রবিবার, অক্টোবর ২৫, ২০২০

কোভিড-১৯ চিকিৎসায় রেজেন-কভ-২ থেরাপী (পর্ব – ১)

কোভিড-১৯ চিকিৎসায় রেজেন-কভ-২ থেরাপী (পর্ব – ১)

image_pdfimage_print
সম্প্রতি কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে গত শুক্রবারে (২ অক্টোবর) পরীক্ষামূলক ভাবে রেজেন-কভ-২ মনোক্লোনাল এন্টিবডি চিকিৎসা দেয়া হয়। সাথে তাকে চিকিৎসা হিসেবে আরো দেয়া হয় এন্টিভাইরাস ওষুধ রেমডিসিভির এবং ডেক্সামেথসন।
রেজেন-কভ-২ হলো যুক্তরাষ্ট্রের রেজেনেরন ফার্মাসিউটিক্যালসের নবউদ্ভাবিত দুইটি মনোক্লোনাল এন্টিবডির সম্মিলিত ককটেল যা সার্স-কভ-২ নোভেল করোনাভাইরাসকে নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম। এই নতুন ওষুধটি বেশ কিছুদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যের কয়েকটি হাসপাতালে বিভিন্ন ধাপের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে রয়েছে। এখনো ওষুধটি সাধারণে ব্যবহারের জন্য এফডিএ’র অনুমোদন পায়নি। ট্রাম্পের বয়স এবং শারীরিক স্থূলতার (ওবেসিটির) কথা বিবেচনা করে তাকে এই পরীক্ষামূলক ওষুধটি দেয়া হয় কম্প্যাশনেট চিকিৎসা হিসেবে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে দেয়ার পর থেকেই এই ওষুধটি বিভিন্ন মিডিয়াতে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয় যা পরবর্তিতে সাধারণের মাঝে বেশ কৌতূহল সৃষ্টি করে।
মনোক্লোনাল এন্টিবডি থেরাপী কি? এটা কিভাবে উৎপাদিত হয়? রেজেন-কভ-২ আসলেই কি কোভিডের একটি কার্যকরী চিকিৎসা হতে যাচ্ছে? এসব জানতে সবাই বেশ উদগ্রীব, অন্তত পক্ষে যতদিন একটি কার্যকরী ভ্যাকসিন না আসে ততোদিন সবাই চায় একটি কার্যকরী ওষুধ।
করোনায় মনোক্লোনাল এন্টিবডি থেরাপী কিন্তু একদম নতুন নয়। টসিলিজুম্যাব নামক একধরণের মনোক্লোনাল এন্টিবডি সিভিয়ার বা মারাত্মক কোভিডে ব্যাবহৃত হয়ে আসছে বেশ কিছুদিন হল। টসিলিজুম্যাব হল প্রদাহ সৃস্টিকারী একধরণের সাইটোকাইন ইন্টারলিউকিন-৬ রিসিপ্টর ব্লকার। সিভিয়ার বা ক্রিটিক্যাল কোভিডে রোগী মারা যায় একধরণের সাইটোকাইন স্টোর্ম বা মারাত্মক প্রদাহক্রিয়াতে, যেখানে ইন্টারলিউকিন-৪ এবং ইন্টারলিউকিন-৬ প্রোটিন দুটি প্রধান চালিকা হিসেবে কাজ করে। সিভিয়ার কোভিডে এই টসিলিজুম্যাব ইন্টারলিউকিন-৬ এর কার্যকারীতা অনেকাংশে কমিয়ে দেয় এবং সাইটোকাইন স্টোর্ম প্রশমনে সহায়তা করে। আর এভাবেই অনেক ক্ষেত্রে এ ওষুধটি করোনা থেকে মৃত্যুহার কমিয়ে দেয়।
অন্যদিকে রেজেন-কভ-২ মনোক্লোনাল এন্টিবডি ককটেল কাজ করে সম্পূর্ন ভিন্নভাবে। টসিলিজুম্যাব করোনাভাইরাস সংক্রমণের পরে সংঘটিত হওয়া ইনফ্লামেশন বা প্রদাহ প্রশমণ করে, কিন্ত রেজেন-কভ-২ মূলত করোনাভাইরাসের সংক্রমণ করার ক্ষমতাকেই দমন করে। রেজেন-কভে থাকা দুইটি নিউট্রালাইজিং এন্টিবডি করোনাভাইরাসকে নিস্ক্রিয় করে।
▪️ রেজেন-কভ-২ এর ধারনা প্লাজমা থেরাপী থেকে
নিউট্রালাইজিং এন্টিবডি দিয়ে ভাইরাস নিস্ক্রিয় করার ধারনাটির আবির্ভাব হয় মূলত কনভালেসেন্ট প্লাজমার ভাইরাস নিস্ক্রিয় করার প্রাকৃতিক গুনাবলী থেকে। ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রেও এই নিউট্রালাইজিং এন্টিবডি ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। কনভালেসেন্ট প্লাজমা হল রোগ থেকে সেরে ওঠা মানুষের রক্তের জলীয় অংশ যার ভেতরে থাকে রোগ সৃষ্টিকারী ভাইরাসের বিপরীতে তৈরী হওয়া অনেক ধরনের এন্টিবডি। গবেষণায় দেখা যায় যে করোনাভাইরাস সংক্রমণের পর মানবদেহে থাকা বি-লিম্ফোসাইট (একধরণের শ্বেত কনিকা) ঐ ভাইরাসের বিপরীতে প্রায় ২০৮ ধরনের এন্টিবডি তৈরী করে, এবং এদের ভেতর বেশ কয়েকটি এন্টিবডি ভাইরাসকে নিস্ক্রিয় করতে পারে। এই নিস্ক্রিয় করার ক্ষমতা সম্বলিত এন্টিবডিগুলোই হচ্ছে নিউট্রালাইজিং এন্টিবডি বা ইমিউনোগ্লোবিউলিন, যা আইজিজি (IgG) নামে পরিচিত।
করোনা চিকিৎসায় কনভালেসেন্ট প্লাজমা থেরাপী এখন অনেকটাই প্রতিষ্ঠিত। বাংলাদেশেও এর ব্যবহার চলছে অনেকদিন ধরে। কোভিডে আক্রান্ত রোগীকে সময় মত ভাল মানের কনভালেসেন্ট প্লাজমা দিতে পারলে এ রোগ থেকে অনেক জীবন রক্ষা করা সম্ভব। তবে এক্ষেত্রে একটা প্রধান সমস্যা হল কনভালেসেন্ট প্লাজমার সরবরাহ বা লভ্যতা। বিশ্বব্যাপী রোগী অনুপাতে কনভালেসেন্ট প্লাজমার সরবরাহ খুবই অপ্রতুল। আবার অনেক ক্ষেত্রেই আহরিত প্লাজমায় এন্টিবডি টাইটার থাকে খুবই কম, যা বস্তুত কোন কাজেই আসে না। অন্যদিকে, প্লাজমা থেরাপীর মাধ্যমে একজন থেকে আরেকজনে বিভিন্ন ধরনের রোগ জীবানু যেমন এইচআইভি, হেপাটাইটিস ইত্যাদি সঞ্চালনের সম্ভাবনাও থাকে। এসব কারনে বিজ্ঞানীরা চেস্টা করছেন কনভালেসেন্ট প্লাজমায় যেসব নিউট্রালাইজিং এন্টিবডি থাকে তা ল্যাবরেটরীতে কৃত্রিমভাবে তৈরী করে কিভাবে ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করা যায় তা নিয়ে।
▪️ করোনাভাইরাসের টার্গেট নির্বাচন
সার্স-কভ-২ করোনাভাইরাসটি একটি অতিক্ষুদ্র আণুবীক্ষণিক আরএনএ (RNA) ভাইরাস। ভাইরাসটির কাঠামো তৈরী চারটি প্রধান প্রোটিন দিয়ে: এগুলো হল স্পাইক প্রোটিন (S-প্রোটিন), এনভেলপ প্রোটিন (E-প্রোটিন), নিউক্লিওক্যাপসিড প্রোটিন (N-প্রোটিন) এবং মেমব্রেন প্রোটিন (M-প্রোটিন)। এই প্রোটিন চারটির ভেতরে নিউক্লিওক্যাপসিড প্রোটিনটি ভাইরাসের জিনোম আরএনএ’কে একত্রিত করে রাখে, আর বাকি তিনটি প্রোটিন তৈরী করে ভাইরাসটির বহিরাবরণ বা খোলক (এনভেলপ)।
বহিরাবরণের প্রোটিনগুলোর ভেতরে স্পাইক প্রোটিনটি সংক্রমণ সৃস্টিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ফুসফুসে প্রবেশের পর এই প্রোটিনের মাধ্যমেই করোনাভাইরাসটি আমাদের কোষের গায়ে থাকা এসিই-টু (ACE2) রিসিপ্টরের সাথে আটকে যায় এবং পরবর্তীতে ভাইরাসটি কোষের ভিতরে প্রবেশ করে বংশবিস্তার করে এবং সমক্রমিত কোষগুলোকে ধ্বংস করে ফেলে। স্পাইক প্রোটিনের অগ্রভাগে থাকা ছোট্ট অংশটিকে বলে রিসিপ্টর বাইন্ডিং ডোমেইন (RBD), এই অংশটিই মূলত এসিই-টু রিসিপিটরের সাথে সংযুক্ত হয়। এ কারনেই বিজ্ঞানীরা স্পাইক প্রোটিনের রিসিপ্টর বাইন্ডিং ডোমেইনকেই বেছে নিয়েছে তাদের এন্টিবডি ও ভ্যাকসিনের টার্গেট হিসেবে। কারন একটা এন্টিবডি যদি এই রিসিপ্টর বাইন্ডিং ডোমেইনকে আবৃত করে ফেলে তাহলে করোনাভাইরাসটি আর তার রিসিপ্টরের সাথে কার্যকর বন্ধন সৃস্টি করতে পারবেনা, এবং এর ফলে ভাইরাস নিঃশ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসে প্রবেশ করলেও তা কোষকে আর সংক্রমিত করতে পারবেনা। এই মূলনীতির উপরেই তৈরী হয়েছে মনোক্লোনাল এন্টিবডি থেরাপী।

কোভিড-১৯ চিকিৎসায় রেজেন-কভ-২ থেরাপী (পর্ব – ২)

FavoriteLoadingপ্রিয় পোস্টের তালিকায় নিন।

About The Author

মন্তব্য করুন