মঙ্গলবার, আগস্ট ১৩, ২০১৯

গোলমরিচ নামা

গোলমরিচ নামা

image_pdfimage_print

কালা সোনা! গেছে মাম্মার মাথাটা! সোনা আবার কালা হয় নাকি? প্রাচীন গ্রীসে গোলমরিচরে এই নামেই ডাকতো!তখন গোলমরিচ তাদের মূদ্রা হিসাবেও ব্যবহার হইতো! ফেরাঊন বাদশা দ্বিতীয় রামসেস এর নাকের ফুটায় কালো গোলমরিচ পাওয়া গেছিল! রামসেস মাম্মা ‘আল্লাহ কা পেয়ারা’ হইছেন যীশুখ্রীষ্টের জন্মের ১২১৩ আগে! তার মানে, এইটা সমাদর কত উঁচু ছিল যে তা ফেরাঊণ অধিপতি মারা যাওয়ার পরে তার নাকে রাখা গেছে!

আবার আরেক দিক দিয়া দেখা যায় এই হতচ্ছাড়া মশালার জন্য ভারত উপমাদেশে বেনিয়া বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গঠন, আগমন, বানিজ্য, দখলদারী, শাসন ও শোষন সহ্য করছে আমার তোমার পূর্বপুরুষ। গোল মরিচের আদিবাস দক্ষিণ ভারত (কেরালা), বর্তমানে ভিয়েতনাম প্রধান উৎপাদনকারী দেশ। ইন্দোনেশিয়া ও ব্রাজিল এর নামও আছে উৎপাদনকারী দেশ হিসাবে।

যাউক্কগ্যা! কালো গোলমরিচ আসলে কালো হইল তার একটা অবস্থার নাম এইটা পাকলে কালো হয়, প্রথমে সবুজ, পরে লাল আর পাইকা শুকাইলে তা কালো হয় আর এইটা কালো গোল মরিচ নামেই পরিচিত সারা দুইন্যায়। আরেকটা কনফিউজিং বিষয় আছে সাদা গোল মরিচ এইটা আসলে কালো গোল মরিচের খোশা ছিল্যা ফালাইলে যে বীজটা থাকে সেইটেই গুড়া কইরা বানানো হয়। মানে সাদা গোলমরিচ গাছে ধরে না!

গোল মরিচ ‘পিপারেসেই’ piperaceae গ্রুপের সদস্য। আমাদের দেশে এর ব্যবহার একটু উন্নত মানের খাবার অর্থাৎ মোঘলাই আদলের খাবারেই আছে। সাধারন বাংগালী খাবার মাছ মাংশের তরকারীতে এর প্রয়োগ দেখা যায় না। তাই ভাবলাম এর কামেল জিনিষ গুলি আইনা হাজির করি তাইলে যদি মাম্মালোগ এর উপকারীতা ও কার্য্যকারীতা বুঝতে পারে।

খাবারে এক চিমটি কালো গোল মরিচ শুধু ঘ্রাণ আর স্বাদই বাড়ায় না এর প্রয়োগে পরিপাকতন্ত্র’র কার্যকারীতা বৃদ্ধি (হজম) সর্দি কাশি দূরীকরণ, মেটাবলিজম বৃদ্ধি, ত্বক এর চিকিৎসা ও সর্বোপরী ওজন কমানো!! (এখন যদি মাম্মালোগের দৃষ্টি আকর্ষিত হয়!!) গোল মরিচ এ পাওয়া রাসায়নিক এর নাম পিপারিন piperine, যা আর ঝাল স্বাদ আর ঝাঁজের জন্য দায়ী। ইংরাজীতে গোল মরিচ রে পেপারকর্ন কয়, টেল্লিচেরী (এইটা আসলে একটা জাতের গোল মরিচের নাম) নামেও পরিচিত।

ওই একটা ছোট দানায় কি আছে! কি নাই!? ম্যাঙ্গানীজ, তামা, ম্যাগনেশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ফসরাস, আয়রন, পটাশিয়াম নামক খণিজ আর রিবোফ্ল্যাভিন, ভিটামিন সি, ভিটামিন কে, আর ভিটামিন বি৬, ডায়েটারী ফাইবার, কিঞ্চিত প্রোটিন আর কার্বোহাইড্রেটও আছে!

কালো গোলমরিচ এর একই সাথে মশালা আর ঔষধ হিসাবে প্রয়োগ আছে। আয়ুর্বেদিক ইউনানি, হার্বাল মেডিসিন, ন্যাচারোপ্যাথী নামের বিভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতিতে গোল মরিচে সম্যক ব্যবহার আছে। সাইনাস প্রদাহ দমনে, এ্যজমা, নাশারন্ধ্র বন্ধ হইয়া যাওয়া (ন্যাজাল কনজেশন) ছাড়াও চিকিৎসকরা বলেন এইটা ওয়েট লস (ওজন কমানো) ক্যান্সার, হার্ট ও লিভার এর রোগ নিয়ন্ত্রনে সাহায্যকারী ভূমিকা রাখে।

খাবারের সাথে নিয়মিত গোল মরিচ গ্রহনে পেটে হাইড্রোক্লোরিক এ্যাসিড (Hydrochloric Acid) ক্ষঃরণে সহায়ক হয়, তার মানেই খাবার হজমে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখে, কোষ্ঠকাঠিন্য, ডায়ারিয়া, কলিক Colic (পেট বেদনা) এড়াইতে খাবার হজম হওয়া জরুরী । গোল মরিচ পেটে গ্যাস হইতে বাধা দেয়। গোল মরিচ গ্রহনে শরীর জল বিয়োগ মানে ঘাম ও প্রস্রাব এ উদ্বুদ্ধ করে। ঘাম শরীর থাইকা টক্সিন বা বিষাক্ত পদার্থ বহিস্কারের একটা প্রাকৃতিক পদ্ধতি। খাবারে গোল মরিচ নিলে শরীর ঘামে তাতে কইরা তার সাথে টক্সিন নিয়া যায়, ত্বকের পোর (pore) বা রোমকুপ পরিস্কার করে, শরীরের অতিরিক্ত পানি দূর কইরা দেয়।

প্রস্রাবও শরীর তার নিজের আত্মরক্ষার একটা পদ্ধতি, প্রস্রাবের সাথে ইউরিক এ্যাসিড, ইউরিয়া, অতিরিক্ত পানি এবং চর্বি বাইর কইরা দেয়, হ্যা প্রস্রাবের ৪% ফ্যাট বা চর্বি!! ইন্টারেস্টিং হ্যা!!! তাই ভালো হজমী সিস্টেম, শরীরের জন্য উপকারী আর ডায়েট মাম্মালোগ ওজন কমাইতে চাইলে খাবারে গোল মরিচের ব্যবহার বাড়াও।

গোল মরিচের বহির্বারন শরীরের ফ্যাট সেল ভাংগতে সাহায্য করে। এছাড়াও গৃহীত খাবারের ফ্যাট ও ভাংগে তাই খাবারের অন্যান্য উপকারী উপাদান শরীর সহজে হজম করতে পারে। যদি তুমি সদ্য ভাঙ্গা গোল মরিচ খাও তাইলে ঘামতে শুরু করবা। তার মানেই শরীর ঘামের মাধ্যমে শরীরের অতিরিক্ত পানি ও টক্সিন দূর করতাছে। তবে খাবার ব্যাপারে সাবধান একবার খাবারের সাথে একচিমটি পরিমানই যথেষ্ট।

ভিটিলিগো Vitiligo বা স্বেতী রোগের চিকিৎসায় এর ব্যবহারে উপকার পাওয়া গেছে, স্বেতী বা ভিটিলিগো রোগে শরীর তার ত্বকের স্থানে স্থানে স্বাভাবিক রং হারায়। গোলমরিচের পিপারিন (Piperine) ত্বকের মেলানোসাইট পিগমেন্টেশন প্রস্তুতে সাহায্য করে।

পিপারিন এর ত্বকের উপরিভাগে প্রয়োগ তার সাথে আল্ট্রাভায়লেট রে চিকিৎসা অন্য কেমিক্যাল বেসড চিকিৎসার চাইতে নিরাপদ ও সস্তা। এটা অতিরিক্ত আল্ট্রাভায়োলেট রে বিকিরণ জনিত ক্যান্সারও প্রতিরোধ করে। স্ক্রাবার বা এক্সফ্যলিয়েট হিসাবে গোল মরিচের গুড়া একটা ন্যাচারাল পদ্ধতি! সরাসরি না একটা পেস্ট বানাও, মধু, দই আর গোল মরিচের গুড়া মিশাও তার পরে শরীরে লাগাইতে পার। এটা রক্ত চলাচলে সাহায্য করে তাতে ত্বকে বেশি পরিমানে অক্সিজেন সাপ্লাই হয় আর ত্বকে জেল্লা থাকে!

আয়ুর্বেদিক পদ্ধতিতে সর্দিকাশি চিকিৎসায় টনিকে গোলমরিচের ব্যবহার আছে, এটা সাইনুসাইটিস ও ন্যাজাল কনজেশন চিকিৎসায়ও ব্যবহার আছে। এতে থাকা এক্সপোট্যান্ট প্রপার্টিজ শরীরের মিউকাস , কফ নিঃস্ক্রমনে সাহয্য করে। এর জ্বালা ধরানো বিষয়টা হাঁচি আর কাশি রূপে শরীর থাইকা বাইর কইরা কইরা দেয়।

একচামচ মধুতে আধা চা চামচ ফ্রেশ গুড়া করা কালো গোল মরিচ মিশাইয়া খাও। নাক বন্ধ হওয়া সাইনাসের কেচাল থাইকা মুক্তি পাইতে একটা কেটলিতে পানি, ইউক্যালিপ্টাস ওয়েল, গোল মরিচের গুড়া মিশায়া তার বাস্প নাকে নিতে পার ( কেটলি মুখের সামনে টাওয়েল মাথার উপরে দিয়া তাবুর মত বানানো)।

গোলমরিচে থাকা এ্যান্টি ব্যাক্টেরিয়াল গুণ শরীরে প্রদাহ থাইকা বাঁচাইতে সহায়তা করে। নিয়মিত গ্রহনে আর্টারী বা শিরা উপশিরা পরিস্কার রাখতে সাহায্য করে যেমনটা করে ফাইবার, এইটা আর্টারীতে জমা কোলেস্টেরল সরাইয়া এথেইরোস্ক্লোরেসিস ( Atherosclerosis) যা হার্ট এ্যাটাক ও স্ট্রোকের প্রধান কারণ হিসাবে নির্ণীত।

গোলমরিচের এ্যান্টিঅক্সিডেন্ট গুণ শরীরের ফ্রি র‍্যাডিকেল (ক্যান্সারের কারণ) দ্বারা সাধিত ক্ষতি মেরামতে, কার্ডিওভাস্কুলার অসুখ, লিভার ডিজিজ নিরসনে সাহায্য করে। ফ্রি র‍্যাডিক্যাল (Free Radical) শরীর নিজে নিজে তৈরী করে এইটা কোষ বিভাজনের বা সেলুলার মেটাবলিজমের বাই প্রোডাক্ট। এইটা শরীরর ভালো কোষ গুলিরেই আক্রমণ করে, কোষ এর ডি এন এ (DNA) বদলায় আর মিউটেট কইরা তারে ক্যান্সারাস সেল বানাইয়া দেয়।

এ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এই অবস্থারে নিষ্ক্রিয় করে, যা ফল স্বরূপ ত্বক কোঁচকানো/ভাজ পড়া, বয়সের ছাপ, ম্যাক্যুলার ডিজেনারেশন, ও মেমরী লস জাতীয় রোগ থাইকা বাঁচাইতে সহ, কোষ এর ডি এন এ বদলায় আর মিউটেট কইরা তারে ক্যান্সারাস সেল বানাইয়া দেয়। এ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এই অবস্থারে নিষ্ক্রিয় করে, যা ফল স্বরূপ ত্বক কোঁচকানো/ভাঁজ পড়া, বয়সের ছাপ, ম্যাক্যুলার ডিজেনারেশন, ও মেমরী লস জাতীয় রোগ থাইকা বাঁচাইতে সহায়ক। আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকরা বলেন কাঁচা হলুদের সাথে এর মিশ্রন এর গুন দ্বিগুণ কইরা দেয়।

গোল মরিচ এর পিপারিন মস্তিস্কের কগনেটিভ ফাংশন (Cognitive Function) রে স্টিম্যুলেট করে যা আলযাইমার (Alzheimer) এর মত স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়া অসুখ প্রতিরোধ সহায়ক। আয়ুর্বেদ চিকিৎসকরা এর এ্যান্টি ইনফ্ল্যামাটেরী আর এ্যন্টি অক্সিডেন্ট গুনের জন্য গ্যাস্টরিক মিউকাসল ড্যামেজ ( Gastric Mucosal Damage) ও পেপ্টিক আলসার (Peptic Ulcer) রোগের চিকিৎসায় গোল মরিচ প্রেস্ক্রাইব করেন।

কিছু বিশেষজ্ঞ্য বলছেন গোল মরিচের পিপারিন
ডিপ্রেশন বা অবসাদ জনিত রোগের বেলাও কার্য্যকরী, কারন এইটা মস্তিস্ক স্টিম্যুলেট করে তাই তার ফাংশন ভালো হয়।

আস্ত অর্থাৎ না ভাঙ্গা গোল মরিচ অনির্দিষ্টকাল ভালো থাকে। আর ভাইংগা গুড়া করলে তা তিন মাসের মধ্যে খায়া ফেলা উচিত। বেস্ট রেজাল্ট চাও, প্রতিবার ভাইংগা নেও।

FavoriteLoadingপ্রিয় পোস্টের তালিকায় নিন।

About The Author

মন্তব্য করুন