রবিবার, জুলাই ২৫, ২০২১

রূবেলা

রূবেলা

image_pdfimage_print

রূবেলা নাম শুনলে আইসক্রীম আইসক্রীম মনে হয়, তাইনা! ভ্যানিলা, রূবেলা!!

আসলে এইটা একটা রোগের নাম। আরো কয়েকটা নাম আছে এই যেমন হাম (আমাদের দেশে), মিজলস, জার্মান মিজলস ইত্যাদি। এই রোগ এর উপসর্গ যদিও দেখতে প্রায় একই রকম কিন্তু ভিন্ন ভাইরাসে ভিন্ন রূপ দেখা দেয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আর বিভিন্ন দেশের সরকারের ঐকান্তিক চেষ্টায় এই রোগ প্রায় নির্মূল হইয়া গেছিল। কারন বাচ্চার জন্মের পরে প্রথম বছরের মধ্যেই যেই পাঁচটি রোগের জন্য ইম্যুনাইজেসন বা টিকার ব্যাবস্থা আছে তার মধ্যে একটা এই রূবেলা বা ‘হাম’। এই ইম্যুনাইজেশনরে “এম এম আর” (মিজলস + মাম্পস + রূবেলা) ও বলা হয়।

কিন্তু এই ইম্যুনাইজেসন ও তার বুস্টার ডোজ নেওয়ার গাফলতি তে এই রোগের প্রকোপ দেখা দিতাছে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায়। আজকের বিষয় রূবেলা বা হাম।

এই রোগের প্রাথমিক উপসর্গ সর্দি সাথে উচ্চ মাত্রার জ্বর, নাকে পানি পড়া, হাঁচি, খসখসে গলা এবং জোরালো কাশি। ঘাড়ের লিম্ফনোড ফুইলা যাইতে পারে। অবসাদ লাগে, ডায়ারিয়া হইতে পারে, চোখ লাল ও জ্বলুনী হইতে পারে। উপসর্গ চইলা যাইতে পারে, মুখের ভিতরে লাল ছোপ থাকতে পারে এরপরে সারা শরীরে র্যাস দেখা দিবে। বাচ্চাদের চাইতে বড়দের এই রোগ হইলে কষ্ট আর উপসর্গ দেখা দেয় বেশী। এই রোগীর সংস্পর্শে আসার পরে ৭ থাইকা ১৮ দিন সময় লাগে আক্রান্ত হইতে। এইটারে ‘ইনক্যুবেশন’ পিরিয়ড কয়।13627086_10154103206492819_6411517735297623130_n

যদি অনুমান কর তোমার বা বাচ্চার হাম হইছে তাইলে দেরী না কইরা ডাক্তার মাম্মার কাছে নিয়া যাও। তিনি প্রাথমিক পরীক্ষা কইরা রক্ত ও ভাইরাল কালচারের পরীক্ষা দিতে পারেন নিশ্চিত ও রূপ নির্ণয় করার জন্য।

রূবেলা ভাইরাস বাতাসে ছড়ায়, আক্রান্ত রোগী হাঁচি কাশির সাথে ভাইরাস বাতাসে মিশা যায় আর একই বাতাস যখন তুমি নিঃশ্বাসের সাথে গ্রহন কর তখনা তা তোমার শরীরেও প্রবেশ করে, রোগী খাবার শেয়ার করলেও এটা তোমার বা বাচ্চার শরীরে প্রবেশ করতে পারে। এই ভাইরাস মায়ের পেটের শিশুকেও আক্রান্ত করতে পারে। এই ক্ষেত্রে এইটা মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। বাচ্চা কনজেনিটাল রূবেলা সিন্ড্রোম নিয়া জন্ম নিতে পারে।

১৯৬৯ সালে এর প্রতিষেধক টিকা প্রয়োগ শুরু হওয়ার আগে প্রতি ৬ থাইকা ৯ বছরে একবার ৫ থাইকা ৯ বছর বয়সী শিশুরা আক্রান্ত হইত এই রুবেলায়। বিশ্ব ব্যাপী এই প্রতিষেধক টিকার ব্যবহারের ফলে রুবেলা ও কনজেনিটাল রুবেলা সিন্ড্রোম নিয়া জন্মানো শিশুর সংখ্যা আশাব্যাঞ্জক কইমা গেছে।

এখন শিশুদের রূবেলা হইতে দেখা যায় না কিন্তু বয়ঃসন্ধির বাচ্চাদের এই রোগ দেখা যাইতাছে আর তাদের ১০% ভাগ ক্ষেত্রেই তারা প্রতিষেধক টিকা গ্রহনকারী না। এইটা বাকীদের জন্য একটা ঝুঁকির কারণ হইয়া দাঁড়াইছে।
রূবেলা ১/২ ৯৯ থাইকা ১০০ ডিগ্রী জ্বর, ঘাড়ের অথবা কানের পিছনের ‘লিম্ফনোড’ ফুইলা যাওয়া, চেহারায় র‍্যাস আভির্ভূত হওয়া শুরু হয় আর র‍্যাস শরীরের নিম্নাংগের দিকে যাইতে থাকে, তখন চেহারা পরিস্কার হইয়া যাইতে পারে। গোলাপী, লাল ছোপ ছোপ হইতে পারে র‍্যাশ। চুলকানি হইতে পারে দিন তিনেক থাকে এই উপসর্গ। র‍্যাস আক্রান্ত স্থান থাইকা চামড়ার উপরী ভাগ গুড়া হইয়া ঝইরা পরতে পারে।

একটু বড় বাচ্চা দের মাথা ব্যাথা, ক্ষুধামান্দ, মৃদু কনজাংটিভাইটিস (চোখ লাল) নাক বন্ধ বা পানি পড়া, মেয়েদের বেলায় হাড়ের জোড়ায় জোড়ায় ব্যাথা হইতে পারে আবার কারো এর কোন অভিযোগ নাও থাকতে পারে।
আগেই বলছি গর্ভবতী মায়ের দের রূবেলা হইলে গর্ভস্থ বাচ্চা কনজেনিটাল রূবেলা সিন্ড্রোম নিয়া জন্মাইতে পারে, তা থাইকা বাচ্চার বাইড়া উঠা, বুদ্ধিমত্তার স্থবিরতা, হৃদপিন্ডে বা চোখ, শ্রবণ শক্তি, লিভার, বোন ম্যারো বা অস্থিমজ্জার সমস্যা হইতে পারে।

এইটা ভীষন ছোয়াচে একটা ভাইরাস, আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি কাশির একটা সুক্ষ্ম ফোঁটা বাতাসে ভাইসা তোমার শরীরে প্রবেশ করতে পারে। আক্রান্ত হবার প্রথম এক সপ্তাহ আর সুস্থ্য হবার আগের এক সপ্তা সবচাইতে বিপদজনক এই রোগ ছড়াইতে। বাচ্চা যদি কনজেনিটাল রূবেলা নিয়া জন্মায় তার মূত্রের সাথে, মুখের লালার সাথে এই ভাইরাস ছড়াইতে পারে, আর যারা এর প্রতিষেধক টিকা নেও নাই তারা আক্রান্ত হইতে পার।

এইরোগ খুব সহজেই প্রতিষেধক টিকা গ্রহনের মাধ্যমে এড়ানো যায়। সাধারনত বাচ্চা ভুমিষ্ঠ হবার পরেই ‘এম এম আর’ দেওয়া যায় তবে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই প্রথম ডোজ ১২ থেক ১৫ মাস বয়সের মাথায় দেওয়া হয় আরেক বার বুস্টার ডোজ হিসাবে বাচ্চার বয়স ৪ থাইকা ৬ এর মধ্যে দেওয়া হয়। এর ব্যতিক্রম ও আছে প্রয়োজন বিধায় ডাক্তার মাম্মার পরামর্শানুযায়ী আগেও দেওয়া যায়।

গর্ভাবস্থায় রূবেলা টিকা দেওয়া উচিত না, গর্ভ ধারনের চিন্তা থাকলে একমাস আগেই টিকা দিয়ে দেওয়া উচিত। রক্ত পরীক্ষা কইরাই বুঝা যাইতে পারে মা’র প্রতিষেধক টিকা দেওয়া আছে কিনা।

এই ভাইরাসের ‘ইঙ্ক্যুবেসন’ সময় ১৪ থাইকা ২৩ দিন গড়ে ১৬ থাইকা ১৮ দিন তার মানে একটা শিশুর শরীরে চিহ্ন দেখতে অথবা আক্রান্ত হইতে দুই থাইকা তিন সপ্তাহ লাইগা যাইতে পারে আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে আসার পরে।

রূবেলার র‍্যাস থাকে প্রায় তিন দিন, লিম্ফ নোড ফুলা আর ব্যাথা থাকে সপ্তাহ খানেক জোড়ায় ব্যাথা আরো সপ্তাহ দুই, বাচ্চারা সাধারনতঃ এক সপ্তাহেই ঠিক হইয়া যায় বয়স্কদের বেলায় সময় বেশী লাগে।

রূবেলা প্রাণঘাতী কোন রোগ না, এ্যন্টিবায়োটিকে কাজ হয় না কারন ভাইরাসের বিরুদ্ধে এই অষুধ কাজ করে না যদি না অন্য কোন জটিলতা দেখা দেয়। রূবেলা নিজে নিজেই সাইরা যায়।

বাচ্চাদের হইলে জ্বরের দিকে খেয়াল রাখ, উচ্চ তাপে ও খিঁচুনি যেন না হয়, হইলে সাথে সাথে ডাক্তার মাম্মার স্মরণাপন্ন হও।

গর্ভবতী মায়েরা তাদের ‘অবস্ট্রেশিয়ান’ এর সাথে অবশ্যই দেখা কর।

বাচ্চাদের ‘এসিটোমেনোফেন’ অথবা ‘আইবুপ্রোফেন’ দেওয়া যাইতে পারে বোতলের গায়ে লেখা নির্দেশনা মত অথবা ডাক্তার মাম্মার পরামর্শ মত, কিন্তু কখনোই ‘এ্যাস্পিরিন’ জাতীয় কিছু দেওয়া যাবে না। (ভাইরাসাক্রান্ত বাচ্চাদের এ্যাস্পিরিন দেওয়া যাবে না অন্য সমস্যা দেখা দিবে)।

এইক্ষেত্রে দ্রুত ডাক্তার দেখাও। আগেই কইছ রূবেলা প্রাণঘাতী রোগ না কিন্তু ঘ্যান ঘ্যানে বাচ্চা কার পছন্দ, আর আমাগো জীবন বাচ্চাদের জন্যই উৎসর্গকৃত তাদের আরামের আর সুস্থ্যতার জন্য যতটুক করা যায়।

সব মায়েদের বাচ্চা নিরাপদ আর সুস্থ্য থাকুক।

সূত্রঃ আমার ডাক্তার বিমল অমরাসেকারা
WebMD

FavoriteLoadingপ্রিয় পোস্টের তালিকায় নিন।

About The Author

মন্তব্য করুন