মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ১, ২০২০

করোনাভাইরাস ইনফেকশনের পরে টি-সেল রেসপন্স কার্যকরী থাকে কমপক্ষে ছয় মাস

করোনাভাইরাস ইনফেকশনের পরে টি-সেল রেসপন্স কার্যকরী থাকে কমপক্ষে ছয় মাস

image_pdfimage_print
করোনাভাইরাস সংক্রমণের পরে আমাদের শরীরের ইমিউন সিস্টেম ভাইরাসটির বিরুদ্ধে দুই ধরনের ইমিউনিটি তৈরী করে:
(১) এন্টিবডি মেডিয়েটেড হিউমোরাল ইমিউনিটি এবং
(২) টি-সেল মেডিয়েটেড সেলুলার ইমিউনিটি।
এন্টিবডি মেডিয়েটেড ইমিউনিটির প্রধান কার্যকরী উপাদান হচ্ছে ভাইরাস নিউট্রালাইজিং এন্টিবডি (IgG), যা তৈরী হয় বি-সেল (শ্বেত কণিকা) থেকে। এই নিউট্রালাইজিং এন্টিবডিই করোনাভাইরাসকে নিস্ক্রিয় করার মাধ্যমে সংক্রমণ প্রশমিত করে।
অন্যদিকে সেলুলার ইমিউনিটি পরিচালিত হয় হেল্পার টি-সেল (CD4+) এবং সাইটোটক্সিক টি-সেল (CD8+) দ্বয়ের মাধ্যমে। সাইটোটক্সিক টি-সেল ভাইরাস সংক্রমিত কোষ ধ্বংস করার মাধ্যমে শরীর থেকে ভাইরাস নির্মূল করে। অপরদিকে, হেল্পার টি-সেল এন্টিবডি উৎপাদনকারী বি-সেল এবং সাইটোটক্সিক টি-সেলেদ্বয়ের মধ্যে একধরণের সমন্বয় রক্ষা করে গোটা ইমিউন সিস্টেমকে সক্রিয় রাখে। একবার সংক্রমণের পরে ভাইরাসের সংস্পর্শে আসা টি-সেল এবং বি-সেলগুলি সাধারনত মেমোরি সেল হিসেবে শরীরের লসিকা গ্রন্থি এবং রক্তে থেকে যায়, যা পরবর্তীতে ভাইরাসের পুনঃসংক্রমণ থেকে রক্ষা করে।
পূর্ববর্তী কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে যে করোনাভাইরাস ইনফেকশনের পরে শরীরে তৈরী হওয়া এন্টিবডি টাইটার ৩/৪ মাসের মধ্যেই অনেক কমে যায়। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের ৩,৬৫,০০০ মানুষের উপর চালানো ইম্পেরিয়াল কলেজের সেরোসার্ভাইলেন্স স্টাডিতে দেখা যায় যে তিন মাসের ভেতরেই করোনাভাইরাসের সেরোপ্রিভ্যালেন্স ৬ শতাংশ থেকে কমে ৪.২ শতাংশে নেমে আসে।অর্থাৎ প্রতি তিন মাসে প্রায় ২৬ শতাংশ মানুষের শরীর থেকে নিউট্রালাইজিং এন্টিবডি অদৃশ্য হয়ে যায়। বৃদ্ধদের (৭৫+ বছর) ক্ষেত্রে এই এন্টিবডি অদৃশ্য হওয়ার হার ৩৯ শতাংশ। অর্থাৎ এই স্টাডি থেকে এটা নিশ্চিত যে করেনাভাইরাস সংক্রমণে তৈরী হওয়া এন্টিবডি রক্তে বেশী দিন স্থায়ী হয় না, আর এর ফলে পুনঃসংক্রমণের একটা সম্ভবনা থেকে যায়।
তবে বিজ্ঞানীরা ধারনা করে আসছিলেন যে সেল-মেডিয়েটেড ইমিউনিটি হয়ত করোনার পুনঃসংক্রমণ থেকে রক্ষা করবে। ২০০৩ সালে সংঘঠিত হওয়া সার্স ভাইরাসের মহামারী থেকে জানা যায় যে সার্স ভাইরাসের বিপরীতে তৈরী হওয়া টি-সেল রেসপন্স ৭ বছর পরেও সক্রিয় থাকে। যেহেতু নোভেল করোনাভাইরাস এবং সার্স ভাইরাসের ভেতরে সাদৃশ্য রয়েছে প্রায় ৮০ শতাংশ, তাই স্বভাবতই বিজ্ঞানীরা আসা করছিলেন যে করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রেও টি-সেল ইমিউনিটি একটা বড় ভূমিকা পালন করবে। তবে এ পর্যন্ত তাদের হাতে এই ধারনার স্বপক্ষে তেমন কোন তথ্য প্রমাণ ছিলনা।
এই প্রথম গতকাল ২ নভেম্বর যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বিজ্ঞানী তাদের গবেষণায় দেখালেন যে করোনাভাইরাসের সংক্রমণে তৈরী হওয়া এন্টিবডি টাইটার সময়ের সাথে কমে গেলেও, টি-সেল রেসপন্স সক্রিয় থাকে অন্তত পক্ষে ৬ মাস। অর্থাৎ করোনা ইনফেকশন শরীরে মেমোরি টি-সেল তৈরী করে এবং তা সংরক্ষন করে।
এই গবেষণাটি করা হয় ১০০ জন কোভিডে আক্রান্ত রোগীর উপর যাদের গড় বয়স ছিল ৪১ বছর, এবং যারা মাইল্ড এবং মডারেট কোভিডে ভুগছিলেন। করেনায় আক্রান্তের ৬ মাস পরে সুস্থ হওয়া রোগীদের রক্তে এন্টিবডি এবং টি-সেল রেসপন্স পরিমাপ করা হয়। এ পরীক্ষায় তারা দেখতে পান সংক্রমণের ১০ দিনের ভেতরেই আক্রান্তের রক্তে পর্যাপ্ত এন্টিবডি তৈরী হয় যার টাইটার পরবর্তী ৬ মাসে ৫০ শতাংশ কমে যায়। অন্যদিকে সংক্রমণের ৬ মাস পরে ১০০ জনের ভেতরে ৯৫ জনের রক্তেই পর্যাপ্ত পরিমানে সক্রিয় টি-সেলের উপস্থিতি পাওয়া যায়, যা করোনাভাইরাসের শুধু স্পাইক প্রোটিনই নয়, বরং নিউক্লিয়োক্যাপসিড এবং মেমব্রেন প্রোটিনের সাথেও বন্ধন সৃস্টি করতে সক্ষম হয়। এছারাও টি-সেলগুলি এক ধরনের প্রোটিন ‘ইন্টারলিউকিন-টু’ নিঃসরণ করে যা ভাইরাস নিরোধক প্রোটিন হিসেবে কাজ করে। এই গবেষণাপত্রটি এখনও পিয়ার রিভিউড জার্নালে প্রকাশিত হয়নি, তবে যুক্তরাজ্যের স্বনামধন্য ইমিউনোলজিস্টগন এই ফলাফলকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং গুরুত্বের সাথে দেখছেন।
এই গবেষণার ফলাফল সবচেয়ে বেশী সহায়ক হবে কোভিডের ভ্যাকসিন প্রস্তুতিতে। এযাবৎ যতগুলো ভ্যাকসিন উৎপাদিত হতে যাচ্ছে, তার ভেতরে সিনোভ্যাক এবং সিনোফার্মের ভ্যাকসিন দুটি ছাড়া বাকি সবগুলো ভ্যাকসিনই ফেইজ-টু ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে টি-সেল রেসপন্স ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। ভ্যাকসিনোলজিস্টরা প্রথম থেকেই তাদের ভ্যাকসিন ডিজাইনের সময় এই টি-সেল রেসপন্সের বিষয়টা সামনে রেখেছিলেন। তাদের ধারনা ভ্যাকসিনের মাধ্যমে আমাদের শরীরের টি-সেসগুলোকে ভালমত ট্রেইন-আপ করাতে পারলে তা হয়তো করোনার হাত থেকে দির্ঘমেয়াদী সুরক্ষা দেবে। উপরের গবেষণাটির ফলাফল এই ধারনাটিকে আরো মজবুত করলো।
ড. খোন্দকার মেহেদী আকরাম,
এমবিবিএস, এমএসসি, পিএইচডি,
সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট,
শেফিল্ড ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাজ্য।

FavoriteLoadingপ্রিয় পোস্টের তালিকায় নিন।

About The Author

মন্তব্য করুন