রবিবার, অক্টোবর ২৫, ২০২০

ডেংগুভাইরাস সংক্রমণ কি কোভিড-১৯ রোগে প্রতিরক্ষা দেয়?

ডেংগুভাইরাস সংক্রমণ কি কোভিড-১৯ রোগে প্রতিরক্ষা দেয়?

image_pdfimage_print

সম্প্রতি ব্রাজিলে চালানো একটা গবেষণা থেকে দেখা যায় যে পূর্বে ডেংগু জ্বরে আক্রান্ত মানুষের ভেতরে করোনাভাইরাস সংক্রমণের প্রবণতা অপেক্ষাকৃত কম এবং এই সংক্রমণ থেকে সিভিয়ার কোভিডে মৃত্যুহারও কম। এই গবেষণা পত্রটি প্রি-প্রিন্ট সার্ভার medRxiv তে প্রকাশিত হয়েছে ২১ সেপ্টেম্বর এবং বর্তমানে একটি পিয়ার রিভিউড জার্নালে প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে।

করোনায় আক্রান্তের দিক দিয়ে বিশ্বে ব্রাজিল রয়েছে তৃতীয় স্থানে। তবে দেশটিতে সংক্রমণ বিস্তারে আঞ্চলিক অসামঞ্জস্যতা দেখা যায় প্রকটভাবে যা গানিতিক মডেলে অ্যানোমালি হিসেবে গণ্য হয়। ব্রাজিলের বেশ কিছু রাস্ট্রে বা শহরে করোনা সংক্রমণ অপেক্ষাকৃত অনেক বেশী। আবার কিছু কিছু অঞ্চলে এই সংক্রমণ খুবই কম পরিলক্ষিত হয়। করোনা সংক্রমণের এ ধরনের আঞ্চলিক বিস্তার নতুন কিছু নয়। বাংলাদেশেও দেখা যায় কিছু জেলা বা শহর করোনায় অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে অপেক্ষাকৃত বেশী আক্রান্ত। এর অবশ্য অনেকগুলো কারণ থাকতে পারে।

তবে ব্রাজিলের গবেষকদল সংক্রমণ বিস্তারের কয়েকটি টেকনিক্যাল কারণ ছাড়াও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইমিউনোলজিক্যাল কারণ উদঘাটন করেছেন। গোটা ব্রাজিলে চালানো ইপিডেমিওলোজিক্যাল এবং সেরোকনভার্শন ডাটাবেইজ সার্ভেতে তারা দেখতে পান যে ব্রাজিলের যে অঞ্চলগুলো ২০১৯-২০২০ সময়টিতে ডেংগু মহামারীতে আক্রান্ত হয়েছিল সে অঞ্চলগুলোতে মার্চে শুরু হওয়া করোনা সংক্রমণ এবং পরবর্তিতে তার বিস্তারের গতি অন্যান্য ডেংগুমুক্ত অঞ্চলের চেয়ে অনেক কম। ইমিউনোলজিক্যাল রেকর্ড থেকে দেখা যায় যে মূলত যাদের শরীরে ডেংগুভাইরাসের এন্টিবডি (IgM) ছিল তারা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে কম। একই ভাবে ব্রাজিলের যেসব শহরের মানুষের ভেতরে ডেংগুভাইরাসের এন্টিবডি পাওয়া যায়, সেসব শহরে করোনা সংক্রমণও গড়পরতায় অনেক কম।

এরপর গবেষকগণ দেখার চেস্টা করেন যে আরেকটি মশাবাহীত ভাইরাস চিকুনগুনিয়া সংক্রমণের সাথে করোনাভাইরাস সংক্রমণের কোন সম্পর্ক আছে কিনা। তারা একই ভাবে ভৌগলিক এবং ইমিউনোলজিক্যাল সার্ভে চালান এবং দেখতে পান যে চিকুনগুনিয়া সংক্রমণ করোনাভাইরাস সংক্রমণে কোন প্রকার প্রভাব ফেলে না। অর্থাৎ ডেংগুভাইরাসের সংক্রমণে তৈরী হওয়া এন্টিবডি করোনাভাইরাসের বিপরীতে যে প্রতিরোধ গড়ে তোলে তা চিকুনগুনিয়ায় তৈরী হওয়া এন্টিবডি করতে পারে না।

ডেংগু জ্বর প্রবণ অঞ্চলগুলো যে শুধু ব্রাজিলেই করোনার মহামারীর তিব্রতা থেকে রক্ষা পেয়েছে তাই নয়, বরং এমনটি দেখা গেছে পৃথিবীর আরও ১৫ টি ডেংগু আক্রান্ত অন্যান্য দেশেও। এদের মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ল্যাটিন আমেরিকা এবং প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগর সংলগ্ন দ্বীপগুলোতে দেখা যায় যে ডেংগু জ্বরের প্রাদুর্ভাব ঐ অঞ্চলগুলোকে করোনা মহামারী থেকে রক্ষা করেছে। এই ফলাফল থেকে এটা অনেকটা পরিস্কার যে ডেংগু জ্বরের বিপরীতে তৈরী হওয়া রোগপ্রতিরোধক ক্ষমতা করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

বাংলাদেশে ডেংগু জ্বরের প্রাদুর্ভাব

গত বছরের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশে রেকর্ড সংখ্যক প্রায় ৮২ হাজার ডেংগু আক্রান্ত রোগী সনাক্ত হয়, এবং নভেম্বরে সংখ্যাটি বেড়ে দাড়ায় ১ লক্ষে, যার ভেতরে অর্ধেকের বেশী রোগীই ছিল ঢাকাতে। ২০১৯ এর আগস্ট-ডিসেম্বরে ঢাকার ভেতরে এলাকা অনুযায়ী ডেংগুর সেরোপ্রিভ্যালেন্স বা সংক্রমণের বিস্তার কেমন ছিল? এবং এ বছর ঐ স্থানগুলোতে করোনাভাইরাসের সেরোপ্রিভ্যালেন্স বা সংক্রমণ কেমন? বস্তি এলাকাগুলোতে কি গত বছর ডেংগুর প্রকোপ বেশী ছিল? এবছর ঢাকার বস্তি এলাকাগুলোতে করোনা সংক্রমণের হার কেমন? ধারনা করা হয় রাজধানীর বস্তি এলাকাগুলোতে বসবাসকারীদের ভেতরে করোনা সংক্রমণ অপেক্ষাকৃত অনেক কম। ঢাকায় একটা সেরোপ্রিভ্যালেন্স সার্ভে করলে আসল তথ্যটা জানা যাবে যে ব্রাজিলের মত ঢাকার বস্তিগুলোতেও ডেংগুর প্রাদুর্ভাব করোনা সংক্রমণে কোন ভূমিকা রাখছে কি না।

ডেংগু ইমিউনিটি কিভাবে করোনা প্রতিরোধ করে?

ডেংগুভাইরাস এবং করোনাভাইরাস দুটি দু’ ধরনের ভাইরাস। ডেংগু হচ্ছে ফ্ল্যাভিভাইরাস যা মানুষে ছড়ায় এডিস মশার মাধ্যমে। আর করোনাভাইরাস হল করোনাভিরিডি গোত্রের রেসপিরেটরি ভাইরাস যা মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় হাঁচি কাশির মাধ্যমে। দুটো ভাইরাস দু’ গোত্রের হলেও এরা উভয়ই পজিটিভ সেন্স আরএনএ ভাইরাস। এই দুটো ভাইরাসই রক্ত নালীকার এন্ডোথেলিয়াল কোষকে সংক্রমিত করে এবং সিভিয়ার রোগের ক্ষেত্রে সাইটোকাইন স্টোর্ম সংগঠনের মাধ্যমে মৃত্যু ঘটাতে পারে। ডেংগু এবং করোনা এই দুটি ভাইরাসই সিভিয়ার রোগে রক্ত জমাট বাঁধায়। রক্ত পরীক্ষায় এই দুই ভাইরাসের ক্ষেত্রেই ডি-ডাইমারের উপস্থিতি বেড়ে যায়। অর্থাৎ ভাইরাসের গৌত্রগত ভিন্নতা থাকলেও এদের দ্বারা সংগঠিত ক্লিনিক্যাল সিম্পটম সমুহে অনেক সাদৃশ্য রয়েছে।

অন্যদিকে, ল্যাবরেটরী গবেষণায় দেখা যায় যে দুটো দু’ ধরনের ভাইরাস হলেও ডেংগুভাইরাস এবং করোনাভাইরাসের নিউক্লিয়োক্যাপসিড প্রোটিনের ভেতরে বেশ অনেকটা সাদৃশ্য রয়েছে। ধারনা করা হয় এই সাদৃশ্যের কারণে ডেংগুভাইরাসের নিউক্লিয়োক্যাপসিড প্রোটিনের বিপরীতে তৈরী হওয়া এন্টিবডি এবং টি-সেল ইমিউনিটি সম্ভবত করোনাভাইরাসের বিপরীতেও ইমিউনিটি দেয়। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে যে মার্স এবং সার্স ভাইরাসের বিপরীতে তৈরী হওয়া টি-সেলগুলো করোনাভাইরাসের বিপরীতেও ইমিউন রিঅ্যাকশন করে। আবার এটাও দেখা গেছে যে অন্যান্য করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের শরীরে তৈরী হওয়া ইমিউনিটি নোভেল করোনাভাইরাসের বিপরীতেও কার্যকরী (BMJ, ১৭ সেপ্টেম্বর)। এর আগে এন্টিবডি টেস্টে দেখা যায় কিছু কিছু ক্ষেত্রে ডেংগু এবং করোনাভাইরাসের এন্টিবডি ক্রস রিয়্যাক্ট করে। সুতরাং, বলা যায় ডেংগুর বিপরীতে তৈরী হওয়া নিউট্রালাইজিং এন্টিবডি এবং সেল-মেডিয়েটেড ইমিউনিটি কিছুটা হলেও করোনাভাইরাসের বিপরীতে কার্যকরী হতে পারে।

কোভিড-১৯ এ ডেংগু ভ্যাকসিনের কার্যকরীতা

ডেংগু জ্বরে প্রাকৃতিক ভাবে তৈরী হওয়া ইমিউনিটি যদি করোনাভাইরাসের বিপরীতেও ইমিউনিটি দিয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন আসতে পারে ডেংগু ভ্যাকসিন কি কোভিড-১৯ এ প্রতিরক্ষা দিতে পারে? তত্ত্বগতভাবে পারা উচিত। তবে এর উপরে এখন পর্যন্ত তেমন কোন গবেষণা হয়নি। করোনা মহামারী থেকে বাঁচার জন্য এখন দরকার একটা কার্যকরী ভ্যাকসিন। জানুয়ারী থেকে চেস্টা অব্যাহত রয়েছে, তবে এখনও আমরা কোন ভ্যাকসিন হাতে পাইনি। অনেক বিজ্ঞানী চিন্তা করছেন অন্য কোন ভ্যাকসিন যেমন বিসিজি অথবা ডেংগু ভ্যাকসিন কোভিড প্রতিরোধে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের জন্য ব্যবহার করা যায় কিনা। অস্ট্রেলিয়াতে কোভিডে বিসিজি ভ্যাকসিনের কার্যকরীতা পরীক্ষায় ফেইজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু হয়ে গেছে।

তবে সমস্যা হল এখনও সর্বসাধারনে ব্যবহারের জন্য একটি নিরাপদ ও সম্পূর্ণ কার্যকরী ডেংগু ভ্যাকসিন প্রস্তুত হয়নি। সানোফির ডেংভ্যাক্সিয়া নামক একটি ডেংগু ভ্যাকসিনকে জনসাধারনে অনুমোদন দেয়া হয়েছে যদিও। কিন্তু এই ভ্যাকসিনটি সেরোনেগেটিভ (যার রক্তে ডেংগু এন্টিবডি নেই) মানুষে ইমিউনিটি দেয় মাত্র ৩৮ শতাংশ। শুধু তাই নয়, সেরোনেগেটিভ ভ্যাকসিন গ্রহীতাদের মধ্যে মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রয়াও পরিলক্ষিত হয়। এ কারনেই এখন এই ভ্যাকসিনটি দেয়ার পূর্বে রক্তে ডেংগুর এন্টিবডি পরীক্ষা করে দেখা হয়। রক্তে যদি ডেংগু এন্টিবডি না থাকে তাহলে তাকে আর ভ্যাকসিনটি দেয়া হয়না।

ডেংগুর আরেকটি নতুন ভ্যাকসিন TAK-003 ফেইজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে ভাল ফল দেখিয়েছে। প্রায় ১৩ হাজার ভলান্টিয়ারের উপর চালানো ট্রায়ালে ভ্যাকসিনটি সুরক্ষা দিয়েছে শতকরা ৮০ থেকে ৯০ ভাগ

ভবিষ্যতে বৃহৎ পরিসরে গবেষণা করে দেখা দরকার যে ডেংগু ভ্যাকসিন প্রকৃতপক্ষেই কোভিড-১৯ এ কোন প্রকার প্রতিরক্ষা দেয় কিনা। উত্তরটি এখন পর্যন্ত অজানাই রয়ে গেছে।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

FavoriteLoadingপ্রিয় পোস্টের তালিকায় নিন।

About The Author

মন্তব্য করুন