শুক্রবার, জানুয়ারী ২৪, ২০২০

সোরিয়াসিস ৩ – চিকিৎসা পদ্ধতি

সোরিয়াসিস ৩ – চিকিৎসা পদ্ধতি

image_pdfimage_print

বটম লাইনটাই আগে কই, সোরিয়াসিস রোগের পার্মানেন্ট চিকিৎসা নাই! অর্থাৎ এই রোগ সম্পুর্ন নিরাময় হয় না।

** আমি ডাক্তার না, আমি চিকিৎসা দিতে পারি না আমার যোগ্যতা নাই, এখানে যা লেখা তা সহজেই অনলাইনে উপলব্ধ৷ তার সাথে আমার ডাক্তার বইনের সাথে আলাপ/ইন্টারভিউ এর ফল। আমি অতি সংক্ষেপে “কেন” প্রশ্নের উত্তর দিতে চেষ্টা করছি।**

বিভিন্ন গবেষনা, ডাক্তার মাম্মাদের পরামর্শ, ভুক্তভোগীদের বর্ণনাতে এইটাই প্রতীয়মান যে সোরিয়াসিস সম্পূর্ন ভাল হয় না। তবে বিভিন্ন গবেষনায় এই সিদ্ধান্তে পৌছানো গেছে সোরিয়াসিস ছোঁয়াচে রোগ না, এইটা একটা ‘অটো ইম্যিউন ক্রণিক ইনফ্লেমেটরী ডিজিজ’ সারা জীবন থাকে যা ত্বক, হাড়ের জোড়া ও অন্যান্য অংগের উপর আক্রমন করে কিন্তু এর থ্যাইক্যা অন্যান্য জটিল রোগের প্রকোপ দেখা যায়। যেমন সোরিয়াটিক আর্থারাইটিস, কার্ডিওভাসক্যুলার ডিজিজ, ডায়াবেটিস, ডিপ্রেসন,অবিসিটি, মেটাবলিক সিন্ড্রোম, ছাড়াও অন্যান্য অটো ইম্যিউন ডিজিজ যেমন ক্রোহন ডিজিজ, লিম্ফোমা।

এই রোগে কাউরে মৃত্যু বরন করতে হইছে জানা যায় না তবে জীবনযাত্রারে দুর্বিসহ কইরা দেয় এইটা নিশ্চিত, এই রোগের শাররীক সমস্যার সাথে সাথে সামাজিক সমস্যা ও আছে। এই রোগের আক্রমন মৃদু/মাইল্ড থাইকা গুরুতর/সিভিয়ার হইতে পারে।

সিভিয়ারিটি শরীরের কতটা অংশ আক্রান্ত করছে তা দিয়া মাপা হয়। চিকিৎসাও তার সোরিয়াসিসের প্রকার ও সিভিয়ারিটির উপরে নির্ভর করে। চিকিৎসক অনেক সময় একাধিক পদ্ধতির চিকিৎসা দেন, ডাক্তার মাম্মা সাধারনতঃ মৃদু ধরনের চিকিৎসা দিয়াই শুরু করেন।
বিভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতি থাকা সত্বেও সোরিয়াসিস একটা দূর্বিনীত অসুখ যারে নিরাময় করা যায় না অথবা তার সাথে বাস করা দূর্বিসহ।

মানুষ/রোগী যেমন প্রত্যেকে ভিন্ন এক না, সোরিয়াসিসের চিকিৎসাও তেমন এক না এক চিকিৎসা ব্যবস্থা রাম এর কাম দিলে কিন্তু সেইটাই রহিমের কামে দিব না। তাই ডাক্তার মাম্মার সাথে নিয়মিত আর নিবিড় যোগাযোগ রাখতে হইব। তার সাথে চিকিৎসা পরিকল্পনা আলাপ আলোচনা কইরা বুঝতে হইব রোগের সাথে যুদ্ধের কৌশল।

যেহেতু এখন পর্যন্ত সোরিয়াসিস রোগ নির্মূল করার জন্য কোন নির্দিষ্ট অষুধ বাজারে নাই তাই কি করলে তোমার শরীরে রোগে প্রকোপ কমে আর তুমি আরাম পাও সেইটা বাইর কইরা তাই ক্রমাগত চালাইয়া যাইতে হইব। এইটা অনেকটা ইংরাজী তে কথিত ‘ট্রায়াল এ্যন্ড এরর’ পদ্ধতির মত, বিভিন্ন প্রকার অষুধ চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহার করিয়া খুঁইজা বাইর করতে হইব কোনটা বেস্ট তোমার জন্য।

প্রত্যেক পদ্ধতিতে ব্যবহৃত অষুধ, তার মাত্রা, তার প্রয়োগ পদ্ধতি, তার পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া, রেজাল্ট লেইখা রাখ। ডাক্তার মাম্মার সাথে যোগাযোগ রাখ । আগেই কইছি রোগীর শরীরে সোরিয়াসিসের ধরন, প্রকোপ, লক্ষন উপসর্গ আর ব্যাপ্তীর উপরে চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ভর করে। স্প্রে, মুখে খাওয়ার অষুধ না মলম কোনটায় বেশী উপকার পাওয়া যাইতাছে, যেইটায় উপকার পাওয়া যায় বেশি সেইটাইতেই টিকা থাকতে হইব।

অবস্থার উন্নয়ন দেখলেই অষুধ গ্রহন থামায়া দেওয়া উচিত না। ডাক্তারের ‘ট্রায়াল এ্যান্ড এরর’ পদ্ধতি মাইনা নেও, এতেই তোমার জন্য দীর্ঘস্থায়ী আরামের ব্যবস্থা হইব। খুঁইজা বাইর কর কিসে তোমার সোরিয়াসিস ফ্লেয়ার আপ হয় বা বাইড়া যায়/ পুণরায় দেখা যায়। মনে রাখ মানসিক অবস্থার অবনতিতেও সোরিয়াসিস বাড়তে পারে, আঘাত, কোন কোন অষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াতেও বাড়তে পারে, যেইটাই হোক তোমার জানা থাকা উচিত ‘কি করিলে কি হয়’ আর তা থাইকা নিজেরে সাবধান রাখতে হইব।

নাহ, সোরিয়াসিসের সম্পূর্ন নিরাময় নাই। তাই এরসাথে আরামদায়ক সহাবস্থানই মূল লক্ষ্য। চিকিৎসা সাধারনত তিন গ্রুপে ভাগ করা। টোপিকাল, লাইট বা ফটো থেরাপী আর সিস্টেমিক। এই রোগ আর তার সাথে সহাবস্থান যতটা জানতে পারবা ততটাই আরামে থাকবা।

সোরিয়াসিসের সাথে সহাবস্থানঃ

• উষ্ণ পানিতে গোসল কর প্রতিদিন। জোরে ঘষাঘষি করবা না, আলতো পরশে স্কেলিং/আক্রান্ত চামড়া তুইলা ফেল। ঘষার আগে প্রায় ১৫মিনিট ভিজতে দেও। গরম পানি পরিহার কর।

• ত্বকের পানি নরম তোয়ালে দিয়া হালকা চাপ দিয়া মুইছা নেও, ঘষবা না, ভেজা ভাব/ময়েস্ট থাকতে থাকতেই হেভী ওয়েন্টমেন্ট বেসড ময়েসচারাইজার ত্বকে লাগাও। অতি শুস্ক ত্বকের জন্য তেল ব্যবহার করা যাইতে পারে। তেল, ক্রীম ও লোশনের চাইতে বেশীক্ষন থাকে ত্বকে, যা শরীর থাইকা পানি বা ময়েশ্চার বাইর হইতে বাধা দেয়। শুকনা দিনে বা শীত কালে কয়েকবার ময়েশ্চারাইজার প্রয়োগ করতে হইতে পারে।

• একটা ডায়েরী রাখ তাতে নোট রাখ সোরিয়াসিস কি করতাছে তোমার শরীরে। ধুমপান, আঘাত পাওয়া, অতিরিক্ত সময় ধইরা সুর্যালোক গায়ে লাগানো, ইনফেকশন সোরিয়াসিস বাড়ায়া দিতে পারে, ফ্লেয়ার আপ মানে পূনঃআবির্ভাব হইতে পারে। ডায়েরী রাখলে যদি তার একটা প্যাটার্ন দেখতে পাও তাইলে সেইগুলি এড়াইতে পারবা।

• এ্যাল্কোহল পান সোরিয়াসিসের ফ্লেয়ার আপের সাথে সংযুক্ত, বাদ দেও।

• ধুমপান বাদ, এতে শুধু সোরিয়াসিস না অনেক রোগেই উপকারী পাইবা। স্বাস্থ্যকর খাবার খাও যাতে প্রচুর ফলমূল, ফাইবার, আর বিভিন্ন রং এর শাকসব্জী থাকে। মাংশ কমাও মাছ খাও, লো ফ্যাট খাবার খাও, প্রচুর পানি পান কর।

বিভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতিঃ

টোপিক্যাল /Topical – এই পদ্ধতিতে ত্বকের উপরীভাগে ক্রীম আর ওয়েন্টমেন্ট প্রয়োগের পরামর্শ দেওয়া হয়। প্রধান উদ্দেশ্য ত্বকের কোষের সোরিয়াসিসাক্রান্ত প্রসেসটা ধীর করার, প্রদাহ বা ইনফ্ল্যামেশন কমানো। টোপিকাল মাধ্যম অন্য আরো চিকিৎসা পদ্ধতির সন্মিলিত প্রয়োগ হইতে পারে। টোপিকাল স্প্রে, সাবান, স্যাম্পু, লোশন হিসাবে প্রয়োগ হইতে পারে। এতে নতুন কোষ উৎপাদন কমানো আর ইনফ্ল্যামেশন কমানো উদ্দেশ্য থাকে, এই অষুধ প্রেসক্রিপশন ছাড়া অথবা সহ কেনা যায়। যদি প্রকোপ বেশী থাকে তাইলে টোপিকালের সাথে সাথে মুখে খাওয়ার অষুধও দেন ডাক্তার মাম্মা।

এ্যান্থ্রালিন/ Anthralin –এই অষুধ ত্বকে ডি এন এ কার্যকলাপ স্বাভাবিক করে স্কেল অপসারনে সাহায্য করে। এর প্রয়োগ সহজ নয়, কারণ এতে দাগ লাইগা যায়, জামা কাপড়, বিছানা পত্রে,টেবিল চেয়ার ও নিজ শরীরে যেইখানেই লাগবো সেইখানেই দাগ পড়ে, তাই রোগীদের লাগাইয়াই ধুইয়া ফেলতে বলা হয়।

কোল টার / Coal Tar – এইটা সোরিয়াসিস রোগের সম্ভবতঃ সবচেয়ে পুরানো পদ্ধতি। কোল টার পেট্রোলিয়াম ইন্ডাস্ট্রির তৈরী আলকাতরার একটা বাই প্রোডাক্ট! আশ্চর্য, এইটা কিভাবে কাম করে বলা মুশকিল কিন্তু এইটা চুলকানি কমায়, স্কেলিং কমায়, তবে এইটাও ভেজাইল্যা। দাগ পড়ে আর একটা বাজে গন্ধও আছে তার। ক্রীম, তেল আর শ্যাম্পুতে ব্যবহার আছে।

কোর্টিকোস্টেরয়েড / Corticosteroid– এতে তৈরী ক্রীম অয়েন্টমেন্ট লোশন শক্তিশালী এ্যান্টি ইনফ্ল্যামেটরী গুনাগুন আছে, প্রয়োগে ইরিটেশন চুলকানি, লালচে ভাব দূর হয়। এইটা নতুন কোষ প্রস্তুত ধীর করে যা রেজাল্টে প্লাক বিল্ডাপ করে না। তবে বেশীদিন ধইরা এইটা ব্যবহার করা যায় না, কারন এইটা ত্বক পাতলা কইরা দেয় আর শরীর তার প্রতিরোধ সৃষ্টি করে, কোর্টিকোস্টেরয়েড অবস্থা খারাপ হইলে তার প্রকোপ কমানোর জন্য ব্যবহার হয়।

রেইনোয়েডস /Rainoids– ভিটামিন এ থাইকা বানানো হয় বিশ্বাস করা হয় এইটা ত্বকে ডি এন এ র কাজ কারবার স্বাভাবিক করে, সমস্যা হইল এইটার ব্যবহারে ত্বকে সূর্যালোকের স্পর্শকাতরতা বাড়াইয়া দেয়, তাই এর ব্যবহারে সাবধানতা লাগে সূর্যালোক থাইকা।

সালিসাইলিক এ্যাসিড/ Sallysalic Acid – এইটা প্রেসক্রিপশন দ্বারা অথবা ছাড়াও পাওয়া যায় এইটা ত্বকের উপরি ভাগের মরা কোষ ঝইরা পরতে সাহায্য করে, তাতে আর প্লাক বিল্ডাপ হয় না। মাথার চাঁদির সোরিয়াসিস দমনে এর ব্যবহার দেখা যায়, স্যাম্পু আর লোশনে মেশানো থাকে।

ভিটামিন ডি এ্যানালগ Vitamin D Analoge– অয়েন্টমেন্ট আকারে আসে সিন্থেটিক ভিটামিন ডি। ত্বকের সেল গ্রোথ কমায়।প্রেসক্রিপশনে প্রাপ্য অষুধ।

লাইট থেরাপী Light Therapy– প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম উপায়ে প্রস্তুত আলট্রা ভায়োলেট রে ব্যবহার হয় এই চিকিৎসায়। ডাক্তার মাম্মার পরামর্শ মত নিয়ন্ত্রিত পরিমান সূর্যালোক গায়ে লাগানো হয়, আরেকটা পদ্ধতি কৃত্রিম আল্ট্রাভায়োলেট রে এ অথবা বি রশ্নি শরীরে প্রতিফলিত করা। লাইট থেরাপী কার্য্যকর যদি রোগীর এক্সপোজার অল্প থাকে। অনেক সময় টোপিকাল সিস্টেমের সাথে লাইট থেরাপী কম্বিনেশন করা হয়।

লাইট বা ফটোথেরাপী লম্বা সময় ধইরা নিতে হয়,ডাক্তার ও টেকনিশিয়ানের প্রখর তত্বাবধানে নেওয়া লাগে। একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ্য বলতে পারেন তোমার কতটা আর কি ধরনের ফটোথেরাপী লাগতে পারে।

লেসার লাইট থেরাপী Lessar Light Therapy– এক্সিমার বা পালসড ডাই লেসার ব্যবহার হয় এই পদ্ধতিতে। শুধুমাত্র আক্রান্ত স্থানেই প্রয়োগ হয়। এক্সিমার লেযারে আল্ট্রাভায়োলেট বি রশ্নি ব্যবহার হয় আর পালসড ডাই লেযার সোরিয়াসিস আক্রান্ত স্থানে রক্ত সরবরাহকারী শুক্ষ্ণ কৌশিক নালী গুলি পুড়াইয়া দেয়।

পিউভিএ ফোটোকেমোথেরাপী/ PUVA Photochemotherapy – এই পদ্ধতিএ সরালেন Psoralen নামে একটা আলো সংবেদনশীল ক্রীম লাগানো হয় ত্বকে তারপরে আল্ট্রাভায়োলেট রে প্রয়োগ করা হয় এতে ক্রীম লাগানো যায়গায় আল্ট্রাভায়োলেট রে সহযে গভীরে প্রবেশ করতে পারে। গুরুতর সোরিয়াসিস এর ক্ষেত্রে এর ব্যবহার আছে।

ইউভিবি ফটোথেরাপী/ UVB Phototherapy – ন্যারো ব্যান্ড অথবা ব্রড ব্যান্ড হইতে পারে, কৃত্রিম আল্ট্রাভায়োলেট রে ব্যবহার হয়, সাধারনত ন্যারো ব্যান্ড ই বেশি কামেল।

সিস্টেমিক / Systemic– এইটা ডাক্তার মাম্মার প্রেসক্রিপশন ছাড়া পাওয়া যায় না, মুখে খাওয়ার অষুধ, ইঞ্জেকশন এই গ্রুপে পড়ে যা পুরা শরীরে কাজ করে।
এছাড়াও বায়োলজিক্স Biologics ও বায়োসিমিলারস Biosimilars বইলা দুইটা পদ্ধতি আছে এইগুলি পুরাই ডাক্তার মাম্মার এখতিয়ারে।

বটম লাইনঃ সোরিয়াসিসের নিরাময় নাই, এর সাথে শান্তিপূর্ন সহাবস্থান শিখ।

আল্লাহ ভরসা।

সোরিয়াসিস১

 

FavoriteLoadingপ্রিয় পোস্টের তালিকায় নিন।

About The Author

মন্তব্য করুন