শনিবার, অক্টোবর ২০, ২০১৮

দেন মোহর।

দেন মোহর।

এই লেখাটা যাদের বেলায় প্রযোজ্য টাইপ। অর্থাৎ যারা মুসলমান বা মুসলিম রীতি মাইন্যা চল এখনো, তাদের জন্য। আমি নারীবাদী বা পুরুষতত্ব অধিকার প্রমাণ করার সাফাই গাইতে এইটা লেখি নাই, যা মুসলিম সমাজে চালু আছে শুধু তার আলোচনা-।

“……এবং নারীদের কে বিবাহের সময় তাদের মাহর উপহার স্বরূপ দাও” – সুরা নিসা আয়াত ৪।

আরবী মাহর শব্দটির বাংলায় দেনমোহর নামে প্রচলিত আমাদের দেশে কেউ কেউ ‘কাবিন’ ও বলেন, হয়তো এটা ‘প্রদেয়’ বা দিতে হবে বিধায় এর প্রচলন।

মাহর বা দেন মোহর কি? মুসলিম প্রথা মতে বিয়ের সময় স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে প্রদেয় ‘উপহার’ কে মাহর বলে। এটা ‘স্ত্রীমূল্য’ বা ‘কন্যেপণ’ নয়, এটা দিয়ে স্ত্রীকে কিনে নেয়া হয় না। মাহর স্ত্রীর অধিকার তার স্বামীর কাছে। মুসলিম বিয়ের একটা অবশ্য পালনীয় শর্ত। যা স্বামী হিসাবে ভবিষ্যত দ্বায়ীত্ব পালনের প্রতিকী নমুনা, মাহর নগদ অর্থ, সম্পত্তি, অথবা যেকোন বস্তু বা বিষয় হতে পারে। মাহর এর অর্থ বা মূল্য ঠিক করে দেওয়া হয় নাই, কিন্তু বর্তমান সামাজিক মূল্যনুযায়ী নির্ধারিত হবে।

হযরত মুসা যখন ফেরাউনের সৈন্যদের হাত থেকে বাঁচার জন্য মিশর থেকে পালিয়ে হযরত শুয়াইব আঃ এর কাছে মাদায়েনে আশ্রয় নিয়েছিলেন, শুয়াইব আঃ তার কন্যা সফুরা কে মুসা আঃ সাথে বিয়ে দেন, মাহর মুউয়াজ্জাল হিসাবে হযরত মুসা আঃ দশ বছর তার শশুর এর পশু পালন করেন।

মাহর আদায় করার দুটি পদ্ধতি আছে, মুয়াজ্জাল (তৎক্ষনাত প্রদেয়) ও মূঊয়াজ্জাল/মুওয়াক্ষার (তলব মাত্র অর্থাৎ স্ত্রী যখন খুশী চাইতে পারে)। এটা মুয়াজ্জাল অথবা মূউয়াজ্জাল/মুওয়াক্ষার অথবা সম্মিলিত পদ্ধতি হইতে পারে, তবে মূউয়াজ্জাল বা ‘তলবী’ মাহর এর ক্ষেত্রে স্বামীর মৃত্যুতে অথবা তালাকে সাথে সাথে পরিশোধ্য হয়। “যদি তুমি মাহর নির্ধারিত হবার পরে তাদের সাথে সংগত হবার পূর্বেই তালাক দাও তবে মাহরের অর্ধেক তাদের প্রাপ্য যদিনা তারা তা মাফ করে দেয়………”। সুরা বাকারাহ আয়াত ২৩৭। বাংলাদেশী কাবিন নামার ১৩ ও ১৪ নাম্বার আইটেমে এই শর্তের উল্লেখ আছে। ( নিচে ছবি দেখ)।

যেহেতু মাহর বিবাহ/পারিবারিক জীবন শুরু হবার আগেই নির্ধারিত হয় এবং মাহর তলবীও হতে পারে এক্ষেত্রে তার লিখিত দলিল থাকা প্রয়োজন।

কোরানে মাহর কে ‘ফারিদা’ (ফরজ থেকে ফারিদা) বলা হইছে, যার মানে ‘নির্ধারিত’ ‘স্থিরকৃত’ ও ‘অবশ্য করণীয়’। মাহর এর উপর একমাত্র স্ত্রীর অধিকার আছে এবং তা শুধু মাত্র স্ত্রীকেই প্রদেয় হবে, তার মা বাবা বা আত্মীয়স্বজনকে নয়। অন্য কেউ স্ত্রীর পক্ষে এটা গ্রহণ বা মাফ করে দিতে পারে না। শুধু মাত্র যদি স্ত্রী স্বামীর সংগে যেতে অস্বীকৃতি না জানায় বা সংগত না হয় তাহলেই শুধু স্ত্রীর অভিভাবক মাহর মাফ করতে পারেন। যদি মাহর আদায় করার পূর্বেই স্বামীর মৃত্যু হয় তবে এটা স্বামীর সম্পত্তি উত্তরাধিকারীদের মধ্যে ভাগ করার পূর্বেই শোধ করতে হইব।

আগেই বলছি এটা কন্যেপণ না, এটা নারীর অধিকার, এটা স্বামীর ভালবাসা ও অনুরাগে বহিঃপ্রকাশ, কোরানে এটাকে ‘সাদাকা’ বলা হইছে, যা বন্ধুত্বের প্রতিকী, ‘নিহলাহ’ বলা হইছে অর্থাৎ ‘সুন্দর উপহার’। স্বামী তার স্ত্রীর অর্থনৈতিক দায় দ্বায়ীত্ব (নিফা’ক) নেবে মাহর তারই প্রতীক। আমাদের দেশে মুসলিম সমাজে একটি ধারনা প্রচলিত আছে মাহর তালাকের সময় আদায় করতে হয়, এটা আসলে স্বার্থান্বেষী পুরুষ সমাজের তৈরী করা ধারনা, মাহর বিয়ের জন্য নির্ধারিত তালাকের জন্য নয়। যাই হোক তালাকের ক্ষেত্রে মাহর পরিশোধিত না হয়ে থাকলে তৎক্ষনাত পরিশোধ্য হতে হয়।

শারিয়াতে মাহর কে ‘যথাযত’ হইতে হইব বলা হইছে। শারিয়াতে মাহর এর মূল্য নির্ধারন করে দেওয়া হয় নাই, মাহর স্বামীর আয়ের সাথে সামাজিক মর্যাদার সাথে সংগতি পূর্ন হইতে হইব, আমরা দুইশত বছরের পুরানো মুল্যমানকে এইসময়ে নির্ধারন করতে পারি না। একই সাথে আমেরিকা বা কানাডাতে যে মাহর হবে তা বাংলাদেশের পুরুষদের বেলায় লাগু হইব না।

একই সাথে এটাও খেয়াল রাখতে হবে “মাহর যেন বোঝা না হয়ে দাড়ায়”। “সবচাইতে নন্দিত সেই বিয়ে যেটাতে পাত্রপাত্রী একে অপরে উপর কম বোঝা আরোপ করে”। – আল হায়াতামী, কিতাব আব নিকাহ ৪-২৫৫।

হযরত আলীর বিয়ের মাহর ছিল তার যুদ্ধে ব্যবহৃত ঢাল। অর্থাৎ সামর্থের মধ্যে হইতে হবে। রাসুল সাঃ তার বিভিন্ন স্ত্রীদের বিভিন্ন মাহর দিছেন, কাউকে প্রতীকি অর্থ, দাসীত্ব থেকে মুক্তি, ও ৪০০-৫০০ দিরহাম, শুধু মাত্র তার স্ত্রী উম্মে হাবিবার ক্ষেত্রে মাহর ৪০০০ দিরহাম ছিল, এটা আবেসিনিয়ার খ্রিষ্টান শাসক নাজাসী কর্তৃক নির্ধারিত হয়েছিল। – আবু দাউদ কিতাব আব নিকাহ ২-২৩৫।

কিন্তু আজকাল দেখছি, মাহর অনেকটা স্টাটাস সিম্বল হইয়া গেছে, কার মেয়ের বিয়ের দেনমোহর কত বেশী তা নিয়ে মেয়ের মা, খালা, আত্মীয়স্বজন গর্ব কইরা বলেন, ‘আমার মেয়ের বিয়ের কাবিন ১০ লাখ টাকা ২০ লাখ টাকা।‘

কনে পক্ষ মনে করেন মাহর এর অর্থ তাদের মেয়ের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার গ্যারান্টি, তারা মনে করেন, যদি কোন কারনে বিয়েটা ভাইংগা যায় তাহলে এই টাকা তাদের মেয়ের বিপদের দিনে সহায় হবে, কিন্তু একবারও হয়তো ভেবে দেখেন না যে যদি ছেলেটি এই মাহর এর টাকা শোধ করতে না পারে তাইলে সারাটা জীবন তাদের মেয়েকে এমন একটা লোকের সাথে জীবন যাপন করতে হইব যে তালাক দিতে চায়! সংসারে অশান্তি চলতেই থাকব। এমনকি দেখা গেছে শাররীক ও মানসিক অত্যাচারের ঘটনা অহরহ ঘটছে।

ছেলে পক্ষ মনে করেন “লিখুক না যা খুশী কখনো দিতে তো হইব না”। এটা আল্লাহর সাথে খেলার অনুরূপ “একজন মুসলিম কখনোই ওয়াদা করে না যা সে রাখতে পারবে না”।

আরও বলা হয়েছে এটা যেন প্রদেয় ব্যাক্তির কাছে বোঝা না হয়ে যায়।

কোরানের সুরা নিসার আয়াত ৪ এ আরো বলা হয়েছে, “……এবং নারীদেরকে বিবাহের সময় তাদের মাহর ‘উপহার’ স্বরূপ দাও, কিন্তু তাহারা যদি এর কিছু অংশ তাদের নিজের ইচ্ছা ছাড়িয়া দেয় বা মাফ করে দেয় তাহলে তা সানন্দে গ্রহন কর ও ভোগ কর”। অর্থাৎ এই মাহর স্ত্রী ‘ইচ্ছা করলে’ মাফ করে দিতে পারে, মাফ না করলে স্বামীর কোন উপায় নাই, দিতেই হবে, এবং তা স্ত্রীকে স্পর্শ করার পুর্বেই।

চালাক স্বামী কিছুটা দিয়ে বাকীটা মাফ চাইয়া নেয়। বেচারী নতুন বউএর আর কি করার থাকে, সেও রাজী হয়ে যায়। এভাবেই আমাদের দেশের স্বামীরা পার পাইয়া যায় অনেকক্ষেত্রেই। কখনোই নারীদের এই মাহর এর সিদ্ধান্তে প্রভাবিত করা করা উচিত না। তাদের অধিকার বঞ্চিত করার কৌশল করা উচিত না।

বিবাহিত জীবনটা প্রতারণা দিয়া শুরু কইরো না মাম্মালোগ!

image_print
FavoriteLoadingপ্রিয় পোস্টের তালিকায় নিন।

About The Author

মন্তব্য করুন