বুধবার, আগস্ট ১৫, ২০১৮

সিয়াম এবং স্বাস্থ্যঃ রোযা এবং পরিপাক নালী ও লিভারের সমস্যা

সিয়াম এবং স্বাস্থ্যঃ রোযা এবং পরিপাক নালী ও লিভারের সমস্যা

সার্বিকভাবে রোযা মনোদৈহিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নে ভূমিকা রাখে। কিন্তু ইফতার এবং সেহরির খাবারের উপাদান সঠিকভাবে চয়ন না করলে পাকস্থলী এবং অন্ত্রের বিভিন্ন উপসর্গ দেখা যায়। অনেকেই রমযানের সময় ডিসপেপসিয়া বা বদহজম, পেট ভারী ভারী লাগা, বুক জ্বালাপোড়া বা হার্টবার্ন ইত্যাদি নানারকম সমস্যার কথা বলে থাকেন। ইফতার এবং সেহরিতে অতিরিক্ত তেলচর্বিযুক্ত ভাজাভুজি এবং চিনি-মিষ্টিসমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার পরে এধরণের সমস্যা বেশী হয়।

এখানে পেপটিক আলসার সম্পর্কে কিছু উল্লেখ করা দরকার। এটা আমাদের খুবই পরিচিত রোগ। রমযানের সময় পেপটিক আলসার এবং এর জটিলতাও বেড়ে যেতে দেখা যায়। অনেকে জেনে কিংবা না জেনে পেটের যেকোন ব্যথা কিংবা সমস্যার জন্য অ্যান্টসিড, ওমেপ্রাজল কিংবা র‍্যানিটিডিন জাতীয় ওষুধ অবিরত খেয়ে থাকেন এবং এধরণের লক্ষণ-উপসর্গ থেকে মুক্ত থাকার চেষ্টা করেন।

পেপটিক আলসারের অত্যন্ত গুরুতর জটিলতাসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে পাকস্থলী কিংবা ডিউডেনাম ফুটো হয়ে যাওয়া। সম্প্রতি তুরস্কের ইস্তাম্বুল ইউনিভার্সিটিতে এ সম্পর্কে একটি পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। উদ্দেশ্য ছিল রমযান মাসে রোযার কারণে পাকস্থলী কিংবা ডিউডেনাম ফুটো হয়ে যাওয়ার প্রকোপ কেমন, তা খতিয়ে দেখা।

এই পর্যবেক্ষণ তুরস্কের একটি বড় রেফারাল হাসপাতালে ১৯৭৯ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত যে ২৩১১ জন পাকস্থলী কিংবা ডিউডেনাম ফুটো হয়ে যাওয়া রোগী ভর্তি হয়েছিলেন, তাদের প্রত্যকের অপারেশন সংক্রান্ত নথি-পত্র বিশ্লেষণ করে দেখা হয়েছে। এদের মধ্যে রমযান ব্যতীত অন্যান্য মাসে (৩৯৬ মাস) ভর্তি হয়েছেন ১৮০৫ জন। আর রমযান মাস সমূহে (৩৬ মাস) ৫০৬ জন পাকস্থলী কিংবা ডিউডেনাম ফুটো হয়ে যাওয়ার কারণে ভর্তি হয়ে শল্য চিকিৎসা নিয়েছেন। ফলাফল বিশ্লেষণ দেখা যাচ্ছে এই দুই গ্রুপের রোগীদের মধ্যে অন্যান্য কোন পার্থক্য না থাকলেও রমযান মাসে পাকস্থলী কিংবা ডিউডেনাম ফুটো হয়ে যাওয়ার কারণে তুলনামূলকভাবে অধিক হারে শল্য চিকিৎসা নিতে হয়েছে। গবেষকগণ অবশ্য ঋতুভেদে রোগীর কেমন তারতম্য হয়েছে তা নির্ণয় করতে পারেন নি। উক্ত ৩৬ বছরের মধ্যে কোন এক রমযান মাসে রোযা রাখার সময় ছিল সর্বোচ্চ ১৯ ঘণ্টা।

গবেষকদের সিদ্ধান্ত হচ্ছে রমযান মাসে পাকস্থলী কিংবা ডিউডেনাম ফুটো হওয়ার কারণে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে শল্যচিকিৎসা নেওয়ার হার উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় বেড়ে যায়। অতএব যাদের পেপটিক আলসারের সমস্যা রয়েছে বলে মনে করেন, তাদের রমযান শুরুর পূর্বে চিকিৎসকের নিকট পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত।

পরিপাক নালীর অন্যান্য রোগের ওপর রোযার প্রভাব সম্পর্কে তেমন কোন নির্ভরযোগ্য পর্যবেক্ষণের তথ্য নেই। অনেকে মনে করেন মৃদু থেকে মাঝারি তীব্রতার আন্ত্রিক প্রদাহে (inflammatory bowel disease) সাধারণত রোযার সময় তেমন সমস্যা হয় না। তবে রোগের তীব্রতা বেশী থাকলে সতর্ক হওয়া উত্তম।

অ্যাকিউট ভাইরাল হেপাটাইটিস এবং যেকোন গুরুতর লিভারের রোগের ক্ষেত্রে রোযা থেকে বিরত থাকা উত্তম। তবে অধিকাংশ মৃদু ক্রনিক হেপাটাইটিসের ক্ষেত্রে রোযার ফলে তেমন কোন সমস্যা হয় না। যদিও অনেকের এসময় রক্তে লিভার এনজাইমের পরিমাণ বেড়ে যায়। কিন্তু রমযানের পরে আবার তা পূর্বাবস্থায় ফিরে যায়।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভারের (NAFLD) রোগীরা রোযা থাকলে বিশেষ উপকার পেতে পারেন। সম্প্রতি ইরানের তাব্রিজ ইউনিভার্সিটিতে ফ্যাটি লিভারের ওপর রোযার প্রভাব নিয়ে খুব চমৎকার একটি গবেষণা করা হয়েছে। গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল ফ্যাটি লিভারের রোগীরা রোযা থাকার ফলে রক্তের গ্লুকোজ, ইনসুলিন সহ অন্যান্য রাসায়নিক উপাদানের কেমন পরিবর্তন হয়, তা লক্ষ্য করা। ফলাফলে দেখা যায় যারা রোযা রেখেছেন তাদের সকলেরই রক্তে গ্লুকোজ, ইনসুলিন, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স এবং প্রদাহজনিত বিভিন্ন সাইটোকাইনের মাত্রা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমেছে।

সুতরাং বলা যায় পরিপাক নালী এবং লিভারের রোগভেদে রোযার কারণে ভাল-মন্দ উভয় রকম পরিণতিই হতে পারে। কারও এধরণের সমস্যা থাকলে রোযা শুরু হওয়ার আগে থেকে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত।

তথ্যসূত্রঃ
• Abbas Z. Gastrointestinal health in Ramadan with special reference to diabetes. J Pak Med Assoc. 2015 May; 65(5 Suppl 1):S68-71.
• Kocakusak A. Does Ramadan fasting contribute to the increase of peptic ulcer perforations? Eur Rev Med Pharmacol Sci. 2017 Jan;21(1):150-154.
• Aliasghari F, Izadi A, Gargari BP, Ebrahimi S. The Effects of Ramadan Fasting on Body Composition, Blood Pressure, Glucose Metabolism, and Markers of Inflammation in NAFLD Patients: An Observational Trial. J Am Coll Nutr. 2017 Nov-Dec;36(8):640-645.

 

image_print
FavoriteLoadingপ্রিয় পোস্টের তালিকায় নিন।

About The Author

মন্তব্য করুন