মঙ্গলবার, জানুয়ারী ১৯, ২০২১

পর্ব – ১: অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন সত্তর শতাংশ কার্যকরী হলেও প্রশ্ন রয়ে গেছে বেশ কয়েকটি!

পর্ব – ১: অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন সত্তর শতাংশ কার্যকরী হলেও প্রশ্ন রয়ে গেছে বেশ কয়েকটি!

image_pdfimage_print
গতকাল ২৩ নভেম্বর অতি প্রতিক্ষিত অক্সফোর্ড ও অ্যাস্ট্রাজেনিকার যৌথ উদ্যগে তৈরী করোনা ভ্যাকসিনটির ফেইজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অন্তর্বর্তীকালীন ফলাফল প্রকাশিত হল। ভ্যাকসিনটি কোভিড-১৯ থেকে গড়ে ৭০ শতাংশ প্রতিরক্ষা দিতে সক্ষম হয়েছে।
অন্তর্বর্তীকালীন ফলাফলটি পর্যালোচনা করা হয়েছে যুক্তরাজ্য, ব্রাজিল এবং দক্ষিণ আফ্রিকার প্রায় ২৪ হাজার ভলান্টিয়ারের উপর চালানো ফেইজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের উপর। ভলান্টিয়ারদের মধ্যে অর্ধেককে দেয়া হয়েছে ২৮ দিন অন্তর দুই ডোজ চ্যাডক্স-১ কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন এবং বাকি অর্ধেককে দেয়া হয়েছে মেনিনজাইটিস ভ্যাকসিন (কন্ট্রোল গ্রুপ)। ভ্যাকসিন দেয়ার পরে ভলান্টিয়ারদের মধ্যে ১৩১ জন কোভিডে আক্রান্ত হয়েছে।
ট্রায়ালটিতে কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনের দুই ধরনের ডোজ ব্যবহার প্রয়োগ করা হয়েছে। একটি হচ্ছে স্ট্যান্ডার্ড প্রাইম-বুস্ট ডোজ, যেখানে প্রথম এবং দ্বিতীয় ডোজে একই পরিমান (৫০ বিলিয়ন ভাইরাস পার্টিকেল) ভ্যাকসিন দেয়া হয়েছে। আরেকটি হল হাফ-প্রাইম এন্ড স্ট্যান্ডার্ড-বুস্ট ডোজ, যেখানে প্রথমে দেয়া হয়েছে অর্ধেক ডোজ ভ্যাকসিন (২৫ বিলিয়ন ভাইরাস পার্টিকেল) এবং ২৮ দিন পর দেয়া হয়েছে পূর্ণ ডোজ ভ্যাকসিন।
ভলান্টিয়ারদের ভেতরে বেশিরভাগকেই দেয়া হয়েছে স্ট্যান্ডার্ড প্রাইম-বুস্ট ডোজ ভ্যাকসিন যা কোভিড-১৯ থেকে প্রতিরক্ষা দিয়েছে মাত্র ৬২ শতাংশ। অন্যদিকে, প্রথমে অর্ধেক ডোজ এবং পরে পূর্ণ ডোজ ভ্যাকসিন দেয়া হয়েছে মাত্র ৩ হাজার ভলান্টিয়াকে যা কোভিড থেকে প্রতিরক্ষা দিয়েছে প্রায় ৯০ শতাংশ (বিবিসি নিউজ)। অনেকেই এই ৯০ শতাংশ প্রতিরক্ষাকে বেশ ফলাও করে প্রচার করছেন। কিন্তু এটা খেয়াল রাখতে হবে যে এই ৯০ শতাংশ প্রতিরক্ষার হিসেবটা কষা হয়েছে মাত্র ৩ হাজার ভলান্টিয়ারের উপর। ভ্যাকসিনের ফেইজ-৩ ট্রায়ালে এই সংখ্যাটি নগন্য। সুতরাং অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের গড় ৭০ শতাংশ কার্যকারীতা নিয়েই আমাদের আপাতত সন্তষ্ট থাকতে হবে যতক্ষন না আরো নতুন ফলাফল হাতে আসছে।
দুটি পূর্ণ ডোজ ভ্যাকসিন দেয়াতে ভ্যাকসিনটির কার্যকারীতা এতটা কমে গেল কেন, সেটা কিন্তু আসলেই চিন্তার বিষয়। পূর্বে প্রায় এক হাজার জনের উপর ভ্যাকসিনটির যে ফেইজ-১/২ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল করা হয়েছিল, সেখানে মাত্র ১০ জনের উপর প্রয়োগ করা হয়েছিল সমপরিমান দুই ডোজ ভ্যাকসিন (প্রাইম-বুস্ট)। বাকি সবাইকে দেয়া হয়েছিল এক ডোজ করে কোভিড বা মেনিনজাইটিস ভ্যাকসিন (ল্যানসেট, ২০ জুলাই ২০২০)। ওই ১০ জনের ফলাফলের উপর ভিত্তি করেই কিন্তু পরবর্তিতে ফেইজ-৩ ট্রায়ালে দুই ডোজের প্রাইম-বুস্ট রেজিম ব্যবহার করা হয়! যার ফলাফল হচ্ছে ভ্যাকসিনটির ৬২ শতাংশ কার্যকারীতা।
অন্যদিকে, ফেইজ-৩ ট্রায়ালে যে প্রথমে অর্ধেক ডোজ এবং ২৮ দিন পরে পূর্ণ ডোজ ভ্যাকসিন রেজিম ব্যাবহার করা হয়েছে তার কোন প্রকাশিত ফলাফল আমরা জানি না। ফেইজ-১/২ ট্রায়ালে এমন কোন ডোজ ব্যবহার করা হয়নি। তবে ফেইজ-৩ ট্রায়ালে এসে কেন একটি ছোট গ্রুপের উপর এই ডোজ ব্যবহার করা হল তা এখনও অপরিস্কার। ফেইজ-৩ ট্রায়াল থেকে এটা বোঝা যায় যে ভ্যাকসিন ট্রায়ালের প্রাথমিক টার্গেট ছিল স্ট্যান্ডার্ড প্রাইম-বুস্ট রেজিম, যা থেকে অবশ্য আশানুরূপ ফলাফল পাওয়া যায়নি। তবে ভাল ফলাফল (৯০ শতাংশ কার্যকারীতা) পাওয়া গেছে ছোট্ট গ্রুপ থেকে পাওয়া ফলাফলে!
সুতরাং রেগুলেটরি বডিকে এখন ঐ তিন হাজার জনের ছোট্ট সাব-গ্রুপের উপর চালানো ফলাফলের ভিত্তিতেই ইমারজেন্সি ভ্যাকসিন প্রয়োগে ডোজ নির্ধারণ করতে হবে। অক্সফোর্ড ট্রায়ালে অংশগ্রহনকারীদের ভেতর কোভিডে আক্রান্ত হওয়া সম্ভাবনা হচ্ছে প্রতি ২০০ জনে ১ জন (কোহর্ট প্রিভ্যালেন্স)। সেক্ষেত্রে ৩ হাজার জনে কোভিডে আক্রান্ত হতে পারে মাত্র ১৫ জন। এখন এই ১৫ জন কোভিড আক্রান্তের উপর ভিত্তি করেই কিন্তু অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের ডোজ নির্ধারণ হবে, মোটেও ২৪ হাজার জন থেকে প্রাপ্ত ফলাফলের উপর ভিত্তি করে নয়! এছাড়াও কোভিড আক্রান্তের সংখ্যা ৬০ জনের কম হলে ভ্যাকসিনের কার্যকারীতা নির্নয় করা অতটা সহজ নয়। সেক্ষেত্রে প্রাপ্ত ফলাফল ভ্রান্ত হতে পারে। আশাকরা যায়, অক্সফোর্ডের পরবর্তী ধাপের ফলাফল পর্যালোচনায় আরো বেশী সঠিক তথ্যটি পাওয়া যাবে।
আমরা যদি ফাইজার, মর্ডানা বা স্পুটনিক-৫ ভ্যাকসিনগুলির সাম্প্রতিক ফেইজ-৩ ট্রায়ালের অন্তর্বর্তীকালীন ফলাফলের দিকে তাকাই তাহলে কি দেখা যায়? ত্রিশ এবং চল্লিশ হাজার ভলান্টিয়ারের উপর চালানো মর্ডানা এবং ফাইজার/বায়োন্টেকের এমআরএনএ ভ্যাকসিনটির কার্যকারীতা পরিলক্ষিত হয় ৯৫ শতাংশ, যেখানে কোভিডে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৯৫ এবং ১৬৪ জন। অন্যদিকে, বিশ হাজার ভলান্টিয়ারের উপর চালানো রাশিয়ার স্পুটনিক-৫ ভ্যাকসিনটির কার্যকারীতার প্রদর্শিত হয় ৯২ শতাংশ যেখানে কোভিডে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৩০ জন। আর অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের কার্যকারীতা ৯০ শতাংশ নির্নীত হয়েছে তিন হাজার জনের ফলাফল পর্যালোচনায়।
অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের ট্রায়ালে যেহেতু দুই ধরনের ডোজিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে এবং যেহেতু এ থেকে প্রাপ্ত ফলাফলের তারতম্য ৪৫ শতাংশ (৬২% বনাম ৯০%), তাই এই দুইটি ভিন্নধর্মী ফলের গড় করা আদৌ সমীচীন কিনা তা ভেবে দেখার দরকার আছে (Skewed data)। সেক্ষেত্রে ভ্যাকসিনটির গড় কার্যকারীতা ৭০ শতাংশ বলাটা অনেকটা দূষণযুক্ত?
ড. খোন্দকার মেহেদী আকরাম,
এমবিবিএস, এমএসসি, পিএইচডি,
সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট,
শেফিল্ড ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাজ্য।
FavoriteLoadingপ্রিয় পোস্টের তালিকায় নিন।

About The Author

মন্তব্য করুন