নুন কমান, হার্ট বাচান (৪র্থ পর্ব )

এ দেশের মানুষ দিনে গড়ে নুন খান প্রয়োজনের তুলনায় দুই থেকে তিন গুন (৫ গ্রাম বনাম ১০-১৫  গ্রাম)। ভারতীয়দের মধ্যে রক্তচাপের প্রাবল্য, স্ট্রোক আর কোরোনারি হৃদ রোগের প্রকোপ এত বেশি হবার পেছনে বেশি নুন খাওয়ার অভ্যাস গুরুত্বপূর্ন একটা কারণ।

বেশি নুন খেলেও শরীরে অতিরিক্ত সোডিয়ামের আঁচ না-লাগতে পারে কিডনি বেশি নুন শরীর থেকে ছেঁকে বার করে দিতে পারলে। কোন মানুষের কিডনিই এ-কাজে ততটা সক্ষম নয়। আগে বলা ‘ইন্টারসল্ট স্টাডি’র সঙ্গে যুক্ত ভারতীয় চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের এ সংক্রান্ত বক্তব্যের উল্লেখ এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক হবে। এখন আমাদের ভারতীয়দের শরীর নুনের ছড়াছড়ি, বলেছেন ঐ বিজ্ঞানীরা। এত বেশি নুনের ক্ষতি থেকে বাচার মতো কোনও সুরক্ষা এখনও পর্যন্ত ভারতীয়দের শরীরে তৈরি হয়নি। যে ভাবেই হোক, সুস্থতার জন্য খাবার দাবারে নুনের পরিমাণ তাই কমাতে হবে।

হৃদ্ররোগ আটকাতে খাবারে নুনের ব্যবহারে পরিমিত আনার কোনও বিকল্প নেই। বেশি নুনে অভ্যস্ত মানুষ কম নুনের খাবারে স্বাদ পান না। তার মানে এই নয় যে কম নুনের খাবার মানেই খাবারের স্বাদ কমে যাবে। স্বাদ বোধের ধারনাও অনড় নয়, একই মানুষের স্বাদবোধও নানা ভাবে বদলে যেতে পারে। জিভের স্বাদ কোরকগুলোকে ধীরলয়ে কম নুনের খাবারে অভ্যস্ত করে তোলা কঠিন নয়। কঠিন নয় পর্যায়ক্রমে নুন কমাতে কমাতে কম নুনের খাবারে রপ্ত হয়ে ওঠা।

নোনতা খাবার বা বেশি নুনের খাবার যতই সুস্বাদু মনে হোক, কম নুনে অভ্যস্ত  মানষ এরকম খাবারে অস্বস্তি বোধ করেন। নুন কম খাওয়ার রপ্ত হয়ে ওঠাটাই তাই মুল প্রয়োজন। নোনতা খাবার দেখে জিভের  জল টেনে কষ্ট করে পেছন ফিরে থাকার চাইতে কম নুনে রপ্ত হওয়ায় নোনতা খাবারের মখোমুখি অবিচলিত থাকা- হৃদ রোগ আটকাতে এই দ্বিতীয় পদ্ধতিই বাস্তবসম্মত। বিজ্ঞানসম্মতও।

লিখেছেন  ডাঃ শ্যামল চক্রবর্তী




ক্যানসার চিকিৎসার ইতিহাস

ক্যানসার চিকিৎসার ইতিহাসকে মোটামুটি দুইভাগে ভাগ করা যায়। p53 আবিষ্কারের আগের পর্যায়, p53 আবিষ্কারের পরের পর্যায়।

p53 জিনিসটা তাহলে কী?
যে আঙ্গুল দিয়ে একটু আগে মাউসে ক্লিক করেছি সেখান থেকে একটা কোষ নেই। কোষের ভেতরে নিউক্লিয়াসে যাই। সেখানে গেলে দেখতে পাবো সুতার মতো দেখতে ২৩ জোড়া ক্রোমোজোম নাচানাচি করছে। সবচেয়ে লম্বা ‘ক্রোমোজোম কাপল’টির নাম দেই ক্রোমোজোম নাম্বার এক। পরেরটির নাম দেই ক্রোমোজোম নাম্বার দুই। এভাবে সাজাতে থাকি।
সাজানো শেষ হলে ১৭ নাম্বার ক্রোমোজোমটি হাতে নেই। এই ১৭ নাম্বারের ভেতরেই লুকিয়ে আছে আমাদের p53 জিন। প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন স্যার ডেভিড লেইন। সুন্দর একটা বিশেষণও দিয়েছিলেন p53কে – ‘গার্ডিয়ান অব জিনোম’।

আমাদেরকে ক্যানসারের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য এই জিনটি প্রতি মুহূর্তে যে প্রক্রিয়ায় কাজ করে যাচ্ছে তা পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর কবিতাটির চেয়েও সুন্দর, সবচেয়ে রহস্যময় গল্পটির চেয়েও রহস্যময়।

একটা উদাহারণ দেই।
আমাদের বেঁচে থাকার জন্য কোষ বিভাজন একটি অনিবার্য প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় মা কোষ থেকে নতুন বাচ্চা কোষ তৈরী হয়। তৈরি হওয়ার সময় স্বাভাবিকভাবেই মা কোষের ডিএনএর কপি যায় বাচ্চা কোষে। মা কোষের ডিএনএ’তে কোনো সমস্যা থাকলে সেটা বাচ্চা কোষে যাবে – এটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু স্বাভাবিক অবস্থায় নষ্ট ডিএনএ-ওয়ালা মা কোষ নতুন বাচ্চা কোষ তৈরি করতে পারেনা। কারণ আমাদের আছে জিনোমের গার্ডিয়ান – THE p53!

এই p53র দুইটি হাত। এক হাত থাকে পকেটে। পকেটে কী থাকে সেটা পরে বলছি।
আরেক হাতে থাকে লাঠি। এই লাঠি নিয়ে সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। সুস্থ মা কোষ বাচ্চা তৈরি করার প্রস্তুতি নিলে p53 কিছুই করেনা। সে মা’কে তার কাজ করতে দেয়।
কিন্তু… যখনই একটা একটা অসুস্থ ডিএনএ-ওয়ালা মা কোষ নতুন কোষ তৈরির প্রস্তুতি নেয় তখনই মাঠে নামে আমাদের p53। প্রায় আক্ষরীক অর্থেই p53 লাঠি দিয়ে অসুস্থ মা কোষকে পেটানো শুরু করে। আর বলতে থাকে, ‘এত বড় সাহস! নষ্ট ডিএনএ নিয়ে এসেছো বাচ্চাকাচ্চা ফুটাতে? যাও ডিএনএ ঠিক করে তারপর আসো।’

মা কোষটি যতোবার ডিএনএ ঠিক না করে নতুন কোষ তৈরি করতে আসবে ততবারই p53 তাকে পিটিয়ে বাড়ি পাঠাবে। ডিএনএ ঠিক করে আসলে তবেই সে এলাউ করবে – ওকে ফাইন, তুমি এবার বংশ বৃদ্ধি করতে পারো।

কিন্তু এমন যদি হয় – ডিএনএ-তে এতো বেশি গন্ডোগোল যে মা কোষ আর তার ডিএনএকে কোনোভাবেই ঠিক করতে পারছেনা সেক্ষেত্রে p53 কী করে?
আগেই বলেছি p53-র এক হাত থাকে পকেটে। ঐ হাতে আসলে ধরা থাকে একটি পিস্তল।
এক্ষেত্রে p53 আর লাঠি দিয়ে পেটায় না। সে পকেট থেকে তার পিস্তলটা বের করে। পিস্তলটা মা কোষের হাতে দেয়। দিয়ে বলে, ‘তোমার আর এ নষ্ট জীবন রেখে কী হবে? তুমি বরং আত্মহত্যা করো।’
মা কোষ বাধ্য মেয়ের মতো p53-র কথা শুনে। সে নিজের কপালে পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করে এবং মরে যায়। এই প্রক্রিয়ার নাম হচ্ছে এপোপটোসিস।

এই হচ্ছে p53-র জাদু।

যদি কোনো কারণে আপনার p53 নষ্ট হয়ে যায় তাহলে ক্যানসার হওয়ার সম্ভবনা অনেকগুন বেড়ে যাবে। হয়ও তাই। প্রায় ৫০ থেকে ৬০ ভাগ ক্যানসারে দেখা যায় p53-র মিউটেশন হয়ে গেছে এবং সে লাঠিও তৈরি করতে পারছেনা, বন্দুকও তৈরি করতে পারছেনা।

আজ থেকে ঠিক ৩৭ বছর আগের এই দিনে স্যার ডেভিড লেইন তার গবেষণাটি লিখেছিলেন : p53-গার্ডিয়ান অব জিনোম।




খাবারে নুন আর হৃদরোগ (৩য় পর্ব)

নুন কমানো কঠিন নয়।

২০০৩ সালে মজার একাটা পরীক্ষা হয়েছে অস্ট্রেলিয়াতে। পাউরুটি তৈরি করতে ময়দায় নুন মেশানো হয় যে-কোনও দেশে। অস্ট্রেলিয়ার একদল হৃদবিজ্ঞানী সে দেশের সরকারের অনুমতি নিয়ে কাজ শুরু করে সে দেশের নির্দিষ্ট কিছু পাউরুটি তৈরির বেকারিতে। রুটি তৈরিতে নুনের ব্যবহার একটু একটু করে কমাতে কমাতে আগেকার তুলনায় পচিশ শতাংশ কমিয়ে আনা হয় দীর্ঘ দেড়মাস সময়ে। দেখা গেল, পাউরুটিতে নুন যে কমেছে তা ধরতে পারেননি এমনকি এই কারখানাগুলোর পাউরুটির সঙ্গে নুন কমানো হয়নি এমন কারখানায় তৈরি পাউরুটি স্বাদের ফারাকও।

অস্ট্রেলিয়ার এই পরীক্ষার ফলাফল থেকে শেখার আছে অনেক। আগে ভাবা হত, যে-কোনও মানুষের ‘নুনের খিদে’ একান্তই তার নিজস্ব। ‘নুনের খিদে’ বেশি, এমন খাবারে কম নুন হলে চলে না বলে ভাবতেন বিজ্ঞানীরা। অস্ট্রেলিয়ার পাউরুটির কারখানার গবেষনায় বোঝা গেছে, এরকম ধারণা ছিল ভুল। কোনও মানুষেরই ‘নুনের খিদে’ বলে কিছু থাকে না। বেশি নুনের মানুষের রপ্ত হওয়া নিছক এক অভ্যাসমাত্র।

নুন খাওয়া বেশি হলে বা খাবারে নুন বাড়াতে থাকলে জিভের ‘স্বাদ কোরক’ (Taste Bud)- গুলো বেশি নুনে রপ্ত হতে থাকে। এরকম হলে দুম করে খাভারে নুন কম থাকলে স্বাদ কোরকগুলো উদ্দীপিত হয় না কম নুনে, খাবারও বিস্বাদ লাগে। পাশাপাশি খাবারে নুন ধীরলয়ে কমাতে থাকলে বদলে যেতে থাকে জিভের স্বাদবোধ। তখন কম নুনের খাবারেও স্বাদ কোরকের উদ্দীপনায় তৃপ্তি আসে, বিস্বাদ লাগে না। একবার কম নুনে রপ্ত মানুষের উলটে বেশি নোনতা খেতে কষ্ট হয়, স্বাদ পাওয়া যায় না এরকম বেশি নুনের খাবারে। গত দু’দশক ধরে খাবারে কম নুনে অভ্যস্ত বর্তমান লেখকের অভিজ্ঞতাও বলে একই কথা।

লিখেছেন  ডাঃ শ্যামল চক্রবর্তী




ব্রণশোধ ( LOCALISED INLAMMATION)

সুপ্রাচীন আয়ুর্বেদ চিকিৎসায় শরীর পীড়াগুলিরও শ্রেনী বিন্যাস করেছেন, যেমন নাড়ীব্রণ, সদ্যোব্রণ, শরীর ব্রণ, ব্রণ শোধ প্রভৃতি। এর নামকরণও বিশেষ অর্থ- ব্যঞ্জক। এর কারন রোগগুলির সম্প্রাপ্তিও যেমন পৃথক স্থানভেদও পৃথক, আবার লক্ষণও পৃথক এবং তার চিকিৎসাও বিশেষ পার্থক্য আছে। ওইসব রোগের কোন কোনটা আগন্তুক হয়ে আসে, তার কারন হয়তো কোন ভেষজও হতে পারে। সেই সব ভেষজের একটি নামও হয়তো তার ক্রিয়া প্রকাশিকার ইঙ্গিত দিয়ে রাখা হয়েছে- যেমন ভল্লাতক, যার প্রচলিত নাম ভেলা (Semecarpus anacardium)- এর ফলের আঠা গায়ে লাগলে ঘা হয়। যেমন ব্রণঘ্নী মানে ছোট উচ্ছে- এর ডাটা পাতা বেটে লাগালে ছোট ফোড়া সেরে যায়। আবার বয়োব্রণ, গালের ব্রণও এর উপশামক।

তা যাক, আয়ুর্বেদের মতে ব্রণ (যেকোন ফোড়া) দেহের সব জায়গায় ফোড়া একই পদ্ধতিতে চিকিৎসার বিধি নেই। কোনটাকে বসাতে হয়, কোনটাকে ফাটাতে হয়, কোন- টাকে বাড়িয়ে দিয়ে তারপর তাকে সারাতে হয়। তবে সবই নির্ভর চিকিৎসকের বিচার বিবেচনার উপর। কারণ ব্রণ শোথের ভাল চিকিৎসা না করলে অরিষ্ট লক্ষন দেখা দিতে পারে, তবে সেটা পৃথক পৃথক হতে পারে, এটা যদি মর্মস্থানে পরিসর্পিত হয় এবং সেখানে শোধ হয়,তার সঙ্গে জ্বর থাকে ও হিক্কা হতে থাকে, তবেই সেটা হবে অরিষ্ট লক্ষন।

[সূত্রঃ চিরঞ্জীব বনৌষধি, ৪র্থ খণ্ড]




হাঁটার উপকারিতা

কাউকে চিকিৎসা হিসেবে হাঁটার প্রেসক্রিপশন দিলে হয়তো তেমন মনঃপুত হবে না। কিন্তু সত্যিকার অর্থে বিনে পয়সায় এর চেয়ে ভাল ওষুধ খুব কমই আছে। আমরা সবাই জানি ব্যায়াম করা শরীরের জন্য উপকারী। এজন্য আমরা মনে করি জিমে যেয়ে অনেক ভারী ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে ব্যায়াম করতে হবে। কিন্তু হাঁটা একটি অতি সহজ ব্যায়াম। বিনে খরচার এই ব্যায়ামের উপকারের কোন তুলনা হয় না।

প্রতিদিন নিয়মিত ২১ মিনিট অর্থাৎ সপ্তাহে আড়াই ঘণ্টা করে হাঁটলে হৃদরোগের ঝুঁকি ৩০ শতাংশ কমে যায়। কোন যন্ত্রপাতি ছাড়া যে কোন জায়গায় এই সহজ কাজটি করলে হৃদরোগ ছাড়াও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকে, ক্যানসারের ঝুঁকি কমে যায়; রক্তচাপ এবং রক্তে কোলেস্টেরলের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে থাকে; আর মস্তিস্ক থাকে সতেজ এবং সক্রিয়।

হাঁটার আরও পাঁচটি উপকারিতাঃ

১) হাঁটা আমাদের শরীরের ওজন বাড়ানোর জিনের কাজ কমিয়ে দেয়। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির গবেষকগণ ১২,০০০ মানুষের ওপর ৩২ রকমের ওজন বাড়ানোর জিন নিয়ে পরীক্ষা করেছেন। এতে দেখা গিয়েছে দৈনিক এক ঘণ্টা জোরে জোরে হাঁটলে ওজন বাড়ানোর জিনের কার্যকারিতা অর্ধেক কমে যায়।

২) হাঁটলে মিষ্টি খাওয়ার ইচ্ছে কমে যায়। সাধারণত যাদের মিষ্টি খাওয়ার লোভ বেশী তাদের ওজন সহজে বেড়ে যায়। কিন্তু নিয়মিত ১৫ মিনিট হাঁটলে চকলেটসহ অন্যান্য মিষ্টি খাওয়ার ইচ্ছে কমে যায়। যারা বেশী হাঁটেন তাদের যেকোন ধরণের মিষ্টিযুক্ত খাদ্যগ্রহণের প্রবণতা কম থাকে।

৩) হাঁটলে স্তন ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। যেকোনো ধরণের ব্যায়াম স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি কমায়। তবে আমেরিকান ক্যানসার সোসাইটির সমীক্ষায় দেখা যায়, যে সকল মহিলা সপ্তাহে কমপক্ষে সাত ঘণ্টা হাঁটেন তাদের স্তন ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম।

৪) হাঁটলে বাতের ব্যাথা কমে যায়। অনেকগুলি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে বাতের জন্য হাঁটা উপকারী। যারা সপ্তাহে অন্তত পাঁচ থেকে ছয় মাইল হাঁটেন তাদের মধ্যে বাতের প্রকোপ কম। হাঁটলে আমাদের বোন জয়েন্ট বা অস্থিসন্ধিসমূহ সুস্থ থাকে। ফলে বাতের প্রকোপ লাঘব হয়।

৫) হাঁটলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। যারা নিয়মিত হাঁটেন তাদের সর্দি-গর্মি কম হয়। প্রায় ১০০০ মহিলা এবং পুরুষের ওপর দীর্ঘদিন সমীক্ষা করে দেখা গিয়েছে যারা প্রতিদিন অন্তত ২০ মিনিট করে সপ্তাহে পাঁচদিন হাঁটেন, তাদের অসুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা অন্যদের চেয়ে প্রায় অর্ধেক কম।

অতএব সুস্থতার জন্য হাঁটুন। হাঁটুন এবং সুস্থ থাকুন।




খাবারে নুন আর হৃদরোগ (২য় পর্ব)

বেশি ভোগেন কালো মানুষ

আমাদের মত বা যে-কোনও দেশের কালো চামড়ার মানুষের পক্ষে খাবারে বেশি নুন সাদা চামড়ার সাহেবদের চাইতে বেশি ক্ষতিকর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিগ্রো আর সাদাদের মধ্যে শরীরে বেশি নুনের  তুলানামুলক প্রভাব নিয়ে দীর্ঘ গবেষনার পর এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা। শরীরে নুনের প্রভাবের এই  অযৌক্তিক বর্ণবৈষম্যের কারণটা এখন আর অজানা নয়, জানা।

শরীরে খাবারের সঙ্গে ঢোকা নুনের একটা অংশ কিডনি দিয়ে ছেঁকে বেরিয়ে যায় মূত্রের সঙ্গে। কালো মানুষদের কিডনি রক্তের নুন ছাঁকতে পারে কম, সাদাদের বেশি। সাদাদের তুলনায় কালো মানুষের মূত্রের মাধ্যমে শরীর থেকে নুন বার হতে পারে বেশি। জানা গেছে, একজন মানুষের শরীরে ছাকনিযন্ত্র কিডনি কিভাবে মোকাবেলা করছে রক্তে থাকা নুনের, তার ওপর নির্ভর করে ওই মানুষটির রক্ত চাপের দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রন। সাদা চামড়ার মানুষের শরীরে নুনের মাত্রা স্বাভাবিক রাখতে বেশি সক্রিও থাকে কিডনি। কালো চামড়ার মানুষের কিডনির এক্ষত্রে সক্রিয়তা তুলনায় কম।

বেশি নুন শরীরে ঢুকলে তাই শরীরে নুনের ক্ষতিকর প্রভাব বেশি পড়বে আমাদের মতো কালো মানুষের। বাড়বে রক্তচাপের বাহুল্য, ক্রোনারি ধমনীর গহ্বর সরু হয়ে করীনারি হৃদরোগে ভোগার ঝুকিও বাড়বে। সাদা চামড়ার মানুষের এরকম রোগের ঝুঁকি তুলনায় কম।

এ শরীরে নুনের কথা

নুন বেশি খেলে রক্তচাপ বাড়ে। রক্তচাপ বাড়লে নুন খাওয়া কমিয়ে দিলে আবার রক্ত চাপের মাত্রা সামান্য হলেও কমে। নান গবেষনায় এই তথ্য প্রমাণিত হয়েছে বারাবার। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা তাই অনেক কাল থেকে বেশি নুন খাওয়া এড়িয়ে চলতে বলেছেন। বিশেষ করে রক্তচাপ বাড়লে এরকম নিয়ন্ত্রন আরও কোঠর করে দৈনিক শরীরে ঢোকা নুনের মাত্রাকে পাঁচ গ্রামে সীমাবদ্ধ রাখতে বলা হয়। শরীরে ঢোকা নুনকে  কীভাবে মোকাবেলা করবে আপনার কিডনি তা নির্ভর করে নির্দিষ্ট কিছু শর্তের ওপর।

বংশগতি, খাদ্যাভ্যাস, পুষ্টির মান আর বেঁচে থাকার পরিবেশের ওপর নির্ভর করে আপনার আমার শরীরে ঢোকা নুনের ভবিষ্যৎ। নির্ভর করে শরীরে খাবারে বিপাক আর নির্দিষ্ট কিছু হরমোনের মাত্রার ওপরও, এই শর্তগুলো ঠিক করে দেয় শরীরে ঢোকা অতিরিক্ত নুন কতটা ক্ষতি করবে কিডনির, ধমনীর, হৃদযন্ত্রের।

অনেক অনেককাল আগে পরিবেশে নুনের পরিমাণ ছিল প্রয়োজনের তুলনায় কম। লবনের স্বল্পতায় সেই আদিম পরিবেশে মানুষ নুন পেলে নির্দিষ্ট জিনের প্ররোচনায় একটু বেশি নুন খেয়ে শরীরে নুনের ভারসাম্য বজায় রাখত। পরে পরিবেশের নুন অনেক অনেক বেড়ে গেলেও নুন খেতে প্ররোচনা দেওয়া সেই প্ররোচক জিন থেকে গেছে আমাদের শরীরে। এরকম জিনের প্ররোচনা (Genetic Thrive)-য় আপনি আমি নুন খেতে ভালোবাসি এমন একটা ধারনা আগে অনেকের মধ্যে ছিল।

গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে এরকম ধারণার অসারতা। জানা গেছে, পরিবেশে নুনের জোগান ব্যাপক ভাবে বাড়তে থাকায় মানুষের শরীরে লুপ্ত হয়ে গেছে ওই নুনলোভী জিন। বেশি নুন খাওয়া সভ্য সমাজের অভ্যাসমাত্র। সংস্কার বলা যায় একে। গবেষকরা প্রমান করেছেন, একদিনে নয়, পর্যায় ক্রমে কমাতে দিনে নুন খাওয়ার স্বাস্থ্যকর পাঁচগ্রামে নামিয়ে আনা আদৌ কঠিন নয়।

লিখেছেন  ডাঃ শ্যামল চক্রবর্তী




খাবারে নুন আর হৃদরোগ

(১ম পর্ব)

প্রেশার ধরা পড়ার পর থেকে ডাক্তার কাঁচা নুন খেতে বারন করছেন। আমি তাই নুনটাকে একটু ভেজে  নিয়ে খাই, প্রমীলাবাহিনীর বৈকালিক আড্ডায় সূত্রপাত ঘটালেন সরমাপিসি। না না, ভাজা নুনও প্রেশারে চলে না, তুমি বরং আমার মতো সৈন্ধব নুন খাওয়া শুরু করে দাও, ফরমান জারি করলেন বেলামাসি। একমনে পান সাজতে সাজতে মা বলে উঠলেন, না, না কোন নুনই চলবে না ব্লাড প্রেশার বাড়লে। নীল তো তাই বলে। অমনি সবাই মিলে রে রে করে উঠলেন উচ্চকণ্ঠে। শুরু হল হট্টগোল। মেয়েদের আড্ডায় একটা সময় যা হয়। সবাই বলে যান, কেউ শোনেন না অন্যের কথা।

বাণীপিসির গলাটা চড়েছে সবচাইতে বেশী, আরে, রাখো তোমার ডাক্তারদের কথা! নুন ছাড়া আবার মানুষ  খেতে পারে?  যতদিন বাঁচব নুন খেয়ে যাব, যে যাই বলুক, যেন উচ্চকণ্ঠে খেয়াল গাইছেন বেলামাসি। গোলমালটা একটু থিতিয়ে আসতেই সুরভিত জর্দা- ঠাসা একটা পান মুখে পুরে একটু রসস্থ হলেন সরমাপিশি। মৃদু রস ছুয়ে গেল আড্ডাকেও । সুন্দরবনের বাঘের পেটে এত নুন ধোকে নোনা জল খেয়ে খেয়ে, জলদা পাড়ায় দেখেছি গণ্ডার চেটে খাবে বলীখানে ওখানে নুনের ঢিপি। কোথায় ওদের তো কিছু হয় না। বাঘ, সিংহ, গণ্ডারের প্রেশার বাড়ে বলে তো শুনুনি! কেও কখনও শুনেছ প্রেশার বেড়ে হার্ট অ্যাটাক  হয়েছে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের? আরও এক প্রস্থ রস ঢাললেন বেলামাসি। হোঃ হোঃ করে হেসে উঠলেন সবাই। পান মুখে হাসতে হাসতে বষম খাচ্ছেন মা, হাসির দাপটে কাঁপছে গোটা বাড়িটা।

নুন, রক্তচাপ আর হৃদরোগ

খাবারদাবারে নুনের মাত্রা স্বাভাবিকের চাইতে একটানা বেশি হলে রক্তচাপ বাড়ার আশঙ্খাও বাড়ে। রক্তচাপের প্রাবল্য একটানা চলতে থাকলে করোনারি ধমনির ভিতর চর্বি জমে, বেড়ে যায় করোনারি হৃদ্ররোগের ঝুঁকি। একই ভাবে মস্তিস্ক (Brain) র সেরিব্রাল ধমনীর দেওয়াল ফুলে বাড়ে সেরিব্রাল স্ট্রোকের আশঙ্খা।

হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরা এখন মনে করছেন, দিন পাঁচ গ্রামের মতো নুন বা সোডিয়াম ক্লোরাইড আমাদের শরীরের পক্ষে যথেষ্ট। এর চাইতে বেশি নুন বেশিদিন শরীরে ঢুকলে নানা ধরনের রোগভোগের আশঙ্খা বাড়বে, বাড়বে ওইসব রোগের নানা জটিলতার ঝুঁকি। চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা তাই কম বয়স থেকেই মন নুনের খাবারে রপ্ত হবার পরামর্শ দিচ্ছেন বহুকাল ধরে।

গুন যতই কম গাই না কেন, আমরা বাঙালীরা নুন যে অনেক বেশি খাই তা আর নতূন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। বিশেষজ্ঞদের হিসেব, এ দেশের মানুষ গড়ে দিনে নুন খান ১০ থেকে ১৫ গ্রাম। ভাতের পাতে নুন, ঝালনুনতেল কটকটে ঝোল-ঝাল। পেয়ারায় নুন, শশাতে নুন, স্যালাতে নুন, ডিমে নুন, সেদ্ধতে নুন, নুন আচারে ,চাটনিতে মুখশুদ্ধিতে। নিমকিতে নুন, ভাজায় নুন, নুন ভুজিয়া-মুড়ি-বাদামে। নানাভাবে প্রয়োজনের চাইতে অনেক বেশি নুন ঢোকে আমাদের শরীরে।

নুন মানে সোডিয়াম ক্লোরাইড, তা সে নুন কাঁচা হোক বা ভাজা। সাদা বস্তার নুন, প্যাকেটের নুন, আয়োডিন সমৃদ্ধ নুন, বিটনুন, কর্কচনুন বা সৈন্ধব লবণ যাই হোক, সব নুনেই রয়েছে সোডিয়াম ক্লোরাইড। সোডিয়াম ক্লোরাইড থাকা  সোডিয়াম শরীরে বেশি ঢুকলেই শরীরে একটানা বেশি ঢোকা তাই ক্ষতিকর। বেশি নুন খেলে শুধু রক্তচাপ বাড়ে না, বাড়ে শরীরের কোষের বাইরের জলের পরিমাণ দেখা দেয় আরও নানা শারীরিক সমস্যা।

বেশি নুন খাওয়ার অভ্যাস যে হৃদরোগের প্রকোপ বাড়ায়, বাড়ায় নানা ধরনের হৃদজটিলতার ঝুঁকি, এ তথ্য এখন সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণিত।

লিখেছেন  ডাঃ শ্যামল চক্রবর্তী




একের ক্ষয়ে অপরের বৃদ্ধিতে

পিত্ত ক্ষীণ হয়ে গিয়ে শ্লেষ্মা এসে বায়ুতে যেই মেশা, অমনি সর্বাঙ্গ ব্যেপে বায়ুর গতিটা ব্যাহত হয়, তখন শরীরে শীতও হয় আর প্রসাবের বেগও ঘন ঘন হয়। ঠিক সময়ে আসে জ্বর অথার্ৎ এ অবস্থায় সন্ধায় জ্বর হয়। সারারাত জ্বরের তাপ, অতএব ধরে নিতে হয় এর পিত্ত ক্ষয় হয়েই এই জ্বর।

আবার বায়ুটা ক্ষীণ হয়ে গিয়েছে কোন কারনে, অথচ শ্লেষ্মাটার ক্ষয় হচ্ছে না, সে এসে পিত্তকে ব্যাকুলিত করে-তখন সঙ্গে সঙ্গে সুরু হয় অম্বল, অজীর্ন, অগ্নিমান্দ্য, মাথার যন্ত্রণা, ঝিমুনী আর বুকে চাপ বোধ, এই ধরনের ক্ষেত্রে একটা শঙ্কার কারন থাকে, এদের আসতে পারে জ্বর , পেটের দোষ। কখন ফুটে উঠবে বলা যায় না।

মোটকথা, বায়ু-পিত্ত-কফের প্রকৃতি স্বরূপ আর দেহের কোথায় এরা নিত্য থেকেও অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে  রোগ সৃষ্টি করে, তা জানতে হলে বেশ গভীর মনবিস্তার প্রয়োজন।

তবে এমন কতগুলি অবস্তা দেখা দেয় যেগুলিকে দেখে বলা যায় এর দেহে এই ধাতুটির স্রোতে বেশ বিপত্তি দেখা দিয়েছে। যেমন বুকে ধড়ফড়ানি, কোন কিছু দুমদাম শব্দ শুনলে বুকে অস্বস্তি, বুক খালি খালি,  এগুলি দেখা দিলেই বুঝতে হবে এর রসবহ স্রোতে বিপত্তি।

[সূত্রঃ চিরঞ্জীব বনৌষধি, ২য় খণ্ড]




শিশুরোগ

আয়ুর্বেদে শিশুর সংজ্ঞা ৩ প্রকার। অর্থাৎ শিশুর বয়ঃসীমাকে ৩ ভাগে দেখা হয়। (১) দুগ্ধজীবী, (২) দুগ্ধন্নজীবী, (৩) অন্নজীবী। এখানে পথ্যাপথ্যের ব্যবস্থায় দুগ্ধজীবী শিশুর ক্ষেত্রে কেবল তার মাকেই চিকিৎসা করতে হবে, আর দুগ্ধন্নজীবীর জন্য উভয়কে, আর অন্নজীবীর জন্য সেই শিশুকেই ঔষধ ও পথ্যের ব্যবস্থা করতে হবে। তবে তার রোগ হলেই যে উপবাসে রাখতে হবে সেটাও বিধি নয়, তবে পুরোপুরি অন্নজীবী হলে তার স্বতন্ত্র ব্যবস্থা। এই জন্য শিশুর এ ত্রিবিধ অবস্থা বিবেচনা করে তার পথ্যের ব্যবস্থা করতে বলেছেন।

সুপ্রাচীন আয়ুর্বেদীয় বৈদ্যগণ মনে করেন যে, শিশুরোগের কারন গ্রহবৈগুণ্য, তাদের কোন চিকিৎসা ব্যবস্থা করতে হয় না, গ্রহদুষ্টি অপসৃত হলেই রোগ সেরে যাবে। কিন্তু যুক্তিবাদী আয়ুর্বেদীয় চিকিৎসক বলেন, বিনা কারনে কোন ব্যাধির সৃষ্টি হয় না, তখন ব্যাধির অস্তিত্ব দেখেই তার  কারন নিরসন করার ব্যবস্থা করতে হবে।

[সূত্রঃ চিরঞ্জীব বনৌষধি, ১ম খণ্ড]




রমজান ও ডায়াবেটিস

রোজা ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে অন্যতম স্তম্ভ। তাই রোজা রাখা প্রত্যেক প্রাপ্ত বয়স্ক মুসলমানদের জন্য অবশ্যকরনীয়। ডায়াবেটিস একটি বিপাক জনিত রোগ যার ফলে রক্তে শর্করার পরিমান বেড়ে যায়। বিশ্বের প্রায় ১৫৭ কোটি মুসলিম এর মধ্যে প্রতি বছর প্রায় ৫ কোটি ডায়াবেটিক রোগী রমজান মাসে রোজা পালন করেন। ১৩টি মুসলিম প্রধান দেশে রমজান মাসের রোজা পালন করেন। ১৩টি মুসলিম প্রধান দেশে জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে প্রায় ৮০ শতাংশ টাইপ ২ ডায়াবেটিসের রোগী নিয়মিত রোজা পালন করে থাকে। ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে যারা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া রোজা রাখেন তারা বেশ কিছু জটিলতার সম্মুখীন হন। এই আলোচনা থেকে একজন ডায়াবেটিস রোগী কিভাবে সুস্থ থেকে রোজা রাখতে পারবেন তা জানা যাবে।

 

ডায়াবেটিস রোগীরা রোজা রাখতে পারবেন কিনা এটা অনেকেরই জিজ্ঞাসা। ডায়াবেটিস রোগী রোজা রাখতে পারবেন। যাদের সামর্থ্য আছে তাদের ডায়াবেটিস এমন কোন বাধা নয়। প্রয়োজন রমজানের পূর্ব প্রস্তুতি। ডায়াবেটিস রোগীদের কমপক্ষে রমজানের ৩ মাস পূর্বে ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে রমজানের প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন। আধুনিক চিকিৎসায় রমজানে রোজা রাখা এখন সহজ এবং নিরাপদ। রোজা রাখার জন্য সব স্বাস্থ্যবিধি পালন করেও যদি স্বাস্থ্যহানী হওয়ার ভয় থাকে তবে তার জন্য রোজা সংগত নয়।

শৃংখলাই ডায়াবেটিস রোগীর জীবনকাঠি। রোজা মানুষকে সুশৃংখল জীবন যাপনে উদ্ভূদ্ধ করে। রমজান ডায়াবেটিস রোগীকে শৃংখলা পূর্ণ জীবন যাপন করার সুযোগ করে দেয়। বিভিন্ন গবেষনায় দেখা গেছে রোজা ওজন নিয়ন্ত্রন, কোলেষ্টেরল কমানো ও সুগার নিয়ন্ত্রনে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে।

 

রমজানে জীবন ধারার পরিবর্তন

রমজানে মানুষের জীবন ধারায় বেশ কিছুটা পরিবর্তন হয়ে থাকে। রমজান মাসে খাদ্যভাসে সকল মানুষের মধ্যে বিরাট একটি পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়ে থাকে। অন্য মাসে তিন বার খাবার গ্রহণের পরিবর্তে রমজান মাসে প্রধানতঃ দুইবার খাদ্য গ্রহণের অভ্যাস গড়ে ওঠে। রোজাদারদের নিকট প্রধান আকর্ষণীয় বিষয় হয়ে ওঠে মাগরীবের নামাজের সময় মুখরোচন ইফতার গ্রহণ। যা অন্য মাসের দুপরের খাবার অথবা রাত্রের খাবারের সমতুল্য হয়ে যায়। সামগ্রিক ভাবে মানুষ তাদের খাদ্যাভ্যাস সহ সকল অভ্যাস এবং বাধ্যবাধকতার প্রভাবে প্রভাবান্বিত হয়ে থাকেন। ফলে কেউ কেউ আছেন, যারা অন্য মাসের তুলনায় রমজান মাসে অতিরিক্ত খাধ্য গ্রহণের অভ্যাস গড়ে তোলেন এবং কেউ বা আবার খাদ্য গ্রহণ কম করে থাকেন। সুতরাং উপরোক্ত খাদ্যভ্যাসের দুটি পন্থাই রক্তের সুগার এর বড় ধরনের তারতম্যের কারণ হয়ে থাকে।

অপর দিকে কেউ কেউ রমজান মাসে আবশ্যকীয় কাজ কর্মের মধ্যে কিছুটা সময় কমিয়ে দেন এবং পরিবর্তন করে থাকেন। তাহারা রোজা থাকার কারণে কিছুটা কম সময় নড়াচড়া করে থাকেন। ফলে ওজন বেড়ে যায়, সুগারও বেড়ে যায়। রক্তের খারাপ কোলেষ্টেরলও বেড়ে যায়, ফলে হার্ট এর জটিলতার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়।

রোজা পালনে নিষেধ কখন

রমজান মাস শুরু হওয়ার অন্তত দুই থেকে তিন মাস আগেই পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি এবং আপনার চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করুন। প্রথমেই জেনে নিন আপনার রোজা পালনে কোন বাধা আছে কিনা। গত তিন মাসের মধ্যে হাইপোগ্লাইসেমিয়া (গ্লুকোজ কমে যাওয়া) এবং ডায়াবেটিস কমায় আক্রান্ত হওয়া ব্যক্তিদের ঝুঁকি থেকেই যায়। যাদের বার বার হাইপোগ্লাইসেমিয়া হওয়ার ইতিহাস আছে, যারা হাইপোগ্লাইসেমিয়া অসচেতন রোগী, যাদের রক্তে সুগার একেবারেই অনিয়ন্ত্রিত, যারা যকৃত, কিডনি, হৃদযন্ত্র ও অন্যান্য রোগে আক্রান্ত, ডায়ালাইসিস করেছেন, এমন রোগী, অত্যাধিক বয়স্ক রোগী এবং গর্ভবতী ডায়াবেটিসের রোগীরা রোজা থেকে বিরত থাকলেই ভালো। নিজের সম্পর্কে সঠিক ধারনা পেতে রমজানের দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে একটি সম্পূর্ণ চেকআপ করিয়ে নিন। এ সময় রক্তের সুগার, সুগারের গড় মাত্রা বা HbAlc, কিডনি ও লিভার পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া উচিত। এসব পরীক্ষার রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে আসন্ন রোজা পালনের পরিকল্পনা করুন।

অপরিকল্পিত রোজা রাখার কারণে সৃষ্টি সমস্যা সমূহ

১)      রক্তের মধ্যে গ্লুকোজের মাত্রা কমে যাওয়া (হাইপোগ্লাইসেমিয়া), যা কঠিন পর্যায়ে হতে পারে যে, রক্তে সুগার বা গ্লুকোজের মাত্রা কমে গিয়ে একেবারে শূণ্য পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছায়।

২)      রক্তের মধ্যে গ্লুকোজের মাত্রা অতিরিক্ত বা উচ্চ মাত্রায় হওয়া, সেই সাথে এসিটোন বেড়ে কঠিন বিপদজনক অবস্থায় গ্লুকোজের মাত্রাকে নিয়ে যেতে পারে।

৩)      রক্তের মধ্যে ফ্যাট বা চর্বি উচ্চ মাত্রায় বেড়ে যাওয়া।

৪)      অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহনের কারনে ওজন বেড়ে যাওয়া।

৫)      শরীর পানি শূণ্যতা যার ফলশ্রুতিতে থ্রম্বোসিস হওয়া।

রমজানে ডায়াবেটিক খাবার

         সেহরীর খাবার সেহেরীর শেষ সময়ে অল্প কিছুক্ষণ আগে খাওয়া।

        ইফতারের সময় অধিক পরিমাণে মিষ্টি ও চর্বি জাতীয় খাবার গ্রহণ না করা।

        ডায়াবেটিক রোগীদের পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি ও পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে যেন তারা পানি শূণ্যতায় না ভোগেন। ফলমূল, শাকসবজি, ডাল ও টক দই তালিকাভূক্ত করতে পারেন। ডাবের পানি পান করতে পারেন। ভাজা পোড়া খাবার যেমন পিঁয়াজু, বেগুনী, পুরি, পরোটা কাবাব অল্প পরিমাণে খেতে পারেন।

        খাদ্যের ক্যালরি ঠিক রেখে খাওয়ার পরিমাণ এবং ধরণ ঠিক করতে হবে। সঠিক সময়ে সঠিক পরিমাণ খাওয়া প্রয়োজন।

        রমজানের পূর্বে যে পরিমাণ ক্যালরি যুক্ত খাবার খেতের রমজানে ক্যালরির পরিমাণ ঠিক রেখে খাবার সময় এবং ধরণ বদলাতে হবে। ইফতারের সময় অতি ভোজন এবং শেষ রাতে অল্প আহার পরিহার করতে হবে।

ইফতার

        পানিশূণ্যতা রোধ এবং শরীরে বিপাকক্রিয়ার জন্য শরবত একটি অপরিহার্য পানীয়। বিকল্প চিনি নিয়ে ইসবগুলো, তোকমা, লেবু, কাঁচা আমা বে তেতুল শরবত করে খাওয়া যেতে পারে।

        ডাব ছাড়া অন্য মিষ্টি ফলের রসনা খাওয়াই শ্রেয়।

        টক ও মিষ্টি উভয় ধরনের ফল দিয়ে সালাদ করে খেলে যেমন উপাদেয় হবে, তেমনি এতে খনিজ লবন ও ভিটামিনের ঘাটতি পূরণ হবে।

        কাঁচা ছোলার সঙ্গে আদাকুচি, টমেটোকুচি, পুদিনাপাতা ও লবন মিশিয়ে খেলে বেশ সুস্বাদু হয়। কাঁচা ছোলা রক্তের কোলেষ্টেরল কমাতে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে।

        পানিশূণ্যতার দিকে লক্ষ রেখে প্রচুর পানি খাবেন।

সন্ধ্যারাত

        ডায়াবেটিস রোগীদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে, সন্ধ্যারাতের খাবার একেবারেই বাদ দেয়া উচিত নয়।

        অন্যান্য সময়ের রাতের খাবারের সমপরিমান হবে, সন্ধ্যারাতের খাবার।

        সন্ধ্যারাতে ভাত খাওয়া যাবে। তবে প্রত্যেকেই নিজ নিজ বরাদ্দ খাবারের পরিমানের দিকে খেয়াল রাখতে হবে।

        সন্ধ্যারাতে হালকা মসলায় রান্না করা যে কোন ছোট-বড় মাছ এবং সবজি থাকলে ভালো হয়।

সেহেরীর

        সেহেরীতে রুটি, ভাত রুচি অনুযায়ী গ্রহন করা যাবে।

        সেহেরীতে খেতে হবে অন্যান্য দিনের দুপুরের খাবারের সমপরিমান।

        মাংসের পরিবর্তে ডিম ও খাওয়া যেতে পারে।

        সেহেরীতে দুধ খেলে ডাল খাওয়া প্রয়োজন নেই।

রোজার ডায়াবেটিক রোগীর ব্যায়াম

দিনের বেলায় অধিক পরিশ্রম বা ব্যায়ম করা উচিত নয়। ইফতার বা রাতের খাবারের ১ ঘন্টা পর ব্যায়াম করা যেতে পারে। মনে রাখতে হবে, তারাবীর নামায ব্যায়ামের সমতুল্য বলে ধরা হয় এবং তারাবী পড়লে না হাটলেও চলে।

রোজায় ডায়াবেটিক রোগীর ঔষধ

        যারা দিনে ১ বার ডায়াবেটিসের ওষুধ খান, তারা ইফতারের শুরুতে (রোজা ভাঙ্গার সময়) ঐ ওষুধ একটু কম করে খাবেন।

        যারা দিনে একাধিক বার ডায়াবেটিসের ওষুধ খান তারা সকালের মাত্রাটি ইফতারের শুরুতে এবং রাতের মাত্রাটি অর্ধেক পরিমাণে সেহেরীর আধা ঘন্টা আগে খেতে পারেন।

        যে সকল রোগী ইনসুলিন গ্রহণ করেন, তাদের রমজানের পূর্বেই ইনসুলিনের ধরন ও মাত্রা ঠিক করে নেয়া উচিত। সাধারণত রমজানে দীর্ঘ মেয়াদী ইনসুলিন ইফতারের সময় বেশী এবং প্রয়োজনে শেষ রাখে অল্প মাত্রায় দেয়া উচিত।

        রমজানের কমপক্ষে তিনমাস পূর্বে ডায়াবেটিক রোগীর অবস্থা অনুসারে চিকিৎসকের পরামর্ম নিয়ে মুখে খাওয়ার ওষুধ এবং ইনসুলিন ঠিক করা উচিত।

রমজানে সুগার টেস্ট এবং রোজা ভাঙ্গা

বিম্বের বড় বড় ইসলামি চিন্তাবিদ ও শাস্ত্রবিদেরা আগেই রায় দিয়েছেন যে, রোজা রেখে রক্তে সুগার পরীক্ষা করালে তাতে রোজা ভেঙ্গে যায় না। রমজান মাসে বাড়িতে গ্লুকোমিটারে মাঝে মধ্যে নিজের রক্তের সুগার নিজে মেপে দেখুন। অন্তত সপ্তাহে এক বা দুই দিন সেহেরীর দুই ঘন্টা পর এবং ইফতারির অন্তত আধা ঘন্টা আগে এবং ইফতারের ২ ঘন্টা পর সুগার মাপুন। সেহেরীর পর সুগার আট মিলিমোল বা এর কম এবং ইফতারির আগে ছয় মিলিমোল বা এক কম থাকা বাঞ্ছনীয়। এর মধ্যে দিনের যে কোন সময় খারাপ  লাগলে অবশ্যই শরীর কাঁপলে, ঘেমে উঠলে, মাথা ফাঁকা লাগলে অবশ্যই সুগার মাপুন। দিনের যে কোন সময়ে সুগার ৩ দশমিক ৩ মিলিমোল বা তার কম এবং দিনের পূর্বেহ্নেই ৩ দশমিক ৯ মিলিমোল বা তার কম হয়ে গেলে সে দিন রোজা ভেঙ্গে ফেলতে হবে। দিনের যেকোনো সময় রক্তে সুগার ১৬ মিলিমোলের বেশী হলেও রোজা ভাঙতে হবে।

উপসংহারঃ

        রমজান মাস রহমত, বরকত, মাগফিরাত এবং নামাজের মাস।

        রমজান আত্মশুদ্ধির এবং আত্মপোলব্ধির মাস।

        রমজানের সুশৃংখল জীবন যাপন এবং ইবাদত বন্দেগী ডায়াবেটিক রোগীদের ওজন এবং সুগার কমাতে সহায়তা করে।

        ডায়াবেটিক রোগীরা রোজা রাখতে পারবেন। তবে ৩ মাস আগে থেকে ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রস্তুতি নিতে হবে।

        রোজার সময় নিজে ডায়াবেটিসের ঔষুধ সমন্বয় করবেন না, এতে মারাত্মক পরিণতি হতে পারে।

        রোজার সময় দিনে এবং রাতে সুগার মাপা উচিত, ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, এতে রোজার কোন ক্ষতি হয় না।

        সেহেরীর খাবার সেহেরীর শেষ সময়ের কিছু আগে খাওয়া উচিত। ইফতারের সময় বেশী চিনিযুক্ত খাবার খাবেন না।

        রোজার সময় দিনের বেলা ব্যায়াম করা উচিত নয়।

        রোজার সময় রাতের বেলা পর্যাপ্ত পরিমানে এবং পুষ্টিকর খাবার খাওয়া উচিত।

 

 

ডাঃ অজিত কুমার পাল

এমবিবিএস, এমডি, এমআরসিপিএস (গ্লাসগো)

এফএসিই, এফএসিপি (ইউএসএ)

মেডিসিন, ডায়াবেটিস ও হরমোন বিশেষজ্ঞ

সহযোগী অধ্যাপক

ময়নামতি মেডিকেল কলেজ, কুমিল্লা।




নতুন মায়েদের ফেসবুক ব্যবহার

ইদানীং দেখা যায় নতুন মা হওয়ার পরে তারা একের পর এক সদ্যজাত শিশুর ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে থাকেন। অবশ্যই শিশুদের ছবি খুব সুন্দর। কিন্তু প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে শিশুর নানারকম ছবি পোস্ট করা কতটুকু যুক্তিসঙ্গত? বন্ধু-বান্ধবেরা যাই ভাবুক না কেন নতুন হওয়া মা-বাবার জন্য তাদের শিশুর এসকল ছবি ভবিষ্যতের জন্য বিশেষ স্মৃতি হয়ে থাকবে। ওহিও বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকগণ এর ভিতরে খুঁজে পেয়েছেন নতুন মায়েদের মানসিক পরিস্থিতির চিত্র।

তারা মূলত উচ্চশিক্ষিত বিবাহিত কর্মজীবি মায়েদের ওপরে গবেষণা করেছেন । দেখা গিয়েছে এ ধরণের নতুন মায়েরা শিশুর জন্মের পর যত্নশীল আদর্শ মা হওয়ার এক ধরণের সামাজিক চাপ অনুভব করেন। এজন্য শিশুর অসংখ্য ছবি পোস্ট করে তারা সেই স্বীকৃতি অর্জন করার চেষ্টা করেন। তারা ছবির নীচে বন্ধু-বান্ধব এবং আত্মীয় স্বজনের প্রতিটি মন্তব্যের বিষয়ে অত্যন্ত সংবেদনশীল থাকেন এবং অনেক সময় অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে থাকেন। এ রকম একজন মা শিশুর ছবি পোস্ট করে যদি পরিচিতদের নিকট থেকে আশানুরূপ ইতিবাচক মন্তব্য না পান, তাহলে তারা বিষণ্ণতায় ভুগেন। গবেষকদের বক্তব্য হচ্ছে যে মায়েরা তাদের শিশুদের বিভিন্ন ধরণের ছবি বেশী পোস্ট করেন তাদের মধ্যে বিষণ্ণতার প্রকোপ আসলে বেশী।

ওহিওর এই পর্যবেক্ষণে ১২৭ জন নতুন হওয়া মা অংশগ্রহণ করেছেন। তাদের সকলেরই আন্তরিক ইচ্ছে ছিল ভাল মা হওয়া। পোস্ট করা ছবির মাধ্যমে তারা সেটাই প্রকাশ করতে চেয়েছেন। পর্যবেক্ষকগণ শিশুর জন্মের পর থেকে নয় মাস পর্যন্ত মায়েদের ফেসবুকের কার্যক্রম লক্ষ্য করেছেন। শতকরা ৯৮ জন মা জন্মের পর তাদের শিশুদের ছবি ফেসবুকে পোস্ট করেছেন। জন্মের পরেই ছবি পোস্ট করার হার সবচেয়ে বেশী। নয় মাস পরে তা অনেক কমে এসেছে। যে সকল মা শিশুর ছবি তাদের প্রোফাইল পিকচার হিসেবে রেখেছেন তারা আসলে তাদের শিশুকে নিজের সমস্ত কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন। এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। গবেষকদের বিশ্লেষণ হচ্ছে এর মাধ্যমে একজন মা আসলে শিশুটির মাঝে তার নিজের আইডেন্টিটি খুঁজে ফিরছেন। এধরণের ছবি পোস্ট করার পরে পরিচিতদের নিকট থেকে ইতিবাচক মন্তব্য না পেলে তারা অধিকতর বিষণ্ণতাবোধে আক্রান্ত হয়েছেন।

কিন্তু কর্মজীবী মায়েদের কি এমন আইডেন্টিটি খুঁজে ফেরার প্রয়োজন আছে? কর্মজীবনের আরও অনেক কিছুই তো তাদের আইডেন্টিটি প্রতিষ্ঠা করার জন্য যথেষ্ট। এজন্য নতুন মায়েদের ফেসবুক ব্যবহার এই দিকটি গবেষকদের জন্য বিশেষ কৌতুহল জাগিয়েছে। তারা মনে করছেন এবিষয়ে আরও অনেক বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে। যাহোক গবেষকগণ মনে করছেন নতুন মায়েদের ফেসবুকে শিশুদের কর্মকাণ্ড এবং ছবি পোস্ট করা ভাল; কিন্তু এর মাধ্যমে সবসময় মানসিক তৃপ্তি খোঁজার চেষ্টা করা একটু ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়।

তথ্যসূত্রঃ Schoppe-Sullivan SJ, Yavorsky JE, Bartholomew MK, Sullivan JM, Lee MA, Dush CMK, et al. Doing Gender Online: New Mothers’ Psychological Characteristics, Facebook Use, and Depressive Symptoms. Sex Roles. 2016:1-14.




ষোল রকম ক্যানসার প্রতিরোধের একটিই উপায়

অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে একটি বিজ্ঞাপন প্রচারিত হয় (বিজ্ঞাপনের লিঙ্ক নীচে)। এটা “ষোল ক্যানসার প্রতিরোধ আন্দোলন”-এর অংশ। জনগণকে ধূমপান থেকে দূরে রাখার সরকারী প্রচেষ্টা খুবই চোখে পড়ার মতো। অস্ট্রেলিয়ার পথেঘাটে যত সহজে মদ কিনতে পাওয়া যায়, সিগারেট কেনা ততটাই দুরুহ। সিগারেটের ওপর এতই বেশী করারোপ হয়েছে যে ধূমপান রীতিমতো ধনীদের বিলাসিতার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। স্বভাবতই মনে প্রশ্ন জাগে সিগারেটের বিরুদ্ধে কেন এত কঠোর অবস্থান? কারণ অস্ট্রেলিয়ার জনগণের চিকিৎসাসেবার বা মেডিকেয়ারের টাকার বিশাল অংশ সরকারকেই দিতে হয়। আর তার বিপুল অংশ যায় ক্যানসার চিকিৎসার পিছনে। কাজেই ক্যানসার প্রতিরোধ করা মানেই মেডিকেয়ারের খরচ কমানো। ধূমপান যে অনেক রকম ক্যানসারের কারণ, তা তো এখন আর নতুন করে প্রমাণ করার দরকার নেই। অতএব সরকারী দল এবং বিরোধী দল নির্বিশেষে ধূমপানের বিরুদ্ধে সকলে একজোট।

সিগারেটের ধোঁয়ায় ৭০০০ রকমের রাসায়নিক উপাদান থাকে। এদের মধ্যে অন্তত ৭০ টি উপাদান “কার্সিনোজেনিক” বা ক্যানসার সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। ধূমপান করা মানেই এসকল উপাদান শরীরে প্রবেশ করে এবং কোষে কোষে ছড়িয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে তা শরীরের কোষের স্বভাব বদলে দেয় এবং তা ক্যানসারে রূপ নেয়। ধূমপানের নিরাপদ মাত্রা বলে কিছু নেই। চিকিৎসা বিজ্ঞানে অন্তত ১৬ রকমের ক্যানসারের সঙ্গে ধূমপানের সম্পর্ক নিশ্চিত বলে প্রমাণিত হয়েছে। এই ১৬ রকম ক্যানসারের মধ্যে ফুসফুসের ক্যানসার থেকে শুরু করে রয়েছে লিভার, অন্ত্র, কিডনি, জরায়ু এবং ওভারির ক্যানসার। ষোল রকম ক্যানসারের ঝুঁকি কমানোর উপায় কিন্তু মাত্র এক রকম; আর তাহলো ধূমপান পরিত্যাগ করা। ধূমপান ছেড়ে দেওয়ার ছয় ঘণ্টা পর থেকে বাড়তি ঝুঁকি কমতে শুরু করে এবং যতই দিন যায় ততই স্বাভাবিকতা ফিরে আসতে থাকে।

আমাদের দেশে চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশই জনগণ নিজের পকেট থেকে খরচ করে। নিজের পকেটের টাকা দিয়ে ধূমপান করবো; ক্যানসার হলে আমার পকেটের টাকা দিয়ে চিকিৎসা করবো। এখানে বাধা দেওয়া কেন? এই যদি হয় সকলের মনোভাব, তাহলে অবশ্য বলার কিছু নেই। অন্যথায় ধূমপানের পক্ষে ওকালতি করার আসলে তেমন কোন যুক্তি দেখা যায় না।