বুধবার, অক্টোবর ৯, ২০১৯

চাইল্ড কাস্টোডী – ইসলাম কি বলে?

চাইল্ড কাস্টোডী – ইসলাম কি বলে?

image_pdfimage_print

‘Child custody is a legal term regarding guardianship which is used to describe the legal and practical relationship between a parent or guardian and a child in that person’s care. Child Custody consists of legal custody, which is the right of make decisions about the child and physical custody, which is the right and duty to house provide and are of the child’- Wikipedia

আল্লাহর অসংখ্য নেয়ামতের একটা হইল পরিবার। একজন পুরুষ ও একজন মহিলার সমন্বয়ে একটা সংসার শুরু হয় (ইসলামের সংজ্ঞানুযায়ী)। এই দুইজনের সন্মিলিত চেষ্টা আর ইচ্ছা (কখনো অনিচ্ছা!!)ফসল হিসাবে তাদের সন্তান দুনিয়ায় আসে, এই দুইজন এর উপরেই গুরু দ্বায়ীত্ব আইসা পড়ে এই নতুন অতিথিরে দুনিয়ার জন্য উপযোগী কইরা তোলার।

কিন্তু দুইন্যাতো আর ‘বেডস অফ রোজেস’ মানে কুসুমাস্তীর্ণ না! সব কিছুই ভাল ভাবে চলে না সংসারযাত্রায় ঝড়ঝঞ্জায় ‘নৌকাডুবী’ হয় মানে সংসার ভাইংগা যায়, আর এই সংসার ভাংগায় ভরাডুবী হয় এই দুইজনের ভালোবাসার ফসল সন্তানদেরই, পিতা মাতা ঝগড়াঝাটি, বাদ বিবাদ, অভিযোগ, শালিশের পরে যদি রিকনসাইল না করা যায় তাইলে সংসার ভাঙ্গাই সিদ্ধান্ত উপনিত বা আদালত কর্তৃক আদিস্ট হয়। স্বামী স্ত্রী দুইজনেই খুশ (হয়তো) কিন্তু বেচারা সন্তানের কি হাল! তাদের নাবালক/নাবালিকা সন্তান সন্ততি কোথায় যাইব? কখনো কখনো আদালত নির্দিষ্ট হুকুম দেয় সন্তানের ভরণ পোষনের ব্যাপারে, এইটারেই ‘চাইল্ড কাস্টোডি’ কয়।

কোরান শরীফে চাইল্ড কাস্টোডির ব্যাপারে সরাসরি কোন রুলিং দেওয়া নাই। এখানে বলা নাই তালাকের পরে সন্তানের তত্বাবধানের দ্বায়ীত্ব অটোম্যাটিক কার প্রতি অর্পিত হইছে। যেইসব ব্যাপারে কোরানে পাকে সরাসরি কোন নির্দেশনা নাই সেইসব ক্ষেত্রেই আল্লাহ এই প্রসংগে জড়িতে ব্যক্তিবর্গের উপরে দ্বায়ীত্ব ন্যস্ত করছেন। ‘কেয়াস’ বইলা বিষয়টা এইখান থাইকাই আসছে।

কোরানে চাইল্ড কাস্টোডি ব্যাপারটার বিস্তারিত বর্ণনা নাই কারণ মনে করা হয় প্রত্যেক্টা তালাক ও চাইল্ড কাস্টোডির ব্যাপারটি ভিন্ন, একটার সাথে আরেকটা মিলে না, প্রত্যেকটা মামলা তার স্বকীয়তা নিয়া আসে। তাই কোন ফিক্সড বা নির্ধারিত আইন করা হয় নাই। তত্বাবধানের দ্বায়ীত্ব অর্পনের বেলায়, বাবা মার অর্থনৈতিক অবস্থান, বাচ্চার কোন বিশেষ প্রয়োজন, তার স্বাস্থ্য শাররীক অবস্থা, পিতা মাতার সামাজিক অবস্থান, মানসিক অবস্থা সব কিছুই বিচার্য্য বিষয়। প্রত্যেকটা বিষয় মনোযোগের দাবী রাখে।

কোরানে পাকএ আছে “…নিজেদের মধ্যে আলোচনা কর”
-সুরা আত ত্বালাক আয়াত ৬

“তার পরে যদি তারা নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনার পরে সিদ্ধান্ত নেয় তাহা হইলে তার কোন অপরাধ করে নাই” – সুআ বাক্বারা আয়াত ২৩৩

তত্বাবধানের দ্বায়ীত্বের সাথে ভরণ পোষনের ব্যাপারটা গুলাইয়া ফালাইলে চলবো না। কোরান পাক অনুসারে ভরণ পোষনের দ্বায়ীত্ব পুরুষের তার সংগতি অনুসারে ভরনপোষন করিবে।“ এং সে যার ঔরসে সন্তান জন্মাইয়াছে, ভরন পোষন করিবে, কাহাকেও অরিরিক্ত দ্বায়ীত্ব চাপাইয়া দেওয়া হয় নাই”
– সুরা আত ত্বালাক আয়াত ৬, ৭

কিন্তু সব তালাক বা বিবাহ বিচ্ছেদ কোর্টে যায় না তাই চাইল্ড কাস্টোডি ব্যপারে সুনির্দিস্ট দ্বায় দ্বায়ীত্ব বন্টন করা থাকে না, মা চায় সন্তান তার সাথে থাকুক আর বাবা তার অধিকার ছাড়তে চায় না। আবার কখনো এর বিপরীতও হয়। আবার আমাদের মত গরীব দেশে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই মায়ের আর্থিক অবস্থা এত সংগতি পুর্ন থাকে না যে সে নিজের খরচের সাথে সাথে সন্তানের লেখা পড়া ভরণপোষন এর খরচ সামলাইবো।

সন্তান তত্বাবধানের প্রাথমিক দ্বায় দ্বায়িত্ব সন্তানের পিতামাতার। ইসলামে বাবার উপরেই অর্থনৈতিক দিকটা দেওয়া হইছে, পুরুষ সংসারের কর্তা, তার উপরে সংসারের যাবতীয় খরচ যোগাড় করার দ্বায়ীত্ব।

একটু বিস্তারীত আলাপ করা যাক।

যদি এমন অবস্থা উদ্ভুত হয় যে বিবাহ টিকানো গেল না তালাকেই নিস্পত্তি হইতে হইব তখন খেয়াল রাখতে হইব এই তালাকে যাতে সন্তান(দের)কোন রকম সমস্যা না হয়। সন্তানরা দম্পতির কাছে আল্লাহর আমানত, তার কোন অন্যথা হইতে পারবো না। সন্তানের অনেক অধিকার আছে তার মধ্যে অন্যতম দুইটা হইল ক) তাদের যথাযথ আদর ভালোবাসা দিতে হইব আর খ) সঠিক ভাবে গইড়া উঠতে দিতে হইব (আপব্রিংগীং বা আরবীতে তারবিয়া)। সন্তানের এই দুইটা অধিকার পিতামাতার যৌথ চেষ্টা ছাড়া পুরণ করা প্রায় অসাধ্য।মায়ের আদর ভালোবাসার মত পিতার গাইডেন্স, ট্রেইনিং ও সমান জরুরী।

এই কথার আলোকে যথাসম্ভব তালাক এড়ানোই উত্তম। রাসুল সাঃ বলেন “আল্লাহর কাছে তালাক সবচাইতে ঘৃণিত হালাল কার্য্য” – সুনান আবু দাউদ #২১৭৮

কিন্তু তালাক অহরহই হইতাছে। স্বামী স্ত্রীর উভয় পক্ষ তালাকের ক্ষেত্রে তাদের দাবী পেশ করে আর তার প্রতিফলন দেখতে চায়। মুসলিম তালাকের বেলায় নিচে লেখা বিষয় গুলি খেয়াল রাখতে হইব। মনে রাখ, দুই পক্ষের এই ব্যাপারে আলোচনা ও চুক্তি/সমঝোতা অবৈধ নয়।
• সন্তান যতক্ষন না তার নিজের মৌলিক প্রয়োজন (বেসিক নীড) যেমন টয়লেট সামলানো, খাবার খাওয়া, কাপড় পরার মত কাজ গুলি নিজে নিজে না করতে পারে ততক্ষন শিশু মায়ের তত্বাবধানে থাকব। এই সময়টা সাত বছর পর্যন্ত বইলা স্বীকৃত।

ইমাম আল হাসকাফী রঃ বলেন “একটি বালকের তত্বাবধানের দ্বায়ীত্ব তার মায়ের যতক্ষন পর্যন্ত সে তার নিজের যত্ন নিতে না পারে। এই সময়টা প্রায় সাত বছর পর্যন্ত, তখন বালক নিজের ব্যাক্তিগত প্রয়োজনীয় বিষয়গুলির দেখভাল করতে পারে”। – রাদ আল মুহতার ৩/৫৬৬

আর বালিকা সন্তানের বেলায় যতক্ষন না পর্যন্ত সে সাবালিকা হয় (বা ঋতুমতী হয়) আর এই সময়টা তার জন্য ৯ বছর ব’লে স্বীকৃত হয়েছে”।
– আল মাওসিলি -আল ইক্ততিয়ার লি তা’লিল – আল মুখতার ৩/২৩৭

মায়ের কাছ থাইকা এই দ্বায়ীত্ব রদ করা হইব বা নিয়া নেওয়া হইব যদিঃ
• মা ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে।
• প্রকাশ্যে কোন অবৈধ যৌণাচার করে যাতে সন্তানের ভরণপোষনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হইয়া যায়।
• ঘর থাইকা প্রতিনিয়ত বাইরে যায় আর যার ফলস্রুতিতে সন্তানের দেখভালের বাধা হয়।
• যদি ভরণপোষন এর জন্য সে কোন ভাতা দাবী করে যেইখানে সন্তানের ভরনপোষন করার জন্য অন্য কোন নারী বিনা ভাতায় তা করতে প্রস্তুত থাকে।

উপরোল্লিখিত শর্তে সন্তানের প্রতি মায়ের “চাইল্ড কাস্টোডি” তত্বাবধানের অধিকার হারাইব। আর তা পরিবাহিত বা ন্যস্ত হইবা নিম্নলিখিত ব্যাক্তিবর্গের প্রতিঃ (ক্রমান্বয়ে একজনের অবর্তমানে পরের জন)

• সন্তানের নানী বা তার পরের কেউ
• সন্তানের দাদী বা তার পরের কেউ
• আপন বোন
• মাতৃপক্ষের সৎবোন
• পিতৃপক্ষের সৎবোন
• খালা
• ফুফু

স্ত্রী পক্ষের উপরে বর্নীত সব সম্পর্কের অবর্তমানে স্বামী পক্ষের নিম্ন বর্নীত আত্মীয়র কাছে দ্বায়ীত্ব বর্তাইবঃ

• বাবা
• দাদা
• আপন ভাই
• পিতৃপক্ষের সৎভাই
• মাতৃপক্ষের সৎভাই

এই ফতোয়ার পিছনে যুক্তি হইল মায়ের ও মাতৃপক্ষের মহিলাদের পক্ষেই একজন শিশুরে যথেস্ট আদর, মায়া, মমতা দিয়া লালন পালন করা সম্ভব। একজন বালকের ৭ বছর বয়সের পর থাইকা তার জন্য পুরুষালী কাজকাম, শাররীক/শ্রম সক্ষমতা, লেখাপড়া ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হওয়া জরুরী তাই পিতার গাইডেন্স/দেখভাল করা জরুরী বোধ করা হয়। আর বালিকার সাবালিকা হওয়া পর্যন্ত মায়ের কাছে থাকা দরকার যাতে সে মেয়েলী ব্যাপারগুলি ভালোভাবে মায়ের কাছ থাইকা শিখা নিতে পারে, পালন করতে পারে। তারপর তার বাবার কাছে যাওয়া উচিত বাবা যেই বিষয়গুলির দেখভাল করতে পারে।

একবার একজন মহিলা আইসা আল্লাহর রাসুল সাঃ এর কাছে অভিযোগ করলেন যে তার প্রাক্তন স্বামী তার সন্তানকে নিয়া যাইতে চাইতেছে। রাসুল সাঃ বলিলেন “তুমি যদি পুণঃবিবাহ না কর, তাহা হইলে সন্তানে তোমার অধিকার বেশী” – সুনান আবু দাউদ ২২৭৬ মুস্তাদ্রাক আল হাকিম ২/২০৭

জরুরী – বালকের তত্বাবধান পিতার প্রতি অর্পিত হইলে বালকের সাবালকত্ব প্রাপ্তির পরে বালক ‘মুক্ত’! সে তখন নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারিবে, সে কার সাথে থাকিবে অথবা নিজেই আলাদা থাকিবে।
বালিকার দ্বায়ীত্ব পিতার প্রতি অর্পিত হইলে সে পিতার তত্বাবধানেই থাকিবে যতক্ষন না পর্যন্ত তার বিবাহ হইয়া যায়।
-কাদরী পাশা, হানাফি আর্টিক্লেস ৪৯৬, ৪৯৯

স্বামী অথবা স্ত্রী তত্বাবধানের দ্বায়ীত্ব যার কাছেই থাকুক ‘অপর পক্ষে’র নিজ সন্তানের সাথে দেখা করার সমান অধিকার আছে। কিন্তু দেখা যায় একপক্ষে অপর পক্ষরে ‘শিক্ষা’ দিবার জন্য সন্তানরে ‘ঘুঁটি’ হিসাবে ব্যবহার করে। যা ইসলামের সম্পূর্ন পরিপন্থী, যা কিনা শাস্তিযোগ্য অপরাধ!

সন্তানের তত্বাবধানের দ্বায়ীত্ব যার কাছেই থাকুক তার ভরণপোষনের দ্বায়ীত্ব সম্পুর্ন পিতার। সুস্থ ছেলে সন্তান হইলে তার সাবালকত্ব পাওয়া পর্যন্ত আর মেয়ে সন্তান হইলে তার বিবাহ হইয়া যাওয়া পর্যন্ত আর অসুস্থ্য বিকলাংগ সন্তান হইলে সারা জীবন পিতাকে ভরণপোষনের খরচ চালাইয়া যাইতে হইব।

“যদি মায়ের কাছে সন্তানের তত্বাবধানের দ্বায়ীত্ব বর্তায়, আর মায়ের কোন থাকার জায়গা না থাকে তবে পিতাকে তাদের থাকার জায়গাও ঠিক করিয়া দিতে হইবে”।
-রাদ আল মুহতার – ইবন আবিদিন

বটম প্যারা- তত্বাবধান আর ভরনপোষন এক জিনিষ না। তত্বাবধান স্বামী অথবা স্ত্রীর উপরে অর্পিত হইতে পারে। ভরনপোষন সম্পূর্ন স্বামীর দ্বায়ীত্ব। তত্বাবধানের ক্ষেত্রে স্বামী অথবা স্ত্রীর দাবি অগ্রগন্য না সন্তানের কিসে মংগল সেইটাই অগ্রাধিকার পায়। আল্লাহ করুন এমন ঝামেলা যেন কারো না আসে।

FavoriteLoadingপ্রিয় পোস্টের তালিকায় নিন।

About The Author

মন্তব্য করুন