রবিবার, জুন ২৩, ২০১৯

পেটে গ্যাস নাই, এমন বাঙ্গালি খুজে পাওয়া ভার।

পেটে গ্যাস নাই, এমন বাঙ্গালি খুজে পাওয়া ভার।

তখন মেডিকেল কলেজে নতুন ভর্তি হয়েছি। বিকালে আমতলায় মামার দোকানে বসে আয়েশ করে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছি। সদরুল ভাই(ছদ্মনাম) পাশে এসে বসলেন, চায়ের অর্ডার দিলেন। আমি জানতাম সদরুল ভাইয়ের মানসিক সমস্যা আছে, মাঝেমধ্যে উনার সমস্যা নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যায়, তখন পাবনায় গিয়ে কিছুদিন থেকে ভাল হলে আবার এসে লেখাপড়া করেন। আমার সাথে উনার আগে কখনও কথাবার্তা সেরকম হয় নাই।

‘আচ্ছা, তুই সিউডোমোনাস(pseudomonas) দেখছস কখনও?’, আচমকা আমার দিকে প্রশ্ন ছুড়লেন সদরুল ভাই।

আমি কিছু না বুঝতে পেরে হা করে উনার দিকে তাকিয়ে থাকলাম।

কিছুক্ষন পর উনি নিজেই বললেন, ওহ তুই তো ফার্স্ট ইয়ারে, সিউডোমোনাসের নাম কেমনে জানবি? তাইলে শোন, সব থেইকা হরিবল চেহারার ব্যাকটেরিয়া হইল গিয়া সিউডোমোনাস, গায়ে আবার পশমও আছে। আচ্ছা ধর, তুই একটা সিউডোমোনাস খাইয়া ফেললি, কি হবে জানিস?

আমি না-সূচক মাথা ঝাঁকাইলাম।

ধর তুই সিউডোমোনাস গিলে ফেললি, তখন হবে কি সিউডোমোনাস তোর ইসোফেগাস(oesophagus-খাদ্যনালী) বেয়ে নিচে নামতে শুরু করবে। এরপর ইসোফেগাস যেখানে স্টমাকের(stomach-পাকস্থলী) সাথে লাগছে সেইখানে এই হালার পুত সিউডোমোনাস গিয়া ঝুলতে থাকব, আস্তে কইরা মাথাটা স্টমাকের ভিতরে ঢুকাইয়া উকি দিয়া দেখব নিচে কি অবস্থা। এরপর হের অবস্থা হবে ভুতে পাওয়ার মত, তোর স্টমাকের ভেতরের অবস্থা দেইখা বেচারা সিউডোমোনাস হাঁচড়ে পাঁচড়ে আবার ইসোফেগাস বাইয়া উপরে উঠার চেষ্টা করব।

নিজের পকস্থলীর ভেতরের করুন অবস্থা চিন্তা করে আমি বিমর্ষ হয়ে গেলাম।

এই অবস্থা শুধু তোর একার পাকস্থলীরই না, যেন সান্তনা দেওয়ার জন্য বললেন উনি আবার, সমস্ত বাংগালীর পাকস্থলীর একই কাহিনী, ভেজাল খাইয়া খাইয়া এমন অবস্থা হইছে যে সিউডোমোনাসের মত বদ সুরতের ব্যাক্টেরিয়ারও ভেতরে ঢুকতে চায় না।

এতদিন পর মনে হয় সদরুল ভাই সেদিন ভুল কিছু বলেন নাই। পেটে গ্যাস নাই, এমন বাঙ্গালি খুজে পাওয়া ভার। আর তাই গ্যাসের ওষুধ নাই এমন বাংলাদেশী প্রেসক্রিপশনও খুজে পাওয়া মুশকিল।

আপনার যে অসুখই থাকুক, ডাক্তাররা ধরেই নেয় যে সাথে আপনার গ্যাসের সমস্যাও আছে, সুতরাং প্রেসক্রিপশনের শেষ মাথায় তরকারিতে লবনের মতই অবধারিতভাবে দেখা যায় —ওমিপ্রাজল/প্যান্টোপ্রাজল/ইসোমিপ্রাজল/ল্যান্সোপ্রাজল/র‍্যাবেপ্রাজল/সেক্লো/লোসেটকিল/ওমেপ……ব্লা ব্লা ইত্যাদি।
এক কথায় এই গুলারে পিপিআই(PPI- proton pump inhibitor) গ্রুপের ওষুধ বলে।

আবার দেখা গেল, খাওয়ার পর আপনার পেটটা একটু ভার ভার লাগছে, গুড় গুড় শব্দ হচ্ছে, মোড়ের ফার্মেসি থেকে নিয়ে নিলেন দুই পাতা সেক্লো কিংবা লোসেকটিল।

অনেকে বছরের পর বছর ধরে এইসব ওষুধ খেয়ে যান।

তবে বেশ কিছু অবজারভেশনাল স্টাডিতে এসব ওষুধের দির্ঘমেয়াদী ব্যবহার যে মোটেই নিরাপদ নয়, তার কিছু প্রমান পাওয়া যাচ্ছে।

যেমন, অনেক দিন ধরে পিপিআই গ্রুপের ওষুধ খেলে ম্যালএবজর্বশন (malabsorption) হতে পারে। হতে পারে ভিটামিন বি ১২ এর স্বল্পতা এবং সেখান থেকে ডিমেনশিয়া।

কমে যতে পারে রক্তের ম্যাগনেসিয়ামের পরিমান এবং সেখান থেকে ঝুঁকিযুক্ত ব্যক্তিদের হতে পারে হ্রদরোগ, ক্যালসিয়াম স্বল্পতা।

অস্টিওপোরোসিস, ফ্রাকচারের সাথেও এর যোগসাজশ থাকতে পারে বলে অনেকে মত দিয়াছেন।

আবার দীর্ঘদিন এই ওষুধ সেবনের ফলে স্টমাকের এসিডিক এনভায়রনমেন্ট পরিবর্তনের কারনে গাটের স্বাভাবিক ব্যক্টেরিয়াল ফ্লোরা নষ্ট হয়ে যাতে পারে, ফলে ক্লস্ট্রিডিয়াম ডেফিসিলি(Clostridium difficile) নামক ভয়ানক ব্যাক্টেরিয়া দ্বারা পেটে ইনফেকশন হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

ক্রনিক কিডনি ডিজিজ(CKD) এর সাথেও এর কিছু সংযোগ পাওয়া গেছে, যদিও প্রমানটা এখনও দুর্বল।

সুতরাং যারা দীর্ঘদিন ধরে এসব ওষুধ খাচ্ছেন, একবার চিন্তা করে দেখুন আসলেই কি আপনার এটা দরকার। ডাক্তার বাবুরাও তরকারিতে লবন দেওয়ার মত প্রেসক্রিপশনে পিপিআই লেখার আগে একটু চিন্তা করবেন, আসলেই কি আপনার রুগির এটা দরকার?

কালকে কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে সদরুল ভাইয়ের সিউডোমোনাসের কথা আবার মনে হইল। বেচারা সিউডোমোনাস! আচ্ছা একটা সিউডোমোনাসের ইসোফেগাসের গোড়া থেকে দৌড়াইয়া মুখ পর্যন্ত যেতে কতক্ষন লাগবে? সদরুল ভাই থাকলে জিজ্ঞাসা করা যেত।

image_print
FavoriteLoadingপ্রিয় পোস্টের তালিকায় নিন।

About The Author

মন্তব্য করুন