বুধবার, এপ্রিল ১, ২০২০

বাদুড়, সাপ এবং নব্য করোনা ভাইরাস

বাদুড়, সাপ এবং নব্য করোনা ভাইরাস

image_pdfimage_print

নব্য করোনা ভাইরাসের আবির্ভাব

চীনের উহান (Wuhan) শহরে গত ডিসেম্বর ২০১৯ থেকে নতুন এক করোনাভাইরাসের (novel coronavirus) প্রকোপ দেখা দিয়েছে । দিন দিন আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে চলছে। গতবছর ৩১শে ডিসেম্বর এই শহরে নিউমোনিয়ার মতো একটি রোগ ছড়াতে দেখে প্রথম চীনের কর্তৃপক্ষ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে অবহিত করেন। এরপর ১১ই জানুয়ারী প্রথম একজনের মৃত্যু হয়। ঠিক কীভাবে করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরু হয়েছিল তা এখনও বিশেষজ্ঞরা চিহ্নিত করতে পারেন নি । এক দশক আগে যে ভাইরাস সংক্রমণের ফলে সৃষ্ট সার্স (severe acute respiratory syndrome)-এর কারণে পৃথিবীতে ৮০০ লোকের মৃত্যু হয়েছিল, সেটিও এক ধরণের করোনাভাইরাস দিয়েই ঘটেছিল। সার্সে আক্রান্ত হয়েছিল ৮ হাজারের বেশী লোক। একই ধরণের আর একটি ভাইরাসজনিত রোগ ছিল মার্স (Middle East respiratory syndrome)। ২০১২ সালে এতে মৃত্যু হয় ৮৫৮ জনের । বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুসারে ২১ জানুয়ারী ২০২০ পর্যন্তঃ
• সব মিলিয়ে ৩১৪ জন নিশ্চিতভাবে নব্য করোনা ভাইরাস দিয়ে আক্রান্ত হয়েছেন
• ৩১৪ জনের মধ্যে ৩০৯ জনই চীনের, ২ জন থাইল্যান্ড, ১ জন জাপান এবং ১ জন কোরিয়ার নাগরিক
• থাইল্যান্ড, জাপান এবং কোরিয়ার রোগীরা চীনের উহান শহর থেকে ফেরার পরে আক্রান্ত হয়েছেন
• আক্রান্তদের মধ্যে ৫১ জন গুরুতর অসুস্থ এবং ১২ জন ক্রিটিকাল অবস্থায় ছিলেন
• উহান থেকে ৬ জনের মৃত্যুর খবর স্বীকার করা হয়েছে
• এ পর্যন্ত ১৬ জন স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হয়েছেন।

কোথা থেকে এলো এই ভাইরাস?

করোনা ভাইরাস আমাদের অতি পরিচিত। ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপের নীচে করোনাভাইরাসকে দেখতে মুকুট (crown)বা সৌররশ্মির (solar corona) মতো মনে হয়। এজন্য এর নাম করোনাভাইরাস। এই ভাইরাস বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়। স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং পাখীরা এর দ্বারা বেশী আক্রান্ত হয়। শীতকাল এবং বসন্তের শুরুর দিকে প্রতিবছরই কমবেশী যে সর্দি-গর্মি হয়, তার কারণ এই অতি পরিচিত করোনাভাইরাস। সমস্যা হচ্ছে মাঝে-মধ্যে করোনা ভাইরাসের চেহারা-চরিত্র বদলে যায়। সাধারনত অন্য কোন প্রাণীর শরীর থেকে মিউটেশন হয়ে এই ভাইরাসটি মানুষের শরীরে ঢুকলে এটি মারাত্মক রূপ ধারণ করে। প্রথম থেকেই মনে করা হচ্ছিল এবারও ভাইরাসটি কোনো প্রাণীর শরীর থেকে এসেছে। এবারের ভাইরাসটির আরেক নাম দেওয়া হয়েছে ২০১৯-এনসিওভি (2019-nCoV)। প্রশ্ন হচ্ছে কোন প্রাণী থেকে এলো? অনেক রকম করোনাভাইরাসের সঙ্গে আমরা পরিচিত। কিন্তু এখন যেটির সংক্রমণ ঘটছে, তা নতুন। বিশেষজ্ঞদের ধারণা চীনের উহান বাজারের কোন প্রাণীই এর উৎস ছিল। এসব প্রাণী থেকে প্রথমে ভাইরাসটি কোন মানুষের দেহে ঢুকেছে, এবং তারপর মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়েছে।

অতীতের সার্স এবং মার্স দুটোই প্রাণীবাহিত ভাইরাস রোগ। এর অর্থ মানুষের শরীরে এ দুটো রোগ প্রথমে কোন প্রাণী থেকে ঢুকেছিল। প্রমাণিত হয়েছে যে এর আগে চীনে সার্স ভাইরাস (SARS virus) প্রথমে বাদুড়ের শরীরে ছিল এবং পরে তা খট্টাশ বা গন্ধগোকুলের শরীরে প্রবেশ করে। সেখান থেকে এটা মানুষের দেহে ঢুকেছিল। মধ্যপ্রাচ্যের মার্স ভাইরাস (MERS virus) উটের শরীর থেকে এসেছিল; অর্থাৎ বাদুড় থেকে উটের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করেছিল। ২০১৯ সালের করোনাভাইরাস সংক্রমণের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে উহানের আক্রান্ত সকল রোগী একটি বাজারের দোকানদার অথবা ক্রেতা ছিলেন। ওই বাজারে সামুদ্রিক মাছ, মুরগী,ভেড়া, শূকর, শিয়াল, ইঁদুর, বাদুড়, সাপ এবং খরগোশসহ নানারকম বন্যপ্রাণী বিক্রী করা হয়। এ পর্যন্ত সামুদ্রিক কোন জীব থেকে করোনাভাইরাস সংক্রমণের নজির নেই। এজন্য সকলে ওই বাজারের অন্যান্য প্রাণীদের বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছিলেন। ইতোমধ্যে উহান বাজারের বিভিন্ন প্রাণীর শরীর থেকে নমুনা সংগ্রহ করে করোনভাইরাস সনাক্ত করা হয়েছে এবং তাদের জেনেটিক কোড নির্ণয় করা হয়েছে। দেখা যাচ্ছে ২০১৯-এনসিওভি-র সংগে চীনের বাদুড়ের সার্স-জাতীয় করোনাভাইরাসের গভীর মিল রয়েছে এবং এটা মানুষের শরীরে আক্রমণ করার সক্ষমতা অর্জন করেছে। এরজন্য দ্বিতীয় আরেকটি প্রাণীর সহায়তা দরকার। বিজ্ঞানীরা সম্ভাব্য সকল প্রাণীর শরীরের করোনাভাইরাসের জেনেটিক কোড বিশ্লেষণ করে খুবই অবাক হয়েছেন। কারণ এবারের করোনাভাইরাসের প্রোটিন কোডের মিল পাওয়া যাচ্ছে সাপের শরীরে বাসকারী ভাইরাসের সংগে। সাপ অনেক সময় বাদুড়কে শিকার করার চেষ্টা করে। বিজ্ঞানীদের ধারণা চীনে বাদুড় থেকে ভাইরাস সাপের শরীরে এসেছে। এমন সাপ উহান বাজারে বিক্রী করার সময় বিক্রেতা এবং ক্রেতাদের শরীরে তা প্রবেশ করেছে। দক্ষিণ-পূর্ব চীনে প্রধানত দুধরনের সাপ পাওয়া যায়ঃ বাঙ্গারুস মাল্টিসিঙ্কটাস (Bungarus multicinctus) বা কালাচ এবং নাজা আত্রা (Naja atra) বা চীনা গোখরো। সাপের মাংস চীনের উহানের খাবারের বাজারে বিক্রী করা হয়। সেখান থেকেই সম্ভবত এই ভাইরাস মানুষের শরীরে চলে এসেছে। সাপের রক্ত শীতল, আর বাদুড়ের রক্ত উষ্ণ। করোনাভাইরাস একই সময়ে শীতল এবং উষ্ণ রক্তবিশিষ্ট প্রাণীর শরীরে কিভাবে টিকে থাকল, সেটাই এখন রহস্য। এ রহস্যভেদ করার জন্য উহান বাজারের আরও সাপ এবং অন্যান্য প্রাণীর নমুনা পরীক্ষা করার দরকার ছিল। কিন্তু রোগের প্রাদুর্ভাব হওয়ার পর উক্ত বাজার বন্ধ করে দিয়ে ব্যাপক পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালিত হয়েছে; ফলে এখন আর অরিজিনাল নমুনা পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

কি কি লক্ষ্মণ দেখা যায়?

বেশীরভাগ করোনাভাইরাসই বিপজ্জনক নয়; কিন্তু এবারের অপরিচিত এই নতুন ভাইরাসটি দিয়ে সৃষ্ট নিউমোনিয়া দুনিয়াজোড়া মহামারীর দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে। করোনাভাইরাস সংক্রমণের প্রধান লক্ষণ হলো জ্বর, কাশি এবং , শ্বাস-কষ্ট । কিন্তু এর পরিণামে নিউমোনিয়া, অরগ্যান ফেইলিওর(organ failure) বা দেহের বিভিন্ন প্রত্যঙ্গ বিকল হয়ে যাওয়া এবং মৃত্যু হতে পারে। ভাইরাসটি শরীরে ঢোকার পর সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিতে প্রায় পাঁচ দিন লাগে। প্রথম লক্ষণ হচ্ছে জ্বর। তার পর দেখা দেয় শুকনো কাশি। এক সপ্তাহের মধ্যে দেখা দেয় শ্বাসকষ্ট এবং তখন কোন কোন রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। এই ভাইরাস কত বিপজ্জনক সেটা একটা প্রশ্ন। এখন পর্যন্ত আক্রান্তদের দুই শতাংশ মারা গেছেন, হয়তো আরো মৃত্যু হতে পারে। তা ছাড়া এমন মৃত্যুও হয়ে থাকতে পারে যা চিহ্নিত হয় নি। তাই এ ভাইরাস ঠিক কতটা ভয়ংকর তা এখনও স্পষ্ট নয়।

কত দ্রুত ছড়াতে পারে এই ভাইরাস?

নতুন কোনো করোনাভাইরাস আবির্ভাব হলেই আমরা জানতে চাই এর লক্ষ্মণগুলো কতটা মারাত্মক? কত দ্রুত এটা ছড়াতে পারে? ডিসেম্বরে উহান শহরে প্রথম এ ভাইরাসটি তার অস্তিত্ব জানা গিয়েছিল এবং এ পর্যন্ত মারা গেছে ৬ জন। কিন্তু কর্তৃপক্ষের উদ্বেগের কারণ হলো সামনেই রয়েছে চান্দ্র নববর্ষ(lunar new year) বা বসন্ত উৎসব। নববর্ষ উপলক্ষে লাখ লাখ মানুষ বিশ্বজুড়ে ভ্রমণ করেন। চীনেই অন্তত ৪০ কোটি মানুষ এ সময় বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণ করবেন। ফলে নতুন এই ভাইরাসে দিয়ে অসংখ্য মানুষ আক্রান্ত হওয়ার আশংকা থাকবে। দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও থাইল্যান্ডও এ নতুন ভাইরাসে আক্রান্ত হবার খবর নিশ্চিত করেছে। এক রিপোর্টে বলা হয়েছে যে ইতোমধ্যে এক হাজার সাতশ মানুষ নতুন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমিত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
আমাদের কি উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত?

নতুন করে সংক্রমণের বিস্তারিত খবর না পাওয়া পর্যন্ত বলা কঠিন যে এ মূহুর্তে আমাদের কতটা উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত। সার্সের বিষয়টা আমাদের মনে আছে। কিন্তু এখন যে কোন দেশের এ ধরণের রোগের সাথে লড়াই করার জন্য অনেক বেশী প্রস্তুতি রয়েছে। যে যেকোনো ভাইরাসই মানুষকে আক্রমণ করতে পারে। আর একবার মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারলে তা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। ভাইরাসকে সে সুযোগ দেয়া উচিত নয়।

এর কি কোন চিকিৎসা আছে?

যেহেতু এই ভাইরাসটি নতুন, তাই এর কোন টিকা বা ভ্যাকসিন এখনো নেই, এবং এমন কোন চিকিৎসা নেই যা এ রোগ ঠেকাতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তিকে অন্যান্য ভাইরাসজনিত রোগের মতই পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পানীয় এবং পুষ্টির ব্যবস্থা করতে হবে। রোগের তীব্রতা অধিক মনে হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে, প্রয়োজনে হাসপাতালের শরণাপন্ন হতে হবে।

এর হাত থেকে রক্ষা পাবার উপায় কী?

একমাত্র উপায় হলো, যারা ইতোমধ্যেই আক্রান্ত হয়েছে বা এ ভাইরাস বহন করছে – তাদের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা।
হাত সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। হাত দিয়ে নাক বা মুখ ঘষবেন না, ঘরের বাইরে গেলে প্রয়োজনে উপযুক্ত মাস্ক বা মুখোশ পরতে হবে। অন্যকে সংক্রমিত করার ঝুঁকি পার হওয়া পর্যন্ত সংক্রমিত ব্যক্তিকে আলাদা করে রেখে চিকিৎসা দিতে হবে। ইতোমধ্যে উহান প্রদেশের সেই বাজার বন্ধ করে দেয়া হয়েছে এবং সেখানে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চলছে। এক কোটিরও বেশী মানুষকে শহর থেকে অন্য কোথাও যেতে বারণ করা হয়েছে। মানুষজনকে অরক্ষিত প্রাণী থেকে সাবধানতার পাশাপাশি ডিম ও মাংস রান্না এবং ঠাণ্ডা বা ফ্লুতে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে থাকার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। চীনা নববর্ষের সময় যারা ভ্রমন করবেন তাদের শরীরের অতিরিক্ত তাপমাত্রা আছে কিনা সেটি দেখা হবে। বিভিন্ন দেশে উহান থেকে আসা যাত্রীদের স্ক্রীনিং শুরু হয়েছে। চীনের সংগে বাংলাদেশের ভালো যোগাযোগ থাকায় ঢাকার আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরেও বিশেষ সতর্কতা নেয়া হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দুনিয়াজুড়ে এটি ছড়িয়ে পড়ার আশংকা নিয়ে হাসপাতালগুলোকে সতর্ক করেছে।

তথ্যসূত্রঃ
1. WHO. Novel Coronavirus (2019-nCoV) SITUATION REPORT – 2; 22 JANUARY 2020
2. Ji, W., Wang, W., Zhao, X., Zai, J. and Li, X. (2020), Homologous recombination within the spike glycoprotein of the newly identified coronavirus may boost cross‐species transmission from snake to human. J Med Virol. Accepted Author Manuscript. doi:10.1002/jmv.25682

FavoriteLoadingপ্রিয় পোস্টের তালিকায় নিন।

About The Author

মন্তব্য করুন