বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ২১, ২০১৯

কলমের এক খোঁচায়

কলমের এক খোঁচায়

image_pdfimage_print

একদিন পরিচিত একলোক তার স্ত্রীকে নিয়ে এসেছেন আমার কাছে। এডমিন ক্যাডারের লোক। পি এ টি সি তে পরিচয়। পরিচিত বলেই গাইনোকলজিক্যাল প্রবলেম হওয়া স্বত্তেও দেখেছি যা সাধারনত আমি দেখি না। কথায় কথায় বললেন “আপনাদেরতো কলমের এক খোঁচাতেই ৫০০ টাকা। আমি কলমটা এগিয়ে দিয়ে বললাম, “দেননা একটা খোঁচা, দেখেন ৫০০ টাকা বের হয় কিনা “।

এই খোঁচাটি আমার শৈশব, কৈশোর, যৌবন, প্রৌঢ়ত্ব এবং এই বার্ধক্যের অবর্ণনীয় শ্রম ও সাধনার ফলাফল। এই খোঁচার বিনিময়ে জীবন রক্ষা পেয়েছে বহু নারীর, অসুস্থ জ্বালাময় জীবন থেকে সুস্থতায় এসেছে অনেক নারী, মাতৃত্ত্বের স্বাদ পেয়ে সংসার রক্ষায় সমর্থ হয়েছে অনেক সন্তানহীন নারীরা। এ গল্প শুধু আমার নয়। এ গল্প প্রতিটি চিকিৎসকের। যাদের যুদ্ব শুরু সেই শৈশব থেকেই। প্রথম সারিতে থাকার যুদ্ব। যারা শুধু মেধার জোরে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে উপরে উঠেননি। বহু বিনিদ্র রজনী, আরাম আয়েশের বলীদান, বাবা মা ভাই বোন স্ত্রী পুত্র কন্যা স্বামীর প্রেম ভালবাসা শিকেয় তুলে রেখে মেধাকে শান দিয়েছেন মানুষের কল্যানে। আমরন প্রতিদিন মাথায় চিন্তা ঘুরে কিভাবে পেশেন্টদের নতুন কিছু দেয়া যায়।

একজন চিকিৎসক শুধু চিকিৎসা দেননা। তিনি একজন শিক্ষক, চিকিৎসক তৈরীর একজন কারিগর, তিনি একজন গবেষক, যে গবেষনালব্দ্ব ফলাফল পেশেন্টদের কল্যানেই ব্যবহৃত হয়, একজন পুস্তক লেখক যা পড়ে আরও চিকিৎসক তৈরী হয় এবং একজন চিকিৎসক যিনি জীবনে বহু বহু মানুষের মুখে হাসি ফোটান।

এদেশে কারো কারো কলমের এক খোঁচায় কোটী টাকা ঘরে চলে যায়। যে খোঁচা অর্জনের শ্রম চিকিৎসকের শ্রমের তুলনায় কিছুই নয়। চিকিৎসক একজন উচ্চমার্গীয় দিন মজুর। যিনি প্রতিদিন শ্রমের বিনিময়ে, গায়ের ঘাম ঝরিয়ে টাকা অর্জন করেন। দিনমজুরের কর্মঘন্টা আছে, কিন্তু চিকিৎসকের কোন কর্মঘন্টা নেই।

সেই চিকিৎসকরা আজ সমাজের প্রতিপক্ষ হয়ে গেছে। আর এজন্য দায়ী কিছু অপ সাংবাদিকদের কলমের এক খোঁচা। শুধু নেতিবাচক কথা, শুধু নেতিবাচক কথা, ডাহা মিথ্যে কথা, অবান্তর কথা লিখতে লিখতে মানুষের মন বিষবাস্পে বিষাক্ত করে দিয়েছে।

এদেশের কত শতাংশ লোক সিঙ্গাপুর আর ইন্ডিয়ায় চিকিৎসার জন্য যায়? দেশে মানুষ গিজ গিজ করে। সেই গিজগিজানি থেকে একটু স্বস্তির জন্য, একটু আরামের জন্য সামর্থবানরা যদি বিদেশে যেয়েই থাকে তাতে দোষের কি?

এদেশে কি সরকারী, কি বেসরকারী কোন হাসপাতালটাকে খালি রেখে মানুষ বিদেশে গেছে? একটি হাসপাতালও খালি থাকেনা। গিজগিজ করে। সামর্থবানরা জন্মদিন করতে বিদেশ যায়, বিবাহ বার্ষিকী করতে বিদেশ যায়, বার্ষিক সভা করতে বিদেশ যায়, সন্তানের বিদেশী নাগরিকত্ত্ব পাবার জন্য বিদেশে ডেলিভারী করায়, সেখানে অন্যান্য চিকিৎসা করতে বিদেশ গেলে আপত্তি থাকবে কেন? সামর্থবানরা মাউন্ট এলিজাবেথ থেকে হেলথ চেক আপ না করালে তাদের সোসাইটিতে তাদের সন্মান থাকে না। একমাত্র সামর্থবানরাই শেষ চেষ্টা এবং মানসিক স্বান্তনার জন্য এয়ার এম্বুলেন্সে করে মাউন্ট এলিজাবেথে যায় ডেথ সার্টিফিকেট আনতে। তাই যাদের সামর্থ আছে তারা যাকনা। কিন্তু দেশী চিকিৎসকদের গালি দিয়ে কেন? এই গুটিকতক মানুষ এদেশের কোটী কোটী মানুষের চিকিৎসকদের অবমামনা করলে সেই কোটী কোটী মানুষদেরও অবমাননা করা হয়। পক্ষান্তরে ঐ গ্রাহকদের জন্যও কসাই আর ডাকাত ডাক্তারদের গ্রাহক হওয়া অবমাননাকর।

ছবির লেখাটি একজন সিনিয়র কলামিস্টের লেখা। এদেশের গাইনোকলজিস্টদের অধিকাংশই নাকি ডাকাত। তাই ডেলিভারীর জন্য ইন্ডিয়ায় যাবে। ইন্ডিয়ায় যাবে যাক কিন্তু এই অসদাচরণ করে কেন?

এদেশে আর কোন পেশাদার আছে যে নিজের শ্রম এমন বিনে মূল্যে বিলিয়ে দেয়? Prof. Rowshan Ara Begum নিজ বাবার ভিটে বাড়ীকে হাসপাতাল বানিয়ে বিনামূল্যে, স্বলমূল্যে অকাতরে চিকিৎসা দিয়ে আসছেন বহুবছর ধরে। প্রতি শুক্রবার তার দলবল সহ চলে যান মানিকগঞ্জ। Prof. Sayeba Akhter বিনামূল্যে ভি ভি এফ, প্রলাপ্স, পেরিনিয়াল টিয়ারের চিকিৎসা করে আসছেন কয়েক বছর ধরে। Prof. Anowara Begum Anu Bibi বিনামূল্যে ভি ভি এফ এর চিকিৎসা করে আসছেন যুগ যুগ ধরে। এদের অনুসারী হিসেবে আমরাও করি বিনা পারিশ্রমিকে নানান কাজ।

তাই বিদেশে যান ভাল কথা, দেশী ডাক্তারদের বদনাম করে নয়। ইন্ডিয়ান গাদোয়াল,তসর আমরাও পরি, কিন্তু আমাদের জামদানী, কাথা স্টীচ কিংবা টাংগাইলের আটপৌরে শাড়ীকে মাথায় করে নিয়েই।

সব সাংবাদিকদের দৃষ্টি বিশুদ্ব হোক, Muzahid Shuvo এবং গোলাম মুর্তজার দৃষ্টির মত। তাদের কলমের খোঁচায় ফিরিয়ে আনুক মানুষের আস্থা ও দেশপ্রেম।

FavoriteLoadingপ্রিয় পোস্টের তালিকায় নিন।

About The Author

মন্তব্য করুন