শুক্রবার, এপ্রিল ৩, ২০২০

ক্যান্সার রোগী যেনো শেষ নিশ্বাস নির্ভয়ে ত্যাগ করতে পারেন ………. সেই অধিকার হোক নিশ্চিত ll

ক্যান্সার রোগী যেনো শেষ নিশ্বাস নির্ভয়ে ত্যাগ করতে পারেন ………. সেই অধিকার হোক নিশ্চিত ll

image_pdfimage_print

একজন ক্যান্সার রোগী যখন আমাকে বলেন – ‘ আমাকে অমুক হাসপাতাল থেকে বলা হয়েছে , আমার আয়ু আর বেশিদিন নেই ! আমি ভারতে গিয়েছি – একই কথা বলেছে ! বড়জোড় .. মাস ! ‘

রোগীর ছেলে যখন বলেন – ‘ আমি সংসারের বড় ছেলে , বাবা মানসিক ভাবে প্রচন্ড ভেঙ্গে পড়েছেন ! আমার বাবা কি সত্যিই আর বাঁচবেন না বেশিদিন ডক্টর ? ‘

 

প্রশ্ন হলো –

চিকিৎসা বিজ্ঞান কি রোগীকে সরাসরি বলার অধিকার রাখে ? – ‘ আপনি ক্যান্সারে আক্রান্ত ! আর তো বেশিদিন বাঁচবেন না , আমাদের কিছুই করার নেই ! ‘

উত্তর হলো –

না ! চিকিৎসা বিজ্ঞানের কোনো অধিকার নেই রোগীকে সরাসরি বলার ( রোগী জানতে না চাইলেও যেঁচে পড়ে বলা ) – ‘ আপনার দুরারোগ্য রোগ , আপনি বেশি দিন বাঁচবেন না । ‘ কোনো অধিকার নেই , সরাসরি রোগীর মনোস্তত্ত্বে আঘাত করার । Palliative care সম্পর্কে ধারণার অভাবেই এমনটা হয় ।

তবে , রোগ নিয়ে প্রশ্ন যদি সরাসরি রোগী করে, তাহলে সেক্ষেত্রে খুব ধীর স্হিরে চিকিৎসককে উত্তর দিতে হবে। রোগীকে উত্তর বলার আগে এটাও বলে নিতে হবে, উত্তর টা খুব একটা সুসংবাদ না, তবুও রোগী / তিনি শুনতে চান কি না ! রোগী শুনতে না চাইলে বলা যাবেনা , পরে রোগীকে মানসিক ভাবে প্রস্তুত করে তারপর বলতে হবে।

পেলিয়েটিভ কেয়ার ( palliative care ) নিয়ে বারবার কিছু লেখা আমার নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে গেছে ।

পেলিয়েটিভ কেয়ার ( খুব সংক্ষেপে বললে অনিরাময় যোগ্য দুরারোগ্য ব্যাধির সান্তনামূলক চিকিৎসা ) , যেটা একজন মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠতম জীব হিসেবে মৃত্যুর মুহূর্ত পর্যন্ত পাবার অধিকার রাখেন।

এই চিকিৎসায় রোগীকে মানসিক , সামাজিক , আত্মিক ( spiritual / ধর্মীয় ) , অর্থনৈতিক সাহায্য করার পাশাপাশি আস্তে আস্তে রোগীর মনোস্তত্ত্বকে অবধারিত মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত করা হয়।

একজন ক্যান্সার রোগী যখন রেডিওথেরাপি কেমোথেরাপি শেষ করার পরও ক্যান্সার কোষ ছড়িয়ে যায় শরীরের সর্বত্র , চিকিৎসা বিজ্ঞান হয়ে যায় নিরুপায় – সেক্ষেত্রে মৃত্যুর পূর্বদিন পর্যন্ত রোগীকে কিছু basic support দিয়ে যায় এই পেলিয়েটিভ কেয়ার ( palliative care ) । রোগীর অর্থনৈতিক অবস্হা , রোগীর সর্বশেষ ইচ্ছা , রোগীর ব্যাথা কমিয়ে শারিরীক প্রশান্তি ( pain relief ), রোগীর ধর্মীয় ও সামাজিক অনুশাসন , রোগীকে অহেতুক শারিরীক কষ্ট না দেয়া ( অপ্রয়োজনীয় ও অতিরিক্ত পরীক্ষা নিরীক্ষা ) সর্বোপরী রোগীর রোগের অনিরাময় যোগ্যতার বিষয়টি সর্বাধিক প্রাধান্য দিয়ে রোগীকে প্রশান্তিময় মৃত্যুর দিকে আস্তে আস্তে ধাবিত করাই পেলিয়েটিভ কেয়ার ( palliative care ) এর মূলনীতি।

পঞ্চাশোর্ধ একজন মানুষ দীর্ঘদিনের কাশি নিয়ে চিকিৎসকের গাছে গেলেন। চিকিৎসক রোগীকে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে বুঝলেন – রোগীর advance stage ক্যান্সার , রেডিও থেরাপী ….. কেমোথেরাপি দিয়েও তেমন ফলপ্রসু কিছু হবেনা , সেক্ষেত্রে চিকিৎসকের প্রধান দায়িত্বের মধ্যে পড়ে রোগীকে সাহস দেয়া কিন্তু রোগীর নিকটাত্মীয়ের বিস্তারিত বুঝিয়ে বলা – রোগীর বর্তমান অবস্হা সম্পর্কে। রোগীর নিকটাত্মীয়ের এটাও বোঝানো চিকিৎসকের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে যে , এডভান্সড ক্যান্সার বা শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে যাওয়া ( distant metastasis ) ক্যান্সার কোষগুলো অনিরাময় যোগ্য !

 

মানুষ বাঁচতে চায় …….. মানুষ বাঁচতে চাইবে …… এটা ধ্রুব সত্য। কিন্তু অহেতুক রোগীকে আশা দিয়ে অর্থনৈতিক দৈন্যতার দিকে ঠেলে না দেয়াটা মানবিক গুণের প্রকাশ  হ্যাঁ ! যাদের সামর্থ্য আছে সেসব রোগী উন্নত চিকিৎসা নিয়ে জীবনের আয়ুস্কাল কিছু বাড়াতে পারেন বৈকি, কিন্তু অর্থনৈতিক ভাবে দূর্বল বিপর্যস্ত রোগীকে আশার দুষ্টু চক্রে ফেলে দেয়াটা অমানবিক। একজন ক্যান্সার রোগী বাঁচার জন্য তার ভিটে মাটি বিক্রীর জন্যও প্রস্তুত থাকে ……. কিন্তু পর্দার অাড়ালে থেকে যায় তার সন্তানদের ভবিষ্যৎ , তার জীবনের সঞ্চয়টুকু অনিরাময় রোগের পিছে খরচ করার আগে বারবার রোগীর আত্মীয়দের বোঝাতে হবে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ব্যর্থতা।

 

End of life care ( জীবনের শেষ সময়ের কিছু চিকিৎসা ) :

২০১৪ সালে ( DMC তে ) একজন ক্যান্সার রোগী মৃত্যুর ঠিক আধা ঘন্টা আগে আমাকে বলেছিলেন –

‘ ডক্টর একটা রবীন্দ্র সংগীত শুনবো ! …….আর আমার ব্যাথাটা একটু কমিয়ে দিন । ‘

আমি রোগীকে ব্যাথানাশক মরফিন দেই এবং ‘ আগুনের পরশমনি ‘ গানটা শোনাই মোবাইলে ! রোগী মৃত্যুর আগে শুধু বলেছিলেন – ‘ বাহ্ ‘ !

এটুকুই তাঁর শান্তি ………. চিকিৎসক হিসেবে আমার শান্তি ।

রোগীকে শারিরীক , মানসিক , আত্মিক প্রশান্তি দেয়াই পেলিয়েটিভ কেয়ারের কাজ । একজন ক্যান্সার রোগী মৃত্যুর আগে যদি চিকিৎসককে হাত ধরে বলেন – ‘ ডক্টর ! আমার মৃত্যুর পর আমার সন্তানটার লেখাপড়া কে দেখবে ? ‘

ডক্টর এবং পেলিয়েটিভ সোসাইটি তখন বলে – ‘ আমরা আপনাকে ওয়াদা করছি …….. আপনার সন্তানের লেখাপড়ার খরচ আমরা দেবো l ‘ – Yes ! এটাই spiritual ( আত্মিক ) সাপোর্ট।

 

” LET THE PATIENT DIE SMOOTHLY …… WITHOUT PAIN , WITHOUT ANXIETY , WITH THE PROPER DIGNITY WHICH HE DESERVES AS A HUMAN .”

 

বিএসএমএমইউ ( BSMMU ) র পেলিয়েটিভ বিভাগের প্রধান প্রফেসর নিজাম উদ্দীন ( FCPS , MD )যখন বাংলাদেশে প্রথম palliative care এর কনসেপ্ট এনেছিলেন, তখন অনেকেই হেসেছিলেন , স্যারকে পাগলও ডেকেছিলেন । আজ  সেই পেলিয়েটিভ কেয়ার দায়িত্ব নিচ্ছে ক্যান্সারে মৃত রোগীর সন্তানের লেখাপড়ার ও।

হ্যাঁ ……. এটাই মানবতা …….. palliative care department এবং পেলিয়েটিভ কেয়ার কনসেপ্ট ছড়িয়ে পড়ুক বাংলাদেশের প্রত্যন্ত জনপদে ,

প্রফেসর নিজাম উদ্দিন তৈরি হোক …… নতুন প্রজন্মের চিকিৎসকদের মধ্যেই।

বেঁচে থাকুন , দীর্ঘজীবী হউন – আমার অধ্যাপক প্রফেসর নিজাম স্যার ।

একজন ক্যান্সার রোগী যেনো শেষ নিশ্বাস নির্ভয়ে ত্যাগ করতে পারেন ………. সেই অধিকার হোক নিশ্চিত ll

ডা: আসিফ
রেজিস্ট্রার – আইসিইউ এন্ড ক্রিটিক্যাল কেয়ার ,
অ্যাপোলো হাসপাতাল ঢাকা ।

FavoriteLoadingপ্রিয় পোস্টের তালিকায় নিন।

About The Author

মন্তব্য করুন