বুধবার, আগস্ট ১৪, ২০১৯

সিজারিয়ান সেকশনঃ প্রয়োজন অপ্রয়োজন

সিজারিয়ান সেকশনঃ প্রয়োজন অপ্রয়োজন

image_pdfimage_print

সেই রোমান সভ্যতার সময়ে মৃত মায়ের পেটের বাচ্চাকে রক্ষা করার জন্য পেট কেটে বাচ্চা বের করা হোত। সম্ভাবনার রাস্তা পেয়ে যাবার পরে জীবন্ত মায়ের পেট কেটে বাচ্চা বের করার চিন্তা শুরু হোল।কথিত আছে যে মাদক দ্রব্য সেবন করিয়ে হাত পা চেপে ধরে তারপরে সিজার করা হোত। কিন্তু কাটা জায়গা জোড়া দেবার মত সেলাই দেবার বুদ্দ্বি তখনও হয়নি। তাই মৃত্যুর হার ছিল শতভাগ। রক্তক্ষরন এবং ইনফেকশনই ছিল মৃত্যুর প্রধান কারন। চিন্তা শুরু হোল কিভাবে রক্তক্ষরন বন্দ্ব করা যায়? কলা গাছের বাকলের ভিতরের অংশ কিছুটা স্পঞ্জি। শুকালে গজের মত হয় বলে সেটা শুকিয়ে সেগুলো দিয়ে কাটা জায়গা পেচিয়ে উবু করে শুইয়ে রাখত। চাপে কিছু রক্তক্ষরন বন্দ্ব হোত, কিছু রক্তপাত গাছের শুষ্ক বাকলে শুষে নিত।

প্রথম রেকর্ডেড বেঁচে যাওয়া মহিলার সিজার হয়েছিল তার স্বামীর হাতে ১৫৮০ সালে যখন কিছুতেই ডেলিভারী হচ্ছিল না। ১৮৫৩ সালে প্রথম ক্লোরোফর্ম ব্যবহার শুরু হোল। ১৮৬৭ সালে অপারেশনের জায়গা জীবানুমুক্ত করার জন্য কার্বলিক স্প্রে ব্যবহার শুরু হোল।

জরায়ু যেহেতু রক্তক্ষরনের জায়গা তাই রক্তক্ষরন বন্দ্বের জন্য ১৮৭৬ সালে একজন অবস্টেট্রিসিয়ান সুপারিশ করলেন সিজারের পরে জরায়ু ফেলে দেবার। ১৮৮১ সাল পর্যন্ত কাটা জায়গা সেলাই করার মত কোন উপায়ই ছিলনা। অবশেষে ১৮৮২ সালে দু’জন জার্মান অবসটেট্রিসিয়ান প্রথম সেলাই দিয়ে রক্তক্ষরন বন্দ্ব করলেন। পরবর্তিতে নানান গবেষনার মাধ্যমে সহজ পদ্বতি ও নিরাপদ উপায় বের করা হোল। ধীরে ধীরে হোল অনেক পরিবর্তন ও পরিবর্ধন।

আজ একবিংশ শতাব্দীতে কোমড়ে একটি ইনজেকশন দিয়ে পেশেন্টের সজ্ঞান অবস্থায় তার সাথে গল্প করতে করতে একজন সার্জন ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে বাচ্চা বের করে পেট এমনভাবে সেলাই করে জোড়া দিবেন যে কেউ বুঝতেই পারবেনা যে এ পেটে কোন কাটা চিহ্ন আছে। এ যেন বন্ধুর পথে পদব্রজে গমনের সাথে রকেটের তুলনা। কে না পছন্দ করবে এমন ব্যবস্থা? জীবানুমুক্ত পরিবেশ, এন্টিবায়োটিকের ব্যবহার, রক্তের সহজলভ্যতা নিরাপদ করে দিয়েছে এ পদ্বতিকে।

কিন্তু না। যতই নিরাপদ ও সহজ হোক এই পদ্বতি, আমরা এটিকে সর্বজনীন করবনা। কারন সন্তান জন্মদান একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। আদিকাল থেকেই এটি চলে আসছে। এটি জৈবিক অন্যান্য প্রক্রিয়ার মতই। আমরা যেমন সুস্থ অবস্থায় মুখ বাদ দিয়ে নাকে নল দিয়ে খাব না তেমনি বিনা কারনে স্বাভাবিক পথ বাদ দিয়েও সোজা সাপটা ভিন্ন রাস্তায় সন্তান প্রসব করাব না।

তাহলে কেন করি?
আগে নরমাল বা স্বাভাবিক ডেলিভারীর সঙ্গা জেনে নেই।
“৩৮ থেকে ৪০ সপ্তাহের” মধ্যে “নিজ থেকে প্রসব বেদনা” উঠে বাচ্চার “মাথা নীচের দিকে” থেকে “১২-১৬ ঘন্টার” মধ্যে “মায়ের সুস্থতা” বজায় রেখে, কোন “কাটা ছেড়া” না করে “সামান্য সহায়তায়” “যোনীপথে” একটি বাচ্চা ভূমিষ্ঠ হয়েই “কেঁদে” তার আগমনের প্রমান দিলে তাকে স্বাভাবিক প্রসব বলা হয়। কমার মধ্যে বন্দী শব্দ গুলোর প্রতিটা স্বাভাবিক প্রসবের প্যারামিটার। শুধুমাত্র যোনীপথে টানা হ্যাচরা করে মায়ের জীবন বিপন্ন হতে হতে বাচ্চা প্রসব করাকে ভ্যাজাইনাল ডেলিভারী বলা হলেও নরমাল ডেলিভারী বলে না।

এর ব্যত্যয় ঘটলেই মা ও বাচ্চা দু’জনেরই নানান সমস্যা এমনকি মৃত্যুও হতে পারে। কখনও মৃত্যু রোধ হলেও রয়ে যায় ভি ভি এফ (মায়ের) এবং সেরেব্রাল পলসির (প্রতিবন্ধী বাচ্চা) মত মরবিডিটি। তাই যে কোন অস্বাভাবিক অবস্থাতে মাতা মৃত্যু , শিশু মৃত্যু এবং নানান মরবিডিটি রোধ করতে সিজারের ভুমিকা আধুনিক বিশ্বে অনস্বিকার্য।

সিজার সাধারনত দু’রকমের। ইলেক্টিভ এবং ইমারজেন্সী। গর্ভকালীন পরিচর্যার সময়ে যদি গর্ভকালীন ঝুঁকি সনাক্ত করা যায় এবং স্বাভাবিক প্রসবের ব্যত্যয় অনুমান করা যায় তখন প্রসবের জন্য ইলেকটিভ সিজার করা হয়। অর্থাৎ পূর্বনির্ধারিত সিজার। আর ডেলিভারী প্রসেসের মধ্যে যদি হঠাৎ কোন অসুবিধা দেখা যায় তখন যে সিজার করা হয় তাকে বলে ইমারজেন্সী সিজার। এই হঠাৎ অসুবিধার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হোল ফিটাল ডিস্ট্রেস বা বাচ্চা মায়ের পেটে অক্সিজেনের অভাবে থাকা। দীর্ঘ সময় এভাবে থাকলে বাচ্চার ব্রেইন অক্সিজেন না পেলে পেটেই বাচ্চা মারা যেতে পারে বা এমন অবস্থায় ডেলেভারী হয় যে ভূমিষ্ঠ হয়ে কাঁদেনা। অর্থাৎ শ্বাস প্রশ্বাস চালু হয়না। ফলে মারাও যেতে পারে বা বিভিন্ন ব্যবস্থার মাধ্যমে শ্বাস প্রশ্বাস চালু হলেও প্রতিবন্দ্বী হয়ে বেঁচে থাকে।
বাংলাদেশে একসময়ে ফ্যাসিলিটির অভাবে সিজারের হার কম থাকায় মাতা মৃত্যু এবং শিশু মৃত্যুর হার ছিল অনেক বেশী। প্রতি বিশ মিনিটে একজন মা মারা যেত এবং বছরে মারা যেত ২৮০০০ প্রসূতি। একটি ফিজিওলজিক্যাল কারনে একটি মেয়ে মারা যাবে এটি ভাবা যায়? তেমনি ছিল ভি ভি এফ এর মত দুর্বিসহ মরবিডিটি যা একটি মেয়ের জীবনকে পঙ্গু করে দেয়। মায়ের জীবনকে আরও দুর্বিসহ করে দেয় যদি বাচ্চা হয় প্রসবজনিত প্রতিবন্দ্বী।

এই অতিরিক্ত মাতামৃত্যু রোধের জন্য গত শতাব্দীর নব্বই দশকে ইমারজেন্সী অবসটেট্রিক কেয়ারের (জরুরী প্রসূতি সেবা) প্রবর্তন করেন অধ্যাপক আব্দুল বায়েছ ভুঁইয়া। যার ফলে গ্রামের প্রসূতিরা কাছাকাছি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জরুরী ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সেবা পেতে পারে।

এই জরুরী প্রসূতিসেবার মধ্যে সিজার অন্যতম। হোম ডেলিভারীর চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে বাচ্চার হাত পা ঝুলিয়ে, মায়ের জরায়ু ফাটিয়ে, ফুল সরে গিয়ে রক্তক্ষরন নিয়ে, খিঁচুনী হতে হতে মুখে ফেনা বের করে, দাইয়ের যদেচ্ছা হাতাহাতির পরে মুমূর্ষু অবস্থায় যখন প্রসূতিরা ফ্যাসিলিটিতে আসে তখন সিজারই জীবন রক্ষার একমাত্র সহায়ক। মাতা মৃত্যুর উল্লেখযোগ্য কারন অবস্ট্রাক্টেড লেবার বা বাধাগ্রস্থ লেবার সেবা পেতে শুরু করল এই সিজারিয়ানের মাধ্যমে। ফলে কমতে শুরু করল শুধু মাতা মৃত্যু নয়, শিশু মৃত্যু এবং ভি ভি এফ। মাতা মৃত্যুর রেসিও ১৯৯০ সালে ৫৭৪/১০০০০০ থেকে কমে ২০১০ সালে ১৯৪/১০০০০০ এবং ২০১৫ সালে দাড়াল ১৭৬/১০০০০০। আর বৈশ্বিক হার ১৯৯০ সালে ৩৮৫/১০০০০০ থেকে কমে ২০১৫ সালে দাড়িয়েছে ২১৬/১০০০০০।

মিলিনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল ৫ (এম ডি জি ৫) এর যে লক্ষ্য ছিল ২০১৫ সালের মধ্যে বৈশ্বিক মাতা মৃত্যুর হার ৭৫% কমিয়ে আনবে, সেই গোল লক্ষ্যে বিশ্বের ৭৫ টি দেশের মধ্যে মাত্র ৯টি দেশ টারগেটে পৌঁছাতে পেরেছিল । বাংলাদেশ তার মধ্যে একটি। একইভাবে এম ডি জি ৪ এর টার্গেট ছিল ২০১৫ এর মধ্যে ৫ বছরের নীচে শিশু মৃত্যু্ ৪৮/১০০০ যা ২০১১ এর মধ্যেই ৪৪/১০০০ এ নেমেছে। পাঁচ বছরের নীচে শিশুর মধ্যে সদ্যজাত শিশু ৬১% আর সেটা ১৯৯৩ সালে ৫২/১০০০ থেকে কমে ২০১৪ সালে হয়েছে ২৮/১০০০। সদ্যজাত শিশু মৃত্যু কমে যাবার পিছনে উত্তম প্রসূতি ব্যবস্থাপনার অবদান অপরিসীম। সিজার তারমধ্যে অন্যতম। আর এই মাতা মৃত্যু শিশু মৃত্য কমিয়ে এম ডি জি ৪ ও ৫ এর গোলে পৌঁছাবার সাফল্যের জন্য বাংলাদেশ পুরস্কৃত হয়েছিল।

একটি ইমারজেন্সী প্রসূতি সেবা দেবার জন্য একজন অবস্টেট্রিসিয়ানের কি স্যাক্রিফাইস তা আর একজন অবস্টেট্রিসিয়ান ছাড়া কেউ বুঝবেনা। এমনকি এর একটি অংশ হিসেবে বছরের পর বছর পরষ্পরের নিঃশ্বাস গায়ে লাগিয়ে পাশাপাশি শুয়ে থাকা চিকিতৎসক স্বামী বা স্ত্রীটিও না।

প্রসব নিরাপদ রাখার জন্য তাহলে সিজারই কি উত্তম পন্থা?

নিশ্চয়ই নয়। প্রসবকে এবং সদ্যজাত শিশুকে নিরাপদ রাখার জন্য সিজারই উত্তম পন্থা নয়। নিরাপদ প্রসব, সুস্থ শিশু ও নিরাপদ মাতৃত্ত্বের জন্য যা অনস্বিকার্য তা হোল গর্ভকালীন পরিচর্যা। এই গর্ভকালীন পরিচর্যা একটি দেশের নিরাপদ মাতৃত্ত্বের সূচক। দ্বিতীয়তঃ উচ্চ ঝুঁকিসম্পন্ন প্রেগন্যান্সিগুলোর অবশ্যই হাসপাতালে ডেলিভারী করানো। হাসপাতালে বিলম্বিত বা দীর্ঘায়িত লেবারগুলো খারাপ অবস্থায় যাবার আগেই সিজার করে বাচ্চা বের করে ফেলা হয়। বাংলাদেশে সেই গর্ভকালীন পরিচর্যার হার এখনও ৫৮% যার অধিকাংশই শহরগুলোতে। তাহলে গ্রামের মেয়েদের গর্ভকালীন পরিচর্যার হার হবে আরও অনেক অনেক কম। ফলে বহু গর্ভবতী নারীরা একটি ইমারজেন্সী অবস্থা তৈরী করে হাসপাতালে আসে।

সিজারের হার কেমন হওয়া উচিত?
ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের ভাষ্য অনুযায়ী এই নিরাপদ প্রসবের জন্য একটি কমিউনিটিতে ১০-১৫% সিজার হওয়া উচিত যা ঐসব ঝুঁকিপূর্ন গর্ভবতীদের জন্যই প্রযোজ্য। আর সেটার জন্যই দরকার শতভাগ গর্ভকালীন পরিচর্যা। কিন্তু সারা বিশ্বের সব দেশে কি সেই সুযোগ আছে? বিভিন্ন দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভিন্নতার পরেও সিজারের হার কেমন আমরা একটু দেখি।

সারা বিশ্বেই সিজারিয়ান সেকশনের হার বাড়ছে। আমেরিকাতে ২০০০ সালে সিজারের হার ছিল ২৩% যা বেড়ে ২০১৫ সালে হয়েছে ৩২%। একই ভাবে ইউকেতে ২০০০ সালে ছিল ১৯.৭% যা বেড়ে ২০১৫ সালে হয়েছে ২৬.২%। বিভিন্ন দেশে ২০০০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বাড়ার হারঃ

গ্লোবাল. ১২.১% থেকে ২১.১%
মিডল ইস্ট এবং নর্থ আফ্রিকা ১৯% থেকে ২৯.৬%

দক্ষিন এশিয়া ৭.২% থেকে ১৮.১%

পূর্ব এশিয়া এবং প্যাসিফিক ১৩.৪% থেকে ২৮.৮%

ল্যাটিন আমেরিকা এবং ক্যারেবিয়ান ৩২.৩% থেকে ৪৪.৪%

পূর্ব ইউরোপ এবং মধ্য এশিয়া ১১.৯% থেকে ২৭.৩%

নর্থ আমেরিকা ২৪.৩% থেকে ৩২%

পশ্চিম ইউরোপ ১৯.৬% থেকে ২৬.৯%
বাংলাদেশ ৩% থেকে ২৪%

সিজারিয়ান সেকশনের উচ্চহারের দেশগুলো হোল

ডমিসিয়ান রিপাবলিক ৫৮.১%
ব্রাজিল ৫৫.৫%
মিসর ৫৫.৫%
তার্কি ৫৩.১%
ভেনেজুয়েলা ৫২.৪%
চিলি ৪৬%
প্যারাগুয়ে ৪৫.৯%
ইরান। ৪৫.৬%
ইকুয়েডর ৪৫.৫%
মৌরিটিয়াস ৪৪.৭%
মালদ্বীপ ৪১.১%
মেক্সিকো ৪০.৭%
কিউবা ৪০.৪০%
ইন্ডিয়া ৪০%
বুলগেরিয়া ৩৯.১%
কোরিয়া ৩৮%
হাঙ্গেরী ৩৭.২%
জর্জিয়া ৩৬.৫%
পোলান্ড ৩৬.২%
ইটালী ৩৫.৩%
শ্রীলঙ্কা ৩৫.৫%
চায়না ৩৪.৯৫%
বাংলাদেশ ৩১%

বাংলাদেশের অবস্থান

বাংলাদেশে ২০১০ সালে সিজারের হার ছিল ১২% যা ২০১৬ তে হয়েছে ৩১% । অন্যান্য দেশের সাথে তুলনা করলে এখনও অনেক দেশের তুলনায় অনেক কম। বিশেষ করে প্রায় একই কালচারের ইন্ডিয়ার তুলনায়ও কম। ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগ্যানাইজেশন ১০-১৫% সুপারিশ করার সাথে সাথে এটাও বলেছে যে “Every effort should be made to provide caesarean sections to women in need, rather than striving to achieve a specific rate.” যেটা বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য। আমদের কমিউনিটিতে অশিক্ষা, অসচেতনতা, অপুষ্টী, রক্তশূন্যতা, প্রসূতির প্রতি অবহেলা কি ভয়াবহ পর্যায়ে আছে তা ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন আমলে নেয়নি। তাই সময় এসেছে নতুন করে ভাবার। এই অরগ্যানাইজেশনের বেঁধে দেয়া সিজারের রেটে আমাদের বর্তমান আর্থসামাজিক অবকাঠামো নিয়ে যদি থাকতে চান তো অসুবিধে নেই, মৃত্যুর রেট আবার বেড়ে যাবে।

প্রশ্ন হতে পারে সিজারের রেট বাড়ার পরেও মাতা মৃত্যু স্টাটিক কেন? হয়ত বর্তমান আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে এটাই আমাদের তলানী। যেহেতু এখনও উল্লেখযোগ্য প্রসূতি হাসপাতালে আসেন “পয়েন্ট অব নো রিটার্নে।“ যেখান থেকে ফেরাবার সামর্থ চিকিৎসকের নেই। মৃত্যুগুলো সেই দল থেকেই হয়। তবে ভবিষ্যতে গ্রামবাংলার আরও উন্নতির সাথে সাথে হয়ত মানুষের সচেতনতা আরও বৃদ্বি পাবে এবং মাতা মৃত্যু আরও কমবে আশা করি।

অপ্রয়োজনীয় সিজার

আমি বলব এভয়েড এবল সিজার। গর্ভাকালীন পরিচর্যায় না থাকার কারনে এবং হাসপাতালে ডেলিভারীর জন্য না আসার কারনে অনেকেই দাই, সেকমোদের দ্বারা ম্যালট্রিটেড হয়ে আসে। যার প্রায় সবই সিজারের প্রয়োজন হয়। প্রথম থেকেই সুষ্ঠূ লেবার ম্যানেজমেন্ট হলে হয়ত অনেকগুলোই ভ্যাজাইনাল ডেলিভারী সম্ভব হোত এবং সিজার এড়ানো যেত।

অন্যদিকে শহরাঞ্চলে গর্ভকালীন পরিচর্যা এবং হাসপাতালে ডেলিভারীর হার বেশি হওয়া সত্বেও সিজারের হার ৮০%.। তাহলে দেখা যাচ্ছে দু’দিক থেকেই এভয়ডেবল সিজারের রেট উচ্চ। গ্রামে সিজার হয়েছে প্রয়োজনে, কিন্তু প্রয়োজনটা তৈরী হয়েছে সুষ্ঠূ ব্যবস্থাপনা না পেয়ে। শহরেও অপ্রয়োজনীয় সিজার হয়ে থাকে সুষ্ঠূ ব্যবস্থাপনার অভাবে। পেশেন্টদের চয়েজও একটি উল্লেখযোগ্য কারন।

আর যদি শুধুমাত্র ব্যবসায়িক কারনে কোন অবস্টেট্রিসিয়ান সিজার করেই থাকে/থাকেন সেটা নিশ্চয় গর্হিত কাজ এবং তাদের চরিত্র বদলাবার কোন উপায় আছে কিনা আমার জানা নেই। তবে সংখ্যায় তা নিতান্তই নগন্য।

কি করনীয়?

১| শতভাগ পেশেন্ট কে গর্ভকালীন পরিচর্যার অন্তর্ভুক্ত করা। সেটা যতদিনে যেখানে না হবে WHO এর সুপারিশ সেখানে প্রযোজ্য নয়।

২| কম ঝুঁকিসম্পন্ন রোগী হোম ডেলিভারি করাতে পারবে তখনই যদি সে কোন বার্থ এডেন্টডেন্ট এর তত্ত্বাবধানে থাকে। সে সমস্যা হলে সাথে সাথে নিকটবর্তী ফ্যাসিলিটিতে পাঠাবে।

৩। লেবার ইন্ডিউসড এবং ত্বরান্বিত করার জন্য সেকমো এবং বার্থ এটেন্ডেন্ট গন অক্সিটোসিন বা মিসোপ্রস্টোল প্রয়োগ করলে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গন্য হবে। বহু পেশেন্ট ইমারজেন্সি নিয়ে আসে, ইউটেরাস রাপচার নিয়ে আসে এই ম্যালট্রিটমেন্টের জন্য।

৩।উচ্চ ঝুঁকি সম্পন্ন রোগী অবশ্যই হাসপাতালে ডেলিভারির জন্য ভর্তি হবে।
অনেক সময় ডেটের অনেক আগেই ভর্তি হতে হয়। উল্লেখযোগ্য মাতামৃত্যু এই গ্রূপ থেকে হয় যারা মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে আসে।তখন সিজার করলেও সবাই কে বাঁচানো যায় না। একলাম্পসিয়া,অবস্ট্রাকটেড লেবার উল্লেখযোগ্য। সিজারের হারও এদের বেশি। প্রসবোত্তর রক্তক্ষরন মাতা মৃত্যুর ১ নং কারন। হাসপাতালে ডেলিভারী প্রসবোত্তর রক্তক্ষরনের কারনে মৃত্যুকে ঠেকাতে পারে।

৪।প্রশিক্ষিত মিডওয়াইফ প্রনয়ণঃ ওয়ান/ ওয়ান অর্থাৎ একজন প্রসূতির জন্য একজন মিডওয়াইফ। (WHO এর রেট পেতে হলে)। যে হাসপাতালেই ডেলিভারি হোক না কেন। প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাসপাতাল থেকে শুরু করে রাজধানীর করপোরেট হাসপাতাল পর্যন্ত।

৫। পার্টোগ্রাফ এবং এক্সটারনাল মনিটরিংসহ একটি যুগোপযোগী লেবার ম্যনেজমেন্ট প্রটোকল প্রনয়ন করা। সারা বাংলাদেশে একই প্রটোকলে কাজ হবে। প্রটোকলের মধ্যে থেকে যথোপযুক্ত ভাবে ম্যানেজ করার পরেও কখনও দুর্ঘটনা হতে পারে। তার ফলে মা বা বাচ্চার কোন অসুবিধে হলে চিকিৎসককে দায়ী করে কোন হামলা ভাংচূড় হলে দোষীদের শাস্তির বিধান থাকবে।

৬। এপিডুরাল এনেস্থেসিয়ার প্রচলন শুরু করা। এপিডুরালহীন জায়গায় পেশেন্ট ও পেশেন্ট এর অভিভাবক দের সহিষ্ণুতা অর্জন করা।
শহরে মেয়েদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সিজার হয় পেইন সহ্য করতে না পারার জন্য। অসহিষ্ণু পেশেন্ট এবং পেশেন্টদের অভিভাবকদের কারনে অনেক সিজার হয়।

৭। ভ্যাজাইনাল ডেলিভারীর সপক্ষে মটিভেশনাল কাউন্সেলিং। পেশেন্টের চয়েজ অপ্রয়োজনীয় সিজারের উল্লেখযোগ্য কারন।

৮। ভ্যাজাইনাল ডেলিভারি কার হাতে হবে এ ব্যাপারে রোগীদের কন্সালট্যান্টকে চাপ না দেয়া।
প্রেফারেন্স অবশ্যই থাকবে। তবে যে ডেলিভারি দাই এর হাতে
হওয়া সম্ভব সেটার জন্য কন্সাল্ট্যান্ট কে বারবার প্রতি ব্যাথায় ব্যথায় চাইলে কনসাল্ট্যান্ট বাধ্য হয় আগে আগে টারমিনেট করে দিতে। ঢাকা শহরের ট্রাফিক জ্যামও একটি উল্লেখ্য বিষয়।

৭।কন্সাল্ট্যান্ট দের এককভাবে পেশেন্ট ম্যানেজ না করে শেয়ারিং পদ্ধতি চালু করা।
তিন চার জনের গ্রূপ থাকবে যারা কেউ না কেউ রাউন্ড দি ক্লক পেশেন্টের যে কোন প্রয়োজনে এটেন্ড করতে পারবে।ব্যস্ত থাকার কারনে সময়মত পেসেন্ট এটেন্ড করতে না পারলে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা থাকে। তা এড়াতে সিজারের সম্ভাবনা থাকে।

৮। প্রশিক্ষিত সহকারী ডাক্তার নিয়োগ।

লেবার ম্যানেজমেন্টে অন্তত ছয় মাসের প্রশিক্ষণ ছাড়া কাউকে মনিটরিং এর দায়িত্বে না রাখা।
৯। চিকিৎসক ইনন্সিউরেন্স পলিসি প্রনয়ন।
১০। চিকিৎসক সুরক্ষা আইন বাস্তবায়ন।
১১। প্রাইভেট ক্লিনিকে সিজার ও নরমাল ডেলিভারীর চার্জ কাছা কাছি করা।
১২। সরকারী প্রতিষ্ঠানে সেবা নেবার জন্য সব ধরনের সুযোগ সুবিধা আরও বৃদ্বি করা।

উপসংহারঃ
একজন চিকিৎসকের ধ্যান ধারনা সবসময়েই পেশেন্ট কেন্দ্রিক। তার পেশেন্টের জন্য তার চেয়ে বেশী দরদ আর কারো নেই। ও জি এস বি সব সময়েই এ দেশের মায়েদের স্বাস্থ্যের উন্নতিকল্পে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য দেশের আর্থ সামাজিক কাঠামো এবং পলিসি প্রনয়ন একটি বড় সীমা্বদ্বতা। আমরা আমাদের বিবেক বুদ্বি দিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের পেশেন্টদের বৃহত্তর স্বার্থ দেখাই আমাদের ব্রত হওয়া উচিত। তাই পেশেন্টের স্বার্থে, ঠিক ঐ মুহূর্তের অবস্থা অনুযায়ী তার জন্য ভাল যা কিছু দরকার আমরা সেটাই করে থাকি এবং করব। তবে ক্লিনিক মালিকের সাজানো পেশেন্টদের অপারেশন করে যারা অভ্যস্ত তাদের প্রতি অনুরোধ, আপনার শ্রমের বিনিময়ে তার পকেট ভারী করার সুযোগ দিবেন না। আপনি ক্লিনিশিয়ান সিদ্বান্ত হবে আপনার, ক্লিনিকের মালিকের নয়। সবশেষে স্লোগান আমাদের একটাই—“একটি সুস্থ মায়ের থেকে একটি সুস্থ বাচ্চাই আমাদের কাম্য”।

পুনশ্চ: লেখাটি ইত্তেফাকে আজ ছাপা হয়েছে। আসল কথার কিছুই ছাপেনি। ডাক্তারদের কথা কেন যেন মিডিয়াগুলো আড়ালে রাখতে পছন্দ করে।

FavoriteLoadingপ্রিয় পোস্টের তালিকায় নিন।

About The Author

মন্তব্য করুন