বুধবার, এপ্রিল ১৭, ২০১৯

ব্যথা এবং নারীর ব্যথা

ব্যথা এবং নারীর ব্যথা

তখন বিসিএস দিয়ে সদ্য সরকারী চাকুরিতে যোগ দিয়েছি, কর্মস্থল কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। আশপাশের বেশ কয়েকটা গ্রাম থেকে অনেক রুগী আসত আউটডোরে, বিশেষত হাটের দিন রুগীর ভিড় হত বেশি। এদের একটা বড় অংশ গ্রাম্য মহিলা, যাদের একটা বড় অংশের আবার রোগের উপসর্গ ছিল একই রকম। যেমন- সারা শরীর ব্যথা, মাজা(কোমর) ব্যথা, গিরায় গিরায় ব্যথা, হাড়ে হাড়ে ব্যথা, তলপেটে ব্যথা, উপর পেটে ব্যথা, ঘাড়ে ব্যথা, কইলজির (হার্ট)মধ্যে ব্যথা ইত্যাদি। এদের এতপদের ব্যথার ফিরিস্তি শুনতে শুনতে নিজেরই মগজের মধ্যে মাঝে মধ্যে চিন চিন করে ব্যথা করে উঠত। কিন্তু এদের এতসব ব্যথার জন্য হেলথ কমপ্লেক্সে একটাই ঔষধ ছিল, সেটা হল প্যারাসিটামল কিংবা বড়জোর একপাতা ভিটামইন বি কমপ্লেক্স। মাঝে মধ্যে ভাবতাম এই মাইয়া গুলার এত ব্যথার উৎস কি?

পরে বুঝেছি এইসব গ্রাম্য নারীদের ব্যথা বেদনার উৎস অনেক জটিল, অনেক বহুমুখী। সত্য বলতে কি মেয়েমানুষের নানাবিধ ব্যথা বেদনা নিয়ে সমাজে, এমনকি চিকিৎসক সমাজেও একধরনের প্রেজুডিস কিংবা বায়াসনেস কাজ করে। সাম্প্রতিক এক গবেষনায় দেখা গেছে বিভিন্ন ব্যথা নিয়ে হাসপাতালের জরুরী বিভাগে আসা রুগীদের মধ্যের নারী রুগীদের সমস্যাকে চিকিৎসকগন কম গুরুত্ব দেন, এমনকি ইমার্জেন্সীতে নারী রুগীদের ডাক্তারের দেখা পেতে বেশিক্ষন অপেক্ষা করতে হয় পুরুষ রুগীদের চেয়ে। গবেষনায় এও দেখা গেছে যে মহিলা রুগীদের সমস্যাকে এংজাইটি ডিসঅর্ডার কিংবা নানাবিধ মানসিক সমস্যা হিসবে চিহ্নিত করা হয়েছে বেশি। পূরুষ রুগীদের ব্যথার জন্য ব্যথানাশক ঔষধ যত দেয়া হয়, তার থেকে অনেক কম দেয়া হয় নারীদের। বরং তাদের ব্যথার জন্য মানসিক সমস্যাকে দায়ী করা হয়েছে বেশি, মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞদের কাছে রেফারও করা হয়েছে বেশি। উদাহরন দেয়া যাক-

বুকে ব্যথা, ধড়ফড় করে- প্যানিক ডিসঅর্ডার

সারা শরীর ব্যথা, গা জ্বালাপোড়া করে- ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডার (বিষন্নতা)

পেটে ব্যথা- ও কিছু না, সেক্স করার আগে একগ্লাস লেবুর শরবত খাও

দম আটকাইয়া আসতেছে, মনে হইতাছে মইরা যামু- কিচ্ছু হয় নাই, একটা ক্লোনাজিপাম দিতাছি, ভাল কইরা ঘুম দিলে দেখবা সব ঠিক।

একটু পেছনে ফেরা যাক। তখন মেডিসিন ওয়ার্ডে ইন্টার্নশীপ করি। ভর্তির দিন ইমার্জেন্সী দিয়ে অনেক রুগী ভর্তি হত যাদের আসলে একটা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি থাকার কোন দরকারই ছিল না। এজন্য পোস্ট-এডমিশন রাউন্ডে স্যারদের মধ্যে একটা প্রবনতা থাকত এইসব রুগীদের ছুটি দিয়ে সিরিয়াস পেশেন্টগুলোকে ওয়ার্ডে রাখার। তো ভর্তির পরেরদিনই ছুটি হয়ে যাওয়া এসব রুগীদের বড় অংশ হত মহিলা রুগী, যাদের অনেকেরই ডায়াগনসিস থাকত গ্যাড(GAD= Generalized anxiety disorder)। সত্য বলতে কি এসব অনেক রুগীরই মানসিক সমস্যা থাকত, তবে সবার হয়ত না। এমনই গ্যাড ডায়াগনসিস করা এক রুগীকে তার কয়েকদিন বাদে নেফ্রলজী ওয়ার্ডে দেখেছিলাম সিকেডি(CKD=Chronic kidney disease) নিয়ে ভর্তি হতে।

মেয়ে মানুষের পেটে ব্যথা মানেই গায়নোকলজিকাল সমস্যা এরকম ধ্যানধারনাও চিকিৎসকদের মধ্যে বেশি দেখা যায় বলে বলছে সাম্প্রতিক গবেষনা। ফলে তাদের অনেক একিউট সার্জিকাল প্রবলেমও ডায়াগনসিস হতে দেরি হয় অনেক সময়। আর সে যদি পেটে ব্যথা নিয়ে গাইনী ডাক্তারের কাছে যায়, তাহলে তার একটা না একটা গাইনোকলজিক্যাল সমস্যা বের হবেই।

তবে চিকিৎসকদের এই জেন্ডার বায়াসের উৎস ঠিক কি সেটা নিয়ে পরিস্কার কোন ধারনা এখনও দিতে পারছে না গবেষনাগুলো। এরকম পক্ষপাতিত্বপূর্ন মনোভাব মানব সম্প্রদায় জন্মগতভাবেই পায় নাকি এটা আমাদের সমাজ, সংস্কার ইতিহাস আমদের মধ্যে ধীরে ধীরে ঢুকিয়ে দেয় সেটা পরিস্কার না।

আবার এও হতে পারে নারী রুগীদের রোগের উপসর্গ হয়ত পূরুষ রুগীদের থেকে কিছুটা ভিন্ন। যেহেতু চিকিৎসা বিষয়ক নানা গবেষনায় এখনো পূরুষদের আধিপত্য কিংবা অংশগ্রহন বেশি, সেহেতু চিকিৎসা সংক্রান্ত পুস্তক কিংবা জার্নালগুলোতে যেসব রোগ বিবরন পাওয়া যায় সেগুলোই হয়ত একপেশে। অন্য এক গবেষনায় বলছে মহিলা রুগীরা চিকিৎসকদের কাছে তাদের সমস্যার বিবরন ভিন্নভাবে দেয়। অর্থাৎ রোগ সম্পর্কে তাদের শারীরিক উপলব্ধি কিংবা শারীরিক সমস্যার মানসিক ব্যখ্যা ভিন্ন। একই সমস্যায় পূরুষ মানুষ বলবে ‘বুকে ব্যথা’, তারা বলবে ‘বুকে তুফান বয়’।এর পক্ষে আবার কিছু প্রমানও পাওয়া গেছে এক গবেষনায়, তারা বলছে যেসব পূরুষদের আচরন মহিলাদের মত, তাদের প্রতিও চিকিৎসকদের আচরন অনেকটা নারী পেশেন্টদের প্রতি আচরনের মতই। তাই সমস্যার মূল হয়ত সেখানেই।

আরেক রিসার্চে বলা হচ্ছে মহিলারা সামান্য সমস্যাতেই ডাক্তার বাড়িতে বেশি ছোটেন। ইউকের এক গবেষনায় বলছে সেখানে পূরুষরা মহিলাদের চেয়ে ৩২ শতাংশ কম যান জিপি চেম্বারে। একারনে চিকিৎসকদের মধ্যে মহিলাদের অভিযোগে গুরুত্ব না দেওয়ার প্রবনতা বেশি। তবে অন্য এক মেটা এনালাইসিসে আবার উলটো কথা বলছে, তারা দেখিয়েছে মাথা ব্যথা এবং কোমর ব্যথার জন্য মহিলা এবং পূরুষ সমান দ্রুততায় ডাক্তারের কাছে গেছে।

তবে ব্যথার উপলব্ধিটাও হয়ত নারী-পূরুষ ভেদে ভিন্ন হয়। দেখা যায় মহিলাদের ব্যথা সহ্য করার ক্ষমতা কম, যদিও জগতের ভয়ংকর ব্যথাগুলোর একটা প্রসব বেদনা একান্তই তাদের। এর পেছনে হরমোনাল কারনও থাকতে পারে। ইস্ট্রোজেন হয়ত ব্যথার চেতনা অন্যরকম ভাবে নারীর মস্তিষ্কে পাঠায়, ফলে তাদের উপসর্গ হয় ভিন্নরকম। এজন্য এখন অনেকেই চিকিৎসা বিজ্ঞানে লিঙ্গের ভিন্নতাকে একটা গুরুত্বপূর্ন বায়োলজিক্যাল ভেরিয়েশন হিসাবে নিতে বলছেন। তবে সেটা ঠিক কোন লেভেল পর্যন্ত যৌক্তিক তা এখনও অনির্নেয়।

মোদ্দা কথা এ বিষয়ে এখনও পরিস্কার কোন ধারনা কেউ দিতে পারছে না। তবে এ সমস্যা নতুন কিছু নয়, বেশ প্রাচীন। গ্রামাঞ্চলে অনেক সময় ভূতে ধরা মানুষ দেখা যায়, যাদের বেশিরভাগই নারী। (ভূতও কি জেন্ডার বায়াসড?) একসময় এইসব ভূতে ধরা নারীদের চিকিৎসক গন হিস্টিরিয়া বলে ডায়াগনসিস করতেন (হিস্টিরিয়া শব্দটা অনেকদিন থেকেই চিকিৎসা বিজ্ঞানে আর ব্যবহার হয় না)। হিস্টিরিয়া শব্দটাও এসেছে গ্রীক hysterus থেকে যার অর্থ womb বা জরায়ু। সুতরাং দেখা যাচ্ছে এই সমস্যার মূল আসলে অনেক গভীরে, হয়ত আমাদের উপলব্ধির সীমানারও বাইরে।

কোন এক মনীষী বলেছিলেন, ‘নারী হচ্ছে ঈশ্বর রচিত মহাকাব্য’। মানব রচিত মহাকাব্যই এই অধমের মগজে ঢোকে না আর ঈশ্বর রচিত মহাকাব্য, সে তো চেতনার জগতের উর্ধে। সুতরাং, শুভরাত্রি।

image_print
FavoriteLoadingপ্রিয় পোস্টের তালিকায় নিন।

About The Author

মন্তব্য করুন