তেজপাতার লোকায়তিক ব্যবহার

তেজপাতা ব্যবহার করতে গেলে প্রথমেই মনে রাখতে হবে-এই পত্রের ক্বাথ, শীত কষায় ( ঠাণ্ডা জলে ভিজিয়ে রেখে পরের দিন খাওয়া), ফাণ্ট (গরম জলে ভিজিয়ে রেখে পরে খাওয়া) যে রুপেই ব্যবহার করা যাক না কেন, এটার উপযোগিতা আছে প্রধান ভাবে রক্তবহ স্রোতবিকারজনিত রোগে, তবে রসবহ স্রোতে যে এই পত্রের কোন উপযোগীতা নেই তা নয়, অবশ্য সেটা সীমায়িত ক্ষেত্রে।

১। তৃষ্ণা রোগে

পিপাসা যে একটা রোগ হতে পারে, সেটা আমাদের ধারণা নেই। এটা কিন্তু যে দ্রব্যে রক্তবহ স্রোতে বিকার হবে-সেটা খেলেই পিপাসা আসবে; তবে লক্ষ্য করা যায়-কোন লবনাক্ত দ্রব্য বেশি খেলে কিছু হয় না, কিন্তু মিষ্টদ্রব্য একটু বেশি খেলেই সেটা হয়, যেহেতু এটি পার্থিব গুনপ্রধান আর লবণও যে মৌল রস এবং সেটা খার দ্রব্য নয় এটা প্রসঙ্গতঃ  ষড় রসের পংক্তিভুক্ত মাত্র, তবে অগ্নি গুনে প্রধান এটা নিঃসন্দেহ। তাই ওই ক্ষার দ্রব্যের সহযোগে লেখন কাজই হয়, শোষণ হয় না। এদের বিশেষ লক্ষন থাকে-হয় অর্শ, না হয় কোন জায়গায় হঠাৎ লাল হয়ে যেন রক্ত জমে গিয়েছে, আবার একটু একটু ব্যথারও অনুভব হয়, আবার কয়েকদিন বাদে একটু কালচে হয়ে পরে মিলিয়ে যায়।

এক্ষেত্রে ৫ গ্রাম তেজপাতা এক লিটার জলে সিদ্ধ করে আধ লিটার থাকতে নামিয়ে, সেটা ছেকে, পিপাসা লাগলে অথবা না লাগলেও দুই-তিন বাড়ে ঐ জলটা খেতে হবে।এর দ্বারা ঐ তৃষ্ণা রোগটা উপশমিত হবে।

২। চুলকুনিতে:

এটা রক্তবহস্রোতের বিকারে হয় কিন্তু রক্তবিকারে হয় না, যেমন ভাল ছেলে সতসর্গদোষে পড়েই অমনতর। কিন্তু সে নিজেই খারাপ হয়নি, এই পরিবেশটা বদলাতে সে ভাল হবে।

এই ক্ষেত্রে ৫ গ্রাম তেজপাতা কুচিয়ে, একটু থেতো করে ৫/৬ কাপ জলে সিদ্ধ করার পর আন্দাজ দুই কাপ থাকতে নামিয়ে, ছেকে প্রত্যহ সেটা ২/৩ বাড়ে খেতে হবে। এই রকম কয়েকদিন খেলে রক্তবহ স্রোতের বিকার নষ্ট হবে।

৩। লাবন্য-হানিতে:

খাওয়া দাওয়াও খারাপ নয় অথচ দিনে দিনে দেহের রং তামাটে হয়ে যাচ্ছে-যেন একটা কালো ছোপ পড়ে গেছে, যেন পোড়া-কড়ি। এর মূল কারন কিন্তু রক্তবহ স্রোতের বিকৃতি।

সেক্ষেত্রে ৫/৬ গ্রাম তেজপাতা কুচিয়ে, থেতো করে আন্দাজ দুই কাপ গরম জলে ১০/১২ ঘণ্টা ভিজিয়ে রেখে, সেটাকে ছেকে দুইবারে খেতে হবে। এই রকম অন্ততঃ ২ সপ্তাহ খাওয়া দরকার। শুধু তাই নয়, নিত্য ভোজ্য ব্যাঞ্জনাদিতেও তেজপাতা বাটা একটু করে দিতে হবে। এর দ্বারা লাবন্য ফিরে আসবে।

৪। রক্তমূত্রে

প্রসাব রক্তবহ থাকলেও সেটা রক্ত নয়- ওটা বিদগ্ধ পিত্ত, এই পিত্তের রং কিন্তু হলদে, তাহলে কি হবে-আমাদের মূত্র ক্ষারধর্মী এর ক্ষারধ্ররমীত্ত ঐ হলদে বিগদ্ধ পিত্তের সঙ্গে মিশলে রাসায়নিক পরিবর্তন হয়ে রক্তবর্নে রূপান্তরিত হয়-যেমন হয় চূন হলুদে মিশে। এই বিদগ্ধ পিত্তের উদ্ভব হয় অজীর্ণ দোষে, রাত্রি জাগরণে, রুক্ষ আহারে ও বিহারে, অত্যধিক ভ্রমনে ও স্ত্রী সহবাসে। বায়ূ রুক্ষ হয়ে পিত্তটা উদ্রিক্ত হয়ে এই রকম লাল রঙের প্রসাব হতে পারে।

এক্ষেত্রে ৫/৭ গ্রাম তেজপাতা থেতো করে ২ বা ৩ কাপ গরম জলে ঘণ্টা দুই ভিজিয়ে রেখে, সেটা ছেকে নিয়ে ২/৩ দিনে নিশ্চয়ই চলে যাবে।

৫। তন্দ্রা রোগে:

প্রচলিত ভাষায় একে বলে “ঢুলুনি” এটাও একটা রোগ। এটাকে উপেক্ষা করা উচিত নয়, আর এ রোগ যেকোন বয়সেই আসতে পারে। মেদোবহ স্রোত বিকারগ্রস্ত হলে এই রোগের সৃষ্টি হয়। এদের একটা বিশেষ লক্ষন থাকে- পায়ের ডিম ( জানুর নিচে পিছনের মাংস পেশী) দুটোর ব্যথা, তার হাত পা টেপানোটা বেশী পছন্দ করেন।

এর প্রতিকারের জন্য ৫/৭ গ্রাম করে তেজপাতা ৩/৪ কাপ জলে সিদ্ধ করে এক কাপ থাকতে নামিয়ে, ছেকে বেশ কিছুদিন খেতে হয়। এর দ্বারা পক্ষকালের মধ্যে উপকার পাওয়া যায়।

বাহ্য প্রয়োগ

৬। চোখ ওঠায়:

দুখানা তেজপাতা গরম জলে ধুয়ে নিয়ে তাকে একটু থেতো করে সিকি কাপ গরম জলে কয়েক ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখতে হবে, তারপর পরিষ্কার ন্যাকড়ায় সেটা ছেকে নিয়ে সেই জল চোখে দিতে হবে।

এই রকম সকালে ও বিকালে দুবার দিলে চোখ লাল হওয়া, করকর করা, পিচুটিপড়া, জুড়ে যাওয়া এগুলি সেরে যাবে। অবশ্য ২/৩ দিন দিতে হবে।

৭। মাড়ির ক্ষতে

এই ক্ষত কিন্তু রক্তবহ স্রোত বিকার হলে তবেই হয়, সেই ক্ষেত্রে তেজপাতা চূর্ণ দিয়ে দাত মাজলে এই ক্ষত সেরে যায়।

৮। অরুচিতে:

কয়েকখানা তেজপাতা জলে সিদ্ধ করে, ছেকে সেই জলে কুলি করলে অরুচি সেরে যায়।

৯। গাত্র-দৌর্গন্ধে:

তেজপাতা চন্দনের মত করে বেটে সেইটা গায়ে মাখলে গায়ের দুর্গন্ধ হওয়া বন্ধ হয়ে যায়।

১০। অত্যধিক ঘামে:

যাঁদের বেশি ঘাম হয়-তারা প্রত্যহ একবার করে তেজপাতা বাটা মেখে আধ ঘণ্টা থাকার পর স্নান করে ফেলবেন। এর দ্বারা অত্যধিক ঘাম হওয়াটা কমে যাবে।




ডাক্তারকে গালি দেবার আগে ‘একটু ভাবুন’

রক্ত আর পানির মধ্যে এখন আর কোন পার্থক্যই চোখে পড়ে না, শুধুমাত্র রঙ ছাড়া!

মেডিকেল কলেজের প্রথম দিকে ফিজিওলোজি প্রাক্টিক্যাল ক্লাসে আঙ্গুল ফুটো করে রক্ত নেওয়া দেখে মাথা ঘুরে প্রতিবছরই কেউ না কেউ পড়ে যায়! এটা বাংলাদেশের বেশিরভাগ মেডিকেল কলেজেই হয়। আর ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের মধ্যেই এই পড়ে যাওয়ার হার বেশি।

সেই মেয়েটিই যখন ৫ বছর এমবিবিএস/বিডিএস পড়ে ডাক্তার হয়, রক্তকে আর রক্ত মনেই হয় না তার কাছে। পানির মত সহজ বস্তু হয়ে যায় তখন রক্ত।

শুধু কি রক্ত? মানব শরীরের কোন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গই তখন আর আলাদা কোন অনুভূতি সৃষ্টি করে না। সবকিছুই জড়বস্তুর মত মনে হয়।

প্রথম বর্ষের এনাটমি ক্লাসের মৃতদেহ, মৃতদেহের বিভিন্ন অংশ যেমন হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস, যকৃৎ, বৃক্ক, অগ্ন্যাশয়, প্লীহা, জননাঙ্গ ইত্যাদি ঘাঁটাঘাঁটি করে মনটাকে এমনভাবে তৈরি করে নিয়েছি, হাজার চেষ্টা করলেও এখন আর এসবে কোন আলাদা অনুভূতি পাই না। নন-মেডিকেল কোন মানুষ যদি কয়েক ফোঁটা রক্ত দেখেন, তাহলে তার মাথা চক্কর দিয়ে ওঠে। অনেকের বমি পায়। গায়ের মধ্যে ঘাঁটা দেয়। অথচ ডাক্তারদের এসবে কিছুই হয় না! কি রোবোটিক!

ডাক্তাররা আসলেই বিশেষ কিছু। তারা আর যাই হোক, সাধারণ মানুষ না। সাধারণ মানুষের অনুভূতিগুলো মেডিকেল কলেজে ভর্তি হবার পরে খুব যত্নসহকারে মেরে ফেলা হয়। ৫ বছর যে পরিমাণ চাপে রাখা হয় তাদের, পরীক্ষার সময় যে পরিমাণ মানসিক কষ্ট দেওয়া হয়, এর পরে আর অনুভূতিগুলো আগের মত থাকে না।

অনেক রোগী অভিযোগ করে, ডাক্তাররা কেন তাদের দুঃখে দুঃখিত হন না।

তাদের উত্তরে বলতে হয়, ডাক্তারদের জীবনটাই এমন। আপনার যখন রোগ হয়, তখনই শুধুমাত্র আপনি রোগীপূর্ণ হাসপাতালে যান। কিন্তু ডাক্তারদের সারাটা জীবন কাটে হাসপাতালে রোগীদের সাথে, রোগের সাথে যুদ্ধ করে। রোগীর দুঃখে দুঃখিত হলে তাদের সারা জীবন দুঃখ করেই কাটাতে হবে। আর এত দুঃখের মধ্যে থেকে আস্তে আস্তে দুঃখের অনুভূতিটাও ভোঁতা হয়ে যায়। তাই, তাদেরকে আপনি আপনার সাথে তুলনা করতে পারেন না।

এমনকি আপনি কোন ডাক্তার এর সম্পর্কে না জেনে না বুঝে কোন মন্তব্যও করতে পারেন না। আপনি জানেন না, এই অবস্থানে আসতে তাকে কি কি করতে হয়েছে।

আপনি যখন বিকালে বন্ধুদের সাথে হাফ প্যান্ট পরে ফুটবল খেলতে বের হয়েছেন, তখন আজকের এই ডাক্তার বিকালের খেলা বাদ দিয়ে বই নিয়ে পড়া মুখস্থ করেছে।

আপনি যখন ঠোঁটে সিগারেট, হাতে বাইক নিয়ে গার্লস স্কুল, কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে মেয়ে পছন্দ করেছেন; তখন আজকের এই ডাক্তারকে চোখে চশমা আর কাঁধে ব্যাগ নিয়ে নিয়মিত স্কুল-কোচিং দৌড়াদৌড়ি করতে হয়েছে।

আপনি যখন আপনার স্ত্রীর বাহুতে সুখনিদ্রায় মগ্ন ছিলেন- ডাক্তারকে তখন তার স্ত্রীকে বাসায় একা রেখে এসে আপনার মত রোগীদের রাত জেগে চিকিৎসা করতে হয়েছে।

এখন আপনি তাদের গাড়ি বাড়ি দেখে হিংসায় জ্বলেন, আপনি কেন এসবের মালিক হতে পারলেন না। তার কারণ কোনদিন খুঁজেছেন কি?

খোঁজ নিয়ে জেনেছেন কি, কত বছর অমানুষিক পরিশ্রমের পরে একজন ডাক্তার এই বাড়ি-গাড়ির মালিক হতে পেরেছেন?

হ্যাঁ। এভাবেই একজন ডাক্তার বড় ডাক্তার হয়ে ওঠেন। তার এই ত্যাগের কি কোনই মূল্য নেই?

ডাক্তারকে গালি দেবার আগে নিজের অবস্থানটা একবার ভেবে নিবেন। তিনি গালি খাবার যোগ্য কি না, তা ভাবার চেয়ে আপনি তাকে গালি দেবার যোগ্য কি না, এটাই বেশি ভাবতে হবে।




প্রশ্নোত্তরে হার্ট অ্যাটাক – ১ম পর্ব

হার্ট অ্যাটাক হওয়ার ঝুঁকি কাদের বেশি?

  • পঁয়তাল্লিশ বছর বয়স পর্যন্ত পুরুষদের।
  • যাদের পরিবারে হার্ট অ্যাটাকের ইতিহাস রয়েছে।
  • যাদের ওজন বেশি, রক্তে সুগার বেশি, কোলেস্টেরল বেশি।
  • যারা ধুম্পান অথবা মাত্রা ছাড়ানো মদ্যপান করেন।
  • যারা খুব বেশি চর্বি জাতীয় বা কোলেস্টেরল-ঠাসা খাবারে আসক্ত।
  • যারা পরিশ্রম করেন না বা খুব কম করেন।
  • যাদের মানসিক চাপ্রে মাত্রা খুব তীব্র।
  • যারা অতিরিক্ত চাপের শিকার।

রক্তে কোলেস্টেরল বাড়লে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কেন বাড়ে?

কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়লে সাধারণত ‘খারাপ কোলেস্টেরল’-ও বাড়ে। এরকম হলে ওই কোলেস্টেরল ধমনীর দেওয়ালে জমা হয়ে অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিসকে ত্বরান্বিত করে। ফলে ক্রোনারি হৃদ্ররোগের আশঙ্খা বেড়ে বাড়ে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি। দেখা গেছে খাদ্য নিয়ন্ত্রণ ও প্রয়োজনে কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ খেয়ে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমালে করোনারি হৃদরোগ ও হার্ট অ্যাটাকের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে।

ডায়াবেটিসে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ে?

হ্যা বাড়ে। দেখা গেছে ডায়াবেটিসে রক্তে অনিয়ন্ত্রিত লিপিডের মাত্রা, করোনারি ধমনীকে দ্রুতলয়ে সরু করে করোনারি হৃদরোগ আর হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ায়। ডায়াবেটিসে সুগার নিয়ন্ত্রণ যত কম হবে এরকম ঝুকিও তত বাড়বে। এছাড়াও ডায়াবেটিসের রোগীর মাত্রায় অতিরিক্ত চাপ ও স্থূলতের শিকার হইয়ার আশঙ্কা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ায়।

রক্তচাপ বেশি থাকলে হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা কেন বাড়ে?

রক্তচাপ বেশি থাকলে বেশি বাধা অতিক্রম করে যথেষ্ট রক্ত পাম্প করে ধমনীতে পাঠাতে বেশি কাজ করতে হয় হৃদযন্ত্রকে। এভাবে বেশি কাজ করতে করতে একটা সময় ক্লান্ত হয়ে গিয়ে আর যথেষ্ট পরিমাণ রক্ত পাঠাতে পারে না হৃদযন্ত্র। করোনারি ধমনীর মাধমে অতিরক্তচাপের রোগীর হৃদযন্ত্র যথেষ্ট রক্ত পায় না এই কারণে। এর পাশাপাশি রক্তচাপ রক্তচাপবৃদ্ধিতে দেওয়াল স্ফীত হয়ে যাওয়ার পদ্ধতি ত্বরান্বিত হয়ে করোনারি ধমনীর মাধ্যমে হৃদপেশিতে রক্তের যোগান কমে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত এক বড় মাপের সমীক্ষায় দেখা গেছে রক্তচাপ বেশি এমন মানুষের মধ্যে রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা সাধারণভাবে স্বাভাবিকের চাইতে বেশি হয়ায় করোনারি ধমনীর গহ্বর শীর্ণ হওয়ার পদ্ধতি দ্রুততর হয়। এই সব কারণে অনিয়ন্ত্রিত অতিরক্তচাপের রোগী করোনারি হৃদরোগে যেমন, হার্ট অ্যাটাকেও আক্রান্ত হন রক্তচাপ স্বাভাবিক এমন মানুষের তুলনায় বেশি।

(তথ্যসূত্রঃ ডা. শ্যামল চক্রবর্তী, রক্তচাপ কোলেস্টেরল হার্টঅ্যাটাক)




দৈনন্দিন জীবনে মাথা ব্যথার কারণ ও প্রতিকার

দৈনন্দিন জীবনে মাথা ব্যথা খুব সাধারণ একটি সমস্যা। যদিও বেশীর ভাগ মাথা ব্যথা বিরক্তিকর, তবে বেশীর ভাগ মাথা ব্যথাই মারাত্মক রোগ নির্দেশ করেনা। দুশ্চিন্তা ও মাইগ্রেন শতকরা ৯০ ভাগ মাথা ব্যথার জন্য দায়ী। মাথা ব্যথা নানা রকমের। টেনশন হেডেক বা দুশ্চিন্তাজনিত মাথা ব্যথা, মাইগ্রেন হেডেক, ক্লাস্টার হেডেক, সাইনাস হেডেক, আর্জেন্ট হেডেক, আইহেডেক বা চক্ষুজনিত মাথা ব্যথা, হরমোনজনিত মাথা ব্যথা। তাছাড়া মগজের টিউমার, মগজের ঝিল্লির ভিতর রক্তপাত, উচ্চ রক্তচাপ ইত্যাদি কারণেও মাথা ব্যথা হয় টেনশন হেডেক বা দুশ্চিন্তাজনিত মাথা ব্যথা মাথা ব্যথা মাথার উভয় দিকে হয়। মাথায় তীব্র চাপ অনুভূত হয় এবং ব্যথা ঘাড়ে সংক্রমিত হতে পারে। মানসিক চাপে ব্যথা বাড়তে পারে। পুরুষ, মহিলা সমানভাবে আক্রান্ত হয়।

লক্ষণসমূহ:
মাথা ব্যথা সাধারণত: মাথার পিছনে দুই দিকে ও ঘাড়ে অনুভূত হয়।
মাথা ব্যথা সপ্তাহব্যাপী বা মাসব্যাপী স্থায়ী হয়।
তবে ব্যথার তীব্রতা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকমের হতে পারে।
মাথা ব্যথা দিনের যে কোন সময় হতে পারে।
মাথায় চাপ অনুভূত হয়। কিন্তু ব্যথার সাথে কখনো জ্বর থাকে না।

চিকিৎসা:
সাধারণত বেদনা নাশক দ্ব্বারা চিকিত্সা করা হয়। স্বল্পমাত্রার ট্র্যাঙ্কুলাইজারও দেয়া যেতে পারে। মাইগ্রেন-এর মাথা ব্যথা শতকরা ১০-১৫ ভাগ লোক এ ধরণের মাথা ব্যথায় আক্রান্ত হয়। মাইগ্রেন মহিলাদের বেশী হয়। সাধারণত: ১৫-১৬ বছর বয়স থেকে মাইগ্রেনের লক্ষণ দেখা দেয় এবং বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই ৪০-৫০ বছর বয়স পর্যন্ত স্থায়ী হয়। মাইগ্রেনের আক্রমণের সময় মগজের রাসায়নিক বাহক সেরোটনিন-এর মাত্রা বেড়ে যায় এবং মাথা বাইরের ধমনীগুলো প্রসারিত হয়।

লক্ষণসমূহ:
মাথা ব্যথা সাধারণত: মাথার এক দিকে হয় (আধ কপালে মাথা ব্যথা)। তবে ব্যথা সমস্ত মাথায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।
মাথা ব্যথার সাথে বমি বমি ভাব হয়, এমনকি বমিও হতে পারে।
রোগী তখন আলো সহ্য করতে পারে না।
এ ধরণের মাথা ব্যথা কয়েক ঘন্টাব্যাপী চলতে পারে, কিন্তু সারাদিনব্যাপী খুব কম হয়।
মাইগ্রেন রোজ, সপ্তাহব্যাপী বা মাসব্যাপী হতে পারে।
দুশ্চিন্তা, মদ্যপানে মাথা ব্যথা বেশী হয়। পনির, চকোলেট ইত্যাদি খাবারেও মাথা ব্যথা বেশী হয়।
ঘুমালে মাথা ব্যথা কমে যায়।
মাইগ্রেনের বংশগত ইতিহাস থাকতে পারে।
সাধারণত কোন স্নায়ুবিক উপসর্গ থাকে না।

চিকিৎসা:
যেসব কারণে মাইগ্রেনের আক্রমণ বৃদ্ধি পায়, তা পরিহার করতে হবে। স্বল্পস্থায়ী চিকিত্সা হিসাবে অ্যাসপিরিন বা প্যারাসিটামলের সাথে এন্টিইমেটিক যেমন প্রোক্লোরপেরাজিন, মেটাক্লোপ্র্যামাইড দেয়া যেতে পারে। তীব্র আক্রমণের চিকিৎসা হিসাবে সুমাট্রিপটিন, যা মাথার বাইরের ধমনীকে সংকুচিত করে, তা মুখে বা ইনজেকশনের মাধ্যমে দেয়া যেতে পারে আর্গোটামিন বিকল্প হিসাবে দেয়া যেতে পারে। ঘন ঘন আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে প্রতিরোধকারী হিসাবে প্রোপানোলল, পিজোটিফেন বা অ্যামিট্রিপটাইলিন দেয়া যেতে পারে।

ক্লাস্টার হেডেক
ক্লাস্টার হেডেক মাইগ্রেনের চেয়ে কম হয়। এ ধরনের মাথা ব্যথা মধ্য বয়স্ক পুরুষদের বেশী হয়ে থাকে। কিন্তু মাইগ্রেন মহিলাদের বেশী হয়।

লক্ষণসমূহ:
তীব্র যন্ত্রণদায়ক মাথা ব্যথা।
মাথা ব্যথা সাধারণত: এক চোখে ও চোখের পিছনে হয় এবং সেদিকের চোখ লাল হয়, পানি পড়ে। নাক দিয়েও পানি পড়ে।
মাথা ব্যথা হঠাৎ করেই হয়ে থাকে। পাঁচ থেকে দশ মিনিটের মধ্যে ব্যথা সবচেয়ে বেশী হয় এবং আধ ঘন্টার মধ্যে সেরে যায়।
মাথা ব্যথায় ঘুম ভেঙে যেতে পারে।
মদ্যপানে মাথা ব্যথা বেশী হয়।
মাথা ব্যথা কয়েক সপ্তাহব্যাপী স্থায়ী হয় এবং দিনে কয়েকবার করে হয়।

চিকিৎসা:
চিকিৎসা হিসাবে উচ্চ মাত্রায় প্রদাহ বিনাশকারী (এন্টিইনফ্লামেটরী) দেয়া হয়। সুমাট্রিপটিনও ফলপ্রসূ। আর্গোটামিন ও ভেরাপামিল রোগ প্রতিরোধের জন্য কার্যকর। অর্ধেকের বেশী রোগী ফেস মাস্কের মাধ্যমে ১০০% অক্সিজেন শ্বাসের সাথে নিয়ে উপকার পায়। ধূমপান ও মদ্যপান বর্জন করা উচিত।

সাইনাস এর মাথা ব্যথা
যাদের ঘন ঘন সর্দি-কাশি হয়, তাদের সাইনুসাইটিস থেকে এ ধরণের মাথা ব্যথা হয়ে থাকে।

লক্ষণসমূহ:
ঠান্ডা বা সর্দি-কাশি লাগার সময় বা পরে থেকে এ ধরণের মাথা ব্যথা শুরু হয়। ব্যথা মুখমন্ডলের বা মাথার কোন নির্দিষ্ট জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকে। মাথা ব্যথা সকালের দিকে বেশী হয়। হাঁচি-কাশি দিলে ব্যথা বেশী হয়। হঠাত্ করে মাথা নাড়লেও ব্যথা বেশী হয়। শীতকালে বেশী হয়। রোগ নির্ণয়ের জন্য এক্সরে বা সিটি স্ক্যান
করতে হবে।

চিকিৎসা:
চিকিৎসা হিসাবে এন্টিবায়োটিক, এন্টিহিস্টামিন, নাজাল ডিকনেজস্ট্যান্ট বা নাজাল স্প্রে দেয়া হয়।

চক্ষুজনিত মাথা ব্যথা
শতকরা ৫ ভাগ মাথা ব্যথা চক্ষুজনিত। চোখের দৃষ্টিশক্তি কম থাকলে মাথা ব্যথা হতে পারে। অনেকক্ষণ পড়াশুনা করা, সেলাই করা, সিনেমা দেখা বা কম্পিউটার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলেও মাথা ব্যথা হতে পারে। চোখের কোন রোগ যেমন- কর্ণিয়া, আইরিশের প্রদাহ, গ্লুকোমা বা রেট্রোবালবার নিউরাইটিস ইত্যাদি কারণেও মাথা ব্যথা হতে পারে। চক্ষুজনিত মাথা ব্যথা সাধারণত: চোখে, কপালের দু’দিকে বা মাথার পিছনে হয়ে থাকে। চক্ষুজনিত মাথা ব্যথায় চক্ষু বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।

হরমোনজনিত মাথা ব্যথা
মহিলাদের মাসিক কালীন সময়ে প্রোজেষ্টেরন ও এষ্ট্রোজেন হরমোনের উঠানামার কারণে মাথা ব্যথা হতে পারে। জন্ম নিয়ন্ত্রণ বড়ি খেলেও মাথা ব্যথা হতে পারে। মাসিক চক্র শেষ হলে বা জন্ম নিয়ন্ত্রণ বড়ি খাওয়া বন্ধ করলে এ ধরণের মাথা ব্যথা ভাল হয়ে যায়।

কখন সিটি স্ক্যান বা এম,আর,আই করতে হবে
তীব্র ও অসহ্য মাথা ব্যথা।
কোন পরিশ্রমের কাজ করার পর মাথা ব্যথা শুরু হলে।
মাথা ব্যথার সাথে ঘাড় শক্ত হলে।
অস্বাভাবিক স্নায়ুবিক উপসর্গ দেখা দিলে।

৪০-৫০ বৎসর বয়স্কদের মাথা ব্যথা যদি দুই মাসের বেশী স্থায়ী হয়।




Infectious skin disorders of Children

Study revealed skin diseases  accounts about (20-30)% of child illness. The skin of the children differs from that of the adult or at the developing stage & premature.

  • Layers are thin,
  • bonding between cells are loose,
  • sebaceous & sweat glands are premature
  • less oil & sebum secretion,
  • sensations are not well developed
  • immune or defense power is less.

That’s why child’s are prone to inflammatory, infectious or allergic skin diseases. Specially in hot & humid weather there is outbreak of measles, chiken pox, impetigo. These diseases are very infectious & contagious too.

Infectious skin disease of children may classify as follows.

Viral: chiken pox or vaicella, measles,rubella or german measles, herpes simplex & zoster,warts, codylometa, mumps etc are from infection of virus.

Bacterial: Impetigo or summer boils, foliculitis, erysepleas, furuncle, carbunkcle, leprosy,anthrax are of bacterial origin.

Parasitic: these diseases are parasitic origin such as scabies, pediculosis, miasis, trombiculities, lectulariasis etc.

Fungul: funguses are responsible for this group of diseases. These are candidiasis,erythrasma,Tinea versicolor, tinea capitis, tinia pedis etc.

 Treatment:

As the skin of the children is very sensitive & needs urgent attention for treatment. Easily treated after finding the cause & proper diagnosis.

 Prevention:

  • keep children away from infected person;
  • Always keep your children’s garments clean & hygienic;
  • Children should be rested in comparatively cool place;
  • if sweats,clean & dry as early as possible;
  • Most of the viral diseases can be prevented by vaccination.

Remember if infectious skin diseases of children are not treated timely & properly,it could be serious.Even complication arises from diseases may fatal.




দেশজ চিকিৎসায় ওঝাদের সেকাল একাল

রোগ এর ইতিহাস মানুষের ইতিহাসের সমসাময়িক। সেই প্রাচীন কাল থেকেই মানুষ রোগ মুক্তির উপায় খুঁজেছে। নানা রোগ ও তার প্রতিকার নিয়ে মানুষের অভিজ্ঞতা প্রজন্মের পর প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে রোগ প্রতিকার পদ্ধতি পরিমার্জিত ও পরিশীলিত হয়েছে। কিন্তু সর্বত্র রোগ প্রতিকার পদ্ধতি হিসাবে যে পন্থা অবলম্বন করা হয়েছে তার উপর মূলত দুটি প্রভাব কাজ করেছে। প্রথমত, যে সম্প্রদায়ের মানুষ যে এলাকায় বসবাস করে সেই এলাকার নানা প্রাকৃতিক উপাদান কে রোগ মুক্তির উপায় হিসেবে ব্যবহার করা এবং  দ্বিতীয়ত, সেই এলাকার মানুষ যে ধরনের ধার্মিক ও সাংস্কৃতিক আচার অনুষ্ঠান পালন করে তার মাধ্যমে আরোগ্য লাভের উপায় খোজা।

আমাদের দেশে বর্তমানে প্রচলিত চিকিৎসা ব্যবস্থা মূলত দুই প্রকার। একটি হল আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা আর একটি সনাতন চিকিৎসা ব্যবস্থা। আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার ইতিহাস প্রাচীন নয় এবং স্বদেশীও নয়। আর সনাতন চিকিৎসা ব্যবস্থা মূলত প্রাচীন কাল থেকে গড়ে ওঠা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র দেশীয় চিকিৎসা ব্যবস্থা। অঞ্চল ভেদে এই দেশীয় চিকিৎসা পদ্ধতির নানা রূপ দেখা যায়। ঐতিহাসিক কাল থেকে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সাংস্কৃতিক আমাদের সাংস্কৃতিক আদান প্রদান ঘটেছে। দেশীয় চিকিৎসা পদ্ধতির উপরও তার প্রভাব পড়েছে। সুদূর অতীতকাল থেকে বাঙলায় প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতি মূলত কবিরাজ-বৈদ্য-ওঝা-গুণিন নির্ভর। কবিরাজ-বৈদ্য শ্রেণীর চিকিৎসা পদ্ধতি ভারতীয় আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের ধারা যার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত হয়েছে বাংলার আঞ্চলিক ভেষজ জ্ঞান। অন্যদিকে ওঝা গুনিন শ্রেণীর তন্ত্র-মন্ত্র নির্ভর চিকিৎসা পদ্ধতি বাংলার সম্পূর্ণ আঞ্চলিক ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে গড়ে উঠেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগিতায় দেশীয় সনাতনী চিকিৎসা পদ্ধতির উপর উচ্চ শিক্ষার ব্যবস্থা চালু হয়েছে আমাদের দেশে। যুগ যুগ ধরে গড়ে ওঠা দেশীয় আয়ুর্বেদ শাস্ত্র, যোগা, বৈদেশিক সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানের ফলে প্রাপ্ত ইউনানি, সিদ্ধা, হোমিওপ্যাথি একত্রে AYUSH নাম দিয়ে প্রচলিত শিক্ষার মধ্যে নিয়ে আসা হয়েছে। অপরদিকে তন্ত্র মন্ত্র নির্ভর ওঝা গুনিন দ্বারা প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতি কুসংস্কার হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়েছে অনেকদিন। এখন প্রশ্ন হল, এই ওঝা গুনিন সম্প্রদায় কি আজও আমাদের সমাজে বর্তমান না কি বিলুপ্তপ্রায় পেশাজীবী মাত্র? প্রসঙ্গত, এই লেখার মাধ্যমে আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতিতে একদা গুরুত্বপূর্ণ ওঝা-গুণিন ও তাদের চিকিৎসার ধারা ও বর্তমান তাদের অবস্থাটি জানার চেষ্টা করা হয়েছে, তাদের চিকিৎসা পদ্ধতি আধুনিক বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে কতটা গ্রহণযোগ্য তা বিচার করা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়।

ওঝা কারা?

বাংলার সংস্কৃতি মূলত তিন ভাগে বিভক্ত। নগর সংস্কৃতি, গ্রাম সংস্কৃতি, আদিবাসী সংস্কৃতি। চিকিৎসক হিসাবে নগর সংস্কৃতিতে কবিরাজ – বৈদ্যের প্রভাব ছিল। গ্রাম ও আদিবাসী সমাজে প্রভাব ছিল ওঝা-গুনিনের। কবিরাজি ও ওঝা গুনিনের চিকিৎসায় সূক্ষ্ম আভিজাত্যের প্রভেদ থাকলেও অন্যান্য সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানের মত একটি চিকিৎসা পদ্ধতির প্রভাব অন্যটির উপর পড়েছিল। ওঝা-গুনিনেরা মূলত মন্ত্র-তন্ত্র নির্ভর চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসরণ করলেও এটিই একমাত্র পদ্ধতি ছিল না। রোগ বিশেষে কখন ভেষজ তো কখন মন্ত্র তন্ত্র তো কখনও দুটোর প্রয়োগ একসাথে করতেন। মানুষের চিকিৎসায় ধাতু দৌর্বল্য, মধুমেহ, কুশ পরিবর্তন অর্থাৎ পুত্র সন্তান লাভ, সুস্থ সন্তান লাভ, নানা ধরনের পেটের রোগ, বাচ্চার নজর লাগা, জন্ডিস, সাপে কাটা এরকম বহুবিধ রোগের চিকিৎসা তারা করতেন। গবাদি পশুর চিকিৎসা যেমন গরুর দুধ না এলে চিকিৎসা করা ইত্যাদিও তাদের আওতায় ছিল। হস্তরেখা বিচার, বশীকরণ, চোর ধরার বিদ্যা ইত্যাদি অনেক ক্ষেত্রে তাদের প্রভাব ও প্রতিপত্তি ছিল।

ওঝা বা গুনিন সম্প্রদায় বা পির ফকির সাধু সন্ন্যাসী শ্রেণীর মানুষ যারা মানুষের অসুখ বিসুখে চিকিৎসা করতেন তারা এই চিকিৎসা বিদ্যা কিছু ক্ষেত্রে বংশপরম্পরায় পেতেন। অনেকসময় গুরুর কাছে থেকে সাধনার মাধ্যমে এই মন্ত্র-তন্ত্রের শিক্ষা নিতে হত। স্বপ্ন প্রদত্ত ওষুধ অর্থাৎ স্বপ্নে পাওয়া কোন বিশেষ ওষুধ যা বিশেষ কোন রোগে বা সব ধরণের রোগে ব্যবহার করা যায়।

মন্ত্র-তন্ত্র মূলক চিকিৎসার প্রকৃতি –

মানুষের প্রাচীনতম বিশ্বাস হল রোগ ব্যাধি, অমঙ্গলের পিছনে যে কোন দেবদেবীর অসন্তোষ, অপদেবতা বা ভুত প্রেত-এর কুদৃষ্টি দায়ী । মনে করা হয় এই দেবদেবী, অপদেবতারা কোন মানুষের ওপর ভর করে এবং তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। তাই কোন রোগ ব্যাধি দেখা দিলে রোগ ব্যাধির অধিষ্ঠাতা দেব দেবীকে পূজা দেওয়া হয়, মানত করা হয়। যেমন কারও ঘরে বসন্ত হলে শীতলা দেবীর পূজা করা হয়ে থাকে। এই রকম ভাবেই মারি মড়ক অকাল মৃত্যু সর্প দংশনে মৃত্যুর হাত থেকে মুক্তির জন্য মনসা পূজা, তিস্তা বুড়ির পূজা প্রচলিত।  দেবদেবী ও অপদেবতার পূজার মুল বিষয় মন্ত্র। কেননা মন্ত্র যাদুমূলক ক্রিয়া হিসেবে কাজ করে। যাদুমূলক চিকিৎসার আবার দুটি ভাগ দেখা যায় – কল্যাণকারী ও অকল্যানকারি।

 কিছু মন্ত্র                                                                                                                    

“হরে কিস্ন হরে কিস্ন দেহার মুক্তি”, “অরের কুল অক্ত হালা”, “রামের নামে তকে করিম গতি”, “ফন্নার শরীরে কিসের খেলা”, “আয় আয় চন মগর ভূত পেত্তানির রঙ্গে”, “ছাড় তর বাপের পাট”, “ভাত ব্যঞ্জন রুচের তরকারী দিসুবেটা তর সঙ্গে”, “মোর পুজাত নাগাও খইখাট”,  “নিধুয়া ডাঙ্গাত যুগে যুগে থাক”, “যদি কালে কন্নার দেহাত রহিব পড়িয়া”, “যদি হাক না মানিয়া আসিব ফিরিয়া”, “সিবের সাত দোহায় নাগিবে বেড়িয়া”, “রাম লক্ষণের বান রাখিনু তর লাগিয়া”

দীর্ঘদিনের আমাশা, জ্বর, খাদ্যে অরুচি, হটাত চমকে যাওয়া , ভয় পাওয়া ইত্যাদি ক্ষেত্রেও মন্ত্রের প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। এসব ক্ষেত্রেও কিছু পদ্ধতি অনুসরণ করে। যেমন,  জলে তুলসী পাতা দিয়ে মন্ত্র পড়ে দেওয়া হয়। এই রকম আরও অনেক পদ্ধতি আছে। কল্যাণকারী যাদু মূলক চিকিৎসায় আরোগ্য লাভ নয় একই সঙ্গে রোগ প্রতিরোধমূলক চিকিৎসাও আছে। যেমন সুস্থ ব্যক্তি কে যেন কোন অশরীরী আত্মা আক্রমণ করতে না পারে তার জন্যে মন্ত্র দিয়ে বশ করা হয়। সন্তান সম্ভবা নারী বা সদ্য প্রসূতি নারী ও শিশুর রক্ষা করার জন্য সম্পূর্ণ বাড়িটাকেও বশ করা হয়। ছোটো শিশু চমকালে বা বা কান্না কাটি করলে সাদা কাল বা লাল সুত দিয়ে তাবিজ হাতে পরিয়ে দেওয়া হয়।

এমনি মন্ত্র –

“বন্দরে বোন বন্দে কুন্ঠু খারা মরে বা কলিযুগে হরির নাম মন মদ্দে খুলন্তি”, “ফল্যার বাড়ি চত্ত পাকে ফেলে”, “রাম নামে জপমালা সংসারে সের সুমেরু”, “আদিলে নহার ব্রহ্ম জালে”, “চঞ মালা চঞ্জের আকার অবিল সিসই ঠেঙ্গা”, “সইনির মল কায়েরা কলার চমকা ধমকা”

রোগী বিকলাঙ্গ হয়ে পড়লে হাতা-চলা, হাত-পা নাড়া বন্ধ হয়ে যায়। একে ‘গহিলিও’ বলে, এতে মানুষের শারীরিক সক্ষমতা ক্রমশ হ্রাস পেয়ে যায়। এই সময় ওঝাদের ডাক পড়ে। ওঝারা আবার চিকিৎসার পদ্ধতি হিসাবে পূজা বা আচার মূলক চিকিৎসা করেন। উপকরণ হিসেবে একজোড়া পায়রা, কলার খোল, বেলপাতা, সিঁদুর, কলা, তের হাত কাপড়, তিনটি তুলসী পাতা ইত্যাদি ব্যবহার হয়। রোগীকে পূজা স্থানে বসিয়ে মন্ত্র পড়েন ওঝা –

যাদুমূলক চিকিৎসা যে শুধু রোগ নিরাময় জাতীয় কল্যাণকর কাজেই লাগান হয় তা নয়, অকল্যানকর কাজেও ব্যবহার হয়। এরূপ মন্ত্রকে কুমন্ত্র বলা হয়। অকল্যানকারি যাদুমূলক মন্ত্রের আবার দুটি ভাগ আছে, যেমন – বাণমারা ও বশীকরণ

বাণমারা –  এই পদ্ধতিতে কোন ব্যক্তিকে মন্ত্র প্রয়োগ দ্বারা অসুস্থ করে দেওয়া হত বা মেরেও ফেলা হত। ব্রহ্মবান, অগ্নিবাণ, খোঁড়া বান, খাছুলা বান ইত্যাদি মত ৬৪ প্রকার বাণের কথা শোণা যায়। কোন বানে হয়ত রোগীর শরীর আগুনের মত পুড়তে থাকবে আবার কোন বানে হয়ত রুগীকে সারাজীবন খোঁড়া হয়ে থাকতে হবে। কোন বাণে আবার রোগীর শরীর ক্রমশ শীর্ণ হতে থাকবে। কোন ব্যক্তির উপর বাণ প্রয়োগ করা হয়েছে তা বোঝার উপায় ও আছে। এই রকম একটি পদ্ধতি হল – পুকুর থেকে ধরা মৌরলা মাছ ধুয়ে পানের সঙ্গে খেতে দেওয়া হয়। রোগী যদি সেই পান খাওয়ার সময় কোন প্রকার মাছের গন্ধ না পান বা মাছ খাচ্ছেন সেটা অনুভব করতে না পারেন তাহলে বুঝতে হবে তার উপর বাণ প্রয়োগ করা হয়েছে। বাণ কাটানোর জন্য আছে অনেক প্রকার মন্ত্র। যেমন

হিরা হিরা বলিয়া স্বর্গ দিলা টান।

আকাসের ইন্দ্রকাপে আকাসের আসম।।

ইন্দ্রের ইন্দ্রাণী কাপে আর কাপে বাণ।

নাক নাগকাপে নাগিনী কাপে আর কাপে বাণ।।

বশীকরণ – এমন কিছু বিষয় আছে যা মানুষ নিজের শক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রণ বা বশ করতে পারেন না। তখন মানুষ মন্ত্র বা সাধন বলে নিজের আয়ত্তে আনতে চেষ্টা করেন। এই প্রকার পদ্ধতিকে বলে  বশীকরণ মন্ত্র। বিবাহিত স্বামী স্ত্রীর মধ্যে মতানৈক্য ঘটলে বা পরিবারের কোন সদস্য কে বসে আনতে হলে এই পদ্ধতির অনুসরণ করা হয়। এ ক্ষেত্রেও জল পড়া তেল পড়া তাবিজ কবজের আশ্রয় নেওয়া হয়। বস করার একটি পদ্ধতি হল রাজ মোহিনী পদ্ধতি – এতে ওঝা বা কোন ব্যক্তি উঠনের মাঝখানে বসে ডান হাতের তিন আঙ্গুল সরিষার তেলে দিয়ে মন্ত্র পড়ে কপালে ধারণ করে ওই ব্যক্তির বাড়ি গেলে তিনি মোহিত হয়ে যান।

মন্ত্রটির কিছু অংশ –

ছান সূর্য অমরাজি নজর ধাইয়া

লাগ মোহিনী লাগ অমুকের গায়ে

মুখে লাগ। যদি না লাগে ধায় মা চণ্ডী

মোর মাথা খাইস

পূজা প্রায়শ্চিত্ত মূলক চিকিৎসা –

রোগ ব্যাধির পিছনে অশুভ শক্তি কে যেমন কল্পনা করা হয় তেমনি দেবতার ক্রোধ বা দেবতার শাস্তি কেও প্রাচীন কাল থেকেই মানুষের রোগ ভোগের কারণ বলে মনে করা হয়। এর থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে পূজা প্রায়শ্চিত্ত মূলক ক্রিয়ার বিধান তৈরি হয়েছে। এই প্রকার ক্রিয়াকলাপে পৌরাণিক দেবদেবীর সঙ্গে নানা আঞ্চলিক দেবদেবীর প্রাধান্য লক্ষ্য করা যায়। লক্ষ্মী, মনসা, শীতলা, ষষ্টি, ওলা-দেবী, বন-দুর্গা, দক্ষিনরায়, সত্যনারায়ণ, পাচু ঠাকুর প্রভৃতি দেবদেবীর পুজাচার পালন করা হয়। দীর্ঘকাল একত্রে বসবাসের জন্য ধর্মের ব্যবধান ভেঙ্গে গেছে অনেক ক্ষেত্রে। হিন্দু মুসলমান সমাজে একসাথে গৃহীত হয়েছে সত্যপীর, গাজি পির, মানিকপুর, বনদেবী, ওলাদেবী , হাওয়া-দেবী। এসবের পিছনে অসহায় মানুষের রোগ ব্যাধি ক্ষয়ক্ষতি থেকে মুক্তি লাভের বাসনা নিহিত আছে। এই সমস্ত আঞ্চলিক দেবদেবীর কাছে রোগ মুক্তির জন্য মানত করা হয়। পূজা করা হয়। এই দেবদেবীর পূজা প্রায়শ্চিত্তমূলক কাজে আচার অনুষ্ঠানে মানত-ভঙ্গে পুরোহিত সম্প্রদায় ওঝাদের কাজ করেন।

এই প্রকার চিকিৎসা পদ্ধতির মধ্যে আছে পচ্ছুত কাটা, পাক, শুকল সেবা, জরিভস্ম, পিটানি, লোক দেবদেবীর পূজা। মূলত ছোটো বাচ্চারা কোন অশৌচ স্থানের উপর দিয়ে গেলে বা অশৌচ ব্যক্তির হাতে খেলে সেই শিশু যদি অসুস্থ হয়ে পড়ে তাহলে সেই শিশুর পচ্ছুত কাটা হয়। এক বালতি জলে কাঁচা দুধ, হলুদ, দূর্বা ঘাস মিশিয়ে কোন রাস্তার মোড়ে কাটা চিহ্ন দিয়ে সেখানে শিশুটিকে স্নান করানো হয়। পাক হল অপদেবতা বা দ্যাও এর পূজা। দ্যাও দেবতার শক্তি অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন পাকের উপকরণ প্রয়োজন হয়। যেমন মাসান দ্যাও ধরলে সোলার মাসান দ্যাও ঠাকুর, চ্যাং মাছ ভাজা, চাল ভাজা প্রয়োজন হয়। আবার গহিলি দ্যাও পাকের জন্য প্রয়োজন হয় হাঁসের। দুরারোগ্য ব্যাধির জন্য কাল পায়রা প্রয়োজন। ওঝারা এক্ষেত্রেও মন্ত্র তন্ত্রের আশ্রয় নেয়। যদি বাড়ির কেও দীর্ঘ দিন থেকে অসুস্থ থাকে বা বাড়িতে অসুখ বিসুখ লেগেই থাকে তাহলে বাড়ির তুলসী তলায় শান্তি সেবা দেওয়া হয়। সেদিন বাড়ির সব কিছু ধোয়া মোছা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করতে হয়।

ওঝা গুণিনেরা কি বিলুপ্তির পথে?

এ প্রশ্নের উত্তর এক কোথায় দেওয়া সম্ভব নয়। আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা এতটাই প্রসারিত ও জনপ্রিয় যে যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই পেশা অনেকটাই তার পসার হারিয়েছে। কিন্তু ওঝা গুণিনেরা যে একেবারে হারিয়ে যায়নি বরং গ্রামে গঞ্জে তাদের এখনও দেখা মেলে।

ওঝা গুণিনের জনপ্রিয়তা কমার কারণ –

জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার সবথেকে বড় কারণ হিসেবে বলা হয় মানুষের মধ্যে শিক্ষার প্রসার ও সচেতনতা বৃদ্ধি। শিক্ষা ব্যবস্থার প্রসার ঘটেছে দূর প্রত্যন্ত অঞ্চলেও। আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষ ক্রমে পুরনো অনেক ধ্যান ধারণা সংস্কার কে কুসংস্কার বলে বর্জন করেছে। সরকারী ও বেসরকারি দিক থেকে সচেতনমুলক কর্মসূচী, এমন কি নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে সচেতন মূলক প্রচার (যেমন সাপে কাটা রোগীর ওঝাদের কাছে না নিয়ে যাওয়া) আসলে ওঝাদের সমগ্র চিকিৎসা পদ্ধতির উপরেই প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। সেই মানসিকতা থেকেই মানুষ ওঝা – গুণিনদের চিকিৎসা পদ্ধতিকে বর্জন করেছে। এছাড়া আর একটি বড় কারণ হল, আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার পসার। এলোপ্যাথি নির্ভর আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার সঙ্গে সংঘাত শুধু নয় গ্রামে গঞ্জে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার পসার শুরু হওয়ার সময় থেকেই ওঝা গুণিনের সংঘাত শুরু। হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা গ্রামে গঞ্জে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। খরচ কম তাছাড়া হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় গ্রামের শিক্ষিত সম্প্রদায়ের যুক্ত থাকার কারণে সব ধরণের মানুষের মধ্যে তা গ্রহণীয় হয়ে ওঠে। অপরদিকে এলোপ্যাথি সরকার স্বীকৃত শুধু নয় সরকারী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা যা প্রাতিষ্ঠানিক রূপে মানুষকে নির্ভরতা দেয়। একইসঙ্গে দ্রুত ফলদায়ী চিকিৎসা পদ্ধতি। ক্রমে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হওয়ার ফলে  গ্রাম থেকে গঞ্জ গঞ্জ থেকে সহরে চিকিৎসার জন্য ছুটে যাওয়া মানুষের পক্ষে সহজ হয়ে যায়।

আগেকার দিনে ওঝা গুনিন সম্প্রদায় কিছু ক্ষেত্রে ছিল পারিবারিক। পরিবারের কেও তার মন্ত্র জ্ঞান অন্য কোন পরিবারের সদস্যকে শিখিয়ে দিয়ে যেতেন। অনেকক্ষেত্রে আবার ছিল গুরুমুখী, সাধনার দ্বারা লব্ধ হত জ্ঞান। কিন্তু আধুনিক শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থার পসার ঘটতে শুরু করল যখন তখন পেশা হিসেবে ওঝা খুব একটা লাভ জনক থাকল না। আগেকার দিনে ওঝা গুণিনের চিকিৎসা পেশায় প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল কবিরাজি চিকিৎসা পদ্ধতি কিন্তু ক্রমে দুই পেশাতেই পরস্পরের প্রভাব পড়ে। ওঝা গুনিনেরাও অনেক ক্ষেত্রে ভেষজ চিকিৎসা দিয়ে থাকতেন। কিন্তু তাদের পক্ষে এলোপ্যাথি চিকিৎসা পদ্ধতি আয়ত্ত করা সম্ভব হয়নি। পেশা হিসেবে লাভজনক না হওয়ার ফলে পরবর্তী প্রজন্ম আগ্রহ হারায়।

ওঝা সম্প্রদায়ের মধ্যেও কি বিশ্বাসের ভীত নড়ে যায়নি কিছুটা? সঠিক উত্তর পাওয়া কঠিন। অনেক ওঝারাও বলেন তাদের চিকিৎসায় সুফল পাওয়ার পথে অন্তরায় হয়ে দাড়ায় অনেক জিনিস। যেমন, মন্ত্র শক্তি তখনি কার্যকর হয় যখন তার প্রয়োগ কোন সঠিক ব্যক্তি দ্বারা হয়। সট এবং নিষ্ঠাবান না হলে তার প্রয়োগ ব্যর্থ হবে। ওঝাদের মধ্যে উপার্জনের প্রয়াসে সততা নষ্ট হচ্ছে। মন্ত্র শক্তির প্রয়োগেও তাই বিফলতা আসছে। ফলে মানুষের মধ্যে বিশ্বাস উঠে যাচ্ছে। এছাড়াও তাদের চিকিৎসায় ব্যবহ্রত ভেষজ ও অন্যান্য দ্রব্যাদি এখন দুষ্প্রাপ্য হয়ে গেছে। এছাড়া ওঝা সম্প্রদায়ের একটা অংশ ছিল আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে। যেমন, বেদে সমাজের মানুষেরা দাঁতের পোকা বের করা, বাতের ব্যথায় কাবু মানুষের হাঁটু থেকে শিঙার মাধ্যমে বিষাক্ত রক্ত বের করা, নানা রকম গাছের ছাল পশুর হাড় কে ওষুধ হিসেবে বিক্রি করতেন। কিন্তু সেই যাযাবর বেদে এখন লুপ্তপ্রায়, অন্যান্য আদিবাসী সমাজেও আর্থসামাজিক পরিবর্তন এসেছে।

পেশা হিসেবে কি ওঝারা বিলুপ্তপ্রায়? উপরের অংশ পড়ে এই প্রশ্নের উত্তর ইতিবাচক মনে করলে তা সরলীকরণ করা হবে বা বলা ভালো আমরা ভুল পথে চালিত হব। একথা সত্যি যে গ্রামে গঞ্জে চিকিৎসক হিসেবে ওঝা সম্প্রদায় এর পসার আর নেই। একথাও সত্য যে এর পিছনে আধুনিক চিকিৎসা ও শিক্ষার পসার কাজ করছে। তবুও, এই সম্প্রদায় বিলুপ্তপ্রায় বলা ঠিক হবে না। ওঝা গুনিন সম্প্রদায় কি তাদের চিকিৎসায় বা তাদের পেশায় কোন পরিবর্তন আনেনি? তাদের পরিচয়ে কি পরিবর্তন আসেনি? শিক্ষা ও সচেতনতা প্রসারে ওঝাদের বিলুপ্তির কথা বলা হয় কিন্তু আধুনিক শিক্ষিত শহুরে সমাজেও কি তাদের অস্তিত্ব একেবারে মুছে গেছে?  ওঝা সম্প্রদায়ের মানুষেরা যেমন ভেষজ চিকিৎসাও করতেন তেমন মন্ত্র দ্বারা চিকিৎসা করতেন – বশীকরণ করতেন, তাগা তাবিজ দিতেন, তেমনি হস্তরেখা বিচার করতেন। বর্তমান শহুরে শিক্ষিত সমাজে মানুষ আঙ্গুলে আংটি পরেন নান রকমের ধাতু পাথর ধারণ করেন। এসবের পিছনে যেমন নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার অভিপ্রায় থাকে তেমনি থাকে সুস্থ নীরোগ  জীবন বা দীর্ঘ রোগভোগ থেকে মুক্তির উপায়। খবরের কাগজে বড় বড় বিজ্ঞাপন, টি ভি চ্যানেলে জ্যোতিষ-গুরু-আচার্য দের জনপ্রিয়তা কিন্তু প্রমাণ করে শহুরে শিক্ষিত সমাজেও মন্ত্র তন্ত্র নির্ভর পদ্ধতি যথেষ্ট আদৃত। তবে কি এরা একসময়ের ওঝা গুনিন দের আধুনিক সংস্করণ? বর্তমান সমাজে যাদের দেখছি তারা কি আসলে নতুন মোড়কে সেই পুরনো পদ্ধতি ব্যবহার করছেন না? গবেষণা থেকে উঠে আসতে পারে ওঝা গুনিন সম্প্রদায়ের এই বিবর্তন।  কিন্তু একথা বলা যেতে পারে তাদের অনুসৃত পদ্ধতির অনেকটাই পুরাতন ওঝা – গুনিন সম্প্রদায়ে আগের থেকেই ছিল।

ওঝা গুনিন সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব আজও গ্রামে আছে এবং তা অনেক ক্ষেত্রে জোরাল ভাবেই আছে। এখনও আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষ গ্রামে বাস করেন। প্রতিকূল যোগাযোগ ব্যবস্থা, পরিকাঠামগত উন্নয়নের অভাব, আর্থিক অসংগতি এখনও আধুনিক চিকিৎসার প্রসারে বাধা হয়ে আছে। ফলে এখনও অনেক মানুষের বিকল্প চিকিৎসার মাধ্যম ওঝা সম্প্রদায়। যেমন সাপে কাটা রোগীর চিকিৎসায় ওঝাদের কে প্রাচীন কাল থেকে চিকিৎসা করতে দেখা গেছে।  সাপে কাটা রোগীর চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো, কিন্তু প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রতিকূল যোগাযোগ ব্যবস্থায় দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়ার মত পরিকাঠাম সব হাসপাতালে নেই। ফলে মানুষ বাধ্য হয়ে ওঝাদের কাছে জান।

এখনও রোগ বিশেষে ওঝাদের প্রতিপত্তি প্রবল। যেমন, মানসিক রোগ নিয়ে আমাদের সমাজে বিশেষ করে গ্রাম সমাজে জ্ঞান ও সচেতনতা ভীষণ কম। আবার মানসিক রোগের চিকিৎসা আমাদের দেশে এখনও সহজলভ্য নয়। তথ্য বলছে আমাদের দেশে ১০ লক্ষ মানুষ পিছু  ৫ জন মানসিক রোগের চিকিৎসক। স্বাভাবিকভাবেই মানসিক রোগ সম্বন্ধে একদিকে অজ্ঞানতা ও চিকিৎসা পরিষেবার অভাবে ভুল ধারণা রয়েই গেছে। এখন গ্রামে গঞ্জে তাই অশুভ আত্মার ভর করা রোগী দেখা যায়। এবং তাদের চিকিৎসা করেন ওঝারাই। অনেকটা একই ছবি যৌন রোগের ক্ষেত্রেও। যৌনরোগ সম্বন্ধে মানুষের মধ্যে সঙ্কোচ এখনও কাটেনি। এই রোগ নিয়ে মানুষ সহজে আলোচনা করতে পারেনা। একইসঙ্গে এর চিকিৎসা পারিকাঠাম বা আর্থিক দিক থেকে সহজ লভ্য নয়। ফলে মানুষ ওঝা গুণিনের শরণাপন্ন হন। শহুরে মানসিকতায় এর বিশাল পরিবর্তন দেখা যায় না। গুপ্ত-রোগের সুচিকিৎসায় অপেশাদারদের বিরাট বিজ্ঞাপনের ছড়াছড়ি দেখা যায়।

এছাড়া সংস্কারগত বা ঐতিহ্যগত ভাবে মানুষ দীর্ঘদিন থেকে ওঝা গুণিনদের কাছে যান। সেই ধারা এখনও বন্ধ হয়ে যায়নি। গ্রামেরদিকে ছোটো বাচ্চাদের কান্না কাটি করা কম খাওয়া স্বাস্থ্য ভেঙ্গে যাওয়া, গা গরম হওয়া, সাধারণ পেট খারাপ ইত্যাদি কে নজর লাগা বাতাস লাগা বলে মনে করা হয়। অশৌচ ও অশুভ স্থান সম্বন্ধে সংস্কার প্রবল ভাবেই আছে। এর প্রতিকার হিসেবে ওঝাদের কাছে তেল পড়া জল পড়া, অমাবস্যা পূর্ণিমা তে গাছের শিকড় হাতে বাধা এখনও প্রচলিত। এই সব ক্ষেত্রে ওঝা বৃত্তি লাভজনক পেশা হিসেবে নয় বরং সম্মানজনক পেশা হিসেবে দেখা হয়। ক্রমে পেশা হিসেবে ওঝাবৃত্তি লোপ পেলেও রোগ বিশেষে এই বৃত্তি তে যুক্ত মানুষ আছেন এবং তারা যথেষ্ট সম্মানীয়। এখনও গ্রামীণ পারিবারিক কাঠামোয় পরিবারের কর্তা ব্যক্তি পরিবারের বয়স্ক বাবা মায়েরা। তাদের সিদ্ধান্তে পুরনো সংস্কার বা ঐতিহ্যের অনুসরণ দেখা যায়। তারই ফল আধুনিক চিকিৎসার পাশাপাশি ওঝাদের চিকিৎসা। দীর্ঘদিনের রোগ সারানোর একটা চেষ্টা হিসেবেও মানুষ ওঝাদের কাছে যান। ওঝাদের প্রতি বিশ্বাসের আর একটা বড় কারণ ধর্মীয়। অনেক রোগ ব্যাধি থেকে মুক্তির জন্য ধর্মীয় দেবদেবীর প্রচলন আছে। বিভিন্ন আঞ্চলিক পূজা ও আচারমূলক কাজ আজো পালন করা হয় যার সঙ্গে ওঝা সম্প্রদায় যুক্ত। ধর্মীয় বিশ্বাস ওঝা সম্প্রদায়কে এখনও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

অতএব, ওঝা সম্প্রদায় আমাদের সমাজ থেকে একেবারে মুছে যায়নি একথা বলাই যায়। সমাজের অনেক ক্ষেত্রে এই সম্প্রদায়ের উন্নত সংস্করণ আমরা দেখছি কি না তা হয়ত একমাত্র গবেষণার দ্বারা উঠে আসতে পারে। গবেষণায় বলে দিতে পারে ওঝা সম্প্রদায়ের এই বিবর্তন আমাদের সমাজে কি প্রভাব ফেলেছে বা ফেলতে পারে।

 




হৃদযন্ত্র প্রতিস্থাপন

চিকিৎসা বিজ্ঞানের চরম অগ্রগতির এই সময়ে হৃদ-প্রতিস্থাপন বা হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট আর কাল্পনিক কোনও  ধারনা নয় একান্ত বাস্তব। কম বয়সে মারাত্মক হৃদ সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের জীবনকে মৃত্যুর থাবা থেকে ফিরিয়ে এনে দীর্ঘ দিন বেচে থাকার আশাকে বাস্তব করে তুলেছে চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক এই সাফল্য।

করোনারি হৃদরোগ বা বড় হয়ে যাওয়া হৃদযন্ত্রের সমস্যা [ ডাইলেটেড কার্ডিওমায়োপ্যাথি] থেকে কম বয়সে বারবার ওষুধের কাজ হচ্ছে না-এমন হৃদব্যর্থতা [হার্ট ফেইলিওর] ঘটতে থাকলে হৃদযন্ত্র প্রতিস্থাপন রোগমুক্তির পাশাপাশি দীর্ঘ জীবন ভাল থাকার আশ্বাস জোগায়। হৃদ যন্ত্রের কোন সমস্যা নেই এমন মানুষের মৃত্যু [ Brain Death]-র সঙ্গে সঙ্গে তার হৃদযন্ত্র খুলে নিয়ে হতভাগ্য হৃদরোগীর অসুস্থ হৃদযন্ত্রকে বদলে দেওয়া হয় সুস্থ এরকম হৃদয় দিয়ে।

ফুসফুসের কিছু সমস্যা সঙ্গে থাকলে এরকম হৃদ প্রতিস্থাপন করা যায় না। প্রতিস্থাপনের পরে নতুন বসানো হৃদযন্ত্রের প্রত্যাখ্যাত হবার [Rejection] আশঙ্কা এখন অনেকটাই কমে এসেছে সাইক্লোস্পোরিন জাতীয় কিছু ওষুধ [Immuno-supressant Drugs] এর একটানা ব্যবহারে। এখন নতুন হৃদপিন্ড বসানো  মানুষের ভবিষ্যৎ আগের চাইতে অনেকটাই উজ্জ্বল। প্রতিস্থাপন হৃদযন্ত্র নিয়ে এক বছর পর্যন্ত বাঁচছেন নব্বই শতাংশরও বেশি মানুষ।

যত দিন যাচ্ছে হৃদ- প্রতিস্থাপন গ্রহীতার জীবনের মান বাড়ায় উল্লেখযোগ্যভাবে। মূল সমস্যা দাতার তীব্র অভাব। দাতার সংখ্যা বাড়লে হৃদ-প্রতিস্থাপনে জীবনে ফেরা মানুষের সংখ্যাও বাড়বে।

হৃদ- প্রতিস্থাপন সময়সাপেক্ষ, ব্যয়বহুল এক চিকিৎসা ব্যবস্থা হলেও বিশ্বের নানা দেশে সফল হৃদ- প্রতিস্থাপনের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এরকম অস্ত্রোপচারের রয়েছে নানা ধরনের জটিলতার আশঙ্কা যেমন নতুন বসানো হৃদযন্ত্রকে মেনে না- নেওয়া। একটানা এরকম প্রত্যাখ্যান থেকে তীব্রমাত্রায় অ্যাথেরোক্লেরোসিস দেখা দেয় কোনও কোনও গ্রহীতার করোনারি ধমনীতে। নানা ধরনের জটিল সংক্রমণ বেশ কিছু হৃদগ্রহীতার প্রাণও কেড়ে নিতে পারে।

এই জটিলতা গুলো থাকা সত্ত্বেও হৃদচিকিৎসায় অদূর ভবিষ্যতে হৃদ-প্রতিস্থাপনের গুরুত্ব যে বাড়বে, একথা নিশ্চিতভাবে বলা যায়।




অটিজম :শিশুর পাশে থাকুন,সচেতন হোন

অটিজম কি?
অটিজম কোন সাধারণ রোগ নয়। এটি শিশুদের একটি মনোবিকাশগত জটিলতা যার ফলে সাধারণত ৩টি সমস্যা দেখা দেয়া। যেগুলো হচ্ছে-

প্রথমতঃ মৌখিক কিংবা অন্য কোনো প্রকার যোগাযোগ সমস্যা, দ্বিতীয়তঃ সমাজিক বিকাশগত সমস্যা, তৃতীয়তঃ খুব সীমাবদ্ধ ও গণ্ডিবদ্ধ জীবন-যাপন ও চিন্তা- ভাবনা এবং পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণ।

এছাড়া অতি চাঞ্চল্য (Hiper Activity), জেদী ও আক্রমণাত্মক আচরণ (Aggressiveness), অহেতুক ভয়ভীতি, খিচুনী ইত্যাদি ও থাকতে পারে। অটিজম রোগটি কবে অবিষ্কৃত হয়েছে ? ১৯৪৩ সালে জন হপকিনস হাসপাতালের ডাঃ লিও কান্নের এবং প্রায় একই সময়ে জার্মান বিজ্ঞানী ডাঃ হ্যান্স এসপারজার রোগটি সম্বন্ধে বিস্তারিত জনসমক্ষে উপস্থাপন করেন। তার আগে রোগটি থাকলেও এসম্বন্ধে তেমন কোন ধারণা ছিল না। বর্তমানে উন্নত দেশগুলোতে এই রোগটি নিয়ে প্রচুর গবেষণা হচ্ছে। রোগটি কোন্ বয়সে এবং কিভাবে সনাক্ত করা যায়? সাধারণত শিশুর বয়স ১৮ মাস থেকে ৩ বছর এবং মধ্যে এই রোগ দ্ব্যর্থহীনভাবে সনাক্ত করা সম্ভব হয়। এখানে উল্লেখ্য যে যত দ্রুত রোগটি সনাক্ত করা যায়, শিশুর জন্য ততই মঙ্গল। সাধারণত নিন্মলিখিত বৈশিষ্ট্যগুলোর মাধ্যমে অটিষ্টিক রোগটি সনাক্তকরণ সম্ভবঃ এদের ভাষার বিকাশ হতে বিলম্ব হয়। (এক বছর বয়সে অর্থবহ অঙ্গভঙ্গি, ১৬ মাস বয়সে একটি শব্দ এবং ২ বছর বয়সে ২ শব্দের বাক্য বলতে পারে না)। এই রোগে আক্রান্ত শিশু সমবয়সী কিংবা অন্যান্যদের সাথে সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে না। এরা নাম ধরে ডাকলে ও সাড়া দেয় না এবং আপন মনে থাকতে পছন্দ করে। এরা অন্যদের চোখের দিকে তাকায় না। অন্যের দিকে তাকিয়ে হাসে না কিংবা আদর করলেও ততটা সাড়া দেয় না। একই কথা পুনঃরাবৃত্তি করে এবং একই কাজ বার বার করতে পছন্দ করে। এদের কাজ-কর্ম এবং সক্রিয়তা সীমিত ও গণ্ডিবদ্ধ। পরিবেশ এবং আশেপাশের কোন পরিবর্তন খুব অপছন্দ করে। এরা কখনো কখনো অতি সক্রিয় আবার কখনো কখনো খুব কম সক্রিয় হয়।

অতিসক্রিয়তা থেকে কখনো কখনো খি সাধারণত দোলনা/রকিং চেয়ার বা এই জাতীয় পুনঃরাবৃত্তিমূলক খেলা পছন্দ করে। সাধারণত খেলনা দিয়ে কোন গঠনমূলক খেলা খেলতে পারে না অথবা কোন বিশেষ খেলনার প্রতি অত্যধিক মোহ দেখা যায়। কখনো মনে হতে পারে যে এরা কানে শু না। এরা মাকে বা অন্য কোন প্রিয়জনকে জড়িয়ে ধরে না এবং তাদে কেউ ধরলেও তেমন প্রতিক্রিয়া দেখায় না অথবা অত্যন্ত ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে।

এরা কখনো আত্মপীড়ন করে এবং মনে হয় তাতে সে তেমন কষ্ট পায় না। কোন বিশেষ কিছুর প্রতি অত্যাধিক আকর্ষণ থাকে যেমন- কাগজ ছেঁড়া, পানি, তরল পদার্থ দিয়ে খেলা, চাল, ডাল দানাদার কিছু দিয়ে খেলা ইত্যাদি। সাধারণত কল্পনাপ্রসূত খেলা খেলতে পারে না। কোন বিশেষ সংবেদন-এর প্রতি অস্বাভাবিক আচরণ করে যেমন আলোতে চোখ বন্ধ করা, শব্দ শুনলে কানে হাত দেয়া, দুর্গন্ধে কোন প্রতিক্রিয়া না করা, স্বাদ ও স্পর্শে তেমন কোন অভিব্যক্তি প্রকাশ না করা ইত্যাদি। কি কারণে অটিজম রাগটি হতে পারে? এখনো পর্যন্ত অটিজম কেন হয় তার সঠিক কারণ উদঘাটন করা সম্ভব হয়নি। মনেবিকাশের প্রতিবন্ধকতার কারণ হিসাবে মস্তিস্কের অস্বাভাবিক জৈব রাসায়নিক কার্যকলাপ, মস্তিস্কের অস্বাভাবিক গঠন, বংশগতির অস্বাভাবিকতা, এমন কি বিভিন্ন টিকা প্রয়োগ থেকে এই রোগ হতে পারে বলা হলেও নির্দিষ্ট করে কিছু এখনো জানা সম্ভব হয়নি। জন্ম পরবর্তীêকালের কোন জটিলতা কিংবা শিশুর প্রতি অমনোযোগিতার ফলে এই রোগের সৃষ্টি হয় না। কাজেই কোন বাবা মা ও আত্মীয়-স্বজন নিজেদের দোষী ভাবা অথবা বাবা- মাকে দায়ী করার কোন যৌক্তিকতা নেই। অটিজম রোগটির প্রাদুর্ভাব কেমন? বর্তমানে পৃথিবীতে অটিজম রোগটি প্রায় মহামারীর পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে। এমনকি কেউ কেউ একে এইচআইভি এইডস এর সাথে তুলনা করেছেন। আমাদের দেশে সঠিক তথ্য না থাকলেও গড়ে প্রতি হাজারে ১০ থেকে ২০টি শিশু এই রোগে আক্রান্ত বলে বিশেষজ্ঞগণ মনে করছেন। উন্নত দেশগুলোতে এই সংখ্যা আরও বেশি বলে জানা গেছে। অটিজম রোগটির কি কোন চিকিৎসা আছে? অটিজম সারিয়ে তোলার জন্য কোন প্রকার জাদুকরী চিকিৎসা এখনও পর্যন্ত অবিষ্কৃত হয়নি। এরূপ পরামর্শে বিভ্রান্ত হওয়া বোকামী।
তবে নিজেদের সম্পূর্ণ অসহায় মনে করাও সঠিক নয়। কেননা বিশেষ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, পিতা-মাতা ও আপনজনদের শ্রম ও যত্ন এবং এই রোগের সাথে সংশিস্নষ্ট বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সহায়ক দলের একত্রে কার্যক্রমে শিশুর বিকাশ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক না হলেও একটি শিশুকে স্বাধীন জীবন-যাপন করার মত পর্যায় আনা সম্ভব হয়। আর এজন্য যা করণীয় তা হচ্ছেঃ এ ধরনের শিশুর বাবা-মা ও পরিবারের সদস্যদের বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিশুটিকে সার্বক্ষনিক সহায়তা প্রদান। কিছু ঔষধপত্র প্রয়োগ যা তার অন্যান্য শারীরিক অসুবিধা দূরীকরণে সহায়তা করে। দ্রুততার সাথে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেয়া যা শিশুটির ভাষা বিকাশ, সামাজিক বিকাশ, স্বাবলম্বিতার বিকাশ, বিশেষ দক্ষতার বিকাশ এবং অন্যান্য স্বকীয়তা অর্জনে সহায়তা করবে।

সামাজিক স্বীকৃতি এবং সকলের সহযোগিতা এই ধরনের শিশুর বিকাশের জন্য খুবই জরুরী। সত্যিকার অর্থে আমাদের দেশে বেশির ভাগ মানুষ এখনো এ বিষয়ে তেমন কিছুই জানে না। কাজেই সহযোগিতার বিষয়টি একান্তই অবান্তর। অটিষ্টিক শিশুরা কি প্রতিবন্ধী? অটিষ্টিক শিশুরা কখনো কখনো বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে অত্যন্ত পারদর্শী হয়। এই ধরনের শিশুদের তাই বিশেষ প্রয়োজন সম্পন্ন শিশু বা বুদ্ধিবৃত্তিক চাহিদাসম্পন্ন বলা হয়।

যথাযথভাবে তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে তারা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে পারবে বিধায় এদের
প্রতিবন্ধী আখ্যায়িত করা সঠিক নয়। অটিষ্টিক শিশুদের বিভিন্ন পর্যায় কি কি ? সাধারণত অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের ৪টি পর্যায়ে ভাগ করা হয়। বয়সের সাথে নয় বরং প্রতিটি শিশুর সামর্থেøর উপর তার পর্যায় নির্ভর করে।

পর্যায়গুলো সংক্ষেপে নিম্নরূপঃ
প্রথম পর্যায়ঃ আত্মকেন্দ্রিক স্তরঃ এই পর্যায়ে শিশুরা আত্মকেন্দ্রিক থেকে এবং আপন মনে একাকী খেলতে পছন্দ করে। এরা সাধারণত কোন আদেশ-নিষেধ অথবা নির্দেশ বুঝতে পারে না ও পালন করে না।

দ্বিতীয় পর্যায়ঃ অনুরোধকারী স্তরঃ এই পর্যায়ের শিশুরা শারীরিক অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে খুব কাছের লোকদের সাথে অল্প সময়ের জন্য যোগাযোগ স্থাপন করে এবং তাদের চাহিদা পূরণ করার জন্য অনুরোধ করে।

তৃতীয় পর্যায়ঃ যোগাযোগ শুরুকারী স্তরঃ এই পর্যায়ের শিশুরা কিছু প্রচলিত শব্দ বুঝতে পারে এবং অতি পরিচিত মানুষের সাথে অল্প সময়ের জন্য যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে। তারা ছোটখাট আদেশ-নির্দেশ পালন করতে পারে।

চতুর্থ পর্যায়ঃ সহযোগী স্তরঃ এই পর্যায়ের শিশুরা পরিচিত সমবয়সী শিশুদের সাথে অল্প সময়ের জন্য খেলা করে। ভাষায় দক্ষতা একটু ভালো এবং অন্যদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হয়। অটিষ্টিক শিশুদের প্রশিক্ষণ প্রদানের উপায় কি? উন্নত এবং উন্নয়নশীল অনেক দেশে অটিষ্টিক শিশুদের প্রশিক্ষণের জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা আছে।

বর্তমানে আমাদের দেশেও বেশকিছু প্রতিষ্ঠান এই ধরনের শিশুদের নিয়ে কাজ করছে। তবে মানসম্পন্ন তেমন কোন প্রতিষ্ঠান এখনও পর্যন্ত গড়ে উঠেনি একথা নিশ্চিতভাবে বলা য পৃথিবীর অনেক দেশে এই শিশুদের জন্য পরিচালিত প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো সাধারণত এই ধরনের শিশুদের বাবা- মায়েরা পরিচালনা করে থাকেন। কাজেই এই ধরনের শিশুদের সময়ক্ষেপণ না করে সনাক্ত হবার সাথে সাথে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পাঠানো অত্যন্ত জরুরী। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর উচিত কত দ্রুত শিশুটিকে এক পর্যায় থেকে অন্য পর্যায়ে উন্নত করা যায় সেজন্য সচেষ্ট হওয়া।




আমাদের ভারতপ্রীতি ও হে বঙ্গ ভান্ডারে তব বিবিধ রতন

প্লট-১ (পিঁপড়ার দল)

ওয়াইফ MRCPCH(UK) পরীক্ষা দিবে, এক্সাম সেন্টার হয় কোলকাতা অথবা মুম্বাই বা চেন্নাই।ভিসা সংক্রান্ত কাজ কমপ্লিট করার জন্য মতিঝিলের #State Bank of India তে গেলাম। সিরিয়ালে আটকা পড়লাম, আমার আগে আরও প্রায় ১৫ জন লোক।সিরিয়ালে আমার সামনে থাকা লোকের সাথে টুকটাক কথা বলে সময় পার করছি ।

কথায় কথায় জানলাম উনিও উনার ওয়াইফকে নিয়ে ইন্ডিয়া যাচ্ছেন, ওয়াইফ Ankylosing Spondylitis( এক ধরণের বাতব্যাথা রোগ) এ আক্রান্ত। আমি একটু আমতা আমতা করে বললাম,’ইন্ডিয়া যাচ্ছেন কেন? যতদূর জানি এর চিকিৎসা তো এদেশেই হয়, আমার মামাতো ভাইতো এদেশেই চিকিৎসা নিচ্ছে’।

উনি বলে উঠলেন, “দূর, দূর, আর বইলেন না, এদেশের ডাক্তাররা কিছু জানে নাকি! সব মূর্খের দল। দেখেন না, আমার সামনের জন সেও চিকিৎসার জন্য ইন্ডিয়া যাইতেছে”। তার সামনের ভদ্রলোক মাথা নেড়ে এই কথায় সায় দিলেন, যতটুকু বুঝলাম Hepatitis B virus carrier, এর পারফেক্ট চিকিৎসা এদেশেই আছে, তারপরও যাচ্ছেন। এবার সে লোকের কথায় জানলাম তার সামনের লোকও চিকিৎসার জন্য ইন্ডিয়া যাচ্ছে, আমি ভিমরী খেলাম।

আমি মোটামুটি নিশ্চিত হলাম, আমার সামনের ১৫ জনের মধ্যে মিনিমাম অর্ধেক চিকিৎসার জন্য ইন্ডিয়া যাচ্ছেন। আমি এদের সাথে আংশিক কথাবার্তায় এটাও নিশ্চিত হলাম এদের অধিকাংশের চিকিৎসা এদেশেই সম্ভব ছিলো।

আমার সামনের জন আমি কেন ইন্ডিয়া যাচ্ছি তা জানতে চাইলেন। এই দেশের ডাক্তারদের যে লোক একটানে মূর্খ বলে রায় দেয়, তার কাছে কিভাবে বলি যে চিকিৎসা বিদ্যার উচ্চশিক্ষার জন্যই আমার এই মুভমেন্ট। মূল ঘটনা চাপা দিয়ে বললাম, ‘ঘুরতে যাচ্ছি’। এবার ভদ্রলোকের চোখ চকচক করে উঠলো, বললো, “যান, যান, ঘুইরা আসেন, আহাহা! কি সুন্দর দেশ ! কয়েকবার গেছি। কোন কোন জায়গায় ঘুরবেন, সেইটা একটু বলি……”

প্লট-২ (ঝড়ে বক মরে)

আম্মু ESRD (#Irreversible, দীর্ঘমেয়াদী কিডনী জটিলতার শেষ পর্যায়) এর পেশেন্ট। আমার আত্মীয় সজনের বধ্যমূল ধারণা আম্মুকে ইন্ডিয়া নিয়ে গেলে উনি সুস্থ হয়ে যাবেন, আমি অবহেলা করে নিচ্ছিনা। একজন তো মা’র সামনেই বলে ফেললেন, “ছেলেটা আপনেরে ইন্ডিয়া নিলে বাঁইচা যাইতেন। সঠিক শিক্ষা দেন নাই, তাই বাপ-মায়ের দিকে নজর কম”।

বার বার বললে অসত্য তথ্যও সত্যের মত শোনায়। বাইরের লোকদের কথায় একসময় আম্মু মোটিভেটেড হলেন, বললেন, ‘ইসহাক সাহেবেরও তো #ক্রিয়েটিনিন(এক ধরণের কিডনী ফাংশন মার্কার) ১২ ছিলো, ইন্ডিয়া গিয়ে ভালো হইছে। আমারে একটু ইন্ডিয়া নিয়ে দেখবি?’ আমি বিরক্ত হলাম, বললাম, ‘বাইরের লোকের কথা বিশ্বাস কর, আর আমার উপর বিশ্বাস নাই? ঠিক আছে, ইসহাক সাহেবকে কাগজপত্র নিয়া আসতে বল, দেখি ইন্ডিয়া কি ম্যাজিক দেখাইছে’।

ইসহাক সাহেবের কাগজপত্র আসলো। যা ভেবেছিলাম তাই–উনার ডায়াগনোসিস ছিল AKI( এক ধরণের #Reversible কিডনী ইনজুরী), Proper চিকিৎসা পেলে উনি এদেশেও ভালো হতেন। Reversible এই রোগের নামকাওয়াস্তে চিকিৎসা দিয়ে ইন্ডিয়ান ডাক্তরারা পার্টটা ভালোই নিয়েছে, –‘কেউ পারতো না, যা ব্যাটা, তোরে ভালো কইরা দিলাম’।–“ঝড়ে বক মরে, হুজুরের কেরামতি বাড়ে”–কথাটা জানতাম, ঐদিন নিজ চোখে ইন্ডিয়ার হুজুরদের কেরামতি দেখলাম।

প্লট-৩ ( বাটপারী ওভারলোডেড)

আমি যে জায়গায় পেশেন্ট দেখি সে জায়গাটা হিন্দু অধ্যুষিত, কিছু হলেই এখানকার রোগীদের একটা বড় অংশ ইন্ডিয়া ছোটে।

চেম্বারে রোগী দেখছিলাম। রোগী ঠিকমত হাটতে পারে না।ইন্ডিয়াতে গিয়েছিলো, কাগজপত্র দেখলাম। মিনিমাম ৫০ টা পরীক্ষা, আই রিপিট, মিনিমাম ৫০ টা ইনভেস্টিগেশন করানো, Serum Trypsin লেভেলও করা।রোগী হাটতে না পারার সাথে Serum Trypsin লেভেলের ইহকালে বা পরকালে কোন সম্পর্ক আছে বা থাকতে পারে বলে আমার জানা নেই।

ক্লিনিক্যাল এক্সামিনেশন শেষে প্রেসক্রিপশনে ডায়াগনোসিস #CIDP ( এক ধরণের নার্ভের রোগ) লিখে রোগীকে পরবর্তী চিকিৎসার জন্য আগারগাঁ Neuroscience Institute এ রেফার করলাম।

এতক্ষণ পরে চোখে পরলো, রোগীর স্ত্রী যক্ষের ধনের মত কি একটা যেন হাতের মধ্যে আগলে রেখেছেন। এক্সপ্লোর করে দেখি রোগীকে প্রেসক্রাইব করা ইন্ডিয়ান মাল্টিভিটামিন। ৫০ পরীক্ষা শেষে মাল্টিভিটামিন!!! বাটপারির একটা সীমা থাকা উচিত–ভারতীয় মুভির একটা ডায়ালগ মনে পড়ে গেল–“ইন্ডিয়া, তুসি গ্রেট হো!”

প্লট-৪( ইন্ডিয়ান রামধরা)

এবারের কাহিনী কিংবদন্তী এক নিউরোলজিস্ট স্যারের,ঘটনাটা অনেক ডাক্তারই জানেন। এক আমলা নিউরোলজিস্ট স্যারের কাছে রোগী হিসেবে এলে স্যার ক্লিনিক্যালি ডায়াগনোসিস করলেন #GBS( এক ধরণের নার্ভের সমস্যা)।

আমলা সাহেবের তাতে মন ভরলো না। আমলা সাহেব ইন্ডিয়াতে গিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করবার পর তাকে জানানো হলো তার রোগ-GBS….” নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিঃশ্বাস,ওপারেতে সর্ব সুখ আমার বিশ্বাস”…আমলা সাহেব ওপারের সুখের স্বাদ নিতে গিয়ে রামধরা খেলেন…..

Bangladesh vs India

(হায়রে কপাল মন্দ, চোখ থাকিতে অন্ধ)

World Health Organization (WHO) ২০১৬ সালে Health Sector এর সামগ্রিক দিক বিবেচনা করে যে ১৯০ টি দেশের World Ranking প্রকাশ করে সেখানে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৮ তম। ইন্ডিয়ার পজিশনটা জানা আছে?–১১২ তম(Screenshot কমেন্টে)। WHO এর কর্তাব্যক্তিরা ঘাস খেয়ে এই Ranking তৈরি করে নাই। এই Ranking দেখার পরও ইন্ডিয়াতে গণহারে যারা চিকিৎসার জন্য যান, তাদেরকে দেখে একটা কথাই আমার মাথায় ঘোরে-‘ হায়রে কপাল মন্দ,  চোখ থাকিতে অন্ধ….’

ভারতের  নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ  অমর্ত্য সেনের কথাগুলো হুবহু তুলে ধরি, “ভারত অর্থনৈতিকভাবে অনেক এগিয়ে থাকলেও তারা স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সংক্রান্ত সূচকে বাংলাদেশের তুলনায় অত্যন্ত পিছিয়ে।……..ভারত স্বাস্থ্য সমস্যাকে জটিল করেছে। কিন্তু বাংলাদেশে এটি হয়নি। বাংলাদেশ গত এক দশকে এই খাতে ভাল উন্নতি করেছে।……. ভারতের মাথাপিছু জিডিপি বাংলাদেশের দ্বিগুণ, কিন্তু বাংলাদেশের গড় আয়ু ভারতের চেয়ে বেশি।”

যে কথা ভারতের সজ্জন ব্যক্তিরা স্বীকার করেন, জানেন ও বোঝেন, জাতিগতভাবে বেশী বুঝদার বাঙালীর সেটা বুঝতে সমস্যা হয়। যে দেশে এখনও millions of people- Open air defecation( সোজা বাংলায় -খোলা ময়দানে মলমূত্রত্যাগ) করে, আমাদের দেশের একশ্রেণীর লোক সেদেশে গিয়ে চিকিৎসা নিয়ে আনন্দিত হয়, তৃপ্তির ঢেকুর তোলে। ভালোই…..

যে দেশের অবস্থান WHO ranking এ ইন্ডিয়ার আগে, যে দেশের বিশেষজ্ঞরা খোদ ভারতে গিয়ে ভারতকে দ্বিতীয় বানিয়ে নিজেরা প্রতিযোগীতায় প্রথম হয়(APLAR আয়োজিত প্রতিযোগিতায়), যে দেশে Kidney transplant এ নবদিগন্ত রচিত হচ্ছে, যে দেশের চিকিৎসকরা Tree man syndrome( Epidermodysplasia verruciformis) নামক rarest রোগের চোখধাঁধানো অপারেশনের নেতৃত্ব দেয়, যে দেশের চিকিৎসকরা মাতৃগর্ভে গুলি খাওয়া শিশুকে তাদের প্রজ্ঞা ও ধী-শক্তির সহায়তায় আবার তার মায়ের কোলে ফিরে যাওয়াকে নিশ্চিত করে–সে দেশ থেকে চিকিৎসার জন্য পিপীলিকার মত লোক ইন্ডিয়াতে কেন যায়?

কারণগুলো কিন্তু পরিষ্কারঃ

১. কাউন্সেলিং এর অভাবঃ আমি জানি, এদেশের চিকিৎসকরা রোগ ধরতে যথেষ্ঠ পারদর্শী, কিন্তু ৫ মিনিট রোগীর সাথে রোগ নিয়ে কথা বলতে তাদের বাঁধে।এ সুযোগটাই ইন্ডিয়া নেয়।ওপার বাংলায় যাওয়া মাত্রই “ওপার থেকে দাদা এসেছেন” বলে হাত ধরে তারা যখন আমাদের দেশের রোগীকে হাসপাতালে ঢোকান, তখন এই বাঙালির নরম হৃদয় আবেগে আপ্লুত হয়। ভুলেও এই বাঙালি বুঝতে পারে না যে “দাদা, দাদা” বলে ওনারা অলরেডী গাছের গোড়া কাটা শুরু করেছেন….

২. পেইড মিডিয়াঃ এটাও কি বলে দিতে হবে যে কোন্ কোন্ মিডিয়া এই পেইড দলের অন্তর্ভুক্ত? যদি ধরতে না পারেন তবে epic fantasy novel series– “A Song of Ice and Fire” এর একটি ডায়ালগ মনে করিয়ে দেই- “You know nothing, Jon Snow”…..

৩. পেইড এজেন্টঃ ইন্ডিয়ায় পোষ্ট গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট হয় ৩ বছরে, যেখানে আমাদের দেশে লাগে ৫ বছর। ৩ বছরে তৈরি হওয়া এই দুর্বল বিশেষজ্ঞের কিছু অংশ নিজ দেশে ভাত না পেয়ে আমাদের দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দুর্বলতায় এদেশে আসন গাড়ে।হাজার হাজার টাকা ভিজিট নিয়ে একসময় বলে পরবর্তী চিকিৎসা হবে ইন্ডিয়ায়, ইন্ডিয়ার ভিজিটিং কার্ডটাও ধরিয়ে দেয়।কি বিশ্বাস হয় না? লিঙ্ক লাগলে বলবেন, খবরটা ধরিয়ে দেব।

একটা কথা না বললেই নয়-এই পেইড মিডিয়া ও পেইড এজেন্টের জন্যই আজ বাংলাদেশে Kidney Transplant বন্ধ হবার দশা, কিছু চিকিৎসকদের অনৈতিকতাও দায়ী।ইন্ডিয়াতে গেলে এই অপারেশনের খরচ পড়ে ১৫-২০ লাখ টাকা, এর ঝুটা একটা অংশ এই পেইড মিডিয়া ও এজেন্ট পায়।বাংলাদেশে এই অপারেশন শুরু হবার পর “ঝুটা” বন্ধ হবার উপক্রম হলো, কাজেই প্ল্যান করে Kidney Transplant বন্ধ করা হলো।বাংলাদেশে এই অপারেশনের খরচ পড়তো ২ লাখ টাকা।নিজ দেশের হাজার হাজার লোকের জীবন তো বাঁচতোই, কম খরচের জন্য এসব দক্ষ চিকিৎসকদের কাছে দেশের বাইরে থেকেও রোগী আসারও সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিলো।এদেশের টাকা এদেশে থাকার সাথে সাথে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের এ খাতটি এখন ধংসপ্রায়।

৪. সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আশ্চর্যজনক নীরবতাঃ  পেইড মিডিয়া ও পেইড এজেন্টের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সন্দেহজনকভাবে নীরব। নীরবতার কারণটা কি?

৫. সাধারণ জনগণের  তুলনামূলক তথ্যর অভাবঃ তুলনামূলক দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো রোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভালো নাকি ইন্ডিয়া ভালো -সে তথ্য সাধারণ জনগণের অজানা। এ ব্যাপারে তারা নির্ভর করে আরেক সাধারণ লোকের মনগড়া তথ্যকে।চায়ের দোকানদারও চা-বানাতে বানাতে বলে,” ইন্ডিয়ার চিকিৎসার উপ্রে কিছু নাই”….আমরা চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বলি, “কথাডা মিছা না, কথা সত্য”।

৬. আমি তো এমনি এমনি যাইঃ হরলিক্সের একটা বিজ্ঞাপনে এক বাচ্চাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো সে কেন হরলিক্স খায়? উত্তরটি ছিলো–” আমি তো এমনি এমনি খাই”….ঠিক তেমনি কিছু লোককে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, ‘চিকিৎসার জন্য ইন্ডিয়া কেন যান?’ উত্তর -“আমি তো এমনি এমনি যাই, ভালো লাগে”। এ গর্দভকুলের সংখ্যা কম নয়।

পরিশেষ

“হে বঙ্গ, ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন;—

তা সবে, (অবোধ আমি!) অবহেলা করি, পর-ধন-লোভে মত্ত, করিনু ভ্রমণ…… ”

স্পেসিফিক কিছু ডিজিজের সমাধানে ইন্ডিয়া এই দেশ থেকে বেটার হতে পারে, এ কথা অস্বীকার করি না।কিন্তু তা বলে ঢালাও ভাবে এদেশ থেকে চিকিৎসার জন্য ভারতে যাওয়া যুক্তিহীন। এ ধরণের উদ্ভট কর্মকান্ড নিজের দেশপ্রেমকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, নিজের মূর্খতাকে উন্মোচিত করে। আমি জানি বাংলাদেশ এখনও চিকিৎসা শাস্ত্রে কাঙ্খিত অর্জন থেকে দূরে আছে।কিন্তু ইন্ডিয়া তার বিকল্প নয়।এই বঙ্গ-ভান্ডারে অনেক চিকিৎসক রত্ন রয়েছেন।তাদের উপর আস্থা রাখুন, তাদের সেবা নিন।দেশের কারেন্সি দেশেই রাখুন, দেশকে সমৃদ্ধ করুন…..




শরীরটাকে খাটান, সুস্থ থাকুন।

হাত-পাগুলো ফেলে রাখার জন্য নয়, রোজ নিয়ম করে শরীরটাকে একটু খাটান। রোজ মাত্র আধঘন্টা সপ্তাহে অন্তত ছ’টা দিন। একান্তই না-পারলে কম করে তিনদিন। পরিশ্রম করলে হৃদযন্ত্রের ক্ষমতা বাড়ে, বাড়ে করোনারি ধমনীর বিকল্প প্রাকৃতিক বাইপাস। কমে করোনারী ধমনীর বিকল্প প্রাকৃতিক বাইপাস। কমে করোনারি হৃদরোগের আশঙ্কা, হার্ট অ্যাটাকের ভয়। বিশেষ করে যেসব পেশায় মানসিক পরিশ্রম বেশি, শরীরের খাটনি প্রায় নেই, হার্ট বাঁচাতে এমন পেশার মানুষকে খাটাতে হবে শরীরটাকে। অথবা যোগ্য প্রশিক্ষকের কাছে শিখে নিতে হবে হৃদয় ভাল রাখার উপযুক্ত যোগাসন।

জোরে হাঁটা, দৌড়োনো, সাঁতার কাটা, নাচা, স্কেটিং, মাঠে খেলা বা জোরে সাইকেল চালানোর মতো ‘এরোবিক এক্সারসাইজ’- এর যে-কোনও একটা বেছে নিন। যেটা পছন্দ হয় বা সুবিধাজনক মনে হয়। এতে শরীরে অক্সিজেনের জোগান বাড়বে, বাড়বে করোনারি ধমনীর নেটওয়ার্ক। শরীরের ক্ষমতা বেড়ে আনন্দ বাড়বে, ঝরে যাবে বাড়তি ওজন। কমবে কমবেই হার্ট অ্যাটাকের ভয়।

নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমে শুধু ওজন কমে না, কমে রক্ত চাপ আর কোলেস্টেরলের মাত্রা, কমে ডায়াবেটিসের ভয়। হার্ট অ্যাটকের আশঙ্কা তাই একভাবে নয়, কমে নানা ভাবে। এ ছাড়াও শারীরিক পরিশ্রমে শরীরে ফুর্তি আসে, কমে মনের চাপ। হাড় আর সন্ধি গুলোর জোড় বাড়ে। বাড়ে যৌন সক্ষমতা। এবার আপনার মত করে বেছে নিন যে কোন একটা ব্যায়াম বা খাটুনি। শুরু করতে গড়িমসি নয় শুরু হোক আজই। মাঝে মধ্যে মনে পড়লে নয়, রোজ নিয়ম করে করুন যে-কোন একটা ব্যায়ামঃ2_150090

  • ঘণ্টায় পাঁচ কিলোমিটার বেগে ত্রিশ মিনিট হাঁটুন।
  • ঘন্টায় ছয় কিমি বেগে তেইশ মিনিট বা সাড়ে ছয় কিমি বেগে সতেরো মিনিট হাঁটুন।
  • অত হিসেব না করে যতটা জোড়ে পারেন একটানা কুড়ি মিনিট হাঁটুন।
  • আধ ঘন্টা ফ্রী-হ্যান্ড ব্যায়াম করুন সারা শরীরের।
  • মাঝারি বেগে দশ মিনিট সিঁড়ি ওঠানামা করুন ।
  • জোড়ে তিন চার কিমি সাইকেল চালান ফাঁকা রাস্তায়।
  • এক কিমি বা কুড়ি মিনিট সাঁতার কাটুন।
  • কুড়ি মিনিট ব্যাডমিন্টন খেলুন।
  • আধ ঘন্টা জোড়ে হাঁটুন ছাদে বা বাগানে।
  • এক ঘন্টা কাজ করুন বাগানে।
  • আধ ঘন্টা নাচুন।
  • আধ ঘণ্টা স্কেটিং করুন।
  • দশ মিনিট ফাঁকা মাঠে দৌড়োন।

একবারে না পারলে আস্তে আস্তে বাড়ান, বিশেষ করে বয়স চল্লিশ বা তার বেশি হলে।

অ্যানজাইনা থাকলে, অন্য কোনও বড় শারীরিক সমস্যা থাকলে, হার্ট অ্যাটাক হয়ে গিয়ে থাকলে ব্যায়াম অবশ্যই করবেন আপনার চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে।




কোলেস্টেরল বেশি থাকলে সপ্তাহে ক’টা ডিম খাওয়া যাবে?

কোলেস্টেরল বেশি থাকলে ডিমের সাদা অংশ খেতে কোনও অসুবিধা নেই, সপ্তাহে সাত দিনই খাওয়া যেতে পারে। একটা ডিমের কুসুমে ২৫০-৩০০ মিগ্রা কোলেস্টেরল থাকে। কোলেস্টেরল কিছুটা বাড়লে দিনে কোলেস্টেরল শরীরে ঢুকবে সর্বোচ্চ ৩০০ মিগ্রা, এমনটাই হওয়া বাঞ্ছনীয়। ডিম ছাড়াও অন্য প্রাণীজ খাবার থেকে শরীরে কিছুটা কোলেস্টেরল ঢুকবেই।

তাই মাঝারি মাত্রায় কোলেস্টেরল বৃদ্ধিতে সপ্তাহে তিন দিন গোটা বা অর্ধেক ডিম, অন্য তিন দিন ডিমের সাদা অংশ খাওয়া যেতে পারে। কোলেস্টেরল খুব বেশি বাড়লে দিনে সর্বোচ্চ খাদ্যঘটিত কোলেস্টেরল চলতে পারে ২০০ মিগ্রা। এরকম হলে ডিমের সাদা অংশ খাওয়াই ভাল। মাঝে মধ্যে ইচ্ছে হলে এক-আধদিন একটা গোটা ডিমের পোচ বা সেদ্ধ খাওয়া যেতে পারে।




চা, কফি বেশি খাওয়ার সঙ্গে হার্ট অ্যাটাকের সম্পর্ক আছে কি?

আগে এ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও অতিরিক্ত মাত্রায় চা বা কফি খেলে করোনারি হৃদ্ররোগ আর হার্ট অ্যাটাক বাড়ে বলে গত দু’দশক নানা দেশের নানা সমীক্ষায় জানা গেছে। চা বা কফির ক্যাফিন বেশি মাত্রায় শরীরে ঢুকলে রক্তচাপ বাড়ে। ক্যাফিন রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রাও বাড়ায়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে দিনে যথাক্রমে এক, তিন ও নয় কাপ কফি খাওয়া মানুষের রক্তে গড় কোলেস্টেরলের মাত্রা যথাক্রমে ২২৩, ২৩৭ ও ২৫৩ মিগ্রা%।

অর্থাৎ কফি পানের মাত্রা বাড়লে কোলেস্টেরলের মাত্রাও বাড়তে থাকে। অতিরিক্ত চা বা কফি পানের সঙ্গে হৃদস্পন্দনের অনিয়ম [ Irregular Heart Beat]- এর সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন আমেরিকার হিউস্টনের কলেজ অব মেডিসিনের এক গবেষক। এরকম নানা ভাবে হৃদপেশিতে রক্ত সরবরাহ কমায় অতিরিক্ত কফি বা চা পান। হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কাও বাড়ে।

তথ্যসূত্রঃ ডা. শ্যামল চক্রবর্তী, রক্তচাপ কোলেস্টেরল হার্টঅ্যাটাক।