বুধবার, এপ্রিল ১৪, ২০২১

বাংলাদেশে করোনার দ্বিতীয় ওয়েভ: অবস্থান এখন সূচনালগ্নে

বাংলাদেশে করোনার দ্বিতীয় ওয়েভ: অবস্থান এখন সূচনালগ্নে

image_pdfimage_print
বাংলাদেশে করোনার দ্বিতীয় ওয়েভ শুরু হয়ে গেছে, এটা নিয়ে অনিশ্চয়তার আর কোন অবকাশ নেই। তথ্য উপাত্তের দিকে তাকালেই এটা পরিস্কার বোঝা যায়। তবে মহামারীর ওয়েভ প্যাটার্ন বুঝতে গেলে ওয়েভ সমন্ধে একটা সাধারন ধারনা থাকা দরকার।
                                                 গ্রাফে সংক্রমণের ওয়েভ প্যাটার্ন
(১) মহামারীর ওয়েভ বা ঢেউ হচ্ছে সংক্রমণ বিস্তারের একটি ভিজুয়াল রিপ্রেজেন্টেশন বা চিত্র, যা থেকে তথ্যের দিকে না তাকিয়ে শুধু গ্রাফ বা চিত্রের দিকে তাকিয়েই বলে দেয়া যায় একটা নির্দিস্ট সময় ভাইরাসের সংক্রমণ বাড়ছে নাকি কমছে।
(২) প্রতিদিন কয়জন করে নতুন রোগী সনাক্ত হচ্ছে এইটার উপর ভিত্তি করে যে গ্রাফ অঙ্কন করা হয়, তা দিয়ে ওয়েভের ধরনটি বোঝা যায়। ওয়েভ প্রকাশের গ্রাফে সংক্রমণের সংখ্যা অবশ্যই লিনিয়ার বা প্রকৃত সংখ্যা হতে হবে, লগে রুপান্তরিত সংখ্যা দিয়ে ওয়েভ বোঝা যাবে না।
(৩) সুতরাং কোন গ্রাফে সংক্রমণের ওয়েভ প্যাটার্ন বুঝতে হলে প্রথমে লক্ষ্য করুন গ্রাফটি কী ‘লিনিয়ার স্কেলে’ নাকি ‘লগারিদমিক স্কেলে’ আছে?
(৪) একটি মহামারীর ওয়েভে তিনটি অংশ থাকে: আপ স্লোপ বা উন্নতির ঢাল, পিক বা চূড়া এবং ডাউন স্লোপ বা অবনতির ঢাল।
(৫) প্রতিদিন যখন সংক্রমণের সংখ্যা বাড়তে থাকে তখন তা তৈরী করে ওয়েভের ‘উন্নতির ঢাল’। এভাবে বাড়তে বাড়তে একটা সময় গিয়ে সংক্রমণ আর বাড়ে না, তখন এটাকে বলা হয় চূড়া। এর পর প্রতিদিন সংক্রমণের সংখ্যা আবার কমতে থাকে যা তৈরী করে ওয়েভের ‘অবনতির ঢাল’। এভাবেই তৈরী হয় মহামারীর একটি পূর্ণ ওয়েভ।
(৬) এবার দেখা যাক যুক্তরাজ্যের করোনা মহামারীর ওয়েভের দিকে (চিত্র-১)। এখানে প্রথম এবং দ্বিতীয় ওয়েভ ভাল ভাবেই দৃশ্যমান। প্রথম ওয়েভটি শুরু হয় মার্চের মাঝামাঝিতে এবং শেষ হয় জুলাইয়ের মাঝামাঝিতে। এরপর দ্বিতীয় ওয়েভ শুরু হয় আগস্টের শেষে যা পিকে পৌঁছে মধ্য নভেম্বরে। এরপর শুরু হয় দ্বিতীয় ওয়েভের অবনতির ঢাল। যার কারন হচ্ছে ২ নভেম্বর থেকে ২ ডিসেম্বর পর্যন্ত লকডাউন।
(৭) এবার তাকাই যুক্তরাষ্ট্রের দিকে (চিত্র-২)। যুক্তরাষ্ট্রে করোনার তিনটি ওয়েভ দৃশ্যমান। প্রথম ওয়েভেটি বিস্তৃত মধ্য মার্চ থেকে মধ্য জুন পর্যন্ত। দ্বিতীয় ওয়েভের শুরু হয় ১৮ জুনে এবং শেষ হয় ৯ সেপ্টেম্বর। তৃতীয় ওয়েভটি শুরু হয় অক্টোবরের শুরুতে যা এখন চূড়ার দিকে ধাবিত হচ্ছে। এই তৃতীয় ওয়েভেই এযাবৎকালের সর্বচ্চ দৈনিক মৃত্যু ৩,১০০ জন রেকর্ড করা হয়েছে ৪ ডিসেম্বর!
(৮) এবার আসি বাংলাদেশে। অনেকেই বলছে যে বাংলাদেশ করোনার প্রথম ওয়েভেই শেষ হয়নি, তাহলে দ্বিতীয় ওয়েভ আসলো কোথা থেকে? বাংলাদেশে প্রথম ওয়েভের সূচনা ১০ এপ্রিল (চিত্র-৩)। এর পর থেকে প্রতিদিন সংক্রমণের সংখ্যা বাড়তে তাকে সমানুপাতিক হারে, যা পিক বা চূড়ায় পৌঁছে ২ জুলাই এবং তার পর থেকে সংক্রমণ ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে। সেপ্টেম্বরের শেষে গিয়ে সংক্রমণের এই ক্রমাবনতি স্থিতিশীল অবস্থায় পৌঁছে। আর এভাবেই প্রথম ওয়েভটি সম্পন্ন হয়। এরপর অক্টোবরের শেষ থেকে সংক্রমণের সংখ্যা আবার ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে এবং সূচনা করে দ্বিতীয় ওয়েভটির। বাংলাদেশে করোনা মহামারীটি এখন দ্বিতীয় ওয়েভের ‘উন্নতির ঢালে’ অবস্থান করছে। ঠিকমত টেস্টের সংখ্যা বাড়ানো গেলে হয়ত দ্বিতীয় ওয়েভটি পরিস্কারভাবে বোঝা যাবে।
(৯) অন্যদিকে, ইন্ডিয়াতে কিন্তু মহামারীটি এখনও প্রথম ওয়েভেই সীমাবদ্ধ রয়েছে (চিত্র-৪)।
অতএব অনেকটা নির্ভরশীলতার সাথে বলা যায় যে বাংলাদেশে এখন করোনা মহামারীর দ্বিতীয় ওয়েভের সূচনালগ্নে রয়েছে। তবে, করোনা মহামারীতে একদম টিপিক্যাল ওয়েভ প্যাটার্ন অনেকটা অনুপস্থিত!
__________________________________________
ড. খোন্দকার মেহেদী আকরাম,
এমবিবিএস, এমএসসি, পিএইচডি,
সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট,
শেফিল্ড ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাজ্য।
FavoriteLoadingপ্রিয় পোস্টের তালিকায় নিন।

About The Author

মন্তব্য করুন