বুধবার, মে ২৭, ২০২০

করোনা যুদ্ধের সন্মুখ সৈনিকেরা

করোনা যুদ্ধের সন্মুখ সৈনিকেরা

image_pdfimage_print

কোভিড-১৯ বা করোনা একটি প্যানডেমিক রোগ। সারা বিশ্ব আজ কাঁপছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের পরে এত কঠিন জাতীয় দুর্যোগ আমাদের আর আসেনি। আমরা সবাই দুশ্চিন্তায় অস্থির, আমরা আতঙ্কগ্রস্ত।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বললেন,”সংক্রমন ছড়িয়ে গেলে সামাল দেয়া অসম্ভব “। যেটি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বহুদিন থেকে বলে আসছেন। বলে আসছেন টেস্টের কথা, বলে আসছেন লক ডাউনের কথা। কারন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা ভয়াবহতা জানেন।

এযুদ্ধে সম্মিলিতভাবে কাজ করছেন অনেকেই। সকলের কাজই গুরুত্ত্বপূর্ন। এই লক ডাউনের মধ্যে যারাই করোনা প্রতিরোধের জন্য বাইরে কাজ করছেন সবাই এই যুদ্ধের যোদ্ধা। কিন্তু সন্মুখযুদ্ধের সৈনিকদের কাজের সাথে অন্য কারো কাজের তুলনা হবেনা। যেমন তুলনা হবেনা রনক্ষেত্রে মুখোমুখি যুদ্ধের সৈনিকদের সাথে অন্য কারো। সেই করোনা সন্মুখযুদ্ধের সৈনিক হোল চিকিৎসক এবং তার সহযোগীরা।

দু’টো কারনে এই যোদ্ধারা বিশেষভাবে আলাদা

১। মানুষের মৃত্যুর সাথে লড়া। সে কাজ কি ভীষন বিশেষায়িত তা বোধ হয় বলার অপেক্ষা রাখে না।
২। নিজের জীবনের হুমকি নিয়ে লড়া। সবচেয়ে বেশী সংক্রমিত হবার সম্ভাবনা।

সব সৈনিকই জীবন বাজি রেখে কাজ করে। কিন্তু তফাৎ হোল আমাদের আসল সৈনিকরা তাদের প্রশিক্ষনের শুরু থেকে মানসিক এবং দৈহিকভাবে শক্তিশালী হয়ে প্রস্তুত হয়ে যায়। কিন্তু করোনা যুদ্ধের সন্মুখ সৈনিকরা জীবনে কখনও ভাবতেও পারেনি এমন দিন আসবে, তাদেরও যুদ্ধ করতে হবে। তাই তাদের মানসিক প্রস্তুতি আসল সৈনিকদের মত অত শক্ত নয়।

আসুন দেশের সমগ্র জনগোষ্ঠির জন্য, আপনার পরিবারের জন্য, আপনার নিজের জন্য – সকলকে এই মরনঘাতি রোগ থেকে সারিয়ে তোলার জন্য যারা প্রস্তুত হয়ে আছে তাদের মানসিক শক্তি যোগাই। তাদের সর্বোচ্চ সুরক্ষার ব্যবস্থা করি, তাদের মনোবল বৃদ্ধিতে সহায়তা করি। তারা তাদের ঘর সংসার, ছোট ছোট বাচ্চা, বয়স্ক বাবা মা ছেড়ে এই যুদ্ধে যোগ দিচ্ছে। তাদের উৎসাহ দেই। বাহবা দেই। তাদের নিয়ে কোন নেতিবাচক কথা বলে তাদের মনোবল ভেঙ্গে না দেই। হয়ত আপনার শেষ নি:শ্বাসের প্রহরী আপনার কোন প্রিয়জন না হয়ে এই সৈনিকই হবে।

এদের জন্য আমাদের কি করা উচিত

আমরা চিকিৎসকরা এবং জনতা সবাই প্রথমেই চাই করোনা এবং অন্যান্য রোগীর চিকিৎসার সুব্যবস্থা, যাতে দায় এসে এদের উপরে না পরে। অনেক অব্যবস্থাপনার জন্য সাধারন রোগীরা ভুক্তভোগী হয় যার জন্য চিকিৎসক দায়ী নয়। একজন রোগীর জন্য কি করা উচিত তা চিকিৎসককে কারো শিখিয়ে দিতে হয়না। সে নিজে জানে এবং করে। নিরলস সবাই কাজ করে যাচ্ছে। কেউ অফ লাইনে, কেউ অন লাইনে।

আপনি যদি মজাদার বিরিয়ানী খেতে চান, তাহলে ভাল বাসমতি চাল, ভাল এবং পর্যাপ্ত খাসীর মাংস, সব রকমের পর্যাপ্ত মসল্লা এবং পরিমিত মাপের হাড়ি (পাঁচ কেজি চালের জন্য দু’কেজির হাড়ি নয়), যুতসই চুলা সব প্রয়োজন। তবেই একজন ভাল মানের বাবুর্চি আপনাকে মজাদার বিরিয়ানী খাওয়াতে পারবে।

চিকিৎসায় আপনি একজন ভোক্তা আর চিকিৎসক সেই বাবুর্চি। বাকী জিনিশপত্র প্রাইভেটে হলে আপনি দিবেন (কোভিডের সময় পিপিইসহ), সরকারী হলে সরকার দিবে।

বিরিয়ানীর মজা কেমন হবে তা যেমন নির্ভর করে অর্ডারীর সাপ্লাইয়ের উপর, তেমনি চিকিৎসা কত স্মুথ এবং পারফেক্ট হবে তা নির্ভর করে প্রয়োজনীয় জিনিশপত্রের সাপ্লাইয়ের উপর।

তাই সুব্যবস্থা প্রথমেই শনাক্ত করার সুবিধা যে কে কোভিড পেশেন্ট আর কে কোভিড পেশেন্ট নয়। এর কোন বিকল্প নেই।

আজ এই মহা দুর্যোগে সব চিকিৎসক এক কাতারে তাড়িয়ে গেছে। তাদের পন কিভাবে রক্ষা করবে এই দেশকে। এই সময়ে তাদের এবং তাদের টীম ওয়ার্কার নার্স ও অন্যান্যদের জন্য যা করা উচিত

১।সব রকম চিকিৎসকদের ভাগ করে ফেলা। একসঙ্গে সীমিত সংখ্যক চিকিৎসকদের এক্সপোজ করা।

২। উপজেলাসহ সকল হাসপাতালের বহির্বিভাগ বন্ধ রেখে শুধু ইমার্জেন্সী সার্ভিস চালু রাখা। সেখানেও কম স্বাস্থ্যকর্মীদের ইনভলব করা। রিজার্ভ রাখা। (ঘরে থাকুন সবার জন্যই প্রযোজ্য)। টেলিফোনে ছোটখাট সমস্যার সমাধান দেয়া।

৩। সরাসরি কোভিড-১৯ পেশেন্টকে যারা সেবা দিবেন, সেইসব স্বাস্থ্যকর্মীদের যাতায়াত, আলাদা থাকার ও খাবারের ব্যবস্থা করা। ( তাদের নিজ বাড়ীর লোকদের নিরাপত্তার জন্য)। যারা কোয়ারেন্টাইন্ড হবে তাদের জন্যও প্রযোজ্য।

৪। অন্যান্য চিকিৎসক ও শ্বাস্থ্যকর্মীদের যাতায়াতের ব্যবস্থা করা। প্রয়োজনে খাবারের ব্যবস্থা করা।

৫। এই সময়ে কর্তব্যরত সকল স্বাস্থ্যকর্মীদের সন্তোষজনক ঝুঁকিভাতা প্রদান করা।

৬। কর্তব্যরত স্বাস্থ্যকর্মী করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যবরন করলে তাকে রাষ্ট্রীয় সন্মাননা প্রদান এবং তার পরিবারকে ক্যাটাগরি অনুযায়ী ক্ষতিপূরন প্রদান অবশ্যই বাঞ্চনীয়।

(মনে রাখবেন আমরা যখন নির্বিঘ্নে নিরাপদে ঘরে বসে আছি, ওরা তখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুমূর্ষু রোগীর সেবা দিচ্ছে।)

৭। নতুন চিকিৎসকদের মধ্যে যারা আগ্রহী তাদেরকে অন্তর্ভুক্ত কর। ক্যাপাসিটি বাড়ানোর জন্য।

আমরা যেন অকৃতজ্ঞ না হই। একটি সাংঘাতিক ছোঁয়াচে রোগের রোগীর চিকিৎসকের জন্য তার সহযোগীদের জন্য আমরা সবাই দোয়া করি,”আল্লাহ তুমি ওদের নার্ভটা ঠিক রেখ। ওদের শক্ত ও সুস্থ রেখ”।

আর ওদের কাজের চাপ কমানোর জন্য, আপনার লক ডাউন দীর্ঘায়িত না করার জন্য এবং মৃত্যুর মিছিল কমানোর জন্য নিজে ঘরে থাকি সবাইকে ঘরে থাকতে উপদেশ, নির্দেশ দেই।

FavoriteLoadingপ্রিয় পোস্টের তালিকায় নিন।

About The Author

মন্তব্য করুন