শনিবার, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০১৯

জেস্টেসনাল ডায়াবেটিস Gestational Diabetes – গর্ভকালীন ডায়াবেটিস

জেস্টেসনাল ডায়াবেটিস Gestational Diabetes – গর্ভকালীন ডায়াবেটিস

image_pdfimage_print

নাম পড়লেই কাম বুঝার কথা! গর্ভকালীন ডায়াবেটিস, অর্থাৎ যখন কোন মহিলা গর্ভধারন করে তখন সে ডায়াবেটিক হইতে পারে। মানে এইটা শুধু মেয়েদেরই হয় আর এইটা শুধুমাত্র গর্ভকালীন সময়েই হয়। সংক্ষেপে গর্ভকালীন সময়ে প্রসুতীর রক্তে শর্করার পরিমান বাইরা গেলে যা কিনা গর্ভধারনের আগে স্বাভাবিক ছিল তারে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস বা জেস্টেসনাল ডায়াবেটিস কয়।

উক্কে তোমার জেস্টেসনাল ডায়াবেটিস হইছে এখন কি তোমার প্রেগ্ন্যান্সী ঝুঁকিপূর্ন হইল? নাহ, জেস্টেসনাল ডায়াবেটিস থাকলেও তোমার ডাক্তার এর সহায়তায় আর শুধুমাত্র রক্তে সুগার লেভেল ম্যানেজ করলেই সুস্থ্য বাচ্চা জন্মাইব। বাচ্চা জন্মাইবার পরে জেস্টেসনাল ডায়াবেটিস আপনাআপনই সাইরা যায়, যদি না সারে তাইলে ডায়াবেটিস টাইপ ২ (Diabetes Mellitus Type 2) রোগ রূপে দেখা দিতে পারে। কিন্তু হইবোই এমন কোন কথা নাই।

প্রসংগ ক্রমে বলা যায় ডায়াবেটিস আসলে দুই প্রকার ডায়াবেটিস টাইপ ১ (Diabetes Mellitus Type 1)- যেই ক্ষেত্রে অগ্নাশয় বা প্যাঙ্ক্রিয়াস Pancreas ইনসুলিন Insulin তৈরী করে না, ইনস্যুলিন যা রক্ত থাইকা চিনি দুর করেনা।

ডায়াবেটিস টাইপ ২ যেই ক্ষেত্রে প্যাঙ্ক্রিয়াস যথেস্ট ইনস্যুলিন তৈরী করে না যাতে রক্তের চিনি দূরীভুত করতে পারে।
একটা কথা বলা ভালো ডায়াবেটিস টাইপ ১ হঠাৎ কইরা হইতে পারে না, এইটা জন্মগত! কিন্তু মানুষের লাইফ স্টাইলের কেচালে ডায়াবেটিস টাইপ ২ হয়।

গর্ভকালীন অবস্থায় মায়ের শরীরে পুরাই ওলট পালটা অবস্থা হয়। আরেকটা জীবনরে দুইন্যায় আনা সহজ কোন ব্যাপার না। প্রেগনান্সীর সময় জরায়ুতে প্ল্যাসেন্টা (Placenta) হরমোন (Hormone) তৈরী করে যা তোমার শরীরের রক্ত সুগার বা চিনির মাত্রা বাড়াইয়া দেয়।

সাধারনতঃ তোমার অগ্নাশয় বা প্যাঙ্ক্রিয়াস (Pancreas) যা তোমার লিভার (Liver) বা কলিজার নিচেই থাকে যথেস্ট ইন্সুলিন তৈরী করা যা রক্ত থাইকা চিনি পরিশোধন করে। যদি না করে তাইলেই কেচাল শুরু। রক্তে সুগার বা চিনির গুদাম হয় মানে জমা হয় আর এই পরিস্থিতিরেই জেস্টেসনাল ডায়াবেটিস বা গর্ভকালীন ডায়াবেটিস কয়।

সারা দুইন্যার ২% থাইকা ১০% গর্ভবতী মায়ের জেস্টেশনাল ডায়াবেটিস হয়। যেকোন আপাতঃ সুস্থ্য মায়েরই হইতে পারে কিন্তু যদি নিচের অবস্থা বিদ্যমান থাকে তাইলে তাদের বেলায় ঝুঁকি বাইড়া যায়, যেমনঃ

• প্রসূতীর বয়স ২৫ এর উপরে, দেখা গেছে যেই প্রসূতীর বয়স ২৫ এর উপরে তাদের জেস্টেসনাল ডায়াবেটিস হইছে।

• গর্ভাবস্থার পূর্বেই স্থুলতা (Obesity) .

• আফ্রিকান-আমেরিকান, এশিয়ান, হিস্পানিক, অথবা নেটিভ আমেরিকান গোত্রের অংশ হও।

• যদি রক্তে আগে থাইকাই সুগার লেভেল হাই থাকে, কিন্তু এতটা না যাতে ডায়াবেটিক বলা যায়।

• ডায়াবেটিসের পারিবারিক ইতিহাস।

• আগে জেস্টেসনাল ডায়াবেটিস ছিল।

• উচ্চ রক্ত চাপ বা অন্য কোন মেডিক্যাল জটিলতা বিদ্যমান।

• পূর্বে বড় আকারের বাচ্চা প্রসব (৯ পাউন্ড অথবা তার বেশী) কইরা থাকলে।

• পুর্বে জন্মগত ত্রুটি বা মৃতশাবক প্রসব করলে।

যখন তোমরা ভাবতাছ বাচ্চা জন্ম দিবা তখনই ডাক্তার মাম্মার সাথে দেখা কইরা এই ব্যাপারে আলাপ কইরা নেওয়া উচিত, ডাক্তার মাম্মা তোমারে পরীক্ষা কইরা তোমার জেস্টেশনাল ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা আর ঝুঁকি নিরুপণ কইরা ব্যবস্থা নিতে পারেন।

সাধারনতঃ গর্ভাবস্থার দ্বিতীয় পর্যায়ে গিয়া জেস্টেশনাল ডায়াবেটিসের লক্ষন দেখা যায়। ডাক্তার মাম্মারা তোমার গর্ভাবস্থার ২৪ থাইকা ২৮ সপ্তাহের মাথায় এই পরীক্ষা গুলি করেন, লক্ষণ আগে প্রতীয়মান হইলে টেস্ট আগেও করতে পারেন। ডাক্তার মাম্মা চিনিওয়ালা একটা পানীয় দ্রুত পান করতে দিবেন, এতে তোমার ব্লাড সুগার লেভেল লাফ দিব উপরের দিকে!

একঘন্টা পরে তোমার রক্ত পরীক্ষা করা হইবো দেখার জন্য তোমার শরীর এই হঠাৎ বাইড়া যাওয়া সুগার লেভেল কি ভাবে ম্যানেজ করলো। যদি দেখা যায় তোমার রক্তে স্বাভাবিকের (১৩০ মিলিগ্রাম প্রতি ডেসিলিটা্রে এমজি/ডিএল mg/dl) চাইতে বেশী হইলে আরো কিছু টেস্ট করতে দিবেন। তার মানে ফাস্টিং ব্লাড সুগার টেস্ট করাইবেন। প্রস্রাব টেস্ট করাইতে পারেন।

সমস্যা হইল, যার জেস্টেসনাল ডায়াবেটিস হইছে সে টেরই পায় না! নিয়মিত টেস্টে গিয়া ধরা পড়ে ডাক্তার মাম্মা আওয়াজ দেয় আর মাম্মালোগ চিন্তা শুরু করে ‘হায় হায় আমি ডায়াবেটিক’!! যদি আউট অফ কন্ট্রোল ডায়াবেটিস হয় তাইলে মাম্মালোগের পানি পিপাসা বাইড়া যাইতে পারে, টায়ার্ড লাগা, ঝাপ্সা দেখা, ক্ষুধা বেশী লাগতে পারে, বার বার প্রস্রাব এর বেগ পাইতে পারে। জেস্টেশনাল ডায়াবেটিস প্রিএ্যাক্লেম্পসিয়ার (pre-eclampsia) কারন হইতে পারে।

ডাক্তার মাম্মা তোমার টোটাল অবস্থা পরীক্ষা কইরা চিকিৎসা করবো, হয়তো তোমারে দিনে চার বার রক্তে সুগার লেভেল পরীক্ষা করতে কইব, হয়তো তোমার প্রস্রাবে কেটোন (ketones) এর উপস্থিতি পরীক্ষা করবো যা তোমার সুগার লেভেল নিয়ন্ত্রনে না প্রমান করবো, পুস্টিকর স্বাস্থ্যকর খাবার খাইতে কইব, শরীরচর্চারে অভ্যাসে পরিণত করতে কইব। তোমার ওজন বৃদ্ধির দিকে নজর রাখবো আর জেস্টেশনাল ডায়াবিটিসের চিকিৎসা করবো।

জেস্টেসনাল ডায়াবেটিক মাম্মাদের খাবারের ব্যপারে সাবধান হইতে হইব, ব্যালেন্সড ডায়েট মুল বিষয়। টোটাল খাবারের ৪০ থাইকা ৬০ ভাগ কার্বোহাইড্রেটস ২০ থাইকা ২৫ পার্সেন্ট প্রোটিন আর ২৫ থাইকা ৩৫ ভাগ ফ্যাট বা স্নেহ জাতীয় ক্যালরী হওয়া উচিত। ১২০থাইকা ১৯৫ গ্রামস কার্বো হাইড্রেট দিনের মোট তিন বেলা খাবার ও দুইবেলা স্ন্যাক বা নাসতার মধ্যে সমান ভাগ কইরা দেওয়া উচিত যাতে সুগার লেভেল হঠাৎ উঠা নামা বা স্পাইক না করে। ডাক্তার মাম্মা অথবা ডায়েটেশিয়ান ঠিক কইরা দিব তোমার কতটা কার্বোহাইড্রেট লাগবো প্রতিদিন।

ভালো কার্বোহাইড্রেটের মধ্যে হোল গ্রেইন্স, ব্রাউন রাইস, সীম মটরশ্যুটি, ডাল আঁশযুক্ত কম মিস্ট ফল ও সব্জী।

প্রতি দিন ৬০ গ্রামস প্রোটিন দরকার তা মাছ, চর্বি ছাড়া মাংশ, মুরগী আর টফু থাইকা আসতে পারে।

ফ্যাট আসতে পারে, বিভিন্ন প্রকার বাদাম (লবন ছাড়া) ওলিভ ওয়েল আর এ্যাভোকাডো থাইকা।

শেষ প্যারাঃ বেশীর ভাগ জেস্টেশনাল ডায়াবেটিস সন্তান জন্মদানের পরে নিজে থাইকাই সাইরা যায়। এই অসুস্থতা গুরুতর কিছু না, কিন্তু মোটেই অবহেলা করা উচিত না, বাচ্চা গর্ভে আসার আগেই ডাক্তার মাম্মার সাথে কথা বলা উচিত যাতে তিনি ঝুঁকি নিরুপণ করতে পারেন, জেস্টেশনাল ডায়াবেটিস নির্নিত হইলে না ঘাবড়াইয়া নির্দেশিত ব্যবস্থাপত্র অনুসরন করা উচিত, পুস্টিকর ও স্বাস্থ্যকর খাওয়া, শরীরের রক্তে চিনির পরিমান নিয়ন্ত্রন করা, এ্যাক্টিভ লাইফ অর্থাৎ শরীরচর্চায় মনোনিবেশ করা উচিত।

ইয়ে মানে…… আমি কইলাম ডাক্তার না, আমি চিকিৎসা দেই নাই আমি কইলাম কেন এইটা হয়। এই লেখা আমার নিজের অভিজ্ঞতা, ডাক্তার বইন নাজমা শাহনাজের টিপস আর অনলাইন লেখা পড়ার ফল। ভুল ভাল কইলে ডাক্তার মাম্মারা কইও শুধরাইয়া নিব।

তথ্যসূত্রঃ ডাক্তার নাজমা রশীদ
www.mayoclinic.com
www.webmd.com
www.healthline.com/health/gestational-diabetes

FavoriteLoadingপ্রিয় পোস্টের তালিকায় নিন।

About The Author

মন্তব্য করুন