মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২২, ২০২০

করোনাভাইরাস সংক্রমণের চিকিৎসার জন্য কি কোন অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ আছে?

করোনাভাইরাস সংক্রমণের চিকিৎসার জন্য কি কোন অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ আছে?

image_pdfimage_print

সচরাচর ভাইরাসজনিত রোগের চিকিৎসার জন্য দুই ধরনের অ্যান্টি-ভাইরাল ওষুধ ব্যবহার করা হয়। প্রথমতঃ নিউরামিনিডেজ ইনহিবিটর (Neuraminidase inhibitors) এবং দ্বিতীয়তঃ প্রোটিয়েজ ইনহিবিটর(Protease inhibitors)।

নিউরামিনিডেজ ইনহিবিটর জাতীয় ওষুধ শ্বাসনালীর শ্লেষ্মাতে ভাইরাস নির্গমন কমিয়ে দেয়। ইনফ্লুয়েঞ্জা প্রতিরোধের জন্য এই গ্রুপের ওষুধ ব্যবহার করা হয়। এরকম দুটো ওষুধ ওসেল্টামাভির (Oseltamivir) এবং জানামাভির (Zanamavir)। ইনফ্লুয়েঞ্জার চিকিৎসায় এ দুটো ওষুধ ব্যবহার করে প্রায় ৫৫% থেকে ৬১% রোগীর উপসর্গ উপশম হওয়ার প্রমাণ রয়েছে। কিন্তু করোনাভাইরাস সংক্রমণের চিকিৎসায় এদের কার্যকারিতা সম্পর্কে এখনও নিশ্চিত কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বর্তমানে একটি ট্রায়ালে (NCT04303299) ওসেল্টামাভির ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে এই ট্রায়ালটি ঠিক করোনাভাইরাসের জন্য শুরু করা হয়নি। তবে যেহেতু ইনফ্লুয়েঞ্জার বিরুদ্ধে এই ওষুধ কিছুটা হলেও কাজ করে, এজন্য মনে করা হচ্ছে এর দ্বারা করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীরাও উপকৃত হবেন। কিন্তু এটা এখনও করোনাভাইরাসের জন্য স্বীকৃত ওষুধ নয়।

প্রোটিয়েজ ইনহিবিটর জাতীয় ওষুধ সার্স-করোনা ভাইরাসের ভিতরে প্রোটিয়েজ নামের একটি এনযাইমের কাজ বন্ধ করে দেয়। এই এনযাইম কাজ না করলে ভাইরাস আর বংশবৃদ্ধি করতে পারে না। এইরকম একটি ওষুধের নাম লোপিনাভির(Lopinavir)। এইডস ভাইরাসের চিকিৎসায় লোপিনাভির ব্যবহার করে ভাল ফল মিলেছে। লোপিনাভিরের সংগে এরকমই আরেকটি ওষুধ ব্যবহার করা হয়। তার নাম রিটোনাভির(Ritonavir)। চীনের করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য লোপিনাভির এবং রিটোনাভির ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু বাড়তি কোন উপকারের প্রমাণ পাওয়া যায় নি। সর্বশেষ যে ট্রায়ালটি (NCT04304053) চলছে, সেখানে করনাভাইরাসের চিকিৎসার জন্য ডারুনাভির এবং কবিচিস্ট্যাটের (Darunavir/ Cobicistat) সংগে ক্লোরোকুইন ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে এর ফলাফল এখনও জানানো হয়নি।

এগুলি ছাড়া আরও অনেক অ্যান্টি-ভাইরাল ওষুধ রয়েছে। কিন্তু অধিকাংশই এখনও গবেষণার পর্যায়ে। উল্লেখ্য অধিকাংশ অ্যান্টি-ভাইরাল ওষুধ অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং নানারকম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কাজেই পরীক্ষামূলক ব্যবহারের আগেও গভীরভাবে চিন্তার বিষয় রয়েছে।

সারমর্ম হচ্ছে, এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাস সংক্রমণের প্রতিরোধের জন্য কোন অ্যান্টি-ভাইরাল ওষুধ ব্যবহার করার সত্যিকার অর্থে কোন স্বীকৃতি নেই কিংবা রেকমেন্ডেশন করা হয় নি। আশার কথা হচ্ছে এই মুহূর্তে করোনাভাইরাস প্রতিরোধ করার জন্য অন্তত ১২টি অত্যন্ত উন্নতপর্যায়ের ট্রায়াল চলছে। অচিরেই নিশ্চয় আমরা এর সুফল পাব।

অতএব করোনার আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার কৌশল হচ্ছেঃ স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং প্রতিরোধমূলক নিয়ম কানুন মেনে চলা।

এক।। আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে না আসা। এজন্য রোগীকে আইসোলেশনে রাখতে হবে এবং যারা তার সংস্পর্শে এসেছেন তাদের কোয়ারেনটিনে থাকতে হবে।

দুই।। যারা আক্রান্ত হতে পারে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে তাদের নিরাপদ কোয়ারেন্টিনে রাখা।

তিন।। চলাফেরায় সবসময় সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করে চলুন।

চার।। সাবান-পানিতে নিয়মিত হাত ভাল করে ধুয়ে ফেলুন।

পাঁচ।। যদি একান্তই বাইরে যেতে হয় উপযুক্ত মাস্ক ব্যবহার করুন।

ছয়।। চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য করোনা আক্রান্ত রোগী দেখা এবং সেবা দেওয়া একটি চ্যালেঞ্জ। এরজন্য হাসপাতালের বিশেষ ব্যবস্থাপনা এবং নিজেদের সুরক্ষার জন্য প্রতিরোধমূলক পোশাক পরা জরুরী। এর কোন বিকল্প নেই।

আপাতদৃষ্টিতে করোনাভাইরাস খুবই নিরীহ একটি ভাইরাস। সংক্রমণের পরে প্রায় ৮০% শতাংশ রোগী স্বাভাবিকভাবেই সুস্থ হয়ে যাবেন। কিন্তু ৫% থেকে ১০% রোগীর নিউমোনিয়া এবং আনুষঙ্গিক জটিলতার কারণে হাসপাতালের সেবা নিতে হবে। যাদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার দরকার হয়, তাদের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অংশের শ্বাসযন্ত্রের বিকলতা দেখা দেয়। এরজন্য নিবিড় পরিচর্যা বা আইসিইউ সেবার প্রয়োজন হয় এবং অনেকের মেকানিকাল ভেন্টিলেশন দেওয়ার দরকার হয়। আইসিইউ সেবার জন্য উন্নত প্রযুক্তি এবং প্রশিক্ষিত জনশক্তির দরকার হয়। এটা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এত ব্যয়বহুল এবং উন্নত প্রযুক্তির চিকিৎসা ব্যবস্থা কোন দেশের পক্ষেই অফুরন্ত রাখা সম্ভব হয় না। যেহেতু এবারের করোনাভাইরাস খুব ছোঁয়াচে এবং হাঁচি-কাশি এবং হাতের মাধ্যমে আক্রান্ত রোগী থেকে সুস্থ মানুষের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে; এরফলে একই সময়ে বহু রোগীর জন্য আইসিইউ সেবার প্রয়োজন পড়ছে। কিন্তু এত ব্যাপক সংখ্যক আইসিইউ যেমন সহজলভ্য নয়, আবার নিবিড় সেবা ছাড়া কোভিড-১৯-এর জটিলতার চিকিৎসা করাও সম্ভব না। ফলে মৃত্যুর হার বেড়ে যাচ্ছে। এত অস্বাভাবিক মৃত্যু প্রতিরোধ এবং যেকোন দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়া থেকে রক্ষা করার একমাত্র উপায় পুরো দেশের জনগণের চলাচল বন্ধ করে দেওয়া যেন ভাইরাস নির্বিঘ্নে ছড়িয়ে পড়তে না পারে। এজন্য স্কুল-কলেজ, কল-কারখানা, অফিস-আদালত বন্ধ রেখে ভাইরাস ছড়ানো বন্ধ রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। যে সকল দেশ এটা করতে সফল হয়েছে, তারাই সুফল পাচ্ছে। অন্যথায় মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হওয়া ঠেকানো অসাধ্য।

আল্লাহ পরওয়ারদেগার। সকলের প্রতি রহমত বর্ষণ করুন।

তথ্যসূত্রঃ
• Agrawal S, Goel AD, Gupta N. Emerging prophylaxis strategies against COVID-19. Monaldi Arch Chest Dis. 2020;90(1).
• Cao B, Wang Y, Wen D, et al. A trial of lopinavir-ritonavir in adults hospitalized with severe Covid-19. N Engl J Med 2020.
• Welliver R, Monto AS, Carewicz O, et al. Effectiveness of oseltamivir in preventing influenza in household contacts: A randomized controlled trial. J Am Med Ass 2001; 285:748–54.

FavoriteLoadingপ্রিয় পোস্টের তালিকায় নিন।

About The Author

মন্তব্য করুন