মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ১, ২০২০

পর্ব – ২: করোনাভাইরাসের দ্রুত বিস্তারের রহস্যটা কি?

পর্ব – ২: করোনাভাইরাসের দ্রুত বিস্তারের রহস্যটা কি?

image_pdfimage_print
গবেষণায় দেখা গেছে নোভেল করোনাভাইরাস যখন কোষের ভেতরে বংশ বৃদ্ধি করে তখন তার স্পাইক প্রোটিনটি ফিউরিনের বিক্রিয়াতে প্রি-অ্যাকটিভেটেড বা প্রাক-সক্রিয় হয়ে উঠে। এর ফলে নতুন তৈরী হওয়া করোনাভাইরাস খুব সহজে এবং দ্রুত গতিতে নতুন কোষকে সংক্রমণ করতে পারে। অন্যদিকে, সার্স ভাইরাসের এস-১/এস-২ ক্লিভেজ অংশটিতে ফিউরিন এনজাইমটি কোন বিক্রিয়া করেনা। ফলে রিপ্লিকেশনের সময় সার্স ভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনটি প্রি-অ্যাকটিভেটেড হয়না। বিজ্ঞানীদের ধারনা স্পাইক প্রোটিনের এই প্রি-অ্যাকটিভেশনের তারতম্যের কারনেই নোভেল করোনাভাইরাস সার্স ভাইরাসের চেয়ে এত দ্রুত এবং কার্যকর ভাবে এক কোষ থেকে আরেক কোষ এবং একজন থেকে আরেকজনে ছড়িয়ে পরছে (PNAS, মে ২০২০)।
এছাড়াও অতিসম্প্রতি জার্মানির টেকনিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক নিউরোপিলিন-১ নামের আরেকটি রিসিপ্টরের সন্ধান পেয়েছে যা নোভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এবং বিস্তারকে ত্বরান্বিত করে। এ বছরের ২০ অক্টোবর সাইন্স জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাপত্রটিতে দেখা যায় কোষের বহিরাবরনে থাকা নিউরোপিলিন-১ রিসিপ্টরটি ফিউরিন এনজাইম কর্তৃক খন্ডিত স্পাইক প্রোটিনের এস-১/এস-২ ক্লিভেজ অংশের সাথে এক ধরনের বন্ধন সৃস্টি করে, আর এই বন্ধন সৃস্টির মাধ্যমে নিউরোপিলিন-১ রিসিপ্টর ভাইরাসটিকে টেনে এসিই-টু রিসিপ্টরের কাছে নিয়ে যায় এবং ভাইরাসটিকে কোষের অভ্যন্তরে প্রবেশে সহায়তা করে। আমাদের শ্বাস যন্ত্রের এপিথেলিয়াল কোষে সাধারাণত এসিই-টু রিসিপ্টরের সংখ্যা অনেক কম থাকে, তবে নিউরোপিলিন-১ রিসিপ্টর থাকে পর্যাপ্ত। আর এভাবেই নিউরোপিলিন-১ রিসিপ্ট মূলত করোনাভাইরাসকে তার কাংক্ষিত এসিই-টু রিসিপ্টরটি খুঁজে পেতে সাহায্য করে।
গবেষণায় দেখা গেছে আমাদের নাকের মিউকাস ঝিল্লির কোষে এবং ঘ্রান আহরনের নার্ভে (অলফেক্টরি নার্ভ) পর্যাপ্ত পরিমানে নিউরোপিলিন-১ রিসিপ্টর থাকে। নাসারন্ধ্র হচ্ছে আমাদের শ্বাসযন্ত্রে করোনাভাইরাস প্রবেশের প্রধান পথ। আর এই প্রবেশ পথেই থাকে নিউরোপিলিন-১ রিসিপ্টরের আধিক্য। এতে করে ভাইরাস আমাদের নিশ্বাসের সাথে নাকে প্রবেশ করে খুব সহজেই আটকে যায় নাকের মিউকাস ঝিল্লির কোষে এবং সেখানে বংশ বিস্তার করে। বংশ বিস্তারের পরে ভাইরাস ছড়িয়ে পরে ফুসফুসে এবং কাশি বা হাঁচির সাথে বাতাসে, যা পরবর্তিতে অন্য মানুষকে আক্রান্ত করে। এধরনের ঘটনা পূর্বের সার্স ভাইরাসের ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হয়নি। সুতরাং বিজ্ঞানিদের ধারনা নিউরোপিলিন-১ রিসিপ্টর হচ্ছে দ্বিতীয় প্রধান পন্থা যার মাধ্যমে নোভেল করোনাভাইরাস এত দ্রুত গোটা বিশ্বব্যাপি ছড়িয়ে পরেছে।
করোনাভাইরাস শুধু ফুসফুসেই সংক্রমণ করেনা; বরং তা মস্তিস্কেও আক্রান্ত করতে পারে। ভাইরাসটি কিভাবে মস্তিস্কে প্রবেশ করে তা এখনও ঠিক পরিস্কার না। তবে ধারনা করা হয় নাকের মিউকাস ঝিল্লিতে উন্মুক্ত থাকা অলফেক্টরি নার্ভের মাধ্যমে ভাইরাসটি ব্রেইনে প্রবেশ করে থাকতে পারে। এবং এক্ষেত্রেও নিউরোপিলিন-১ রিসিপ্টর একটি মোক্ষম ভুমিকা পালন করে। বর্তমানে বিজ্ঞানীরা এই নিউরোপিলিন-১ রিসিপ্টরকে টার্গেট করে করোনার বিপরীতে ওষুধ প্রস্তুতির চিন্তাভাবনা করছেন। কোন রাসায়নিক মলিকিউল বা মনোক্লোনাল এন্টিবডি দিয়ে নিউরোপিলিন-১ রিসিপ্টরকে ব্লক করার মাধ্যমে করোনাভাইরাসকে কোষে প্রবেশে বাঁধা প্রদানের মাধ্যমে করোনা সংক্রমণ রোধ করা যেতে পারে।
এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী দেখা যায় যে নোভেল করোনাভাইরাসের রিসিপ্টর বাইন্ডিং ডোমেইনের এসিই-টু রিসিপ্টরের প্রতি অতি আসক্তি, এস-১/এস-২ ক্লিভেজ অংশটির অত্যাধিক সক্রিয়তা এবং নিউরোপিলিন-১ রিসিপ্টরের সাথে বন্ধন সৃস্টির সক্ষমতাই ভাইরাসটিকে এত দ্রুত বিস্তারে সহায়তা করছে। ভাইরাসের এসব অংশকে টার্গেট করে বিজ্ঞানীরা ওষুধ এবং ভ্যাকসিন প্রস্তুত করছেন। সম্প্রতি রিসিপ্টর বাইন্ডিং ডোমেইনকে টার্গেট করে একধরণের মনোক্লোনাল এন্টিবডি থেরাপী তৈরী করা হয়েছে যা ফেইজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে বেশ কার্যকরী ফলাফল দেখিয়েছে। এছাড়াও বেশীরভাগ করোনা ভ্যাকসিনও তৈরী করা হয়েছে ভাইরাসের এ অংশটিকে লক্ষ্য করে।
ড. খোন্দকার মেহেদী আকরাম,
এমবিবিএস, এমএসসি, পিএইচডি,
সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট,
শেফিল্ড ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাজ্য।
FavoriteLoadingপ্রিয় পোস্টের তালিকায় নিন।

About The Author

মন্তব্য করুন