জ্বর হলেই করোনা নয় – পর্ব ৪

নভেল করোনা ভাইরাস১৯ সংক্রমন মোকাবেলায় কার কী করণীয়?

এই পর্বের লেখাটি লিখতে গিয়ে বারবার বাংলাদেশের পরিসংখ্যানটি মনে পড়ছে। সরকারী পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ পর্যন্ত বাংলাদেশে মাত্র তিনজন মানুষের শরীরে নভেল করোনা১৯ ভাইরাসের উপস্থিতি সনাক্ত করা গেছে। পরিসংখ্যানটি আশাব্যঞ্জক হলেও এটি আসলেই বাস্তবতার কতটুকু প্রতিফলন, সেটা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ থেকেই যায়। যে দেশে মানুষের শরীরে নভেল করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি সনাক্ত করার সুযোগ খুবই সীমিত, সেখানে ঠিক কতজনের শরীরে এই মুহূর্তে ভাইরাসটি আছে তা নির্ণয় করা প্রায় অসম্ভব। পরিসংখ্যানের হিসেবে না গিয়েও তাই বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায় যে, বাংলাদেশও নভেল করোনা১৯ ভাইরাসজনিত রোগ কোভিড১৯ এর মহামারীর ঝুঁকির মধ্যে আছে। এই সম্ভাব্য ঝুঁকির চিন্তা মাথায় রেখেই বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমাদের কার কী করণীয় তা নির্ধারণ করতে হবে।

নভেল করোনা ভাইরাস১৯ সংক্রমন নিয়ন্ত্রণে দায়িত্ব কার জিজ্ঞেস করলেই সবাই আঙ্গুল উচিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে দেখিয়ে দেবে। কিন্তু আসলেই কি তাই? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে যাবার আগে আমরা নভেল করোনা ভাইরাস১৯ সংক্রমন নিয়ন্ত্রণের কিছু মৌলিক বিষয় জেনে নেই। নভেল করোনা ভাইরাস১৯ নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রমকে আমরা প্রধানত দুইভাগে ভাগ করে নিতে পারি: তা হলো ভাইরাস সংক্রান্ত করণীয়, এবং এটি নিয়ন্ত্রণে মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রম।

প্রথমত, মানুষকে নভেল করোনা ভাইরাস১৯ সংক্রান্ত সঠিক তথ্য জানাতে হবে। অবাধ তথ্য প্রবাহের এই যুগে যেখানে অসংখ্য ভুল তথ্য সোশাল মিডিয়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে, সেখানে কাজটা খুবই চ্যালেঞ্জিং। এই তথ্য জানানোর কাজটি সরকারী-বেসরকারী উদ্যোগেই হতে হবে। এখানে মূলধারার মিডিয়ার একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। মানুষকে জানাতে হবে, কিভাবে এই ভাইরাসটি ছড়াতে পারে, একজনের কাছ থেকে কিভাবে আরেকজনের কাছে যেতে পারে? সেই সাথে কিভাবে এই ভাইরাসের সংক্রমন প্রতিহত করা যেতে পারে সেটাও সবাইকে জানাতে হবে, যাতে স্ব স্ব অবস্থান থেকে মানুষ তার করণীয় সম্পর্কে জানতে পারে। এমনিতে আমাদের দেশের গণমানুষের পরিষ্কারপরিচ্ছন্নতা অনুশীলনের বিষয়টা খুব উন্নতমানের নয়। রাস্তাঘাটে থুথু ফেলা, নাক ঝাড়া, জনসন্মুখে নাক খোঁটা, পর্যাপ্ত সংখ্যক বার হাত না ধোওয়ার মত ব্যাপারগুলো অনেকটা আমাদের জাতীয় অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। অথচ নভেল করোনা ভাইরাস১৯ সংক্রমন প্রতিরোধে এই ক্ষতিকর অভ্যাসগুলো বদলাতে হবে। আর গণমানুষের অভ্যাসে কাঙ্খিত পরিবর্তন আনতে হলে দেশব্যাপী ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে হবে।

মাঠ পর্যায়ের অপারেশনাল কার্যক্রম নির্ধারণে আমাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হবে, মানুষ থেকে মানুষে নভেল করোনা ভাইরাস১৯ সংক্রমনের ঝুঁকি কমানো। এ লক্ষ্যে মানুষের সচেতনতা বাড়ানো, নিয়মিত হাত ধোয়াসহ ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস নিশ্চিত করার পাশাপাশি আমাদের ‘সামাজিক দূরত্ব’ (সোশাল ডিসট্যান্সিং) নিশ্চিত করতে হবে। শুরুর দুমাসের মধ্যেই চীন কোভিড১৯ মহামারী নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলেও ইটালীর মত উন্নত দেশের সর্বশেষ পরিস্থিতি দেখে আমাদের নিশ্চিন্ত হয়ে বসে থাকবার সুযোগ নেই। এখনই বাংলাদেশে সকল ধরণের গণজমায়েত আপাতত বন্ধ রাখতে হবে। অধিকাংশ রাজনৈতিক দলই তাদের সমাবেশ আপাতত বন্ধ রেখেছে, যা শুভ লক্ষণ। আগামী ১৭ মার্চের মুজিব জন্মশতবার্ষিকীর মত গুরুত্বপূর্ণ এবং আবেগঘন অনুষ্ঠানের জনসমাবেশ আপাতত স্থগিত করে স্বয়ং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একটি দৃষ্টান্তমূলক কাজ করেছেন। পাশাপাশি বিয়ে, জন্মদিন, আলোচনা সভার মত সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতেও জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, প্রয়োজনে সরকারী ভাবে ঘোষণা দিয়ে সাময়িকভাবে এসব অনুষ্ঠান বন্ধ রাখতে নির্দেশ দিতে হবে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আগামী এক মাসের জন্য বন্ধ ঘোষণা এখন সময়ের দাবি। যে সব অফিসে সম্ভব, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাসা থেকে কাজ করার সুযোগ করে দিতে হবে। আমাদের ভীড়ে ঠাসা বাস-রেলে যাত্রীর সংখ্যা যাতে কমে, সে কারণেও জরুরী প্রয়োজন ছাড়া আপাতত ঘরের বাইরে যাবার দরকার নাই। ঘনঘন বাজারে যাবারও দরকার নাই। আগামী তিন-চার সপ্তাহের জন্যে সারা দেশব্যাপী আমাদের চলাচলসহ বিভিন্ন কার্যক্রম সীমিত করতে হবে যাতে অনেক মানুষের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা যায়। অন্যথায়, করোনা পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। একটি বৃহত্তর সম্ভাব্য বিপর্যয় এড়াতে তিন-চার সপ্তাহ থেমে থাকা এমন কঠিন কোন কাজ নয়। বিশেষ করে সেই জাতির জন্য, যারা ন্যূনতম প্রস্তুতি ও সামর্থ্য নিয়ে একাত্তরের মত একটি অসম যুদ্ধে জয়লাভ করেছিল। করোনার বিরূদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভের জন্য আমাদের প্রধান প্রয়োজন একটি সঠিক নেতৃত্ব ও কতিপয় সময়োপযোগী নির্দেশনা। কথা প্রসঙ্গে সেদিন জেনেভায় কর্মরত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় কর্মরত একজন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা আমাকে ফোনে বলেছিলেন, ‘তোমাদের প্রধানমন্ত্রীই সেই মানুষ, যার উপরে অনায়াসে আস্থা রাখা যায়’। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় আমিও জানি, ‘শেখ হাসিনা এখনো পারে, শেখ হাসিনাই পারে’।

কেবল ঢাকা শহরে নয়, সারাদেশব্যাপী আমাদের হাসপাতালগুলোকে কোভিড১৯ রোগের চিকিৎসার জন্য প্রস্তুত রাখতে হবে। সেখানে ভাইরাসের উপস্থিতি সনাক্তকরণের সুবিধা, প্রয়োজনে রোগীকে অন্যদের থেকে আলাদা (আইসোলেশন) করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। রোগীর ফুসফুস আক্রান্তসহ অন্যান্য জটিলতা দেখা দিলে চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এই চিকিৎসার বিষয়ে এবং প্রদানকালে ডাক্তারসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা বিষয়ে পরবর্তী পর্বে বিস্তারিত লিখবো।

প্রিয় পাঠক, এতক্ষণে নিশ্চয়ই অনুধাবন করতে পারছেন, কেবল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একার পক্ষে এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবেলায় স্বাস্থ্যসহ সরকারের প্রায় প্রতিটা মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা রাখতে হবে, বিশেষ করে শিক্ষা, তথ্য, পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র, আইন মন্ত্রণালয়, বানিজ্য মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে। বিমানবন্দরসহ আমাদের সকল সীমান্ত এলাকায় সম্ভাব্য রোগী সনাক্তকরণের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ইতিমধ্যে মহামারী রোগ নিয়ন্ত্রণে আইনের সংশ্লিষ্ট ধারা প্রয়োগসংক্রান্ত নোটিশ জারি করেছেন। এই সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা অযাচিতভাবে দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়িয়ে জনজীবনকে যেন বিপন্ন করে তুলতে না পারে, সেদিকে আইনশৃংখলা বাহিনীকে নজরদারি করতে হবে। জাতির এই সম্ভাব্য দু:সময়ে প্রয়োজনে সেনাবাহিনীকে মাঠে নামানো যেতে পারে। এই দু:সময়ে দেশব্যাপী হতদরিদ্র মানুষদের উপার্জন ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে, সে ক্ষেত্রে তাদের আর্থিক সহায়তা প্রদান করা জরুরী।

সরকারের একার পক্ষেও এই সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবেলা এড়ানো দু:সাধ্য, এ ক্ষেত্রে বেসরকারী খাতসহ পুরো দেশকেই এগিয়ে আসতে হবে, কেতাবি ভাষায় যাকে বলে ‘হোল কম্যুনিটি অ্যাপ্রোচ’। নাগরিক হিসেবেও সমষ্টিগত এবং আত্মরক্ষার স্বার্থে আমাদের সবাইকে নাগরিক দায়িত্বসমূহ পালন করতে হবে, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার অনুশীলন যার মধ্যে অন্যতম। কারো শরীরে নভেল করোনা১৯ ভাইরাস সংক্রমনের ঝুঁকি থাকলে প্রয়োজনে কিছু মানুষের চৌদ্দদিন নিজ দায়িত্বে স্বগৃহে স্বেচ্ছা নির্বাসনে থাকতে হবে। যদি মানুষজন স্বগৃহে স্বেচ্ছায় অন্তরীণ না থাকতে চায়, তাহলে তাদের হাজি ক্যাম্প, স্কুল-কলেজে বা সাইক্লোন শেল্টারের মত জায়গায় কোয়ারেন্টাইন করে রাখতে হবে। দেশব্যাপী গণসচেতনতা বাড়াতে একটি সামাজিক আন্দোলন প্রয়োজন, এনজিওগুলো যেখানে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারবে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রকৃত বিশেষজ্ঞদের পরামর্শক্রমে জনস্বার্থে প্রয়োজনীয় আরো অনেক পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।

এমনিতেই বাংলাদেশ ঘনবসতির দেশ, তার উপরে আমাদের স্বাস্থ্য সেবা প্রদানের সক্ষমতা এখনো বেশ পিছিয়ে। পর্যাপ্ত আইসিইউ সেবা প্রদানের সুযোগ আমাদের নাই। টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প কিংবা দেশের বিভিন্ন বস্তির কথা ভাবলে আমি খুব আতঙ্কিত বোধ করি। ঢাকা শহরেও মানুষের বিশাল ভীড়। এই পরিস্থিতিতে অসুখ হবার পরে চিকিৎসার চেয়ে অসুখ হবার আগেই প্রতিরোধ করাটা আমাদের জন্য উত্তম। আমাদের জন্য অধিক প্রযোজ্য হলো ‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিওর’

জ্বর হলেই করোনা নয় – পর্ব ১




জ্বর হলেই করোনা নয় – পর্ব ৩

নভেল করোনা১৯ ভাইরাস সংক্রমন থেকে কিভাবে রক্ষা পেতে পারেন?

১। প্রতিদিন কয়েকবার করে কব্জি পর্যন্ত দুই হাতে সাবান মেখে পানি দিয়ে কিংবা অ্যালকোহল বেজড হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে দুই হাত সঠিকভাবে (আঙ্গুলের ভেতরে আঙ্গুল ঢুকিয়ে ভালো করে কচলিয়ে এবং দু হাতের সবটুকু জায়গা) হাত ধুতে হবে। এর ফলে যদি হাতের তালুতে ভাইরাস লেগে থাকে, তবে তা মরে যাবে। হ্যান্ড স্যানিটাইজারে অ্যালকোহলের পরিমান কমপক্ষে ৬০% হতে হবে। নন-অ্যালকোহল বেজড হ্যান্ড স্যানিটাইজারে এই ভাইরাস মরবে না। যদি কোন কারণে ধারে-কাছে সাবান বা হ্যান্ড স্যানিটাইজার না থাকে, তাহলে অন্তত পানি দিয়ে আঙ্গুল কচলিয়ে ভাল করে কব্জি পর্যন্ত হাত ধোবেন। কলুষিত কোন কিছু স্পর্শ করার পরেও ভালো করে হাত ধুতে হবে। বাইরে থেকে ঘরে ফিরে অবশ্যই হাত ধোবেন।

২। হাঁচি-কাশিতে আক্রান্ত ব্যক্তির থেকে কমপক্ষে তিন ফুট দূরত্ব বজায় রাখুন। এর ফলে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীর নি:সৃত ভাইরাসবাহী ড্রপলেটগুলো সহজে আপনার নাকে-মুখে প্রবেশ করতে পারবে না।

৩। হাতের দিয়ে বারবার নিজের চোখ, নাক ও মুখ স্পর্শ করবেন না। কারণ নভেল করোনা১৯ ভাইরাস দূষিত (কন্টামিনেটেড) বিভিন্ন পৃষ্ঠতল (সারফেস) স্পর্শ করার ফলে আপনার হাতের তালুতে নভেল করোনা১৯ ভাইরাস লেগে থাকতে পারে, যা পরে চোখ, নাক বা মুখ দিয়ে আপনার শরীরে প্রবেশ করতে পারে।

৪। প্রতিবার হাঁচি বা কাশি দেবার সময় হাতের কনুইয়ে বা টিস্যু পেপার দিয়ে মুখ ঢাকুন। ব্যবহারের পরে টিস্যু পেপারটি ডাস্টবিনে ফেলে দিন। হাঁচি-কাশি দেবার সময় হাতের তালু দিয়ে মুখ ঢাকবেন না। সেক্ষেত্রে অন্যের সাথে হাত মেলানোর সময় কিংবা ভাইরাস কলুষিত হাত দিয়ে পরবর্তীতে কিছু স্পর্শ করলে, আপনার হাতের তালু থেকে সেখানে ভাইরাসটি ছড়াতে পারে।

৫। নিয়মিত ঘরের দরজা, সিড়ির রেলিং, মোবাইল ফোনের স্ক্রিন এবং যেসব স্থান ঘনঘন স্পর্শ করা হয়, সেগুলো জীবানুনাশক ব্যবহার করে নিয়মিত পরিস্কার রাখুন।

৬। বেশী করে ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার যেমন কাঁচা মরিচ, লেবু, পেপে, কমলা, সরিষা শাক, ইত্যাদি খান। এর কারণ হলো, ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে।

৭। নভেল করোনা১৯ ভাইরাস সংক্রান্ত সঠিক তথ্যের জন্য নিয়মিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট ভিজিট করুন। ফেসবুকে যা দেখবেন, তাই বিশ্বাস করবেন না, অন্যের ইনবক্সে ফরোয়ার্ড করবার আগে কয়েকবার ভাববেন।

আপনার জ্বর-কাশি বা ঠাণ্ডা লাগলে হলে কী করবেন?

জ্বর-কাশি বা ঠাণ্ডাজনিত অসুস্থতায় সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত ঘরে অবস্থান করুন। যদি আপনার জ্বর, কাশি এবং শ্বাসকষ্ট থাকে, তাহলে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সম্ভব হলে আগে ফোনে ডাক্তারের সাথে কথা বলে প্রয়োজনীয় পরামর্শ নিন। বাংলাদেশে আইইডিসিআরের অনেকগুলো হটলাইন নম্বর দেওয়া আছে। নভেল করোনা১৯ ভাইরাস সংক্রান্ত যে কোন তথ্য ও পরামর্শের জন্য এসব ফোন নম্বরেও কথা বলা যেতে পারে। জাতীয় এবং স্থানীয় পর্যায়ের স্বাস্ব্য কর্তৃপক্ষের পরামর্শগুলো মেনে চলুন।

নভেল করোনা১৯ ভাইরাসে আক্রান্ত লোকের সংস্পর্শে এলে বা আক্রান্ত এলাকা থেকে আসার পরে কী করবেন?

প্রথমত, উপরে বর্ণিত করণীয়গুলো নিয়মিতভাবে পালন করুন।

এবার একটা সত্যি ঘটনা বলি। কদিন আগে বিখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী ফারহার (ছদ্মনাম) সাথে তার এক তরুণী ভক্ত দেখা করতে এসেছিলেন। বেশ কিছুক্ষণ তারা একসাথে ছিলেন। দেখার শুরুতে হ্যান্ডশেক এবং যাবার সময় ভক্তের সাথে আলিঙ্গনও করেছেন। দুদিন পরে ফোন করে ফারহাকে ভক্তটি জানালেন, তার নভেল করোনা১৯ ভাইরাস পজিটিভ হয়েছে এবং কোভিড১৯ রোগের লক্ষণ দেখা দিয়েছে। ফোন পাবার পর নিজের মেয়ে দুটিকে আত্মীয়ের বাসায় পাঠিয়ে পরবর্তী চৌদ্দদিন তিনি নিজ গৃহে স্বেচ্ছা নির্বাসনে থাকলেন। এসময়ে তিনি বাইরে বের হননি, বাসায়ও কাউকে আসতে দেননি। অফিসসহ প্রয়োজনীয় সব কাজ ফোনে আর ইমেইলে সেরেছেন। চৌদ্দদিন পরেও তিনি অসুস্থ বোধ করেননি, তার রক্ত পরীক্ষায়ও নভেল করোনা১৯ ভাইরাস পাওয়া যায়নি।

আরেকটি ঘটনার কথা বলি। জনৈক ব্যবসায়ী এক বিদেশীর সাথে মিটিং করার পর কদিন পর থেকেই জ্বর ও প্রচণ্ড গলা ব্যথা শুরু হলো। খোঁজ নিয়ে জানা গেলো, বিদেশীর শরীরেও নভেল করোনা১৯ ভাইরাস পাওয়া গেছে এবং তিনিও কোভিড১৯ এ আক্রান্ত হয়েছেন। ফোনে ডাক্তারের পরামর্শমত ব্যবসায়ী লোকটি প্যারাসিটামল আর এন্টিহিস্টামিন ট্যাবলেট খেলেন। চৌদ্দদিন ঘরে নিজের রুমে স্বেচ্ছা নির্বাসনে কাটালেন। অসুস্থতার এই সময়ে অনেকগুলো সিনেমা দেখলেন, বই পড়লেন। চৌদ্দদিনের মধ্যে তিনি পুরোপুরি সুস্থও হয়ে উঠেছেন।

নভেল করোনা১৯ ভাইরাসটি নতুন, তাই এ সংক্রান্ত অনেক প্রশ্নের উত্তরই আমাদের এখন পর্যন্ত জানা নাই। আপাতত প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আক্রান্ত বা সন্দেহজনক ১৪ দিনের এই স্বেচ্ছা নির্বাসনকেই গ্রহণযোগ্য পরামর্শ বলেই আমরা মেনে নিচ্ছি। এর কারণ হলো, কারো শরীরে এই ভাইরাসটি প্রবেশ করলে দুই থেকে ১৪ দিনের মধ্যেই কোভিড১৯ রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে।

(চলবে)

জ্বর হলেই করোনা নয় – পর্ব ৪

***পরবর্তী পর্বটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই পর্বে সরকার ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে করণীয় বিষয়ে লিখব। পরের পর্বটি বিশেষভাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য***




জ্বর হলেই করোনা নয় – পর্ব ২

নোভেল করোনা১৯ ভাইরাস এবং কোভিড১৯ নিয়ে সাধারণ মানুষের কতটুকু জানা দরকার?

নোভেল করোনা১৯ ভাইরাস, বৃহত্তর করোনা ভাইরাস পরিবারের নতূনতম সদস্য বিধায় পরিপূর্ণ তথ্য এখনো বিজ্ঞানীরা জানতে পারেননি, তবে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে গবেষণা চলছে। কিছু কিছু প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আমরা ইতিমধ্যে পেয়েছি। পাশাপাশি, অবাধ তথ্য প্রবাহের এই যুগে এই ভাইরাস নিয়ে প্রচুর বিভ্রান্তিকর তথ্যও ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং আশেপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। যার ফলে মানুষের মধ্যে এক ধরণের বিভ্রান্তির সৃষ্টি হচ্ছে। যে কোন রোগের মহামারী নিয়ন্ত্রণে এ ধরণের বিভ্রান্তিকর তথ্য ক্ষতিকর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আজকের এই লেখায় তাই শুরুতেই কিছু ভুল তথ্যের ব্যাপার তুলে ধরছি।

নভেল করোনা১৯ ভাইরাস সব দেশে, সব অঞ্চলেই ছড়াতে পারে। গরম ও আদ্র জলবায়ুর (Hot and humid climate) এলাকায় ছড়াবে না এমন কোন কথা নাই। শীত ও তুষারপাতের দেশেও এই ভাইরাস ছড়াতে পারে। শীতের ঠাণ্ডা এই ভাইরাসকে মারতে পারে না। বাইরের আবহাওয়া যাই থাকুক না কেন, সুস্থ মানুষের শরীরের তাপমাত্রা সাধারণত ৩৬.৫ থেকে ৩৭ ডিগ্রী সেলসিয়াসের মধ্যেই থাকে।

গরম পানিতে গোসল করলে নভেল করোনা ভাইরাসের আক্রমন থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে বলে কারো কারো মনে যে ধারণা জন্মেছে তা সঠিক নয়।
এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, মশার কামড়েও এই ভাইরাস ছড়ায় না। নভেল করোনা ভাইরাস ধর্ম-বর্ণ-গোত্র চেনে না, যে কোন মানুষকেই আক্রমন করতে পারে।

এই কারণে, নভেল করোনা ভাইরাস কিভাবে ছড়ায় তা জানা জরুরী। ধারণা করা হয়, গত বছরের ডিসেম্বর মাসে চীনের উহান শহরের কোন একটা সামুদ্রিক মাছ ও প্রাণীর বাজার থেকে ভাইরাসটি প্রাণীর দেহ থেকে কতিপয় মানুষের দেহে প্রবেশ করেছিল। তারপর থেকে এক মানুষের কাছ থেকে অন্য মানুষের কাছে ভাইরাসটি ছড়িয়েছে।

যেভাবে ভাইরাসটি মানুষ থেকে মানুষে ছড়াতে পারে:

– সাধারণত এই ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের সংস্পর্শে এলে
– ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের হাঁচি-কাশিতে ছড়ানো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র দানার (ড্রপলেটস) সংস্পর্শে এলে
– ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশি নি:সৃত ড্রপলেট কোন বস্তু বা পৃষ্ঠতলে (surface) লেগে থাকলে অন্য কোন ব্যক্তি যদি তা স্পর্শ করেন এবং পরবর্তীতে ভাইরাসযুক্ত সেই হাত দিয়ে যদি নিজের নাক-চোখ-মুখ স্পর্শ করেন তবে সেক্ষেত্রে ওই ব্যক্তির শরীরে ভাইরাসটি প্রবেশ করতে পারে। সাধারণত কোন পৃষ্ঠতলে এই ভাইরাসটি এই ভাইরাসটি কয়েক ঘন্টা থেকে কয়েক দিন পর্যন্ত বাঁচতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নভেল করোনা১৯ ভাইরাস দ্বারা রোগের নামকরণ করা হয়েছে কোভিড১৯। কারো শরীরে এই ভাইরাস প্রবেশ করলে কোভিড১৯ রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেতে ২ থেকে ১৪ দিন সময় লাগতে পারে।

কোভিড১৯ রোগের লক্ষণসমূহ:

এই রোগের সাধারণ লক্ষণসমূহ হলো জ্বর, ক্লান্তি এবং শুকনো কাশি। এছাড়াও কিছু রোগীর ক্ষেত্রে গায়ে ব্যথা, সর্দি, নাক বন্ধ থাকা, গলা ব্যথা বা পাতলা পায়খানা থাকতে পারে। লক্ষণসমূহ সাধারণত মৃদু আকারে শুরু হয় এবং আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে। আক্রান্ত রোগীদের শতকরা আশি ভাগই তেমন কোন চিকিৎসা ছাড়াই সুস্থ হয়ে ওঠেন। তারা লক্ষণভিত্তিত ওষুধ যেমন জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল, সর্দি-কাশির জন্য এন্টি হিস্টামিন জাতীয় ওষুধ খেতে পারেন। আক্রান্ত প্রতি ছয়জনের মধ্যে একজনের অবস্থা জটিল হতে পারে এবং দেহে শ্বাসজনিত জটিলতা হতে পারে। বয়স্ক মানুষ কিংবা যাদের উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যান্সার জাতীয় অসুখ আছে, তাদের ক্ষেত্রে এই রোগ জটিল হতে পারে। শরীরে নভেল করোনা১৯ ভাইরাস ঢুকলেই যে একজন কোভিড১৯ রোগে আক্রান্ত হবেন, তা সত্যি নয়।

আমাদের মনে রাখা জরুরী, শরীরে এই ভাইরাস প্রবেশ করলেও সবারই শরীরে কোভিড১৯ রোগের লক্ষণ দেখা যাবে না এবং অনেকেই সুস্থ থাকবেন।

(চলবে)

জ্বর হলেই করোনা নয় – পর্ব ৩




জ্বর হলেই করোনা নয় – পর্ব ১

নভেল করোনা১৯ ভাইরাস নিয়ে কেন এত ভীতি!

দুদিন আগে রূপা বাংলাদেশ থেকে ফোন করেছিল। সকাল থেকে ওর জ্বর, কাশি এবং গলাব্যথা। সে খুব ভয় পেয়েছে, পাছে নভেল করোনা১৯ ভাইরাসে পেয়েছে বুঝি। সে ভয়ে অস্থির, তার কোভিড১৯ হয়নি তো? খুবই ভয় পাওয়া গলায় আমারে জানালো, শুধু জ্বর নয় তার খুব অস্বস্তিও হচ্ছে। আমি জিজ্ঞেস, কবে তার জ্বর হয়েছিল অথচ অস্বস্তি লাগেনি? আমি দেশের বাইরে তার সাম্প্রতিক ভ্রমণের ইতিহাস জানতে চাইলাম, জানামতে কোন কোভিড১৯ রোগীর সংস্পর্শে কিংবা অন্য কোন জ্বরের রোগীর সংস্পর্শে এসেছে কি না জানতে চাইলাম। সবগুলোর উত্তরই না হওয়ায় পরামর্শ দিলাম, আপাতত অফিস ও অন্যান্য কাজে বাইরে যাওয়া বাদ দিয়ে বাসায় থাকো। আর শ্বাসকষ্টসহ শারীরিক কোন সমস্যা হলে ডাক্তারের কাছে যেও। আজ সকালে রূপা ফোন করে জানিয়েছে, ওর জ্বর কমে গেছে।

সম্প্রতি আবিষ্কৃত নভেল করোনা ১৯ ভাইরাস নিয়ে সারা পৃথিবী তোলপাড়। গতকাল বুধবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক কোভিড১৯এর বর্তমান অবস্থাকে ‘প্যানডেমিক’ ঘোষণা করেছেন। কোন রোগ মহামারী আকারে যখন একাধিক দেশে হয়, বিশেষ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একাধিক অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তাকে ‘প্যানডেমিক’ বলে।

কেন করোনা নিয়ে এই ভীতি?

নভেল করোনা১৯ ভাইরাস নিয়ে সারা পৃথিবীতে জনমনে ব্যাপক ভীতি দেখা দিয়েছে। এই ভীতির কারণ কী? এর আগে একই রকমের সার্স, মার্স রোগ দেখা দিলেও তা করোনার মত এত ব্যাপ্তি পায়নি। চীন থেকে এই অসুখে যেভাবে আমরা মৃত্যুর খবর পাচ্ছিলাম, তাতে শুরুতেই আতঙ্কিত বোধ করেছি। তারপর এই অসুখ ছড়িয়েছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। তাছাড়া, এবারের ভীতির কারণসমূহের মধ্যে অন্যতম হল, এই ভাইরাসটি আক্রান্ত ব্যক্তির শরীর থেকে সংস্পর্শে আসা মানুষের শরীরে খুব দ্রুত ছড়ায়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় আমরা যাকে বলি ‘ব্যাসিক রিপ্রোডাকশন রেশিও (বিআরআর), যা এই ভাইরাসের ক্ষেত্রে অনেক বেশী।

দ্বিতীয়ত, কারো শরীরে নভেল করোনা ভাইরাস১৯ প্রবেশ করলে কী হয়? এই ভাইরাস শরীরে প্রবেশের পর ওই ব্যক্তি কতটা আক্রান্ত হবেন, তা প্রধানত নির্ভর করে তার দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার উপর। একজন সুস্থ-সবল মানুষের দেহে এই ভাইরাস প্রবেশ করলে দেখা যায় তার শরীরে সামান্য জ্বর বা কাশি হতে পারে, যা অনেকটা ঠাণ্ডা জ্বরের মত।

সমস্যা প্রকট হয় যখন আক্রান্ত ব্যক্তির দেহের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়। যেমন কারো যদি অ্যাজমা বা হাপানি, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ থাকে, বা ক্যান্সারাক্রান্ত রোগী যাদের দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের ক্ষেত্রে এই ভাইরাস নিউমোনিয়াসহ শ্বাসতন্ত্রের নানান জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। অনেক বয়স্ক মানুষদের সাধারণত এসব অসুখের কারণে দেহের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে। ফলে নভেল করোনা ভাইরাস এদের শরীরে ঢুকে বিভিন্ন জটিলতা তৈরী করতে পারে, এতে অনেকের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। যেসব দেশে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বেশী, সেসব দেশে তাই কোভিড১৯ রোগে আক্রান্তের মৃত্যুহার বেশী হবে।

তবে এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বলা যায়, নভেল করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত শতকরা আশিভাগ লোকই কোন চিকিৎসা ছাড়াই বা সামান্য চিকিৎসায়ই ভালো হয়ে যায়। বাকি ১৫-১৮ শতাংশ লোক হাসপাতালে বা চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থেকে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে ওঠে। আক্রান্তদের প্রায় চার-পাঁচ শতাংশ রোগির অবস্থা বেশ জটিল হয়, যাদের অনেকের চিকিৎসার জন্য আইসিইউর প্রয়োজন হতে পারে। কেবলমাত্র দুই শতাংশের মত মানুষে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে।

তবে নভেল করোনা ভাইরাসের ব্যাপারে প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্যে জানা যাচ্ছে যে, এই ভাইরাস বারবার তার জীন বদলাচ্ছে এবং এর ফলে ক্রমাগত ভাইরাসটি আরো ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। বারবার পরিবর্তনের ফলে নভেল করোনা প্রতিরোধে কার্যকর কোন ভ্যাক্সিন তৈরী করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।

(চলবে)

জ্বর হলেই করোনা নয় – পর্ব ২