বুধবার, এপ্রিল ১৪, ২০২১

অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন ট্রায়ালের অযাচিত কিছু ভুল বিলম্বিত করছে এর চূড়ান্ত অনুমোদন

অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন ট্রায়ালের অযাচিত কিছু ভুল বিলম্বিত করছে এর চূড়ান্ত অনুমোদন

image_pdfimage_print
৮ ডিসেম্বর ২০২০ দিনটি দুটি কারনে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এক, এই দিনটিতেই সকল ধাপের ট্রায়াল এবং আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ফাইজারের নবউদ্ভাবিত করোনা ভ্যাকসিনটি জনসাধারনের মাঝে দেয়া শুরু হল। যুক্তরাজ্যের কোভেন্ট্রিতে সকাল ৭ টায় ৯১ বছরের মার্গারেট কিনান নামক এক বৃদ্ধাকে ভ্যাকসিন প্রদানের মাধ্যমে শুরু হল করোনা মহামারী দমনের বিশ্বব্যাপী প্রচেষ্টা।
দুই, এই দিনটিতে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনিকার ভ্যাকসিনটির ফেইজ-৩ ট্রায়ালের ফলাফল প্রকাশিত হল বিখ্যাত জার্নাল ল্যানসেটে। পৃথিবীতে এই প্রথম মানুষের উপর ট্রায়ালে প্রমানিত হল যে অ্যাডিনোভাইরাস ভেক্টর-নির্ভর ভ্যাকসিন কার্যকরী। এছাড়াও অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনই সর্বপ্রথম করোনা ভ্যাকসিন যার ফেইজ-৩ ট্রায়ালের ফলাফল কোন বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশিত হল। এর আগে ফাইজার, মর্ডানা, রাশিয়ার গ্যামালেয়া এবং চীনের সিনোভ্যাক প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে তাদের ভ্যাকসিনগুলোর ফেইজ-৩ ট্রায়ালের অন্তর্বর্তীকালীন ফলাফল ঘোষনা করেছে। তবে কেউ এখনও তাদের পূর্ণ ফলাফল কোন জার্নালে প্রকাশ করেনি।
কি আছে অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের ল্যানসেট পেপারটিতে? ফলাফল কি আশাব্যঞ্জক?
এই পেপারটিতে অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের ফেইজ-৩ ট্রায়ালের প্রথম অন্তর্বর্তীকালীন ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। যুক্তরাজ্য, ব্রাজিল এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় চলমান প্রায় ২৩ হাজার ভলান্টিয়ারের তথ্য উপাত্ত পর্যালোচনা করে ভ্যাকসিনটির নিরাপত্তা বা সেইফটি প্রফাইল নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে ভ্যাকসিনটির কার্যকারীতা বা এফিকেসি নির্ধারনের জন্য শুধুমাত্র যুক্তরাজ্য ও ব্রাজিলের মোট ১১,৬৩৬ জন ভলান্টিয়ারের তথ্য উপাত্ত পর্যালোচনা করা হয়েছে।
ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা যায় যে দুটি পূর্ণ ডোজ বা স্ট্যান্ডার্ড ডোজ (৫০ বিলিয়ন ভাইরাস পার্টিকেল) টিকা দেয়াতে ভ্যাকসিনটির কার্যকারীতা ৬২ শতাংশ।অন্যদিকে, প্রথমে অর্ধেক ডোজ বা লো-ডোজ (২২ বিলিয়ন ভাইরাস পার্টিকেল) এবং পরে পূর্ণ ডোজ টিকা দিলে এর কার্যকারীতা পাওয়া যায় ৯০ শতাংশ। গড়ে অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনটির কার্যকারীতা দাড়ায় ৭২ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি একশ জনকে ভ্যাকসিন দিলে গড়ে ৭২ জন কোভিড আক্রান্ত থেকে রক্ষা পায়।
এছাড়াও ভ্যাকসিন গ্রহিতাদের ভেতরে কারোরই সিভিয়ার কোভিড হয়নি, অথবা তারা কেউই অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়নি। ভ্যাকসিন গ্রহিতাদের ভেতরে কেউ মারাও যায়নি। অর্থাৎ অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন সিভিয়ার কোভিড থেকে মানুষকে রক্ষা করে শতভাগ। এই ট্রায়ালে যারা কন্ট্রোল গ্রুপে ছিল, অর্থাৎ যারা প্ল্যাসিবো বা ডামি ভ্যাকসিন পেয়েছিল, তাদের ভেতরে দশ জন কোভিডে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। এদের ভেতরে দুইজন আক্রান্ত হয়েছিল সিভিয়ার কোভিডে যার ভেতরে একজনের মৃত্যু হয়।
অন্যদিকে, অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন অ্যাসিম্পটোম্যাটিক করোনা ইনফেকশনও প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়েছে। এই প্রতিরোধক ক্ষমতাটি মূলত পরিলক্ষিত হয় ভ্যাকসিনের অর্ধেকডোজ/পূর্ণডোজ টিকাতে। টিকাটির দুটি পূর্ণডোজ যেখানে অ্যাসিম্পটোম্যাটিক ইনফেকশন প্রতিরোধ করে মাত্র ৪ শতাংশ, সেখানে অর্ধেকডোজ/পূর্ণডোজ টিকা ইনফেকশন প্রতিরোধ করে প্রায় ৬০ শতাংশ। অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের এই সক্ষমতাটি সংক্রমণ বিস্তার রোধে বেশ কার্যকরী ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছ। ফাইজার বা মর্ডানার ভ্যাকসিনের এ ধরনের সংক্রমণ বিস্তার রোধের সক্ষমতা এখনও প্রমানিত হয়নি।
সব কিছুর বিচারে অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের ফেইজ-৩ ট্রায়ালের ফলাফল বেশ ভাল মনে হলেও এখনও বেশ কিছু প্রশ্ন এবং জটিলতা রয়ে গেছে। আর এই কারনেই ভ্যাকসিনটির আন্তর্জাতিক বাজারে অনুমোদনে কিছুটা বিলম্ব হতে পারে। গত দু’ সপ্তাহ ধরে ব্রিটিশ রেগুলেটরি বডি (এমএইচআরএ) অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের সকল ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফলাফল রোলিং রিভিউয়ের মাধ্যমে পর্যালোচনা করছে। এখনও বোঝা যাচ্ছে না যে তারা ভ্যাকসিনটিকে ইমারজেন্সি ব্যাবহারের অনুমোদন দিবে কিনা। যদি দিয়েও দেয়, তা হবে মূলত যুক্তরাজ্যের জন্য। যুক্তরাষ্ট্রের রেগুলেটরি বডি এফডিএ এবং বিশ্ব স্বাস্থ সংস্থা কিছুটা ইংগিত দিয়েছে যে অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের ফেইজ-৩ ট্রায়ালের অন্তর্বর্তীকালীন ফলাফল আপাতত অনুমোদন দেয়ার জন্য পর্যাপ্ত নয়।
__________________________________________
ড. খোন্দকার মেহেদী আকরাম,
এমবিবিএস, এমএসসি, পিএইচডি,
সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট,
শেফিল্ড ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাজ্য।
FavoriteLoadingপ্রিয় পোস্টের তালিকায় নিন।

About The Author

মন্তব্য করুন