রবিবার, অক্টোবর ২৫, ২০২০

কোভিড-১৯ চিকিৎসায় রেজেন-কভ-২ থেরাপী (পর্ব – ২)

কোভিড-১৯ চিকিৎসায় রেজেন-কভ-২ থেরাপী (পর্ব – ২)

image_pdfimage_print
▪️ ল্যাবরেটরীতে রেজেন-কভ-২ এর জন্ম
কোভিডের মনোক্লোনাল এন্টিবডি থেরাপী উদ্ভাবনে বিজ্ঞানীদের প্রথম পদক্ষেপ ছিল করোনাভাইরাসের বিপরীতে তৈরী হওয়া কার্যকরী নিউট্রালাইজিং এন্টিবডিগুলোকে খুঁজে পাওয়া। আর এই অনুসন্ধান কাজটি তারা চালায় কোভিড থেকে সুস্থ্য হওয়া মানুষের কনভালেসেন্ট প্লাজমায় এবং এক বিশেষ ধরনের জেনেটিকভাবে রূপান্তরিত ‘ভেলোকইমিউন’ ইঁদুরের উপর। রেজেনেরন ফার্মাসিউটিক্যালসের ভেলোকইমিউন ইঁদুরের ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধক ব্যবস্থা একেবারে মানুষের ইমিউন সিস্টেমের মত। অর্থাৎ এই বিশেষ ইঁদুরকে করোনাভাইরাস দিয়ে সংক্রমিত করলে ইঁদুরটির ইমিউন সিস্টেম ভাইরাসের বিপরীতে যে এন্টিবডি তৈরী করে তা হুবহু মানুষের শরীরে তৈরী হওয়া এন্টিবডির মত। এই ইঁদুর ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা করোনাভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনের বিপরীতে বিস্তৃত প্রকৃতির মনোক্লোনাল এন্টিবডিসমুহ তৈরী করে এবং তার বিশ্লেষণ করে।
এর জন্য প্রথমে তারা ল্যাবরেটরীতে ব্যাকটেরিয়া কালচার করে স্পাইক প্রোটিনের জিন সিকোয়েন্স সমৃদ্ধ প্লাজমিড ডিএনএ (DNA) প্রস্তুত করে। এরপর তারা এই প্লাজমিড ডিএনএ প্রবেশ করায় ভেলোকইমিউন ইঁদুরের শরীরে, যা ইঁদুরের কোষে তৈরী করে স্পাইক প্রোটিন। আর এর দুই সপ্তাহ পরে ইঁদুরগুলোর শরীরে তৈরী হয় স্পাইক প্রোটিনের বিপরীতে বিপুল পরিমান এন্টিবডি। বিজ্ঞানীরা বিশেষ পদ্ধতিতে এই সংক্রমিত ইঁদুরগুলোর স্প্লীন বা প্লীহা থেকে বের করে নেয় উজ্জিবিত বি-লিম্ফোসাইটগুলো। অপরদিক, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের রক্ত থেকেও আলাদা করে নেয়া হয় বি-লিম্ফোসাইট। এই বি-লিম্ফোসাইটগুলোই স্পাইক প্রোটিনের বিপরীতে মনোক্লোনাল এন্টিবডি তৈরী করতে সক্ষম।
এরপর ক্লোনিং পদ্ধতিতে মানুষ এবং ইঁদুর থেকে আহরিত বি-লিম্ফোসাইটগুলো থেকে তৈরী করা হয় কম্প্লিমেন্টারি ডিএনএ (cDNA) বা জিন যা অন্য কোষে প্রোটিন তৈরী করতে সক্ষম। এই কম্প্লিমেন্টারি ডিএনএ গুলোকে এরপর ট্রান্সফেকশন পদ্ধতিতে প্রবেশ করানো হয় চাইনিজ হ্যামস্টারের ওভারি (CHO) কোষে। জিন প্রতিস্থাপিত এই ওভারি (ডিম্বাশয়) কোষগুলো তখন তৈরী করে করোনাভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনের বিপরীতে হরেক রকম মানব রিকম্বিনেন্ট মনোক্লোনাল এন্টিবডি। এই পদ্ধতিতে বিজ্ঞানীরা প্রায় হাজার খানেক এন্টিবডি সনাক্ত করে।
এই এন্টিবডিগুলোকে এরপর পরীক্ষা করা হয় স্পাইক প্রোটিন এবং করোনাভাইরাসের উপর। এতে দেখা যায় প্রায় ২০০ এন্টিবডি স্পাইক প্রোটিনের রিসিপ্টর বাইন্ডিং ডোমেইনের সাথে শক্ত ভাবে যুক্ত হয়ে করোনাভাইরাসকে নিস্ক্রিয় করে দেয়। আরো পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে এই ২০০ টি এন্টিবডি থেকে বাছাই করা হয় ৪ টি মনোক্লোনাল এন্টিবডি যারা ভাইরাস নিস্ক্রিয়করনে বেশ কার্যকরী। এরপর দেখা হয় এই চারটি এন্টিবডির ভেতরে কোনটি ইনফ্লামেটরি কোষের উপর ভাল কাজ করে, কোনটি এন্টিবডি-নির্ভর সাইটোটক্সিসিটি করে এবং কোন এন্টিবডিটির মৌলিক গঠন বেশী মানানসই। এসব বিষয় পুংখানুপুংখভাবে পরীক্ষা নিরীক্ষার পর দেখা যায় মূলত দুইটি এন্টিবডি (REGN10933 এবং REGN10987) একটির সাথে আরেকটি কোনরূপ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত না হয়েই স্পাইক প্রোটিনের রিসিপ্টর বাইন্ডিং ডোমেইনের সাথে বন্ধন সৃস্টি করে এবং ল্যাবে তৈরী সিউডো করোনাভাইরাসকে নিস্ক্রিয় করে (Science, আগস্ট ২০২০)। এই দুইটি মনোক্লোনাল এন্টিবডিকে একসাথে করে ককটেল হিসেবে প্রয়োগ করার সুবিধা হল ভাইরাসে কোন মিউটেশন বা রুপান্তর হলেও এই এন্টিবডি থেরাপী কার্যকর হবে। এভাবেই বিশেষভাবে রুপান্তরিত ইঁদুর ব্যাবহার করে ল্যাবরেটরীতে তৈরী হয় রেজেন-কভ-২ নামের মনোক্লোনাল এন্টিবডি ককটেল যা এখন রয়েছে ফেইজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে।
▪️ কোভিডে রেজেন-কভ-২ এর কার্যকরীতা
রেজেন-কভ-২ মনোক্লোনাল এন্টিবডি ককটেল ওষুধটি এখন যৌথভাবে উৎপাদন করছে রেজেনেরন ফার্মাসিউটিক্যালস এবং রোস। ওষুধটি প্রি-ক্লনিক্যাল টেস্টে ভাল ফল দেখিয়েছে।
পরীক্ষামূলক ওষুধ হিসেবে রেজেন-কভ-২ এখন ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে রয়েছে। দুই গ্রুপের রোগীদের উপর এর ট্রায়াল চালানো হচ্ছে। এক গ্রুপ হচ্ছে মাইল্ড কোভিডে আক্রান্ত রোগী যারা বাসায় থেকে চিকিৎসা নিচ্ছে। আরেক গ্রুপ হচ্ছে মডারেট ও সিভিয়ার কোভিডে আক্রান্ত রোগী যারা হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে। এই গ্রুপটি মূলত যুক্তরাজ্যের রিকভারি (RECOVERY) ট্রায়ালের অন্তর্ভূক্ত।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর ২৭৫ জন মাইল্ড কোভিডে আক্রান্ত রোগীদের উপরে চালানো ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের প্রাথমিক ফলাফল প্রকাশ করা হয় (regeneron.com)। এই গ্রুপের সকল রোগীই বাসায় চিকিৎসা নেয়। সবাইকে পয়েন্ট অফ কেয়ার বা আউটডোরে এক ডোজ করে রেজেন-কভ-২ এন্টিবডি ককটেল থেরাপী ইনফিউশন আকারে শিরার মাধ্যমে দেয়া হয়। এক তৃতীয়াংশ রোগীকে দেয়া হয় হাই-ডোজ (৮ গ্রাম), এক তৃতীয়াংশ রোগীকে লো-ডোজ (২.৪ গ্রাম) এবং বাকি এক তৃতীয়াংশ রোগীকে দেয়া হয় প্ল্যাসিবো। স্টাডিটি একটি ডাবল-ব্লাইন্ড কন্ট্রোল ট্রায়াল।
প্রাথমিক ফলাফলে দেখা যায় যে এক ডোজ রেজেন-কভ-২ ইনজেকশন রোগীদের শরীরে ভাইরাসের লোড কমায় উল্লেখযোগ্যভাবে এবং রোগ থেকে সুস্থ্য হতে সময় অনেক কমিয়ে দেয়। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে চিকিৎসা শুরুর সময় যে রোগীর শরীরে যত বেশী ভাইরাসের সংক্রমণ ছিল তার উপরে ওষুধটি ততো ভাল কাজ করেছে। যেমন যে রোগীর চিকিৎসা শুরুতে শরীরে ভাইরাস ছিল প্রতি মিলিলিটারে ১ লক্ষ কপি, চিকিৎসা দেয়ার সাত দিন পরে তা ৫০-৬০ শতাংশ কমে যায়। আবার যার চিকিৎসা শুরুতে শরীরে ভাইরাস ছিল ১০ লক্ষ কপি, তা চিকিৎসার সাত দিন পরে কমে যায় ৯৫ শতাংশ। আর যার শুরুতে ভাইরাস ছিল ১ কোটি কপি, তা ওষুধ প্রয়োগের সাত দিন পরে কমে যায় ৯৯ শতাংশ
এছাড়াও দেখা যায় যে রেজেন-কভ-২ ওষুধটি অপেক্ষাকৃত ভাল কাজ করে সেরোনেগেটিভ রোগীদের উপর, অর্থাৎ যাদের করোনা সংক্রমণ হয়েছে কিন্তু রক্তে এখনও ভাইরাসের বিপরীতে এন্টিবডি তৈরী হয়নি। সুতরাং যে সব রোগী নিজ থেকে ভাইরাসের বিরুদ্ধে রোগপ্রতিরোধক এন্টিবডি তৈরী করতে পারেনা, রেজেন-কভ-২ হতে পারে তাদের জন্য উপযুক্ত একটি ওষুধটি। এই ট্রায়ালে তেমন কোন মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হয়নি। তবে একটা বিষয় লক্ষণীয়। এই ট্রায়ালে অংশগ্রহনকারী রোগীদের গড় বয়স ছিল ৪৪ বছর। এই বয়সের রোগীরা সাধারনত কোন প্রকার চিকিৎসা ছাড়াই কোভিড থেকে সেরে উঠে এবং খুব কম রোগীই সিভিয়ার কোভিডের দিকে ধাবিত হয়। সুতরাং এই ট্রায়াল থেকে এটা বলা যাবেনা যে রেজেন-কভ-২ থেরাপী ষাটোর্ধ কোভিড রোগীদের সিভিয়ার কোভিডের হাত থেকে কতোটুকু রক্ষা করে। আর এ ওষুধটি সিভিয়ার বা ক্রিটিক্যাল কোভিডে আক্রান্ত হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মৃত্যুহার কমাতে পারে কিনা তাও রয়ে গেছে অজানা, কারন এ ধরনের রোগীর উপর চালানো ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালটি এখনও শেষ হয়নি। তবে যেহেতু এ ধরণের মনোক্লোনাল এন্টিবডি থেরাপী অতীতে ইবোলা ভাইরাসে বেশ ভাল ফল দেখিয়েছে, তাই কিছুটা হলেও আশা করা যায় যে রেজেন-কভ-২ ও হয়তো সিভিয়ার কোভিড থেকে মৃত্যুহার কমাতে পারবে।
▪️ রেজেন-কভ-২ থেরাপী উচ্চবিত্তের চিকিৎসা?
যে কোন ধরনের মনোক্লোনাল এন্টিবডি থেরাপী বেশ ব্যায়বহুল। যেমন টসিলিজুম্যাব ২০০ মিলিগ্রাম ইনজেকশনের এক ডোজের দাম ২৫ হাজার টাকা। সুতরাং কোভিড চিকিৎসায় ৭ দিনে ৭ টি ডোজ দিতে খরচ পরে প্রায় ১ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকা। যুক্তরাজ্যে এই চিকিৎসা আরো বেশী ব্যায়বহুল, কারণ এখানে এক ডোজ ওষুধের দাম পরে প্রায় ৯০০ পাউন্ড, বাংলাদেশি মুদ্রায় যার মূল্য ৯০ হাজার টাকা। এ ওষুধটি অবশ্য শুধুমাত্র সিভিয়ার কোভিডে ব্যাবহার করা হয় যেখানে জীবন সংশয়ের সম্ভবনা রয়েছে। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের রিকভারি ট্রায়ালে দেখা গেছে কয়েকশ টাকার সস্তা ডেক্সামেথসন চিকিৎসায় কোভিডে যে সুফল পাওয়া যায় তা টসিলিজুম্যাব চিকিৎসার চেয়ে উত্তম এবং কার্যকরী।
রেজেন-কভ-২ মনোক্লোনাল এন্টিবডি থেরাপী এখনও পরীক্ষামূলক ব্যাবহারে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে রয়েছে, তাই এর বাজার মূল্য কত হতে পারে রয়েগেছে অজানা। রেজেন-কভ-২ ওষুধটিতে মনোক্লোনাল এন্টিবডির পরিমান এক ডোজে ৮ গ্রাম। এন্টিবডির দুনিয়ায় এই পরিমাণটা অনেক বেশী। ল্যাবরেটরীতে এন্টিবডি উৎপাদন করা সময় সাপেক্ষ এবং ব্যায়বহুল। তবে একটা ভাল দিক হচ্ছে পরিমানে বেশী লাগলেও কোভিড চিকিৎসায় এই ওষুধটি লাগে মাত্র এক ডোজ। যুক্তরাষ্ট্র সরকার রেজেনেরন ফার্মাসিউটিক্যালসের সাথে ৪৫০ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি করে ফেলেছে, যার বিপরীতে কোম্পানীটি প্রায় ৭০ হাজার থেকে ৩০০ হাজার ডোজ মনোক্লোনাল এন্টিবডি সরবরাহ করবে এ বছরেই। সুতরাং অনুমান করা যায় যে এক ডোজ রেজেন-কভ-২ ওষুধের দাম পরতে পারে দেড় হাজার ডলার থেকে ৪ হাজার ডলারের মত। বাংলাদেশী টাকায় যার মূল্য হতে পারে দেড় লক্ষ টাকা থেকে সাড়ে তিন লক্ষ টাকা। এই মূল্যটি উচ্চবিত্তের ক্রয় ক্ষমতার ভেতর থাকলেও, গরীব ও নিন্মবিত্তের জন্য হবে কস্টসাধ্য।
রেজেন-কভ-২ থেরাপী ব্যায়বহুল হলেও যতদিন কোভিডের কোন কার্যকরী ভ্যাকসিন না আসছে ততোদিন পর্যন্ত এ ওষুধটি একটি কার্যকরী ওষুধ হতে পারে ঐসব কোভিড রোগীদের জন্য যাদের বয়স ৭০ এর উপরে, দৈহিকভাবে যারা স্থুলকায় এবং যারা ভুগছে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, হাঁপানি সহ আরো অন্যান্য জটিল রোগে।
ড. খোন্দকার মেহেদী আকরাম, SBMC 27th
এমবিবিএস, এমএসসি, পিএইচডি,
সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট,
শেফিল্ড ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাজ্য।
FavoriteLoadingপ্রিয় পোস্টের তালিকায় নিন।

About The Author

মন্তব্য করুন