সিয়াম এবং স্বাস্থ্যঃ রোযা এবং পরিপাক নালী ও লিভারের সমস্যা

সার্বিকভাবে রোযা মনোদৈহিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নে ভূমিকা রাখে। কিন্তু ইফতার এবং সেহরির খাবারের উপাদান সঠিকভাবে চয়ন না করলে পাকস্থলী এবং অন্ত্রের বিভিন্ন উপসর্গ দেখা যায়। অনেকেই রমযানের সময় ডিসপেপসিয়া বা বদহজম, পেট ভারী ভারী লাগা, বুক জ্বালাপোড়া বা হার্টবার্ন ইত্যাদি নানারকম সমস্যার কথা বলে থাকেন। ইফতার এবং সেহরিতে অতিরিক্ত তেলচর্বিযুক্ত ভাজাভুজি এবং চিনি-মিষ্টিসমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার পরে এধরণের সমস্যা বেশী হয়।

এখানে পেপটিক আলসার সম্পর্কে কিছু উল্লেখ করা দরকার। এটা আমাদের খুবই পরিচিত রোগ। রমযানের সময় পেপটিক আলসার এবং এর জটিলতাও বেড়ে যেতে দেখা যায়। অনেকে জেনে কিংবা না জেনে পেটের যেকোন ব্যথা কিংবা সমস্যার জন্য অ্যান্টসিড, ওমেপ্রাজল কিংবা র‍্যানিটিডিন জাতীয় ওষুধ অবিরত খেয়ে থাকেন এবং এধরণের লক্ষণ-উপসর্গ থেকে মুক্ত থাকার চেষ্টা করেন।

পেপটিক আলসারের অত্যন্ত গুরুতর জটিলতাসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে পাকস্থলী কিংবা ডিউডেনাম ফুটো হয়ে যাওয়া। সম্প্রতি তুরস্কের ইস্তাম্বুল ইউনিভার্সিটিতে এ সম্পর্কে একটি পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। উদ্দেশ্য ছিল রমযান মাসে রোযার কারণে পাকস্থলী কিংবা ডিউডেনাম ফুটো হয়ে যাওয়ার প্রকোপ কেমন, তা খতিয়ে দেখা।

এই পর্যবেক্ষণ তুরস্কের একটি বড় রেফারাল হাসপাতালে ১৯৭৯ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত যে ২৩১১ জন পাকস্থলী কিংবা ডিউডেনাম ফুটো হয়ে যাওয়া রোগী ভর্তি হয়েছিলেন, তাদের প্রত্যকের অপারেশন সংক্রান্ত নথি-পত্র বিশ্লেষণ করে দেখা হয়েছে। এদের মধ্যে রমযান ব্যতীত অন্যান্য মাসে (৩৯৬ মাস) ভর্তি হয়েছেন ১৮০৫ জন। আর রমযান মাস সমূহে (৩৬ মাস) ৫০৬ জন পাকস্থলী কিংবা ডিউডেনাম ফুটো হয়ে যাওয়ার কারণে ভর্তি হয়ে শল্য চিকিৎসা নিয়েছেন। ফলাফল বিশ্লেষণ দেখা যাচ্ছে এই দুই গ্রুপের রোগীদের মধ্যে অন্যান্য কোন পার্থক্য না থাকলেও রমযান মাসে পাকস্থলী কিংবা ডিউডেনাম ফুটো হয়ে যাওয়ার কারণে তুলনামূলকভাবে অধিক হারে শল্য চিকিৎসা নিতে হয়েছে। গবেষকগণ অবশ্য ঋতুভেদে রোগীর কেমন তারতম্য হয়েছে তা নির্ণয় করতে পারেন নি। উক্ত ৩৬ বছরের মধ্যে কোন এক রমযান মাসে রোযা রাখার সময় ছিল সর্বোচ্চ ১৯ ঘণ্টা।

গবেষকদের সিদ্ধান্ত হচ্ছে রমযান মাসে পাকস্থলী কিংবা ডিউডেনাম ফুটো হওয়ার কারণে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে শল্যচিকিৎসা নেওয়ার হার উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় বেড়ে যায়। অতএব যাদের পেপটিক আলসারের সমস্যা রয়েছে বলে মনে করেন, তাদের রমযান শুরুর পূর্বে চিকিৎসকের নিকট পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত।

পরিপাক নালীর অন্যান্য রোগের ওপর রোযার প্রভাব সম্পর্কে তেমন কোন নির্ভরযোগ্য পর্যবেক্ষণের তথ্য নেই। অনেকে মনে করেন মৃদু থেকে মাঝারি তীব্রতার আন্ত্রিক প্রদাহে (inflammatory bowel disease) সাধারণত রোযার সময় তেমন সমস্যা হয় না। তবে রোগের তীব্রতা বেশী থাকলে সতর্ক হওয়া উত্তম।

অ্যাকিউট ভাইরাল হেপাটাইটিস এবং যেকোন গুরুতর লিভারের রোগের ক্ষেত্রে রোযা থেকে বিরত থাকা উত্তম। তবে অধিকাংশ মৃদু ক্রনিক হেপাটাইটিসের ক্ষেত্রে রোযার ফলে তেমন কোন সমস্যা হয় না। যদিও অনেকের এসময় রক্তে লিভার এনজাইমের পরিমাণ বেড়ে যায়। কিন্তু রমযানের পরে আবার তা পূর্বাবস্থায় ফিরে যায়।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভারের (NAFLD) রোগীরা রোযা থাকলে বিশেষ উপকার পেতে পারেন। সম্প্রতি ইরানের তাব্রিজ ইউনিভার্সিটিতে ফ্যাটি লিভারের ওপর রোযার প্রভাব নিয়ে খুব চমৎকার একটি গবেষণা করা হয়েছে। গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল ফ্যাটি লিভারের রোগীরা রোযা থাকার ফলে রক্তের গ্লুকোজ, ইনসুলিন সহ অন্যান্য রাসায়নিক উপাদানের কেমন পরিবর্তন হয়, তা লক্ষ্য করা। ফলাফলে দেখা যায় যারা রোযা রেখেছেন তাদের সকলেরই রক্তে গ্লুকোজ, ইনসুলিন, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স এবং প্রদাহজনিত বিভিন্ন সাইটোকাইনের মাত্রা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমেছে।

সুতরাং বলা যায় পরিপাক নালী এবং লিভারের রোগভেদে রোযার কারণে ভাল-মন্দ উভয় রকম পরিণতিই হতে পারে। কারও এধরণের সমস্যা থাকলে রোযা শুরু হওয়ার আগে থেকে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত।

তথ্যসূত্রঃ
• Abbas Z. Gastrointestinal health in Ramadan with special reference to diabetes. J Pak Med Assoc. 2015 May; 65(5 Suppl 1):S68-71.
• Kocakusak A. Does Ramadan fasting contribute to the increase of peptic ulcer perforations? Eur Rev Med Pharmacol Sci. 2017 Jan;21(1):150-154.
• Aliasghari F, Izadi A, Gargari BP, Ebrahimi S. The Effects of Ramadan Fasting on Body Composition, Blood Pressure, Glucose Metabolism, and Markers of Inflammation in NAFLD Patients: An Observational Trial. J Am Coll Nutr. 2017 Nov-Dec;36(8):640-645.

 




সিয়াম এবং স্বাস্থ্যঃ ব্রেইন স্ট্রোক

ব্রেইন স্ট্রোক বা পক্ষাঘাতের ফলে মস্তিষ্কের রক্তনালী বন্ধ হয়ে যায় কিংবা রক্তনালী ফেটে রক্ত ক্ষরণ হয়। মস্তিষ্ক কোষসমূহ অত্যন্ত সংবেদনশীল। স্ট্রোকের পরে মস্তিষ্কের ক্ষতিগ্রস্থ অংশে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রয়োজনীয় অক্সিজেন এবং গ্লুকোজ সরবরাহে সমস্যা হওয়ায় মস্তিষ্কের নিউরনসমূহ দ্রুত নষ্ট হয়ে যায় এবং ওই নিউরনসমূহ শরীরের যে অংশ নিয়ন্ত্রণ করত সেই অংশগুলো পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে অবশ হয়ে যায় এবং অন্যান্য লক্ষণ উপসর্গ দেখা দেয়।

হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকি মোটামুটি একইরকম। যেমনঃ অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, রক্তে বাড়তি কোলেস্টেরল, ধূমপান করা, মেদ-ভুঁড়ি, মদ্যপান, শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম না করা, পারিবারিক ইতিহাস ইত্যাদি। বয়স্ক পুরুষদের (বিশেষত যাদের বয়স ৫৫ বছরের ওপরে) তুলনামূলক বেশী স্ট্রোক হয়।

অনেকের মনে প্রশ্ন রয়েছে রোযার সময় বাড়তি স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে কি? রোযার সময় স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে কিনা,এ নিয়ে আগেও গবেষণা হয়েছে। কিন্তু সেসব গবেষণায় রমযান মাসে রোযা রাখার ফলে বেশী স্ট্রোক হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়নি। আজকাল স্ট্রোক হওয়ার হার বেড়েছে। সার্বিকভাবে স্ট্রোকের হওয়ার প্রবণতা বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি এ সম্পর্কে একটি নতুন বিস্তারিত পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। দেখার বিষয় ছিল রমজানের সঙ্গে অতিরিক্ত স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে কিনা?

ইসরাইলের সরকা ইউনিভার্সিটি মেডিক্যাল সেন্টারে ২০১২ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত যত স্ট্রোকের রোগী ভর্তি হয়েছে তাদের প্রত্যেকের বিস্তারিত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ওই সময়ে দক্ষিণ ইসরাইলের একটি আবহাওয়া কেন্দ্রে সংরক্ষিত দৈনিক তাপমাত্রা এবং আপেক্ষিক আর্দ্রতার হিসেব নেওয়া হয়েছে। ওই সময়ে উক্ত হাসপাতালে ৪৭২৭ জন স্ট্রোকের রোগী ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৫৬৪ জন ছিলেন আরব বেদুইন। এদের মধ্যে রমযান মাসে ৫১ জন আরব বেদুইনের স্ট্রোক হয়েছে। এই সংখ্যা অন্যান্য সময়ের চেয়ে এবং যারা রোযা রাখেননি তাদের চেয়ে দেড় থেকে দুইগুণ বেশী। অথচ স্ট্রোকের সকল রোগী একই রকম আবহাওয়ার তাপমাত্রা এবং আপেক্ষিক আর্দ্রতার মধ্যে অবস্থান করছিলেন।

গবেষকগণের সিদ্ধান্ত হচ্ছে আরব বেদুইন যারা রমযান মাসে রোযা রাখেন তাদের মধ্যে স্ট্রোক হওয়ার প্রবণতা এই সময়ে (বিশেষত প্রথম দুই সপ্তাহে) বেড়ে যায়। এই ফলাফল আরব বেদুইন ছাড়া দুনিয়ার অন্যদের জন্যও প্রযোজ্য কিনা, সেটা এখনও নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। তবে যাদের স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকি কিংবা ঝুঁকিসমূহ রয়েছে, রোযার আগে এবং রোযা থাকার সময় তাদের বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।

তথ্যসূত্রঃ
• Zimhony N, Abu-Salameh, Sagy I, Dizitzer Y et al. Increase in Ischemic Stroke Incident Hospitalizations Among Bedouin Arabs During Ramadan Month. J Am Heart Assoc. 2018 May 3;7(10). pii: e008018.
• Bener A, Hamad A, Fares A, Al-Sayed HM, Al-Suwaidi J. Is there any effect of Ramadan fasting on stroke incidence? Singapore Med J. 2006; 47(5):404-8.

 




সিয়াম এবং স্বাস্থ্যঃ কিডনির রোগীদের রোযা

অনুমান করা হয় পৃথিবীজুড়ে ১০% অর্থাৎ প্রায় ৭০ কোটি মানুষের ক্রনিক কিডনির সমস্যা রয়েছে। বিভিন্ন কারণে কিডনির রোগের প্রকোপ দিন দিন বেড়েই চলেছে। সুতরাং মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যেও একটি ব্যাপক সংখ্যক কিডনির রোগী রয়েছে এবং তাদের অনেকেই রোযা রাখতে আগ্রহী। কিন্তু কিডনির রোগীরা রোযা থাকলে কেমন সমস্যা হয় সে সম্পর্ক নির্ভরযোগ্য তথ্যের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। এ সম্পর্কে যে সীমিত গবেষণার ফলাফল পাওয়া যায় তাতে রোযা রাখলে কিডনির সমস্যা বেড়ে যায় বা ক্ষতি হয় এমন প্রমাণ কমই মিলেছে।

তারপরও অধিকাংশ গবেষক মনে করেন রোযা থাকাকালে দীর্ঘ সময় পানীয় গ্রহণে বিরত থাকা কিডনির রোগীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এবং পারতপক্ষে ক্রনিক কিডনি ডিজিজের রোগীদের রোযা রাখা থেকে বিরত থাকা ভালো । সুতরাং যাদের কিডনির ক্রনিক সমস্যা রয়েছে তাঁরা রোযা থাকার সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত এবং পুরো রমযানের সময় নিয়মিত কিডনির অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। যাদের কিডনির রোগের গুরুতর উপসর্গ রয়েছে কিংবা কিডনি বিকলতার লক্ষণ রয়েছে তাদের রোযা রাখা থেকে বিরত থাকা বিধেয়।

অনেকের মনেই প্রশ্ন রয়েছে রোযা রাখলে কিডনির পাথরের ব্যথা হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে কি ?
কোন কোন গবেষণার ফলাফলে দেখা গিয়েছে রমজানের সময় রেনাল কোলিক বা কিডনির ব্যথা নিয়ে তুলনামূলকভাবে বেশী রোগী হাসপাতালের জরুরী বিভাগে এসে থাকেন। কিন্তু অন্যান্য পর্যবেক্ষণে তেমন কোন প্রমাণ মেলেনি । রোযা থাকলে কিডনির পাথর হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে কিনা সে সম্পর্কেও নির্ভরযোগ্য তথ্য খুব কম। তাছাড়া এ পর্যন্ত পাওয়া রোযা সম্পর্কে অধিকাংশ গবেষণা শীতকালে পরিচালিত হয়েছে । এজন্য গ্রীষ্মকালের রোযা কেমন প্রভাব ফেলে সে সম্পর্ক মন্তব্য করা কঠিন। সম্প্রতি সৌদি আরবের কিং আব্দুল আজিজ মেডিক্যাল হাসপাতালের জরুরী বিভাগে আগত এমন ২৩৭ জন রোগীর ওপর ১০ বছরের পর্যবেক্ষণের ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে । দেখা যাচ্ছে গ্রীষ্মকালে রমজান মাসে রোযা থাকলে যাদের ইউরেটারে পাথর রয়েছে তাদের ব্যাথা নিয়ে হাসপাতালে আসার হার অন্যান্য সময়ের চেয়ে দ্বিগুণ বেশী। তবে কিডনির অন্যান্য পাথরের ক্ষেত্রে কোন পার্থক্য দেখা যায়নি। সুতরাং বলা যায় রোযা সাধারণত কিডনি পাথরের ক্ষেত্রে কোন ঝুঁকি বাড়ায় না। তবে গ্রীষ্মকালে রোযা থাকলে ইউরেটারের পাথরের কারণে ব্যথা হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়েছে এমন রোগীর ওপর রোযার প্রভাব নিয়ে অনেকগুলি গবেষণা হয়েছে। এতে দেখা যায়, সফল কিডনি প্রতিস্থাপনের পরে রোযা রাখা নিরাপদ। তবে তাদের অবশ্যই চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থেকে রোযার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণে থাকতে হবে ।

সকলেই একমত যে, যারা রোযা রাখবেন তাদের ইফতারী এবং সেহরির মধ্যবর্তী সময়ে যথেষ্ট পানীয় পান করতে হবে যেন ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ২ লিটার পরিমাণ প্রস্রাব নির্গত হয়। যথেষ্ট পানীয় পান করলে এবং প্রস্রাবের পরিমাণ ঠিক থাকলে কিডনির পাথরের কোন বাড়তি ঝুঁকি থাকে না। এছাড়া, কিডনির রোগীদের খাবারে প্রোটিনের পরিমাণ সীমিত রাখতে হবে; ভিটামিন সি, লবণ, পটাসিয়াম এবং অক্সালেটসমৃদ্ধ খাবার (যেমন- পালং শাক, রুবার্ব,আঙ্গুর, খেজুর, বীট, আলুর চিপস, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, বাদাম ইত্যাদি) কম গ্রহণ করতে হবে।

তথ্যসূত্রঃ
• Al Mahayni AO, Alkhateeb SS, Abusaq IH, Al Mufarrih AA, Jaafari MI, Bawazir AA. Does fasting in Ramadan increase the risk of developing urinary stones? Saudi Med J. 2018 May;39(5):481-486.
• Bragazzi NL. Ramadan fasting and chronic kidney disease: A systematic review. J Res Med Sci 2014;19:665-76.

 




সিয়াম এবং স্বাস্থ্যঃ হৃদবিকলতার রোগীদের রোযা

হার্ট ফেইলিউর বা হৃদবিকলতার রোগীরা রোযা থাকলে কি কোন সমস্যা হয়?

ক্রনিক হার্ট ফেইলিউরের রোগীদের ওপর রোযার প্রভাব সম্পর্কে আসলে তেমন কোন তথ্য নেই। সম্প্রতি সৌদি আরবে গবেষকগণ ক্রনিক হার্ট ফেইলিউরের রোগীদের ওপর একটি পর্যবেক্ষণ করেছেন। তাদের দেখার বিষয় ছিল যাদের ক্রনিক হার্ট ফেইলিউর বা হৃদ বিকলতা আছে, তারা রোযা থাকলে কি কোন সমস্যা হয়?

তারা ২০১৭ সালে একটি সৌদি হাসপাতালের কার্ডিয়াক সেন্টারে ২৪৯ জন হার্ট ফেইলিউরের রোগীর ওপরে এই পর্যবেক্ষণ করেন। তারা সকলেই রমযান মাসে রোযা রেখেছিলেন এবং হাসপাতালের বহির্বিভাগে দেখাতে এসেছিলেন।

ফলাফলে দেখা যায় ২৪৯ জনের মধ্যে ২২৭ জন (৯১%) সারা মাস রোযা রেখেছেন এবং তাদের মধ্যে ২০৯ জন (৯২%) কোন রকম সমস্যা অনুভব করেন নি কিংবা হার্ট ফেইলিউরের অবনতি হয়নি। তবে বাকী ১৮ জনের (৮%) শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ার কারণে তাদের রোযা ছেড়ে দিতে হয়েছে এবং বাড়তি চিকিৎসা গ্রহণ করতে হয়েছে। বিশ্লেষণে দেখা যায় অবনতিশীল হার্ট ফেইলিউরের রোগীরা আসলে অন্যদের চেয়ে ওষুধ এবং পথ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বেশী উদাসীন ছিলেন এবং তাদের হার্ট ফেইলিউরের প্রকৃতি ভিন্নরকম ছিল।

গবেষকদের সিদ্ধান্ত হচ্ছে, অধিকাংশ ক্রনিক হার্ট ফেইলিউরের রোগীর পক্ষে রোযা রাখা সম্ভব। যারা ওষুধ এবং পথ্য নিয়মিত ব্যবহারের ক্ষেত্রে উদাসীন, তারা রোযা রাখলে আরও অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন। অতএব কোন ক্রনিক হার্ট ফেইলিউরের রোগী রমযান মাসে রোযা রাখতে আগ্রহী হলে অবশ্যই তাকে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে পরামর্শ মোতাবেক চলতে হবে।

তথ্যসূত্রঃ Abazid RM, Khalaf HH, Sakr H et al. Effects of Ramadan fasting on the symptoms of chronic heart failure. Saudi Med J. 2018;39(4):395-400.

 




সিয়াম এবং স্বাস্থ্যঃ হৃদরোগীদের রোযা

অনেকেই প্রশ্ন করেন রোযা রাখলে যাদের হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ কিংবা রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশী আছে, তাদের কি কোন সমস্যা হয়? নাকি উপকার হয়?

সাম্প্রতিক নির্ভরযোগ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, যদি অন্য কোন ঝুঁকি উপাদান না থাকলে, শুধুমাত্র রোযা থাকার কারণে কারও সহসা হৃদরোগে (হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক কিংবা হার্ট ফেইলিউর ইত্যাদি) আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম। কিছু কিছু পর্যবেক্ষণে অন্য রকম ফলাফলও এসেছে।

যাদের উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আছে, তারা নির্বিঘ্নেই রোযা থাকতে পারেন। তবে ওষুধের সময় এবং মাত্রা পরিবর্তনের প্রয়োজন থাকলে রমযানের পূর্বেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। সাধারণত রমযানের সময় এমন ওষুধ সেবন করা উচিত যা দিনে একবার কিংবা দুইবার গ্রহণ করলেই চলে। উচ্চ রক্তচাপের জন্য যারা ডাইউরেটিক জাতীয় ওষুধ সেবন করছেন, তাদের এটা বদলে নেওয়া উত্তম। বিশেষত গ্রীষ্মকালের রোযার সময় ডাইউরেটিক জাতীয় ওষুধ শরীরে পানি ও লবণশূন্যতা সৃষ্টি করতে পারে। আর মনে রাখতে হবে যে উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের খাবারে কম লবণ এবং কম পরিমাণ চর্বি থাকা ভাল। যারা রক্ত তরল রাখার ওষুধ সেবন করেন ( যেমন- warfarin), রোযা রাখলে তাদের কোন সমস্যা হয় না। কিন্তু যাদের উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে নেই, যাদের হার্ট অ্যাটাক হয়েছে, অনিয়ন্ত্রিত হার্ট ফেইলিউর, কিংবা সদ্য হার্টের অপারেশন হয়েছে, তাদের রোযা পরিহার করা উত্তম। এজন্য সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলতে হবে।

কোলেস্টেরলের ওপর রোযার প্রভাব সম্পর্কে আসলে সুনির্দিষ্ট ফলাফল পাওয়া যায়নি। কিছু কিছু গবেষণায় দেখা যায় রোযা থাকার পরে টোটাল কোলেস্টেরল এবং এলডিএল কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমেছে। আবার অন্য কিছু পর্যবেক্ষণে তেমন কোন পরিবর্তন দেখা যায়নি। আসলে ইফতার এবং সেহরিতে কেমন খাদ্য গ্রহণ করা হচ্ছে, তার ওপরেও এটা অনেকাংশে নির্ভর করে। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষই ইফতার এবং সেহরির জন্য অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত, মিষ্টি এবং মশলাদার খাবার পছন্দ করে থাকেন। এধরণের খাবার আসলে স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী নয়। যাদের রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশী কিংবা সমস্যা রয়েছে, তাদের অবশ্যই কম চর্বিযুক্ত (কম সম্পৃক্ত চর্বি এবং ট্রান্স ফ্যাট) খাবার খেতে হবে। যারা রোযা শুরুর আগে থেকেই কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ সেবন করছেন, তাদের তা অব্যাহত রাখতে হবে। তবে রোযার সময় নতুন কোন কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ সেবন শুরু না করাই ভাল।
তথ্যসূত্রঃ Turin TC, Ahmed S, Shommu NS, Afzal AR, Al Mamun M, Qasqas M, et al. Ramadan fasting is not usually associated with the risk of cardiovascular events: A systematic review and meta-analysis. J Family Community Med 2016;23:73-81.

 




সিয়াম এবং স্বাস্থ্যঃ রোযার উপকারিতা

পবিত্র কুরআন শরীফে বলা হয়েছেঃ “হে মুমিনগণ, তোমাদের উপর সিয়াম বিধিবদ্ধ করা হয়েছে, যেমন করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।” -সূরা বাকারাহ; আয়াতঃ ১৮৩।

“সাওম” অর্থ বিরত থাকা। প্রবৃত্তিকে দমন করে তাকওয়ার গুণাবলী বিকাশের জন্য সাওমের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্রবৃত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। রোযার মাধ্যমে দৈহিক এবং আধ্যাত্মিক উন্নতি হয়। সমগ্র মাসব্যাপী সিয়াম সাধনা একজন মুসলমানকে সৃষ্টিকর্তার অধিকতর নৈকট্য অর্জন করতে সাহায্য করে; স্রস্টার নানাবিধ নিয়ামত সম্পর্কে কৃতজ্ঞতাবোধ জাগ্রত করে; গরীব-অসহায়দের সাহায্য-সহযোগিতা করতে উদ্বুদ্ধ করে এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের শিক্ষা দেয়।

অনেকে রমযান মাসকে জীবনাচরণ পরিবর্তন এবং পরিশুদ্ধ করার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেন। যেমন-যাদের ধূমপানের অভ্যাস রয়েছে তারা এই একমাসে ধূমপান ছেড়ে দেওয়ার অভ্যাস রপ্ত করার চেষ্টা করেন। অনেকে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস করার জন্য কিংবা শরীরের ওজন কমানোর কৌশল হিসেবে গ্রহণ করেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ইবাদত-বন্দেগীর মাধ্যমে সকলে রমযান মাসে আত্মিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতি অর্জনের চেষ্টা করেন এবং এর মাধ্যমে রোযা পালনকারী ব্যক্তি মানসিক তৃপ্তি এবং প্রশান্তি অর্জন করেন।

 




সিয়াম এবং স্বাস্থ্যঃ ডায়াবেটিসের রোগীদের রোযা

২০১৭ সালের একটি হিসেব অনুসারে পৃথিবীতে প্রায় ১৫ কোটি মুসলমান ডায়াবেটিসের রোগী রয়েছেন। অনুমান করা হয় রমযান মাসে এদের মধ্যে অন্তত ৫ কোটি রোগী রোযা থাকেন।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না থাকলে, তা গুরুতর জটিলতা সৃষ্টি করে। অধিকাংশ ইসলামী আলেম এবং চিকিৎসকগণ গুরুতর ডায়াবেটিসের রোগীদের রোযা করা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। কিন্তু ১৩ টি দেশের এক বিশাল সংখ্যক মুসলিম ডায়াবেটিক রোগীদের ওপর পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, শতকরা ৭৯ জনই এই পরামর্শ মানেননি এবং তারা রোযা রেখেছেন। এর থেকে খুব সহজেই বোঝা যায় রমযানের সময় ডায়াবেটিসের রোগীদের সম্পর্কে কেমন সচেতন থাকা প্রয়োজন।

আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিক ফেডারেশন (IDF) এবং ডায়াবেটিস ও রমযান আন্তর্জাতিক অ্যালায়েন্স (DAR) সম্মিলিতভাবে ২০১৭ সালে রোযার সময় ডায়াবেটিসে করণীয় সম্পর্কে একটি বিস্তারিত গাইডলাইন তৈরি করেছেন। এই গাইডলাইনে ডায়াবেটিসের রোগীদের তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়েছেঃ

১) অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ডায়াবেটিসের রোগীঃ এদের কোন অবস্থাতেই রোযা রাখা উচিত নয়।
২) ঝুঁকিপূর্ণ ডায়াবেটিসের রোগীঃ এদেরও রোযা না থাকাটাই নিরাপদ।
৩) মাঝারি থেকে কম ঝুঁকিপূর্ণ ডায়াবেটিসের রোগী যাদের গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ আছেঃ এরা রোযা রাখতে পারেন।

প্রথম দুই শ্রেণীর ডায়াবেটিসের রোগী রোযা রাখার জন্য অতি আগ্রহী হলে, তাদের অবশ্যই চিকিৎসকের নিবিড় পর্যবেক্ষণ থাকতে হবে। তাদের রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে গেলে (> ৩০০ মিঃগ্রাঃ/ ডেসি লিঃ ) কিংবা কমে গেলে (< ৭০মিঃগ্রাঃ/ ডেসি লিঃ ) অবিলম্বে রোযা ভেঙে খাদ্য গ্রহণ করতে হবে এবং চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। এ ধরণের রোগীদের হাইপো এবং হাইপারগ্লাইসিমিয়া সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকা জরুরী। প্রয়োজনে তাদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ কিংবা ক্লাসের আয়োজন করতে হবে।

তাদের ইফতার এবং সেহরিতে কিভাবে সঠিক পরিমাণে সুষম খাবার গ্রহণ করা যায় তা জানাতে হবে। অনেকে ইফতারের পরে অতিরিক্ত ক্যালরিযুক্ত খাবার গ্রহণ করে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা অনেক বাড়িয়ে ফেলেন যা কোনভাবেই কাম্য নয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে রোযার সময় ডায়াবেটিসের সঠিক ওষুধ, সঠিক মাত্রায় এবং সঠিক সময়ে গ্রহণ করা। এজন্য অবশ্যই অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা জরুরী।

 




সিয়াম এবং স্বাস্থ্যঃ শুরুর কথা

হিজরী পঞ্জিকার নবম মাস “রমযান”। “রমযান” শব্দের অর্থ “দহন”। দহন বলতে রোযা বা সিয়ামকে বোঝানো হয়েছে। কারণ উপবাস বা রোযার মাধ্যমে ব্যক্তির পার্থিব লোভ-লালসা দগ্ধ হয়। রমজান মাস মুসলমানদের অন্যতম পবিত্র মাস। এ মাসে পবিত্র কুরআন শরীফ নাযিল হয়েছে এবং মুসলমানগণ “সাওম” বা “রোযা” পালন করে থাকেন। রমযান মাসের রোযা ইসলাম ধর্মের পাঁচটি প্রধান স্তম্ভের একটি বা অবশ্য পালনীয়। হিজরী পঞ্জিকা একটি চন্দ্রনির্ভর বর্ষপঞ্জি। চান্দ্র বছর ৩৫৫ দিনে হওয়ার কারণে প্রতি বছর রমযান ১০ দিন পিছিয়ে যায়; ফলে পর্যায়ক্রমে রমযান মাস ষড়ঋতুর যে কোন ঋতুতে পড়তে পারে।

২০১৫ সালের হিসেব অনুসারে ইসলাম ধর্মানুসারী মানুষের সংখ্যা ১.৮ বিলিয়ন যা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ২৪% বা প্রায় চার ভাগের এক ভাগ। অনুমান করা হয় প্রতিবছর ১ বিলিয়ন বা ১০০ কোটি মুসলিম রমযান মাসে রোযা পালন করে থাকেন। এই মাসের ২৯ কিংবা ৩০ দিন তারা সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সকল প্রকার পানাহার, যৌনাচার এবং ভোগ-বিলাস থেকে বিরত থাকেন। দীর্ঘ একমাস সেহরি এবং ইফতারের খাবারের পরিবর্তিত তালিকা এবং ঘুমের সময় পরিবর্তন হওয়ার কারণে এই কোটি কোটি রোযাদারের দৈনন্দিন স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব পরে। শারীরিক অসমর্থতা কিংবা অসুস্থতার কারণে রোযা পালনে বিরত থাকার নির্দেশনা এবং সে অনুসারে কাযা ও কাফফারার বিধান রয়েছে।

কুরআন শরীফে বলা হয়েছেঃ “নির্দিষ্ট কয়েকটি দিন। তবে তোমাদের মধ্যে যে অসুস্থ হবে, কিংবা সফরে থাকবে, তাহলে অন্যান্য দিনে সংখ্যা পূরণ করে নেবে। আর যাদের জন্য তা কষ্টকর হবে, তাদের কর্তব্য ফিদইয়া-একজন দরিদ্রকে খাবার প্রদান করা। অতএব যে স্বেচ্ছায় অতিরিক্ত সৎকাজ করবে, তা তার জন্য কল্যাণকর হবে। আর সিয়াম পালন তোমাদের জন্য কল্যাণকর, যদি তোমরা জান।” -সূরা আল-বাকারাহ; আয়াতঃ ১৮৪।

কিন্তু অসুস্থতা সত্ত্বেও অনেক সময় ধর্মপ্রাণ অনেকে রোযা রাখতেই বেশী আগ্রহী হয়ে থাকেন। বলাবাহুল্য, ধর্মীয়, আত্মিক ও আধ্যাত্মিক বিশ্বাস মানুষের স্বাস্থ্যগত আচরণ এবং ওষুধ-পথ্য ব্যবহারের ওপরেও ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। ফলে রমযানের কারণে অনেক ক্রনিক রোগব্যাধির সমস্যা এবং জটিলতা বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। মনোদৈহিক স্বাস্থ্যের ওপর এই প্রভাব সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট রোগী এবং চিকিৎসক উভয়েরই সচেতন থাকা দরকারী। পৃথিবীতে অর্ধ শতাধিক দেশ মুসলিম প্রধান হলেও, বর্তমানে প্রায় সকল দেশেই কমবেশী মুসলমান জনগোষ্ঠীর অবস্থান রয়েছে। অসুস্থতার জন্য তারা যেকোন সময় যেকোন ধর্মাবলম্বী চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে পারেন; এজন্য চিকিৎসাশাস্ত্রে রমযানের সময় রোযা পালনের জন্য পরিবর্তিত স্বাস্থ্যগত সমস্যা ও ওষুধ-পথ্য সম্পর্কে সকল চিকিৎসকের ধারণা থাকা আবশ্যক মনে করা হয়। বিগত কয়েকবছরে বিভিন্ন রোগ-ব্যাধির ওপর রোযার প্রভাব এবং করণীয় নিয়ে বিভিন্নমুখী গবেষণা হয়েছে। গত এক বছরে প্রায় শ’খানেক নতুন গবেষণা এবং পর্যবেক্ষণের ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে।




এপিড্যুরাল – স্পাইনাল ব্লক

শহরে যে কোন গর্ভবতী মা রে যদি ‘এপিড্যুরাল’ শব্দটা কও তাইলে কেউ ভয় পাইবো আর কেউ কইবো আমার চাই! আর সবকিছুর মত এর পক্ষে আর বিপক্ষে মতবাদ আছে। আমার চেষ্টা দুই দিক আলোচনা কইরা মাম্মালোগের কাছে ব্যাপারটা খোলাশা করা।

*** সংবিধিবদ্ধ সতর্কবানীঃ আমি ডাক্তার না, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞ্যতা আর ইন্টারনেট আমার ভরসা, আমার উদ্দেশ্য সচেতনতা তৈরী করা। আউলা কিছু কইয়া থাকি তাইলে ডাক্তার মাম্মালোগ একটা ধমক দিয়া শুধরাইয়া দিও।***

সার্জারী (Surgery) বা অস্ত্রপোচার এর সাথে এ্যানেস্থেশিয়া (Anesthesia) ব্যাপারটা অংগাঅংগী ভাবে জড়িত। রোগী সল্য চিকিৎসার কষ্ট, ব্যথা সহ্য করার জন্য তার অংগ অবশ বা অনুভূতী শুন্য করা প্রয়োজন। এর জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করেন ডাক্তার মাম্মারা। এইটা একটা অতি গুরুত্বপূর্ন বিষয় যার জন্য এ্যানেস্থেলিওজিস্ট (Anesthesiologist) নামের এক বিশেষ প্রশিক্ষন প্রাপ্ত ডাক্তার মাম্মারা আছে যারা শুধু রোগী মাম্মালোগ রে অজ্ঞ্যান আর জ্ঞ্যানী (!) করেন।

এ্যানেস্থেসিয়া লোকাল, রিজিওনাল ও জেনারেল হইতে পারে। ছোটখাট, কম সময় লাগে এমন অপারেশনে সাধরনত লোকাল এ্যানেস্থেসিয়া (Anesthesia) বা অভিষ্ট জায়গায়ই শুধু অনুভূতিশুন্য করা হয়, (যেমন ফোঁড়া অপারেশন, দাঁতের চিকিৎসা) জেনারেল এ্যানেস্থেসিয়ায় সারা শরীরে প্রভাব পরে তুমি অজ্ঞ্যান হইয়া যাও, তাতে অন্য জটিলতা দেখা যাইতে পারে। আর রিজিওনাল এ্যানেস্থেশিয়া র বেলায় একটা বড় এলাকার অনুভুতি শুন্য করা হয় যেমন সিজারিয়ান অপারেশনের সময় স্পাইনাল ব্লক নামের একটা পদ্ধতি নেওয়া হয়। যাতে তুমি অজ্ঞ্যান হইবা না কিন্তু কোমড় থাইকা নিচের দিকে আর কোন ব্যথা থাকবে না কয়েক ঘন্টার জন্য। এই লেখার বিষয় স্পাইনাল ব্লক (Spinal Block) বা স্পাইনাল এপিড্যুরাল (Spinal Epidural).

প্রবচন আছে প্রতিটা শিশুর জন্মের সময় মায়েরও জন্ম হয়।
শিশু জন্ম নিতে গিয়া যে ঝুঁকি আর বিপদ সংকুল পথ পার হইয়া আসে তার সমান বিপদ বা তার চাইতে বেশী ঝুঁকিপূর্ন জন্মদানকারী মায়ের থাকে। প্রসব পূর্ব ব্যাথা থাইকা প্রসবকালীন পদ্ধতিতে জন্মদানকারী মা রে একটু আরাম দেওয়ার প্রচেষ্টায় কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয় আজকাল তার মধ্যে একটা স্পাইনাল ব্লক (Spinal Block) যা এপিড্যুরাল (Epidural) নামেই বেশী পরিচিত।

মানুষের শিরদাঁড়া বা স্পাইনাল কলাম (Spinal Column) অনেক গুলি হাড়ের এক্টা উপরে আরেকটা সাজানো, এইগুলিতে ডিস্ক (Disk) কয় কারন তা দেখতে চাকতির মত, এইগুলির মাঝখান দিয়া আমাগো শরীরের যোগাযোগ বা কমিউনিকেশন ব্যবস্থা সব গেছে, মগজ যা সিদ্ধান্ত দেয় সেইটা এই শিরদাড়ার মাঝের স্নায়ু দিয়া শরীরের বিভিন্ন জায়গায় যায় আর সেই অংগ কাজ করে, সেইটারে স্পাইনাল কর্ড (Spinal Cord) কয়, স্পাইনাল কর্ড থাকে সুবারাকনেইড স্পেসে (Subarachnoid Space), সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড (Cerebrospinal Fluid) দিয়া আবৃত, ডিস্কের ঠিক বাইরে জায়গাটারে এপিড্যুরাল স্পেস (Epidural Space) কয়, এইটাও এক ধরনের ফ্লুইড এ আবৃত থাকে, স্পাইনাল ব্লক এর সময় এই ডিস্কের ফাঁক দিয়া সুঁই ঢোকানো হয় এপিড্যুরাল স্পেসে নারকোটিক্স (Narcotics) , এ্যনেস্থেশিয়া (Anesthesia) সরবরাহের জন্য।

এইস্থানে এ্যানেস্থেসিয়া প্রয়োগের ফলে শরীরের নিম্নাগের অর্থাৎ তলপেট বা লোয়ার এ্যাবডোমিন, পেল্ভিস, এলাকায় ব্যাথা শুন্য কইরা অপারেশন করা যায়।

এই পদ্ধতিতে শিরদাড়ার নিচের দিকে সরাসরি শিরদাড়ার হাড়ের ফাকে ফেটানিল (Fetanyl) বুপিভ্যাক্সিন (Bupivaccine) অথার লিডোকেইন (Lidocaine) জাতীয় নারকোটিক্স অথবা এ্যনেস্থেটিক ইঞ্জেক্ট করা হয় তাতে আগামী দুই ঘন্টার জন্য তা বেদনা নাশক এর কাজ করে।

‘স্পাইনাল ব্লক’ আর ‘স্পাইনাল এপিড্যুরালে’ মিশায়া ফালায় অনেকেই, কারন দুইটার প্রয়োগ পদ্ধতি একই, দুই ক্ষেত্রেই তা শিরদাড়ার ডিস্ক বা হাড়ের ফাঁকে তরলে ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে দেওয়া হয়। স্পাইনাল ব্লক এর বেলায় সুঁই দিয়া একবার ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে নারকোটিক্স অথবা এ্যানেস্থেশিয়া প্রয়োগ করা হয়, আর স্পাইনাল এপিড্যুরালের ক্ষেত্রে ঐ স্থানে একটা ‘ক্যাথেটার’ (Catheter) স্থাপনা করা হয় আর তাতে অবিরাম বা যখন প্রয়োজন হয় তাতে এ্যানেস্থেসিয়া প্রয়োগ করা যায়। বার বার ইঞ্জেকশন করা লাগে না।

আজকাল স্পাইনাল ব্লকের চাইতে এপিড্যুরাল এই বেশী ব্যবহার হয় সিজারিয়ান অপারেশনের সময়, কিন্তু জটিল কোন অপারেশনের সময় স্পাইনাল ব্লক ব্যবহার করা হয়।

এপিড্যুরাল ব্লকঃ এই পদ্ধতিতে একটা ফাঁপা সুঁই এর মাধ্যমে নমনীয় সরু একটা ক্যাথেটার স্থাপন করা হয় মাঝ ও নিম্ন শিরদাড়ার মাঝা মাঝি জায়গায়, স্পাইনাল কর্ড এর আউটার মেম্ব্রেন ও স্পাইনাল কলাম এর মাঝে। প্রথমে সুঁই ঢোকানোর জায়গাটারে লোকাল এ্যনেস্থেশিয়া দিয়া অবশ কইরা নেওয়া হয় তার পরে ক্যাথেটার প্রবেশ করানো হয়। একবার স্থাপিত হইয়া গেলে সুঁই বাইর কইরা নেওয়া হয়, এখন স্থাপিত ক্যাথেটার দিয়া যখন প্রয়োজন সরাসরি এ্যানেস্থেসিয়া প্রয়োগ করা যাইব। ডাক্তার মাম্মারা ক্যাথেটারটা সিকিওর করে যাতে দরকার মত আরো অষুধ দেওয়া যায়।

স্পাইনাল ব্লকঃ অনেক্টা একই রকম তবে তাতে ক্যাথেটার স্থাপনা হয় না, ছোট সুঁই ব্যবহার হয়, তবে এই পদ্ধতিতে অষুধ স্পাইনাল কলামের ভিতরে সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইডের মধ্যে মিশাইয়া দেওয়া হয়। যেহেতু ক্যাথেটার ব্যবহার হ্য় না এই ইঞ্জেকশন প্রয়োজনানুসারে বারবার লাগতে পারে।

এককথায় দুইটার পার্থক্য হইল, স্পাইনাল ব্লকে লোকাল এ্যানেস্থেসিয়া সুবারাকনেইড স্পেসে (Subarachnoid Space) যেইখানে সেরেব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড (Cerebrospinal Fluid) আছে তাতে মিশাইয়া দেওয়া হয়, এই সেরেবোস্পাইনাল ফ্লুইড শরীরে বর্জ্য (Waste) আর নিউট্রিয়েন্টস (Nutrients) আনা নেওয়া করে, স্পাইনাল কর্ডের কুশন হিসাবে কাম করে। অল্প পরিমান লোকাল এ্যানেস্থেটিক লাগে কারন এইটা খুব সহজেই মিশা যায়, ছোট সুঁই ব্যবহার হয় পুরা প্রসেস শেষ করতে ৫ থাইকা বিশ মিনিট লাগে।

আর স্পাইনাল এপিড্যুরাল ব্লকে রোগীরে শুইতে হয়, ক্যাথেটার স্থাপনের স্থান পরিস্কার করতে হয় বেশী লোকাল এ্যানেস্থেশিয়া লাগে কারন টিশ্যুর মাধ্যমে ছড়াইতে সময় লাগে বেশী, শিরাতেও ফ্লুইড দেওয়া লাগে। ক্যাথেটার প্রবিষ্ট করানো লাগে, পুরা প্রসেসে ১০ থাইকা ২৫মিনিট লাইগা যাইতে পারে।

স্পাইনাল ব্লক ছোট খাট, কম সময় লাগে এমন আর এপিড্যুরাল লম্বা সময় লাগে এমন সল্য চিকিৎসায় ব্যবহার হয়। স্পাইনাল ব্লকে এ্যাকশন দ্রুত আর কড়া হয় এপিড্যুরালে এ্যকশন শুরু হইতে ২০-২৫মিনিট লাগতে পারে। এপিড্যুরালে অনুভুতি থাকতে পারে কিন্তু ব্যাথা থাকে না। ক্যাথেটার লাগানো থাকায় প্রয়োজনানুসারে আরো অষুধ প্রয়োগ আর পোস্ট অপারেটিভ বা অপারেশনের পরে যদি বেদনা নাশক প্রয়োগ দরকার পরে তা সহজ হয়।

স্পাইনাল ব্লক তলপেট, পা এর অস্ত্রপোচারে আর স্পাইনাল এপিড্যুরাল গর্ভবতী মায়েদের চিকিৎসা ও ‘সি সেকশন’ বা ‘সিজাররিয়ান অপারেশন’এ ব্যবহার হয়।

যদিও সমস্যা এড়ানোর সর্বাত্মক চেষ্টা নেওয়া হয় তবুও সমস্যা দেখা যাইতে পারে, স্পাইনাল ব্লক নিলে ‘হাইপোটেনশন’ (Hypotension) বা নিম্ন রক্তচাপ হইতে পারে।

লেবার বা বাচ্চা প্রসব কালীন দ্বিতীয় স্টেজে ‘পুসিং’ দুর্বল হইতে পারে।

প্রচন্ড মাথা ব্যাথা হইতে পারে যার জন্য ‘এপিড্যুরাল ব্লাড প্যাচ’ লাগতে পারে।

‘ডিযিনেস’ (Dizziness) বা মাথা ঘোরানো লাগতে পারে।

‘প্রুরিটাস’ (Pruritus) বা চুলকানী হইতে পারে শরীরে।

যদিও কম চান্স কিন্তু খিঁচুনী (Convulsions) হইতে পারে।

নারোক্টিক্স আর “কেইন” নামীয় অষুধ ‘প্ল্যাসেন্টা’র স্তর ভেদ কইরা তাতে স্থিত শিশুর রক্তে মিশা যাইতে পারে।

শিশু জন্মের পরে বুকের দুধ পানে সমস্যা হইতে পারে।

পিঠে ব্যাথা হইতে পারে। এই অভিযোগটাই বেশী শোনা যায়, এইটা হয় যদি সুঁই ঢোকানোর সময় স্পাইনাল নার্ভ এ খোঁচা লাগে আর তাতে নার্ভ ফাইবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়াও খুব রেয়ার কিন্তু এইটা থাইকা ‘ইনফেকশন’ ও ‘সিইজার’ হইতে পারে।

এপিড্যুরালের বেলায় নিরাপদ ধরা হয় তবে এ্যানেস্থেশিয়া বিষয়ক জটিলতা দেখা দিতে পারে। যদি ক্যাথেটারের অগ্রভাগ কোন ব্লাড ভেসেল বা রক্তনালী ছিদ্র কইরা দেয় তাইলে এ্যানেস্থেটিক হৃদপিন্ডে যাইব, তাতে হৃদস্পন্দন বা হার্টবীটের সমস্যা থাইকা সিইজার হইতে পারে। মাথাব্যাথা হইতে পারে।

এপিড্যুরাল ব্লক এ সুবিধা বেশী, বারবার সুঁই এর খোঁচা খাওয়া লাগে না, ক্যাথেটার থাকায় দরকার হইলেই আবার এ্যানেস্থেটিক দেওয়া যায়, যদিও কন্ট্রাকশন অনুভব করবা কিন্তু ব্যাথা থাকে না, রক্তচাপ কমায়।

অসুবিধার মধ্যে প্রসেস্টা লম্বা ক্যাথেটার স্থাপনে ২০ মিনিট আর এ্যনেস্থেশিয়া র কাম শুরু করতে ২০মিনিট লাগে। প্রতি আটজন গর্ভবতী মায়ের মধ্যে ১ জনের আরেকটা পদ্ধতি লাগে, কাঁপুনী, জ্বর, চুলকানী হইতে পারে। যেহেতু কোমড় থাইকা নিচ পর্যন্ত লম্বা সময়ের জন্য অনুভুতি শুন্য বা অবশ কইরা দেয়, তাই দাঁড়াইতে বা হাটতে পারবা না অনেকটা সময়, বাথরুমে যাইতেও সাহায্য লাগবো, বাচ্চা নির্গমনের জন্য তলপেটে যে চাপ দেওয়া লাগে সেইটা দেওয়া কঠিন হইব, বাচ্চারে দুনিয়ায় আনতে ডাক্তার মাম্মার সাহায্য লাগবো (ফরসেপ যা আরো সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে সেইটা আরেক কাহিনী)।

স্পাইনাল ব্লকে সুবিধা – সম্পূর্ন ব্যাথা মুক্ত কয়েক মিনিটের জন্য, দ্রুত প্রয়োগ করা যায়, অল্প পরিমান এ্যানেস্থেশিয়া শরীরে যায়।

অসুবিধা – প্রসিডিউরের সময় একটা অস্বস্তিকর পজিশনে থাকা লাগে, শিশুর অবস্থান আর শিরার ফ্লুইডের নিবিড় পর্যবেক্ষন করা লাগে, এপিড্যুরালের মত এইটাতেও চুলকানী, বাচ্চা নির্গমনের জন্য তলপেটে যে চাপ প্রয়োগ কতে মায়েরা তা না করতে পারা বা দূর্বল ভাবে দেওয়া, ফলে বাচ্চার ভুমিষ্ট হইতে দেরী লাগা, ফরসেপ বা বড় চিমটার ব্যবহার লাগতে পারে। ইঞ্জেকশনের জায়গায় কয়েকদিন ফোলা আর চুলকানী থাকতে পারে।

ঝুঁকি সব কিছুতেই আছে, সেইটারে মিনিমাইজ করার জন্যই ডাক্তার মাম্মারা নিরন্তর চেষ্টা কইরা যাইতাছে। আমার লেখার উদ্দেশ্য যখন তুমি এই প্রসেসে যদি যাও তাইলে জাইনা যাও এইটা আসলে কি!

নিরাপদ থাক আমার সব মাম্মালোগ!

সূত্রঃ ডাঃ নাজমা রশীদ




অসময়ে তাজিনের চলে যাওয়া এবং আমাদের জন্য কিছু সতর্ক বার্তা

১।চলে গেলেন তাজিন। রংধনুর দেশে, অসীমে চলে গেলে আর কেউ কোনদিন ফেরে না। তিনিও ফিরবেন না। রেখে গেছেন পরিবারের সদস্য,সহকর্মী, অসংখ্য ভক্ত। তাজিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতায় মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেছিলেন।মিডিয়া পাড়ায় উচ্চশিক্ষিত হিসেবে তিনি নন্দিত ছিলেন।

২।তিনি দীর্ঘদিন অ্যাজমা রোগে ভুগছিলেন। হঠাৎ করে শ্বাসকষ্ট তীব্র আকার ধারণ করলে উত্তরাস্থ রিজেন্ট হাসপাতালে তাকে নেয়া হয়। সেখানে তাকে লাইফ সাপোর্ট – এ রাখা হয়। ‘ রেসপিরেটরী ফেইলিউর ‘ হয় তাজিনের, তারপর কার্ডিয়াক এরেষ্ট। সবশেষে চিকিৎসক কর্তৃক মৃত ঘোষণা।

৩।তাজিন জন্মেছিলেন ১৯৭৫ সালে। মৃত্যু কালে তার বয়স হয়েছিল মাত্র ৪২ বছর। মৃত্য মানুষের অনিবার্য পরিণতি। কিন্তু, সেই মৃত্যু হোক স্বাভাবিক, পরিণত বয়েসে। তাই এই মৃত্যুকে মেনে নেয়া কঠিন।আপাতভাবে অ্যাজমা প্রধানত একটি জেনেটিক রোগ।এই রোগ একবার হলে সাধারণত কোনদিনই পুরোপুরিভাবে ভাল হয় না। নিয়মিত ওষুধ সেবন,ধুলাবালি থেকে দূরে থাকা, এলার্জি জাতীয় খাবার গ্রহণ না করা ,ধূমপান না করা, উত্তেজনা পরিহার করা,নিয়ন্ত্রিত জীবন- যাপন করা, চিকিৎসকের কাছে নিয়মিত ফলোআপ অ্যাজমাকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।নিছক অ্যাজমার কারণে মৃত্যু যে কড়া নাড়বে না সেটি অন্তত প্রত্যাশা করা যাবে।
৪। নাটক,উপস্থাপনা,নানা শৈল্পিক গুণাবলীর সুবাদে তাজিন সাধরণ মানুষের কাছে ব্যাপক পরিচিত ছিলেন।ছিলেন ‘ নক্ষত্র ‘। উঁচু স্থান অর্জন করা যেমন কঠিন, রক্ষা করা আরো কঠিন। সেজন্য প্রায় যে কোন পেশার পদস্থজনদের ‘ অস্থিরতা আর অনিশ্চয়তায়’ থাকতে হয়ে। মানসিক চাপ অ্যাজমাসহ ক্রনিক যে কোন রোগ যেমন উচ্চ রক্তচাপ,ডায়াবেটিসকে বাড়াতে পারে। তাই মানসিক চাপ পরিহার করা, ‘ বায়োলজিক্যাল ক্লক ‘ মেনে চলা এই ধরণের অসুখ নিয়ন্ত্রণ করতে সহায়তা করে।

৫।তাজিনের বয়স চল্লিশ ছুঁয়েছিল। এই সময় দেহের ভিতরে অনেক অসুখের বীজ বাসা বাঁধতে পারে।এইসব অনেক রোগেরই লক্ষণ প্রকাশিত হয় না, অথবা যখন প্রকাশিত হয় তখন রোগটি জটিল আকার ধারণ করে প্রায় অনিরাময় যোগ্য হয়ে পরে। তাই,বছরে অন্তত দুবার এবং ক্ষেত্রবিশেষে তার চেয়ে বেশী ‘ thoroughly checkup ‘ করা উচিত।দেখে নিন আপনার উচ্চরক্ত চাপ,ডায়াবেটিস আছে কি না। লিভার ফাংশান টেষ্ট করে জেনে নিন লিভার যথাযথ আছে কি না, ইউরিয়া – ক্রিয়াটিনিন পরীক্ষার মাধ্যমে ‘ কিডনি’র অবস্থান জেনে নিন।

৬। হাই কোলেস্টেরল এই সময় কালে আরেক নীরব ঘাতকের নাম।রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা জেনে নিন। ভাল-মন্দ বিভিন্ন ধরণের কোলেস্টেরল আছে। সেগুলির প্রোফাইল,রেশিও জানা ভাল। এই ক্ষেত্রে খাদ্যাভ্যাস বিশেষ গুরুত্ববহ। ‘ রেডমিট’ কমিয়ে শাকসব্জি খাদ্য তালিকায় রাখুন।ফাষ্ট ফুডকে না বলুন।ভাত, শর্করাজাতীয় খাদ্য কমিয়ে ফল,দুধ,ডিম রাখুন। সোডা জাতীয় পানীয় পরিহার করে প্রচুর পানি পান করুন। দিনে অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটুন।শুধু ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখলেই অনেক অসুখকে’ না’ বলা যাবে বা নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে। পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুম শরীর ও মনকে চাঙ্গা করে প্রফুল্ল রাখবে ।

৭।পুরুষ হলে প্রষ্টেট গ্ল্যান্ড পরীক্ষা করিয়ে নিন, স্ত্রী হলে স্তন বা জরায়ুতে ক্যান্সার যে বাসা বাঁধে নাই সেটি নিশ্চিত হন।বুকে ব্যথা, ধরফর করলে চিকিৎসকের স্মরণাপন্ন হোন।মনে রাখা দরকার ‘A stitch in time ,saves nine’ তাই মরণঘাতি কোন রোগও প্রাথমিক অবস্থায় নির্ণয় করে সুচিকিৎসার মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে রোগীকে বাঁচান সম্ভব হতে পারে । শুধু বাংলাদেশ নয় সারা বিশ্বে .আধুনিক মানুষের যুগ যন্ত্রণা অনেক বেশী।খোদ আমেরিকায় মানসিক রোগীর সংখ্যা আশংকাজনক হারে বাড়ছে । তাই স্ট্রেস বা হতাশা নিয়ন্ত্রণের বাহিরে গেলে সেটি লজ্জায় লুকিয়ে না রেখে মানসিক রোগের চিকিৎসককের স্মরণাপন্ন হোন । মাদক,এলকোহল, বিড়ি সিগারেটের আরেক নাম ইচ্ছা মৃত্যু।

৮। টিন এজ – আমাদের সন্তানদের মন-দৈহিক অনেক পরিবর্তন আনে ।কেউ বা আপাতভাবে উদ্ধত আচরণ করে কেউ বা অন্তর্মুখী হয়ে পড়তে পারে । স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ বলে ছিলেন ‘বার তের বছরের মত বালাই আর নাই ‘ । শৈশবের শিশুদের সাথেও টিন এজাররা আর আগের মত সবাছন্দ্যেও থাকতে যেমন পারে না ,তেমনি প্রাপ্ত বয়স্কদের সাথে সমানভাবে মিশতে পারে না । তাদের উদ্ধত আচরণকে ‘ আমার সন্তান উচ্ছনে গেছে ‘ এমনটি না ভেবে সংবেদনশীলতা, বুদ্ধিমত্তা আর ‘Good parenting’ এর মাধ্যমে সমাধান করুন । পরীক্ষার ফল খারাপ হলে ‘অমুকের ছেলে পেরেছে ,তুই কেন পারবি না ‘ এমন কথা তাদের ভিতরে হীনমন্যতা দেখা দিতে পারে ।এমন কি আত্মহননের উদাহরণও আমাদের জানা আছে ।

৯। নারীদের ৪০- ৪৫ বয়সে ‘পিরিয়ড ‘ ক্রমশই কমতে কমতে বন্ধ হয়ে যায় ।বিষয়টিকে মেনোপোজ বলা হয় । এটি সম্পূর্ণই প্রকৃতি প্রদত্ত সবাভাবিক প্রক্রিয়া মাত্র ।তাই এটিকে এক বিন্দুও ভয় না পেয়ে ‘সবাভাবিক’ ভাবেই দেখা উচিত । এই সময় হরমোনের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে । তার প্রভাবে হট ফ্ল্যাশসহ আচরণে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে । খোদ ইন্দিরা গান্ধীর মত বিনয়ী কিংবদন্তীর নেত্রীর দল সত্তর দশকে অপ্রত্যাশিতভাবে হেরে যায় ।এই সময় তাঁর বয়স ছিল ৪৫ ।তাঁর আসাধারণ মার্জিত আচরণের পরিবর্তে আকস্মিকভাবে দৃশ্যমান বদালানো ঝগড়াটে আচরণ ভোটারদের মনঃকষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায় । এই বয়েসে বধু-মাতা -কন্যাকেও বাস্তবমুখী ইতিবাচক প্রেষণায় উৎফুল্ল রাখবার চেষ্টা করা উচিৎ ।

১০।’Prevention is better than cure’ তাই রোগাক্রান্ত হওয়ার চেয়ে প্রতিরোধে সচেষ্ট হোন। মাত্র চল্লিশ বছরে তাজিনের চলে যাওয়া আমাদের শরীর স্বাস্থ্য ঠিক রাখবার জন্য আরেকবার সতর্ক বার্তা দিয়ে গেল।

মেজর ডা. খোশরোজ সামাদ ,
উপ অধিনায়ক আর্মড ফোর্সেস ফুড এন্ড ড্রাগস্ ল্যাবরটরী




ঢাকায় সুপারবাগ মহামারি আতংক!

রাজধানী ঢাকার নর্দমায় কার্বাপেনেম, কলিস্টিন রেজিস্ট্যান্ট ই. কোলাই (সুপারবাগ) পাওয়া যাচ্ছে। মেডিকেল জার্নাল ওয়েবসাইট পাবমেড এ তথ্য প্রকাশ করেছে।

অন্য সবাই সেভাবে লক্ষ্য না করলেও আমরা ডাক্তাররা গত কয়েক বছর থেকেই সি.আর.ই পজিটিভ রোগীদের উপস্থিতি বেশ আতংকের সঙ্গে দেখছি।

বাংলাদেশে গবেষণামূলক জরিপ তেমন হয় না। আমার ধারণা, ঠিকভাবে গবেষণা করলে দেখা যাবে দেশের প্রায় সব আইসিইউ, এইচডিইউতেই সি.আর.ই গিজগিজ করছে। কারণ, অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার।

আমেরিকাতে কয়েক বছর আগে একটা সি.আর.ই কেস পাওয়া গেল। ইন্ডিয়া থেকে যাওয়া একজন রোগীর শরীরে। সেটা নিয়ে জাতীয়ভাবে শোরগোল হয়েছিল- সব ধ্বংস হয়ে যাবে! সুপারবাগ এসে গেছে! মহামারি থেকে রক্ষা নাই! ইত্যাদি।

আর আমাদের এখানে যে ড্রেনের পানিতেও সুপারবাগ চলে এসেছে তার বেলায়। হয়তো হাসপাতালগুলোর বর্জ্য থেকেই এর উৎপত্তি।

সুপারবাগ নিয়ে ভয় পাওয়ার কারণ হল- এগুলো দিয়ে ইনফেকশান হলে চিকিৎসা করা খুব কঠিন। হয়তো আপনার ফুসফুসে বা প্রস্রাবে এরকম ইনফেকশান হল। প্রচলিত কোন অ্যান্টিবায়োটিকে আর কাজ হবে না।

মধ্যযুগে ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশান হলে যেভাবে চিকিৎসা ছাড়াই মরতে হত, সেভাবে মরবেন। একসময় গ্রামকে গ্রাম যেভাবে এক মহামারিতে উজাড় হত, সেরকম দিন ফেরত আসতে যাচ্ছে কিনা সেটাই ভাবছিলাম।

এরকম বিপদের সময় পুরো দুনিয়ার কথা ভাবার সুযোগ থাকে না। নিজের কথা আগে ভাবতে হয়। ভয় লাগছে আমার বা আমার পরিবারের কারো সুপারবাগ ইনফেকশান হলে কী করব?

আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু কিছুদিন আগেই তার এক অতি স্বজনকে হারিয়েছে সম্ভবত এই সুপারবাগ ইনফেকশনে। তাদের গোষ্ঠীসোদ্ধো ডাক্তার। কিছু করতে পারেনি।

আমরা কেউই কিছু করতে পারবো না। বৃদ্ধ মা-বাবা, কোলের শিশু চোখের সামনে দিয়ে চলে যাবে।

রাস্তার পাশের ভাতের হোটেলগুলো সব ড্রেনের ওপরে। সেখানেই ধোয়াধুয়ি চলে। শ্রমজীবী মানুষ সেখানে খায়। দেখলেই ভয় লাগে, সুপারবাগ মহামারি কি অতি সন্নিকটে?

লেখক: ডা. কায়সার আনাম, মেডিকেল অফিসার, ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব ক্যান্সার রিসার্স অ্যান্ড হসপিটাল।

সূত্র- যুগান্তর




ফুটপাথে খোলা খাবার

এই রমজানে ইফতারীর নামে রাস্তায় ফুটপাথে খোলা খাবার খাবেন না,কিনবেনও না।সারাদিন অভুক্ত থেকে কাবাব এবং কোল্ড ড্রিংস আপনার দেহে আরো পানি স্বল্পতার সৃষ্টি করে আপনার কিডনিতে পাথর তৈরি করবে,কিডনিকে বিকলও করে দিতে পারে।
তাই ইফতারে মাংসের কাবাব এবং ভাজা পোড়া ও ড্রিংস বাদ দিন।
সহজ পাচ্য ও তরল খাবার খান।দেশীয় ফলমূল খান
যেগুলি কম দাম।কারন,সেগুলিতে ব্যাবসায়ীরা রসায়ন মেশান না।যেমন ডাবের পানি, বেলের শরবত, তালের শাস, জামরুল,সফেদা,কাচা আমের জুস।অথবা বাড়িতে দই বসিয়ে তা দিয়ে লস্যি বানিয়ে খেতে পারেন ইফতারে।চমৎকার স্বাদে ও স্বাস্থেয়।
এই উপদেশ গুলি পবিত্র রমজানের ক্যালেন্ডারে লিখে
মসজিদে মসজিদে বিলিয়েছে “আকু”(এডভান্সড সেন্টার অফ কিডনি এন্ড ইউরোলজি)৪/ক, শ্যামলী রিং রোড।
তাই “আকু”কে একটা ধন্যবাদ দেয়া যেতেই পারে।
তবে এখানেই শেষ নয়।আপনারাও সচেতনতা সৃষ্টিতে এগিয়ে আসুন।
ব্যাবসায়িক মুনাফা নয়, ইফতার কে ধর্মময় ও স্বাস্থ্যময় করে তুলুন।