মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ১, ২০২০

ফাইজারের করোনা ভ্যাকসিন নব্বই শতাংশ কার্যকরী, তবে এখনও প্রশ্ন রয়ে গেছে অনেক!

ফাইজারের করোনা ভ্যাকসিন নব্বই শতাংশ কার্যকরী, তবে এখনও প্রশ্ন রয়ে গেছে অনেক!

image_pdfimage_print
৯ নভেম্বর ২০২০ দিনটি মানব ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে দীর্ঘ দিন। করোনাভাইরাসের মহামারীতে গোটা বিশ্ব যখন দিশেহারা ঠিক তখনই ফাইজার এবং বায়োন্টেক নিয়ে এলো শুভ সংবাদ, ঘোষনা দিলো যে তাদের উদ্ভাবিত এমআরএনএ ভ্যাকসিনটি করোনা প্রতিরোধে ৯০ শতাংশেরও বেশী কার্যকরী! আর এই ফলাফলটি এসেছে ছয়টি দেশে চালানো তাদের ভ্যাকসিনটির ফেইজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অন্তর্বর্তীকালীন ফলাফল পর্যালোচনার প্রেক্ষিতে।
এই ট্রায়ালে অংশগ্রহনকারী ৪৩,৫০০ জন ভ্যাকসিন এবং প্ল্যাসিবো (ডামি ভ্যাকসিন) গ্রহীতার মধ্যে কোভিডে আক্রান্ত হয়েছে মাত্র ৯৪ জন। আসল ভ্যাকসিন এবং প্ল্যাসিবো গ্রহীতাদের ভেতরে সংক্রমিতের হিসেব কষে দেখা গেছে যে প্রতি ১০০ জন ভ্যাকসিন গ্রহিতার ভেতরে ৯০ জনই রয়ে গেছে করোনা সংক্রমণ থেকে মুক্ত। সাধারনত কোন ভ্যাকসিন যদি ৭০-৭৫ শতাংশ সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারে তাহলে তাকেই কার্যকর ভ্যাকসিন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
করোনা ভ্যাকসিন নিয়ে বিজ্ঞানীরা প্রথম দিকে বেশ অনিশ্চয়তার ভিতরে ছিলেন। এত অল্প সময়ে একটি কার্যকরী এবং নিরাপদ ভ্যাকসিন তৈরী করার কোন ইতিহাস আমাদের নেই। বিশ্বব্যাপী ব্যাপক প্রানহাণী, সময় স্বল্পতা এবং মহামারীর তীব্রতার কথা চিন্তা করে, বিজ্ঞানীমহল একমত হয়েছিলেন যে, যদি কোন ভ্যাকসিন ৫০ শতাংশও কার্যকরী হয় তাহলে সেই ভ্যাকসিনকে বিশেষ বিবেচনায় জনসাধারনে প্রয়োগের অনুমতি দেয়া হবে। সেখানে ফাইজারের ভ্যাকসিনটির ৯০ শতাংশ কার্যকারীতা সবাইকে অবাক করে দিয়েছে। ফাইজার আবার তাদের ভ্যাকসিনটির ফেইজ-৩ ট্রায়ালের চূড়ান্ত পর্যায়ের ফলাফল পর্যালোচনা করবে যখন ভ্যাকসিন গ্রহীতাদের ভেতরে ১৬৪ জন করোনায় আক্রান্ত হবে। ধারনা করা হচ্ছে চূড়ান্ত পর্বের ফলাফল পর্যালোচনায় ভ্যাকসিনটির কার্যকারীতা ৯০ শতাংশ থেকে কিছুটা কমে যেতে পারে।
কোম্পানীটি আশা করছে এ বছরের শেষ নাগাদ তারা ৫ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন প্রস্তুত করতে সক্ষম হবে, যা থেকে যুক্তরাজ্য পাবে ১ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন এবং বাকীটা পাবে যুক্তরাষ্ট্র; কারণ এ দেশ দুটি ভ্যাকসিনের জন্য অগ্রীম টাকা দিয়ে রেখেছে। আগামী বছরের পুরোটা সময় জুড়ে ফাইজার/বায়োন্টেক আরো ১৩০ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন উৎপাদন করবে গোটা বিশ্বের জন্য। ফাইজারের এই খবরে আমাদের ভেতর যেমন উৎসাহ এবং আশার সঞ্চার হয়েছে, তেমনি কোম্পানীটির শেয়ারের দামও এক লাফে উঠে গেছে শীর্ষে!
একটা বিষয় কিন্তু এখানে লক্ষনীয়, ফাইজার তাদের ভ্যাকসিনটির শুধু কার্যকারীতার ফলাফল প্রকাশ করেছে। তবে ফলাফলের আরেকটি খুবই গুরত্বপূর্ণ অংশ অর্থাৎ ভ্যাকসিনটির সেইফটি বা নিরাপত্তার বিষয়টি এখনও রয়ে গেছে অজানা। যদিও তারা বলেছে যে তাদের ভ্যাকসিনটি কোন প্রকার মারাত্মক বিরূপ প্রভাব প্রদর্শন করেনি, তবে এ ব্যাপারে এর চেয়ে বেশী তারা কিছু বলেনি। এর অবশ্য কারনও আছে। নিয়ম অনুযায়ী একটা ভ্যাকসিন প্রয়োগের পর থেকে কমপক্ষে ২ মাস অপেক্ষা করতে হয় কোন প্রকার বিরূপ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখার জন্য। ফাইজারকে এই তথ্য আহরনের জন্য আরো ২ সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হবে। আশাকরা হচ্ছে নভেম্বরের শেষেই এই ফলাফল তারা ঘোষনা করবে। আর এর মাধ্যমেই সম্পন্ন হবে ভ্যাকসিনটির অন্তর্বর্তীকালীন ফলাফলের পূর্ণ বিবরনী।
এছাড়াও ভ্যাকসিনটির কার্যকরীতার ব্যাপারে আরো বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনও রয়ে গেছে অজানা। যেমন:
(১) ভ্যাকসিন ট্রায়ালে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৯৪ জন কোভিডে আক্রান্ত হয়েছেন। তবে ভ্যাকসিন গ্রহীতাদের কতো জনের করোনাভাইরাস সংক্রমণ হয়েছে, ট্রায়ালটিতে তা দেখা হয়নি। করোনা সংক্রমণ এবং কোভিড কিন্তু এক নয়। একজন মানুষ যখন করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়ে রোগের লক্ষন প্রকাশ করে তখন তাকে বলা হয় কোভিড। কিন্তু একজন যদি করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয় কিন্ত রোগের কোন লক্ষন প্রকাশ না করে তখন তাকে বলে অ্যাসিম্পটোমেটিক সংক্রমণ। এ ধরনের অ্যাসিম্পটোমেটিক রোগীরা লক্ষন প্রকাশ না করলেও ভাইরাসের বিস্তার ঘটায় একজন কোভিড রোগীর মতই সমান তালে। ফাইজারের ভ্যাকসিনটি ৯০ শতাংশ কোভিড থেকে সুরক্ষা দিলেও তা কত ভাগ অ্যাসিম্পটোমেটিক সংক্রমণ প্রতিরোধ করে তা রয়ে গেছে অজানা। একটা ভ্যাকসিন যদি অ্যাসিম্পটোমেটিক সংক্রমণ কার্যকরভাবে প্রতিরোধ না করতে পারে তাহলে সেই ভ্যাকসিন দিয়ে কিন্তু মহামারী নিয়ন্ত্রনে আনা দুস্কর।
(২) আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ফাইজারের ভ্যাকসিনটি কি বৃদ্ধ মানুষের উপর কার্যকরী? এর উত্তরটা এখনও অজানা। কোভিডে কিন্তু বৃদ্ধরাই মারা যাচ্ছে সবচেয়ে বেশী। একটা ভ্যাকসিন যদি ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ মানুষের উপর কার্যকর না হয় তাহলে কিন্তু ঐ ভ্যাকসিন দিয়ে করোনায় গড় মৃত্যুহার তেমন একটা কমিয়ে আনা যাবে না। অক্সফোর্ড এবং অ্যাস্ট্রাজেনিকা কিন্তু ফেইজ-২ ট্রায়ালের মাধ্যমে দেখিয়েছে যে তাদের তৈরী চ্যাডক্স-১ (কোভিশিল্ড) ভ্যাকসিনটি বৃদ্ধ মানুষের উপরে সমানভাবে কার্যকর।
(৩) এছাড়াও ভ্যাকসিনটি কতদিন পর্যন্ত করোনা সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা দিবে তাও রয়ে গেছে ভবিষ্যত গবেষণার বিষয়।
(৪) ভ্যাকসিনটি যেহেতু একদম নতুন এবং অপরীক্ষিত প্লাটফর্মে তৈরী তাই এর দীর্ঘমেয়াদী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কি হতে পারে তা সম্পূর্ণ অজানা।
ফাইজারের ভ্যাকসিনটি একটি এমআরএনএ প্লাটফর্মে তৈরী ভ্যাকসিন যা উৎপাদনের পর থেকেই সংরক্ষন করতে হয় হিমাংকের অতি নিন্ম তাপমাত্রা –৭০ ডিগ্রী সেলসিয়াসে। এই তাপমাত্রায় সংরক্ষন এবং সরবরাহ না করতে পারলে, ভ্যাকসিনের মূল উপাদান নিউক্লিক এসিড খুব তারাতারি ভেঙ্গে যায় এবং এতে করে ভ্যাকসিনটির কার্যকারীতা নস্ট হয়ে যায়। অনেকেই তাপমাত্রার এই সংবেদনশীলতাকে ভ্যাকসিন সরবরাহে প্রধান অন্তরায় হিসেবে দেখছেন। ভ্যাকসিন সরবরাহের জন্য এ ধরনের অতি শীতল (-৭০ ডিগ্রী) ধারক পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশের ভ্যাকসিন কোল্ড চেইন সিস্টেমেই নেই। সে ক্ষেত্রে এ ধরনের কোল্ড চেইন ব্যাবস্থা বাংলাদেশ বা ভারতের মত উন্নয়নশীল দেশগুলোতে না থাকাই স্বাভাবিক।
ভ্যাকসিন সর্বরাহে এই প্রতিবন্ধকতাকে মাথায় রেখে ফাইজার তৈরী করেছে এক বিশেষ ধরনের ‘শীতল বাক্স’ বা ‘কুল বক্স’। ৫ হাজার ভ্যাকসিন ভায়াল ধারন ক্ষমতার এই কুল বক্সের আঁকার হবে একটি ছোট সাইজের স্যুটকেসের সমান যার ভেতরে অতি শীতল তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রন করা হবে ড্রাই আইসের ব্লক দিয়ে। এই কুল বক্সে এক নাগারে ১০ দিন -৭০ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ৫ হাজার ভায়াল ভ্যাকসিন সংরক্ষন এবং সরবরাহ করা যাবে কোন প্রকার ফ্রিজার বা বিশেষ কন্টেইনার ছাড়াই। এতে করে আঞ্চলিক কেন্দ্র থেকে কুল বক্সের মাধ্যমে ভ্যাকসিন সরবরাহ করা হবে দেশের প্রত্যন্ত আঞ্চলে। সুতরাং দেশের প্রচলিত কোল্ড চেইনে এই কুল বক্স অন্তর্ভুক্তিকরণের মাধ্যমে এমআরএনএ ভ্যাকসিন প্রদান সম্ভবপর হবে। আর এই কুল বক্স পুনঃব্যবহার যোগ্য, অর্থাৎ ড্রাই আইস দিয়ে এই বিশেষ কুল বক্স ব্যবহার করা যাবে বারবার।
সব কিছু মিলিয়ে বলা যায় ফাইজারের ভ্যাকসিনটি এই মহামারীতে আশাজাগানিয়া এবং আশীর্বাদ স্বরূপ। তবে ভ্যাকসিনটির সুদূরপ্রসারী কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে কিনা তা সাবধানতার সাথে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। বাংলাদেশের ভ্যাকসিন কোল্ড চেইনে পরিবর্তন আনার এখনই উপযুক্ত সময়। দেশে একটি কেন্দ্রীয় ড্রাই আইস কারখানা এবং -৮০ ডিগ্রী স্টোরেজ গড়ে তোলার উদ্যগ সরকারকে এখনই নিতে হবে। ভ্যাকসিন বিশ্বে পরিবর্তনের জোয়ার এসেছে। এই পরিবর্তনের সাথে বাংলাদেশকেও খাপ খাইয়ে নিতে হবে।

ড. খোন্দকার মেহেদী আকরাম,
এমবিবিএস, এমএসসি, পিএইচডি,
সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট,
শেফিল্ড ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাজ্য।
FavoriteLoadingপ্রিয় পোস্টের তালিকায় নিন।

About The Author

মন্তব্য করুন