বুধবার, মে ২৭, ২০২০

এন্টিবায়োটিক-অ্যাসোসিয়েটেড ডায়রিয়ার চিকিৎসায় ফিকল মাইক্রবায়োটা ট্রান্সপ্লান্ট (এফ এম টি) বা সুস্থ্য মানুষের মল প্রয়োগ পদ্ধতি

এন্টিবায়োটিক-অ্যাসোসিয়েটেড ডায়রিয়ার চিকিৎসায় ফিকল মাইক্রবায়োটা ট্রান্সপ্লান্ট (এফ এম টি) বা সুস্থ্য মানুষের মল প্রয়োগ পদ্ধতি

image_pdfimage_print

সি ডিফ আমাদের অন্ত্রে স্বাভাবিকভাবে থাকা হাজার প্রকারের ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে একটি। পেটে থাকা অবস্থায় এমনিতেই এটা কোন রোগ তৈরি করেনা। তবে এই জীবাণুটি সুযোগ সন্ধানি প্যথোজেনের অন্তর্ভুক্ত তার মানে এরা সুযোগ পেলেই আমাদের অন্ত্রে বংশবিস্তার করবে এবং এক প্রকারের ডায়রিয়া বাঁধিয়ে ফেলবে। আমেরিকায় প্রতিবছর পাঁচ লাখ মানুষ সি ডিফ ঘটিত ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয় এবং পনের হাজার মানুষ এই ডায়রিয়ায় মারা যায় যা এইডস এর কারণে বছরে যত মানুষ মারা যায় (১৩,৭১২) তার চেয়ে বেশী।

সি ডিফ ঘটিত ডায়রিয়ার মুল কারণ অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে চিকিৎসা। অ্যান্টিবায়োটিক আমাদের দেহে ক্ষতিকর জিবানূগুলো মারার পাশাপাশি আমাদের অন্ত্রে উপস্থিত কোটি কোটি উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলোকেও মেরে ফেলে। এই উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলো আমাদের জন্য ভিটামিন তৈরি করে, ক্ষতিকর জীবাণুর বংশবিস্তার নিয়ন্ত্রন করে, আমাদের খাদ্য হজমে সাহায্য করে ইত্যাদি। ভালো ব্যাকটেরিয়াগুলো মরে গেলে সি ডিফের মতো সুযোগ সন্ধানি ভয়ংকর জীবাণুগুলো দ্রুত বংশবিস্তার করে এবং অন্ত্রের পেশীগুলোকে আক্রমণ করে এবং ফলশ্রুতিতে ডায়রিয়া, পেটে ব্যথা ও জ্বর শুরু হয়। চিকিৎসা না হলে অবস্থা খারাপের দিকে যেতে থাকে এবং রোগী মারা যেতে পারে।

সি ডিফ ঘটিত ডায়রিয়ার চিকিৎসা হিসাবে ব্যবহার করা হয় মেট্রনিডাজল (অ্যামডিস নামে সবাই যাকে চেনে) অথবা ভ্যানকোমাইসিন নামক অ্যান্টিবায়োটিক। কিন্তু অনেক সময় এই অ্যান্টিবায়োটিকগুলো কাজ করে না এবং অ্যান্টিবায়োটিক ঘটিত ডায়রিয়ার চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার আরও ক্ষতির কারণ হয়। প্রবায়োটিক চিকিৎসা অনেক সময় কাজ করে, কিন্তু অন্ত্রের হারিয়ে যাওয়া কোটি কোটি ব্যাকটেরিয়া পুনরুদ্ধার করে সি ডিফের বংশবিস্তার রোধ করতে পারেনা। তাই এই রোগের চিকিৎসার সবচেয়ে কার্যকরী উপায় হল অন্ত্রের স্বাভাবিক ব্যাকটেরিয়ার সমতা আনা, যাতে সি ডিফ বংশবিস্তার করার মতো পর্যাপ্ত জায়গা না পায়। এবং এটা সম্ভব ফিকল মাইক্রবায়োটা ট্রান্সপ্লান্ট এর মাধ্যমে। দেখা গেছে এফ এম টি ৯০ ভাগ ক্ষেত্রে কার্যকরী এবং অতি অল্প সময়েই ফল পাওয়া যায়।

কিন্তু মল বলে কথা। কে চায় অন্যের মল নিজের শরীরে নিতে? তবে গবেষকরা অনেক সহজ পদ্ধতি বের করে ফেলেছেন এই চিকিৎসার। এখন অনেক বড় বড় কাম্পানি তৈরি হয়েছে যারা এই কাজটি সুশৃঙ্খল ভাবে করছে। এই পদ্ধতিতে আগে একজন দাতা খুজে বের করা হয়। দাতা নিকট আত্মীয় বা পরিচিত বন্ধু-বান্ধব হলে ভালো হয়। দাতার শরীর এবং মল-মুত্র খুব ভালো করে পরীক্ষা করে দেখা হয়। দাতার মলে খারাপ এবং ভালো জিবাণুর পরিমাণ কেমন তা পরীক্ষা করা হয়। ভালো জীবাণু্র সংখ্যা সন্তোষজনক হলে এবং ভয়ংকর কোন জীবাণু না পাওয়া গেলে ক্যাপসুল বা কোলনসকপি বা টিউব দিয়ে দাতার মল রোগীর অন্ত্রে প্রতিস্থাপন করা হয়। এটাই হল এফ এম টি।

আমাদের দেশে সি ডিফ ঘটিত ডায়রিয়ার প্রকোপ কেমন তা জানা নেই। সি ডিফ ডায়রিয়া নির্ণয় করার মতো সুযোগ-সুবিধা আমাদের রোগনির্ণয় সেন্টার গুলোতে আছে বলে জানিনা। তবে সি ডিফ অনেক সময় প্রতিরোধ করা সম্ভব। অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার কিছুদিন পর থেকে ডায়রিয়া শুরু হলে এবং তার সাথে জ্বর ও পেটে ব্যাথ থাকলে সেটা সি ডিফ ঘটিত ডায়রিয়ার সম্ভাবনা আছে। এরকম হলে দ্রুত চিকিৎসা নিন, স্যালাইন খান। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক খাবেন না, খাওয়ার পূর্বে এবং মলত্যাগের পর খুব ভালো করে হাত ধুতে হবে। অ্যান্টিবায়োটিক কোর্স শেষ হলে টক দই নিয়মত খেতে হবে যাতে উপকারী ব্যাকটেরিয়া গুলো কিছুটা হলেও প্রতিস্থাপিত হয়। আঁশ সমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে যাতে উপকারী ব্যাকটেরিয়া সুন্দর ভাবে বংশ বিস্তার করতে পারে।

আজিজুর রহমান শামীম
লন্ডন থেকে

Source:

Kassam zain et al.,  (2013). Fecal Microbiota Transplantation for Clostridium difficile Infection: Systematic Review and Meta-Analysis. Am J Gastroenterol 2013; 108:500–508; doi:10.1038/ajg.2013.59.

FavoriteLoadingপ্রিয় পোস্টের তালিকায় নিন।

About The Author

মন্তব্য করুন