রবিবার, জুলাই ২৫, ২০২১

হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসায় কেন আই সি ইউ (ICU)

হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসায় কেন আই সি ইউ (ICU)

image_pdfimage_print

কারণ একমাত্র হৃদচিকিৎসার ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটেই থাকে হার্ট অ্যাটাকের রোগীর চিকিৎসা ও রোগীর ওপর টানা পর্যবেক্ষণের দক্ষ আধুনিকতম ব্যবস্থা।

শুধু বেসরকারি হাসপাতালে নয়, এখন বড় সরকারি হাসপাতালেও এরকম বেশ কিছু ইউনিট দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে চলেছে। এরকম ইউনিটে ভর্তি হলে রোগীর যে-কোনও জটিলতা মুহূর্তে ধরা পরে, জটিলতার চিকিৎসাও শুরু হয় এতটুকু কাল বিলম্ব না করে। যে-কোন হার্ট অ্যাটাকে আই সি ইউ-র চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যুর আশঙ্কা কমে, বাড়ে বাঁচার আশা।

যে-কোনও এরকম ইউনিটে থাকেন হৃদ চিকিৎসায় বিশেষভাবে দক্ষ ও প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত বেশ কিছু চিকিৎসক ও একদল নার্স। অনেক সময় থাকেন রোগীর বিশষ প্রয়োজন সম্পর্কে ওয়াকিবহাল একদল স্বাস্থ্যকর্মীও। বেশির ভাগ এরকম কেন্দ্রে থাকে শীততাপ নিয়ন্ত্রিত আরামদায়ক স্বস্তিকর পরিবেশ। প্রত্যেক রোগীর হৃদযন্ত্রের অবস্থা, হালচাল বুঝতে থাকে ধারাবাহিক ই সি জি মনিটরিং-এর ব্যবস্থা। বড় কেন্দ্রে এরকম নজরদারি  বা মনিটরিং হয় ক্লোজড সার্কিট টিভি [ Ociloscopic Electrocardiographic Closed Circuit Television]  সাহায্যে।  টিভির পর্দায় চোখ রেখে হৃদ যন্ত্রের প্রত্যেক মুহূর্তের অবস্থার ওপর নজরদারি চালান চিকিৎসক, এমনকি দক্ষ সেবিকারাও। থাকে নাড়ীর গতি, রক্তচাপ, রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা ইত্যাদি প্রত্যেক মুহূর্তে রেকর্ড করার নানা ধরনের আধুনিক যন্ত্র ।

রক্তচাপ বা হার্ট রেট খুব কমে গেলে বা হার্ট হঠাৎ করে থেমে গেলে [ Cardiac Arrest ] বেজে ওঠা অ্যালার্ম সে ব্যাপারে সতর্ক করে চিকিৎসককে। একজন বা দুজন চিকিৎসক থাকেন সবসময়। থাকে নিলয়ের স্পন্দনে মারাত্মক ছন্দপতন বা ভেনট্রিকুলার ফিব্রিলেশন দেখা দিলে ওই সমস্যা দূর করার যন্ত্র ডিফিব্রিলেটর। ব্যবস্থা থাকে আকস্মিক হৃদস্তব্ধতা [Sudden Respirarory Arrest]-য় হৃদযন্ত্রকে আবার বাইরে থেকে চাপ দিয়ে সচল করার যন্ত্র ‘এক্সটারনাল কার্ডিয়াক কম্প্রেসর’-এর ব্যবস্থাও থাকে। শ্বাসবন্ধ হয়ে যাবার পরও রোগীকে বাঁচানো যায় এরকম আধুনিক প্রযুক্তিযুক্ত যন্ত্রের সাহায্যে।

হার্ট অ্যাটাক হওয়ার পর রোগীর বাঁচার সম্ভাবনা বাড়ে হৃদ স্পন্দনে ছন্দ পতন, শক, হার্ট ফেইলিওর, কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট বা পালমোনারি এডিমার মতো মারাত্মক জটিলতা দেখা দিলে সমস্যার দ্রুতলয়, আধুনিকতম চিকিৎসায়। বিশেষ করে, হার্ট ফেইলিওর ও নানা ধরনের অ্যারিদমিয়ার নিয়ন্ত্রণে একটানা নজরদারির পাশাপাশি দক্ষ চিকিৎসক ও চিকিৎসাকর্মীর  প্রয়োজন হয় বিশেষভাবে। দেখা গেছে বড় ধরনের হার্ট অ্যাটাক আক্রান্ত রোগীদের শতকরা প্রায় সত্তর জন হৃদস্পন্দনের নানা ধরনের অনিয়ম বা অ্যারিদমিয়ার আক্রান্ত হন।

শতকরা প্রায় পনেরোজন রোগী আক্রান্ত হন নিলয়ের স্পন্দনে মারাত্মক গোলযোগ [ ভেনট্রিক্যুলার ফিব্রিলেশন ]-এ, দ্রুত যে সমস্যার চিকিৎসায় আটকে দেওয়া যায় হৃদযন্ত্র আকস্মিক স্তব্ধ হয়ে যাবার বা আবার এর গোলোযোগ দেখা দেবার আশঙ্কা। হার্ট অ্যাটাকের গুরতর বা জীবনঘাতী সমস্যা গুলা দেখা দেওয়া মাত্র ধরে ফেলে উপযুক্ত চিকিৎসা হলে ইনফার্কশন জনিত মৃত্যুর হার কমানো যায় অনেকটাই। এর জন্য দরকার হৃদযন্ত্রের কাজকর্মের ওপর ধারাবাহিক যন্ত্রনির্ভর পর্যবেক্ষণ, একদল দক্ষ চিকিৎসক ও নার্স, হাতের কাছে সব ধরনের প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র ও আধুনিক যন্ত্রপাতি। এরকম ব্যবস্থা একমাত্র বড় হাসপাতালের আধুনিক  আই সি ইউ-তেই পাওয়া সম্ভব।

সুধুমাত্র একগাদা আধুনিক যন্ত্র এরকম আধুনিক চিকিৎসা কেন্দ্রে ডাক্তার নার্স স্বাস্থ্য কর্মীদের দক্ষ তথা সুসংহত ‘টিম ওয়ার্ক’- এর বিকল্প হতে পারে না। বড় ও সুপরিচালিত এরকম ইউনিটগুলোতে দাক্তাররা তো বটেই, হৃদ সমস্যা ও জটিলতা ধরতে ও বিপদ কাটাতে বিশেষভাবে প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত নার্সরা থাকেন। এঁরা হৃদস্পন্দনে ছন্দ ফেরানো ওষুধ [অ্যান্টি অ্যারিদমিক ড্রাগস, যেমন লিডোকেইন]- এর মাত্রা অ্যারিদমিয়ার অবস্থা অনুযায়ী কমাতে বাড়াতে পারেন দক্ষতার সাথে। নিলয়ের ফিব্রিলেশন দেহা দিলে ডিফিব্রিলেটর ব্যবহারেও ( এতে হৃদযন্ত্রে নির্দিষ্ট মাত্রায় DC শক দিয়ে ওই জটিলতা নিয়ন্ত্রণে আনা হয়) এঁদের দক্ষতা থাকে। হঠাৎ কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হলে মারাত্মক ওই সমস্যাকে নিয়ন্ত্রণে আনতেও এঁদের বিশেষ প্রশিক্ষন থাকে।

এরকম সুদক্ষ সেবিকারা ভারপ্রাপ্ত চিকিৎসক আসার আগেই অনেক রোগীর প্রান বাঁচাচ্ছেন দক্ষতার গুনে, এরকম ঘটনা বড় কেন্দ্রগুলোতে প্রায়ই ঘটে।

শুধুমাত্র দক্ষ চিকিৎসকদের নয়, সুদক্ষ, বিশেষ প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত সেবিকাদের আন্তরিকতা আর তৎপরতাও আই সি সি ইউ-তে থাকা হার্ট অ্যাটাকের রোগীদের কারও কারও জীবন বাচায়। রোগী মৃত্যুর দরজা থেকে ফিরে আসেন জীবনের আলোয়। মৃত্যুর অবসন্ন অন্ধকার থেকে জীবনের উৎফুল্ল আলোয়, আড়ম্বরে।

যে-কোন হার্ট অ্যাটাকের রোগীর অন্তত প্রথম কয়েক দিনের চিকিৎসার আদর্শ জায়গা হিসাবে এরকম ইনটেনসিভ করোনারি কেয়ার ইউনিটের কোনও বিকল্প নেই, থাকতে পারে না। দুর্ভাগ্যবশত এ রাজ্যে এরকম ইউনিতগুলো এখনও পর্যন্ত বড় শহর আর মহানগরীতেই সীমাবদ্ধ। সরকারি স্তরে জেলা বা মহকুমা হাসপাতালে এরকম ব্যবস্থা চালু হলে ভবিষ্যতের বহু হার্ট অ্যাটাকের রোগী ফিরে পাবেন অমূল্য জীবন। হৃদরোগ মহামারীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এরকম ইউনিতগুলো লড়তে পারবে জোরদার লড়াই।

অদূর ভবিষ্যতে।

FavoriteLoadingপ্রিয় পোস্টের তালিকায় নিন।

About The Author

মন্তব্য করুন