বুধবার, আগস্ট ১৫, ২০১৮

ভালসারটান নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়ার ভুল তথ্য

ভালসারটান নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়ার ভুল তথ্য

নিচের সংবাদ শিরোনামগুলি এবং উদ্ধৃত অংশ সমুহ পড়ুনঃ

ইত্তেফাক (২২ জুলাাই) : ভালসারটান ওষুধ প্রত্যাহারের নির্দেশ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর

…”যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফুড অ্যান্ড ড্রাগস অ্যাডমিনিস্টেশন (এফডিএ) রিপোর্টে উঠে এসেছে যে, ভালসারটান ওষুধ সেবনে লিভার, ফুসফুস ও স্তন ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এটি নিয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।”

BDNEWS24 (২২ জুলাই) : ভালসারটান ওষুধ বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ
…”উচ্চ রক্তচাপ ও হার্ট ফেইলিয়রের চিকিৎসার বিভিন্ন ওষুধে ভালসারটান উপাদানটি ব্যবহৃত হয়। এটি ক্যান্সারের ঝুঁকি তৈরি করে বলে গণমাধ্যমে খবর আসার পরিপ্রেক্ষিতে রোববার সচিবালয়ে এক সভায় সভাপতিত্বকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এই নির্দেশ দেন।”

কালের কণ্ঠ (২২ জুলাই): ভালসারটান ওষুধ বাজার থেকে প্রত্যাহার করার নির্দেশ

…”উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের রোগীদের জীবন রক্ষাকারী ওষুধ হলো ভালসারটান। বাংলাদেশসহ বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ এই ওষুধ সেবন করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফুড অ্যান্ডড্রাগস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) রিপোর্টে প্রমাণিত হয়েছে যে, ভালসারটান ওষুধ সেবনে ক্যান্সারের ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে লিভার, ফুসফুস ও স্তনক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এ প্রেক্ষিতে ইউরোপ-আমেরিকায় ওষুধটি প্রত্যাহার করা হয়েছে।”

যুগান্তর (২৩ জুলাাই ): ভালসারটান ওষুধ প্রত্যাহারের নির্দেশ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর
……………”জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফুড অ্যান্ড ড্রাগস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফডিএ) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- ভালসারটান ওষুধ সেবনে লিভার, ফুসফুস ও স্তন ক্যান্সার হওয়ার আশঙ্কা বেশি।”

বাংলা ট্রিবিউন (২২ জুলাই): ভালসারটান ওষুধ বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ

……………”স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা পরীক্ষিত চৌধুরী স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ভালসারটান ওষুধ ব্যবহার না করার লক্ষ্যে জনসচেতনতা বাড়াতে একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেলের মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করে মতামতসহ গণমাধ্যমে সচেতনতামূলক বিজ্ঞপ্তি প্রদানের ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ওষুধ প্রশাসনের প্রতি নির্দেশ দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। সম্প্রতি গণমাধ্যমে ভালসারটান ওষুধের ক্ষতিকারক দিক সম্পর্কে সংবাদ প্রকাশের পরিপ্রেক্ষিতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এ পদক্ষেপ নেন।”

উপরের কয়েকটি প্রধান পত্রিকাসহ ২২ এবং ২৩ তারিখের সকল দেশী পত্রিকায় দেশের বাজার থেকে ভালসারটান ওষুধ প্রত্যাহারের নির্দেশ তথ্য ছিল প্রায় একইরকম। দুঃখের বিষয় কোন পত্রিকাই ভালসারটান ওষুধ প্রত্যাহারের কারণ সঠিকভাবে রিপোর্ট করতে পারে নাই, বরং একটা উচ্চ রক্তচাপের একটি নিরাপদ ওষুধকে ক্যান্সারের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। এই রিপোর্টটা জনস্বাস্থ্যের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা সম্ভবত পত্রিকাগুলো উপলদ্ধি করে নাই।

ভালসারটান হার্ট ফেইলিয়ার এবং উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসার জন্য বেশ নিরাপদ একটি ওষুধ। এটি বাংলাদেশের প্রায় ২০ টি কাম্পানী বিভিন্ন ব্রান্ড নামে বাজারজাত করে (যেমন- নোভারটিসের ব্রান্ড নাম ডায়োভান)। সম্প্রতি যুক্তরাস্ট্রসহ বিশ্বের প্রায় ২২টি দেশ বাজার থেকে কিছু কাম্পানির ভালসারটান বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয়। কারণ, ঐ কাম্পানীগুলো তাদের প্রোডাক্টের জন্য চীনের Zhejiang Huahai Pharmaceutical Co. এর তৈরী ভালসারটানের কাঁচামাল ব্যাবহার করেছিলো। চীনের তৈরী ভালসারটানের কাঁচামালে অন্য একটি ভেজাল উপাদানের উপস্থিতি পাওয়া গেছে যার নাম হলোঃ N-nitrosodimethylamine (NDMA)। এই এনএমডিএ উপদানটি বিষাক্ত এবং এর লিভার ক্যান্সার তৈরি করার ক্ষমতা আছে। বিভিন্ন ক্যামিক্যাল উপাদান রাসায়নিক পদ্ধতিতে সংশ্লেষ করার সময় বাই-প্রডাক্ট হিসেবে এনএমডিএ তৈরী হয়, যা পরে বিশুদ্ধকরণ ধাপে সরিয়ে ফেলা হয়। চীনের উক্ত কাম্পানীর ভালসারটানে এই বিষাক্ত ভেজাল উপদানটির উপস্থিতির কারণ এখনো জানা যায়নি তবে মনে করা হচ্ছে কাম্পানীটি ভালসারটান সংশ্লেষের পদ্ধতি সম্ভবত পরিবর্তন করেছে ফলে বাই-প্রোডাক্ট হিসেবে এনএমডিএ তৈরী হয়েছে, যা ডিটেকশন করা হয়নি এবং মুল উপাদান থেকে সরিয়ে ফেলা হয়নি।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর ওষুধের দেশে ওষুধ সম্পর্কিত সকল বিষয় দেখভাল করে থাকে। গত ১৯ জুলাইয়ের এক নোটিশে ওষুধ প্রশাসন আমাদের দেশের যে সকল ওষুধ কাম্পানী চীনের ঐ কাম্পানীর ভালসারটান ব্যাবহার করেছিলো তাদের প্রোডাক্ট বাজার থেকে প্র্যাতাহার করতে নির্দেশ দিয়েছে। সব কাম্পানীর নয়। যথা সময়ে পদক্ষেপ নেয়ার জন্য ওষুধ প্রশাসনকে সাধুবাদ জানাই। কিন্তু, ওষুধ প্রশাসন কাজটি দায়সারা ভাবে করেছে বলে আমার মনে হয়েছে। উক্ত নোটিশে জনগণের জ্ঞ্যাতার্থে তাদের উল্লেখ করা উচিত ছিল দেশের কোন কোন কাম্পানী চাইনিজ ঐ কাম্পানীর ভালসারটান কাঁচামাল ব্যাবহার করছে এবং সে অনুযায়ী উচিত হত ব্রান্ড এবং কাম্পানীর নাম সহ প্রত্যাহার নির্দেশ জারী করা| পাশাপাশি ওষুধ প্রশাসনের উচিত ছিল একটি প্রেস নোট জারি করা এবং যে সকল রোগী এখন ভালসারটান খাচ্ছেন তাদের কি করা উচিত তা বিশদভাবে ব্যখ্যা দেয়া। সম্ভবত ওষুধ প্রশাসন কোন কারণে এটি এড়িয়ে গেছেন।

ব্যাপারাটা নিয়ে পত্রিকাসমুহের ভুল তথ্য উপস্থাপন এবং ওষুধ প্রশাসনের দায়সারা পদক্ষপের ফল ভয়ানক হতে পারে। মনে করুন কোন এক উচ্চ রক্তচাপের রোগী পাঁচ বছর যাবৎ ভালসারটান খাচ্ছেন। এরপর উনি দেশের বড় বড় পত্রিকার নিউজ পরে জানলেন ভালসারটান ক্যান্সার তৈরী করতে পারে! ভেবে দেখুন সেই উচ্চ রক্তচাপের রোগীর মানসিক অবস্থা কি হবে। ক্যান্সার আতঙ্কে উনার হার্ট অ্যাটাক হলে হতেও পারে! অথচ ব্যাপারটা সে রকম নয়!

তাছাড়া, এর ফলে ওষুধ হিসেবে ভালসারটানের জনপ্রিয়তা এবং যেসকল ওষুধ কাম্পানী চীনের কাঁচামাল ব্যাবহার করেনি তাদের প্রোডাক্টের মার্কেট যে ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হল, তার দায় কে নেবে?

তাই, আমি যে সকল পত্রিকা জনস্বাস্থ্যের জন্য এরকম অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি ইস্যু নিয়ে ভালোভাবে যাচাই না করেই ভুল ভাবে উপস্থাপন করেছে , তাদের একটি সংশোধনী রিপোর্ট প্রকাশের জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করছি| পাশাপাশি, ওষুধ প্রশাসন এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নিকট আবেদন, আপানারা দ্রুত একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করুন যাতে কোন কোন কাম্পানির ভালসারটান খাওয়া যাবেনা তা উল্লেখ থাকবে এবং যারা ঐ সকল কাম্পানীর ওষুধ খাচ্ছেন তাদের কি করা উচিত তা বলা থাকবে |

ধন্যবাদ-
ডঃ মোঃ আজিজুর রহমান
সহযোগী অধ্যাপক, ফার্মেসী বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

image_print
FavoriteLoadingপ্রিয় পোস্টের তালিকায় নিন।

About The Author

মন্তব্য করুন