রবিবার, এপ্রিল ২১, ২০১৯

এনাফেলেক্টিক শক Anaphylactic Shock

এনাফেলেক্টিক শক Anaphylactic Shock

“আরে মাম্মা আমি বেগুন খাইতেই পারি না”, “ইলিশ মাছ খাইতে পারি না”, “বাদাম খাইতে পারিনা এইগুলিতে এ্যালার্জী আছে”। আসলে এ্যালার্জী (Allergy) খাবার গুলিতে না এ্যালার্জী তোমার শরীরে!!

এইডা কি কন মাম্মা! এতদিন শুইন্যাই আইছি গরুর মাংশে এ্যালার্জী, বেগুনে এ্যালার্জী থাকে!

হ্যা, খাবারে এ্যালার্জী থাকলে সবারই একই প্রতিক্রিয়া হইতো সেই খাবার গ্রহনে, একই পাতিলায় রান্না করা খাবার পাশাপাশি বইসা দুইজন খাইলা অন্যজনের কোন প্রতিক্রিয়া নাই খাইয়া দাইয়া পান চিবাইতাছে আর তুমি মেঝেতে পইড়া ছটফটাইতাছ! তুমি সেই খাবারে এ্যালার্জিক দেইখাই এইটা তোমার বেলায় দেখা দিছে।

শুধু খাবারই না, বোলতা মৌমাছির হূল ফোটান। এমন কি কিছু কিছু ওষুধ যেমন পেনিসিলিন এতেও কেউ কেউ এ্যালার্জীক। (আমাদের এইখানে হাসপাতালে গেলে প্রথমেই এইটা জিজ্ঞাসা করে, ‘তোমার কি কোন ওষুধে এ্যালার্জী আছে’?)

যাদের সিভিয়ার এ্যালার্জী আছে তাদের বেলায় এই এ্যালার্জী প্রাণঘাতী হইতে পারে! এইটারে এ্যানাফেলেক্সিস (Anaphylexis) কয়। কোন কোন দ্রব্য/খাবার শরীরে প্রবেশ করলে শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রাসায়নিক (Histamine) ছাড়ে রক্তে এইটা এ্যানাফেলেক্টিক শক দিতে পারে।

শরীরের নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার (Immune system) নির্গত রাসায়নিকের কারনে উদ্ভুত এ্যাফেলেক্টিক শকের কারনে রক্তচাপ হঠাৎ কইমা যাইতে পারে, শ্বাসনালী সংকুচিত হইতে পারে, তাতে স্বাভাবিক শ্বাস প্রশ্বাঃস নেওয়া দুস্কর ও অসম্ভব হইয়া যায়। অত্যন্ত বিপদজ্জনক বলাই বাহুল্য। তৎক্ষনাত এর চিকিৎসা না হইলে তা প্রানঘাতী হইতে পারে।

* উক্কে মাম্মা বুঝুম কেমনে?
এ্যানাফেলেক্টিক শক (Anaphylactic Shock) হওয়ার আগে এ্যানাফেলেক্সিস (Anaphylaxis) এর কিছু কিছু লক্ষন টের পাওয়া যায়। যেমনঃ ত্বকের উপরে র‍্যাস (Rash), হাইভ (Hive), চুলকানো, রক্তশুন্যতা দেখা, লালচে হইয়া যাওয়া। হঠাৎ বেশী গরম লাগা, কন্ঠনালীতে গোটলা বা দলা পাকানো অনূভূতি, ঢোক গিলেতে অসুবিধা। মাথা ঘোরানো, বমি বা বমি ভাব, ডায়ারিয়া, তলপেটে ব্যাথা দূর্বল অথবা দ্রুত হৃদ স্পন্দন, নাক দিয়া পানি পড়া বা হাঁচি দেওয়া, জিহ্বা ফুইলা যাওয়া ঠোট ফুইলা যাওয়া, গলায় ঘড়ঘড়/ফ্যাসফ্যাস শব্দ, শ্বাস কষ্ট, হাত পায়ের আঙ্গুলে মাথার চাঁদি ও মুখে শিনশিন অনুভূতি।

যদি দেখ রোগীর এ্যানাফেলেক্সিস অবস্থা শুরু হইয়া গেছে অতি দ্রুত ডাক্তারের কাছে নিয়া যাও, যদি এ্যানাফেলেক্সিস এ্যানাফেলেক্টিক শকে পৌছায়া যায় মানে সেকেন্ড স্টেজ এ গড়ায় তাইলে লক্ষনগুলির সাথে যোগ হইব শ্বাঃস নিতে কষ্ট, মাথা ঘোরানো, কনফিউশন, হঠাৎ দুর্বল লাগা, ও জ্ঞ্যান হারানো।

এ্যানাফেলেক্সিস হয় কোন একটা ‘এ্যালার্জেন’ এর প্রতি তোমার শরীরের ইম্যিউন সিস্টেম বা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার “ওভাররিয়েকশন” বা সোজা কথায় তোমার শরীর কোন একটা বিশেষ দ্রব্যের প্রতি অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়াশীল। এই এ্যানাফেলেক্সিস ই এ্যানাফেলেক্টিক শক দেয়।

দেখা গেছে নিম্নোক্ত কারণে এ্যালাফেলেক্টিক শক হইতে পারেঃ
পেনিসিলিন, বোলতা মৌমাছির হুল, কোন কোন বাদাম, শেলফিশ (চিংড়ি, কাঁকড়া), গম, সয়াবীন, দুধ, ডিম, ল্যাটেক্স (রাবারের মত দস্তানা প্রস্তুতেও ব্যবহার হয়) তালিকা নির্দিষ্ট কইরা বলা যাইবো না, একেকজন একেক বস্তুতে এ্যালার্জিক হইতে পারে। কিছু কিছু এ্যানাফেলেক্সিস ও এ্যানাফেলেক্টিক শকের কারণ বোঝা যায় না। সেইগুলিএরে ‘ইডিওপ্যাথিক’ (Idiopathic) কয়।

যদি তুমি বুঝতে না পার কি বস্তু তোমারে এই অবস্থার কারন হইতাছে, ডাক্তার মাম্মার কাছে গেলে তোমারে জিজ্ঞ্যাসাবাদ কইরা তিনি “এ্যালার্জেন টেস্ট” দিতে পারেন নিশ্চিত হওয়ার জন্য যে কি থাইকা এই অবস্থার সৃষ্টি হইতাছে। সাধারনতঃ আগের এ্যানাফেলেক্সিস, এ্যালার্জী, এ্যাজমা, ও পারিবারিক ইতিহাস তোমার এই অবস্থায় অবদান রাখতে পারে।

*** ভালো কইরা বুঝ! এ্যানাফেলেক্টিক শক প্রাণঘাতী হইতে পারে!!**

এ্যনাফেলেক্টিক শক হইলে শ্বাঃসনালী সংকুচিত করে, তাই নিঃশ্বাস নেওয়া কঠিন থাইকা অসম্ভব হইয়া যায়। এইটা তোমার হার্ট থামাইয়া দিতে পারে, রক্তচাপ কইমা যাওয়ার ফলে শরীর যথেস্ট অক্সিজেন পায় না যার ফলে ব্রেইন ড্যামেজ, কিডনী ফেইল্যুর, কার্ডিওজেনিক শক (Cardiogenic Shock) (হার্ট পাম্প কইরা যথেস্ট রক্ত সরবরাহ করে না) এ্যারেথমিয়াস (Arrhythmia ) (হৃদস্পন্দন বাইড়া অথবা কইমা যাওয়া) হার্ট এ্যাটাক ও মৃত্যু হইতে পারে।

প্রি এক্সিস্টিং কিছু রোগ থাকলে, মানে আগে থাইকাই কিছু কিছু রোগ থাকলে তাদের যদি এ্যনাফেলেক্টিক শক হয় তাইলে অপূরনীয় ক্ষতি হইয়া যায়। যেমন সিওপিডি (COPD – Chronic Obstructive Pulmonary Disease) । এ্যানাফেলেটিক শকে শ্বাঃসনালী সংকুচিত হয় আর সিওপিডি শ্বাসনালীর অসুখ, অক্সিজেনের অভাবে ফুসফুসের অপূরণীয় ক্ষতি হয় লাং ড্যামেজড (Lung Damaged) হয়। যাদের মাল্টিপল স্কেলোরসিস (Multiple Sclerosis) এইটা একটা অটো ইম্যিউন ডিজিজ- সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেমের অসুখ মগজ, স্পাইনাল কর্ড আক্রমন করে) আছে তাদের বেলাও অত্যন্ত বিপদজনক।

* হুম এ্যানাফেলেক্টিক শক হইল, এখন কি করতাম?

সিভিয়ার এ্যানাফেলেক্সিয়া র উপসর্গ দেখা গেলেই পেশাদার চিকিৎসা সহায়তা নেওয়া উচিত। হাসপাতালের ইমার্জেন্সী, ডাক্তার এর কাছে যাওয়া, যেইটা দ্রুত সেইটাই কর। যাদের এই সমস্যা আছে তাদের কাছে “এপিপেন” (EpiPen) থাকা অত্যন্ত জরুরী। এইটা ইঞ্জেক্টেবল, ‘ইপিনেফিরিন অটো ইঞ্জেক্টার’ (Epinephrine Auto Injector) । সমস্যা দেখার সাথে সাথেই নিজের গায়ে ইঞ্জেক্ট করা দরকার।

যেহেতু এই ক্ষেত্রে শ্বাঃসনালী সংকুচিত হইয়া যায় তাই মুখে কোন অষুধ খাওয়া উচিত না। যদি ‘এপিপেন’ ইঞ্জেক্ট করার পরে শরীর ভালো বোধ হয় তবুও ইমার্জেন্সীতে বা ডাক্তারের সাথে দেখা করা উচিত, কারণ অষুধের প্রভাব শেষ হওয়ার সাথে সাথে আবার এর আক্রমন হইতে পারে।

যদি বোলতা বা মৌমাছির হূল (Sting) থাইকা এইটা শুরু হইয়া থাকে, তাইলে সম্ভব হইলে শরীর থাইকা হূলটা বাইর কইরা ফালাও। খেয়াল রাখ, হুলটায় যেন চাপ না লাগে, না ভাইংগা যায়। তাইলে হুলের বিষ আরো শরীরে ছড়াইবো। হূল বাইর করতে হুলটা শরীরের যেইখানে ঢুইকা আছে তাত পাশ ঘেইষা ত্বকের সাথে চাপ দিয়া উপরের দিকে ‘ফ্লিক’ করো বা চাড় দেও তাতে হূলটা বাইর হইয়া যাইব।

তুমি যদি দেখ আর বুঝতে পার কারো এ্যানাফেলেক্টিক শক হইতাছে ইমার্জেন্সীতে কল দাও এ্যাম্বুলেন্স এর জন্য (বাংলাদেশে কি করবা কইতে পারি না)।

রোগীরে আরাম কইরা শোয়াইয়া দেও। পাও একটু উঁচু যায়গায় রাখ, যাতে প্রয়োজনীয় অংগে রক্ত চলাচল সহজ থাকে।

যদি রোগীর কাছে এপিপেন থাকে তাইলে তা ইঞ্জেক্ট কর।
যদি শ্বাঃসকষ্ট হয় তাইলে সিপিআর বা কৃত্রিম শ্বাঃসপ্রশ্বাসের ব্যবস্থা কর।

প্রাথমিক চিকিৎসার পরে অবশ্যই ডাক্তার মাম্মার কাছে যাও।

শেষাংশঃ
এ্যানাফেলেক্টিক শক মারাত্মক বিপদজ্জনক একটা অধ্যায়। এইটা প্রাণঘাতীও হইতে পারে। আক্রান্ত হওয়ার সাথে সাথে তার চিকিৎসা হওয়া দরকার, সুস্থ্য হওয়া নির্ভর করে কত দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া গেছে।

যদি তোমার এ্যানাফেলেক্সিয়া (Anaphylaxis) থাইকা থাকে তাইলে আগে থাইকাই তোমার ডাক্তারের সাথে আলাপ কইরা একটা ইমার্জেন্সী প্ল্যান কইরা রাখা দরকার, আপতঃকালীন কি করনীয়।

তোমার কাছে (ব্যাগে, পকেটে) নোট থাকা উচিত, নাম ঠিকানা আর ডাক্তারের নাম ফোন নাম্বার লেখা থাকা উচিত। তোমারে শকে দেখা গেলে কি করতে হইব তা লেখা থাকা উচিত।

ঝুঁকি এড়াও, উত্তর আমেরিকায় অনেক মানুষ বাদামে এ্যালার্জিক , তাই স্কুলে বাদাম ও বাদাম থাকতে পারে এমন কোন খাবার নিয়া যাওয়া নিষিদ্ধ।

এ্যানাফেলেক্টিক শকের (Anaphylactic Shock ) ঝুঁকি থাকলে অবশ্যই এপিপেন (EpiPen) সাথে রাখ। তার ব্যবহার জাইনা রাখ, পরিবার ও বন্ধুদের এর প্রয়োগ পদ্ধতি দেখাইয়া রাখ। এপিপেন সস্তা না প্রায় ৪০০ ডলার দুইটা ইঞ্জেকশন, কিন্তু জীবনের মূল্য তার চেয়ে বেশী।
“এভ্রি সেকেন্ড কাউন্টস” মানে প্রতিটা মূহুর্ত মুল্যবান।

আল্লাহ সবাইরে নিরাপদে রাখুন।

সূত্রঃ ডাক্তার নাজমা রশীদ

image_print
FavoriteLoadingপ্রিয় পোস্টের তালিকায় নিন।

About The Author

মন্তব্য করুন