কে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এমনটা হলে ফুসফুসে অবস্থানকারী ইমিউন সেল যেমন, নিউট্রোফিল এবং ম্যাক্রোফেজ জীবাণুকে নিধন করে এবং আক্রান্ত কোষকে খেয়ে পরিস্কার করে। ফুসফুসে থাকা প্রজেনিটর বা স্টেমসেল তখন নতুন কোষ তৈরী করে এবং ফুসফুসের ক্ষতস্থানে প্রতিস্থাপিত হয়। এভাবেই বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে জীবাণু আক্রমণের পরে ক্ষতিগ্রস্ত ফুসফুস নতুন করে গঠিত হয় এবং এর স্বাভাবিক কার্যক্রম সচল রাখে। এটা একটা ন্যাচারাল প্রক্রিয়া। একে বলে হিলিং বাই রিজেনারেশন। প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল। আমি খুব সাধারন ভাবে বললাম।

এখন কিছু কিছু ক্ষেত্রে ফুসফুসে ভাইরাস বা জীবাণু সংক্রমণ খুব মারাত্মক ভাবে হয়, বা সংক্রমণ খুব লম্বা সময়ের জন্য থাকে। এমন হলে ফুসফুসের অ্যালভিওলাইয়ের টাইপ-ওয়ান এবং টাইপ-টু নিউমোসাইট কোষগুলো খুব মারাত্মক ভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। ফুসফুসে থাকা ক্ষুদ্র রক্ত নালীকা (Alveolar capillary network) গুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ফুসফুসের প্রজেনিটর সেল গুলো মারা যায়। যার ফলে আর নতুন করে স্বাভাবিক কোষ তৈরী হতে পারে না। এবং এর ফলোশ্রুতিতে ক্ষতিগ্রস্ত ফুসফুসের অংশ একধরণের ফাইব্রাস টিস্যু দিয়ে প্রতিস্থাপিত হয়। একে বলে হিলিং বাই ফাইব্রোসিস। এ ধরনের ঘটনা ফুসফুসের যে অংশে ঘটে, সে অংশ তার কার্যকারীতা হারিয়ে ফেলে চিরতরে। এখন মারাত্মক ভাইরাস ইনফেকশনের পরে যদি কারো এক-চতুর্থাংশ বা তার বেশী ফুসফুসে ফাইব্রোসিস হয়ে যায় তাহলে এটা রোগীর জন্য সমস্যা জনক।

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণকে ৩ ভাগে ভাগ করা যায়: (১) অ্যাসিম্পটোমেটিক, (২) প্রি-সিম্পটোম্যাটিক এবং (৩) সিম্পটোম্যাটিক

অ্যাসিম্পটোমেটিক ইনফেকশন হচ্ছে যখন একজন করোনা ভাইরাস দিয়ে সংক্রমিত হবে কিন্ত কোন রকম লক্ষণ বা সিম্পটম প্রকাশ না করেই আবার ভাল হয়ে যাবে। ৪০-৪৫% করোনা ইনফেকশনই অ্যাসিম্পটোমেটিক থাকে। অ্যাসিম্পটোমেটিক রোগীরা রোগের কোন সিম্পটম প্রকাশ না করলেও তাদের নাক এবং গলার সোয়াবে ভাইরাসের পরিমান একজন সিম্পটোমেটিক রোগীর সমানই থাকে এবং তারা অন্য সু্স্থ মানুষকেও সংক্রমিত করে। মজার ব্যাপার হল, এদের রোগের লক্ষণ না থাকলেও, অর্ধেকেরও বেশী আক্রান্তের সিটি স্ক্যানে ফোকাল ওপাসিটি (groundglass opacity) দেখা যায়। কত দিন পরে এ স্পট চলে যায় তা জানা নেই। তবে এই গ্রুপের রোগীদের ফুসফুস সম্ভত সম্পূর্নভাবে রিজেনারেট করে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে (Annals of Internal Medicine, 3 June 2020).

প্রি-সিম্পটোমেটিক ইনফেকশন হলো যখন একজন রোগীর সোয়াব টেস্ট পজেটিভ হবে কিন্তু রোগীর কোন লক্ষণ থাকবে না, তবে কিছুদিন পরে লক্ষন প্রকাশ করবে এবং সিম্পটোমেটিক রোগী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবে। সিম্পটোমেটিক রোগীদেরকে ৩ ভাগে ভাগ করা হয়: (১) মাইল্ড কোভিড, (২) মডারেট কোভিড এবং (৩) সিভিয়ার কোভিড।

মাইল্ড এবং মডারেট কোভিড রোগীদের এক্স-রে এবং সিটি স্ক্যান এ রেডিওলোজিক্যাল ওপাসাটি (নিউমোনিয়া) এবং রেটিকুলার ফরমেশনের ধরন এবং ব্যাপ্তি থেকে কিছুটা আন্দাজ করা যায় ফুসফুসে কতটুকু স্ট্রাকচারাল ড্যামেজ হয়েছে। পালমোনারি ইডিমা বেশী দিন না থাকলে তা সাধারনত ফুসফুসের তেমন বড় কোন ক্ষতি করে না। তবে রেটিকুলার ফর্মেশন থেকে ইন্টারস্টিশিয়াল ফাইব্রোসিসের কিছুটা আলামত পাওয়া যায়।

সিভিয়ার কোভিডে ফুসফুস মারাত্মক ভাবে আক্রান্ত হয়। এবং এর ব্যাপ্তিও হয় অনেকটা যায়গা জুড়ে। ধারনা করা হয় সিভিয়ার কোভিড থেকে যারা সুস্থ হয়ে উঠে তাদের ফুসফুসের কিছুটা পারমানেন্ট ক্ষতি হয়ে থাকতে পারে। ঠিক কি ধরনের ক্ষতি এবং তার সুদুর প্রসারি প্রভাব এখনও অজানা।

কোভিডের কারনে ফুসফুসের ক্ষত দেখতে হলে দরকার ফুসফুসের ব্যবচ্ছেদ। ৮ জুন ২০২০ এ Lancet Infectious Disease জার্নালে একটা সুন্দর রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। ওখানে ইতালীর ৩৮ জন সিভিয়ার কোভিডে মৃত রোগীর অটোপ্সি করে ফুসফুসের ভেতরে কী ধরনের ক্ষতি হয় তা দেখা হয়েছে। রোগীরা সবাই হাসপাতালে ভর্তি ছিল ১-২৩ দিন (গড়ে ৭ দিন)। রোগীরা গড়ে ১৬ দিন রোগে ভুগে মারা গেছে।

অটোপ্সিতে দেখা যায় যে প্রায় সবারই ফুসফুসের বায়ু প্রকোষ্ঠ বা alveoli মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফুসফুসে ফাইব্রোপ্রলিফারেটিভ পরিবর্তন হয়েছে। প্রায় সবারই অ্যালভিওলার রক্ত নালীকায় থ্রোম্বোসিস হয়ে রক্ত জমাট বেঁধেছে, ইমিউন সেল দিয়ে alveolar capillary কনজেশন হয়েছে। ফুসফুসে ম্যাক্রোফেজ এবং লিম্ফোসাইট জমা হয়েছে। করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায় অ্যালভিওলার টাইপ-টু নিউমোসাইটে। আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ হিস্টোলোজিক্যাল পরিবর্তন লক্ষ্য করা হয়। উৎসাহীদের জন্য আমি পেপারটির লিংক দিয়ে দিলাম নিচে।

উপরের অটোপ্সিতে কারও ফুসফুসেই ম্যাচিউর ফাইব্রোসিস পাওয়া যায় নি। এর একটা প্রধান করান হল ফুসফুসে ফাইব্রোসিস হতে কয়েক মাস সময় লাগে। রোগীরা সব মারা গেছে গড়ে ১৬ দিন ভুগে। সবার ফুসফুসেই যেহেতু ফাইব্রোপ্রলিফারেটিভ পরিবর্তন দেখা গিয়েছে, সে ক্ষেত্রে রোগীরা যদি সবাই বেঁচে যেত তাহলে ৩ মাস পরে তাদের ফুসফুসে ফাইব্রোসিস ডেভেলপ করতো কী না, এবং করলে ফুসফুসের কার্যকারীতা কতোটুকু ব্যাহত হত তা এখনও অজানাই রয়ে গেছে।

FavoriteLoadingপ্রিয় পোস্টের তালিকায় নিন।

About The Author

মন্তব্য করুন