মঙ্গলবার, জুলাই ১৭, ২০১৮

অটিজম

অটিজম

আজ আমার শ্যালিকার দেবর ফোন করেছিল। ওর মন টা খুব খারাপ। ৪ বছর আগে বউ নিয়ে কানাডায় এসেছে। পরের বছর ফুটফুটে এক ছেলে হল। সুখের সংসার। আমাদের চোখের সামনেই ছেলেটা বড় হচ্ছে। এই মে মাসে তিন বছর বয়স হবে। সব ঠিক ঠাক চলছে। কিন্ত ছেলেটা এখন কোন কথা বলে না। আমরা প্রায়ই বলতাম ডাক্তারের সাথে এই বিষয়ে কথা বলতে। ওরা বলতো আমার দেবর নিজেও চার বছর বয়সে কথা বলেছে। সুতরাং……।

অবশেষে তারা ডাক্তারের সাথে কথা বলেছে! মন খারাপ হওয়ার এইটাই কারন। ডাক্তার জানিয়েছে ওর বাচ্চাটা অটিস্টিক শিশু!

কল্পনা করুন, এমন একটা জগতে বাস করেন যা আপনি বোঝেন না আর দুনিয়াও আপনাকে বোঝে না। যারা অটিজমের রোগী তাদের ব্যাপারটা অনেকটা এমনই। তাদের দুনিয়া আর তাদের ঘিরে বাইরের দুনিয়ার মাঝখানে একটা উঁচু প্রাচীর রয়েছে। অটিজম এক্টি স্বাভাবিক বিকাশের পরিপন্থী অবস্থা, যা কিনা প্রতি দশ হাজারের মধ্যে ৫জনকে আক্রান্ত করে। এই রোগের লক্ষন গুলি বাচ্চাদের মধ্যে তাদের বয়স তিন বছর হবার আগেই দেখা যায়। আর তা মেয়েদের চাইতে ছেলের দুই থেকে চার গুন বেশি আক্রান্ত হয়।

যাদের অটিজম আছে তাদের মস্তিস্কে ‘কেমিক্যাল ইমব্যালেন্স’ র প্রমান পাওয়া গেছে, বেশী মাত্রায় সেরোটনিন পাওয়া গেছে। যদিও এটা কিভাবে অটিজমকে প্রভাবিত করে বোঝা যায় নি । কিছু সংখ্যক রোগীর ক্ষেত্রে জেনেটিক্সও অবদান রাখে। দেখা গেছে জমজ শিশুর ক্ষেত্রে যদি একজনের অটিজম থাকে তবে ৮৫% ক্ষেত্রে অন্যজনের বেলায় অটিজম দেখা যায়।

অটিজমের এর কারন কি তা এখনো জানা যায়নি। মোটামুটি ভাবে বলা যায়, এক ধরনের ‘স্নায়বিক অসংগতী’ যার কারনে মস্তিস্ক কাজ করে না। যার কারনে শিশুকাল থেকে বড় হওয়া পর্যন্ত বিভিন্ন স্বাভাবিক আচরনগত দক্ষতা গুলি এই শিশুদের আয়ত্ত করতে দেরী হয় বা সমস্যা হয়। উদাহরন স্বরুপ বলা যায় এই বাচ্চারা তার বয়সী অন্যান্য বাচ্চাদের মত কথা বলে না, খেলা করে না ইত্যাদি। স্কুলে তারা অন্যান্যদের থেকে পিছিয়ে পড়ে।

আপনার বাচ্চার অটিজম আছে কিনা (আল্লাহ সবাইকে সুস্থ রাখুন) জানার জন্য নীচের সিম্পটমগুলো দেখুন। এর সবগুলো লক্ষনই যে একজনের মধ্যে থাকবে তা নয় আর এগুলি অথবা এগুলির একটা থাকলেই অটিজম হয়েছে ভাবার কোন কারন নেই তবে একজন বিশেষজ্ঞর কাছে নিয়ে যাওয়া দাবী করে।
নানা সামাজিক ও বয়সানুযায়ী স্বাআভাবিক আচরন:
• নাম ধরে ডাকলে সাড়া না দেওয়া
• অন্য লোকের দিকে না তাকানো
• না হাসা (মনে রাখতে হবে সদ্যজাত শিশুও কয়েক সপ্তাহ হাসে না)
• নজর এড়ানো (চোখের দিকে না তাকানো)
• আদর পছন্দ না করা
• কল্পনা প্রসুত খেলায় অংশ গ্রহন না করা
• সামাজিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহন না করা
• বন্ধুত্ব অনাগ্রহী অক্ষমতা
• অপরিচিত লোক ভয় না করা(এটা প্রথম বছরেই শুরু হয়)
• পরিচিতলোক থেকে আলাদা হয়ে গেলেও চিন্তিত না হওয়া
• স্বাধীনচেতা, আত্মকেন্দ্রিক(কারো কাছে সাহায্য না চাওয়া)
• একা একা খেলা
• অন্য কাউকে খামাখাই আক্রমন করা
কথা বার্তা বা যোগাযোগে পশ্চাৎপর
• আলাপ চালিয়ে যাওয়ার অপারগতা
• কখনো কখনো কানে কম শোনে প্রতীয়মান হওয়া
• ভাষায় একঘেঁয়েমী
• একই শব্দের বহুল ব্যবহার
• অস্বাভাবিক,অপ্রাসংগিক শব্দের প্রয়োগ
• কথা না বলা, অনেক অটিস্টিক বাচ্চা বোবা অথবা প্রথম কিছুদিন শব্দ উচ্চারন করার পরে কথা বলা বা শব্দ উচ্চারন বন্ধ করে দেয়
• অনুকরন, তোতা পাখীর মত যা শোনে শুধু সেইগুলি উচ্চারন করে, (অনেক স্বাভাবিক বাচ্চাও এই আচরন করে)
• বিশেষন প্রয়োগে গোলমাল করে ফেলে যেমন আমি, তুমি, আমরা
আচরন
• অস্বাভাবিক অথবা খুব সীমিত কর্মকান্ডে অংশগ্রহন অথবা আগ্রহ
• পুনঃপুঃন আচরন, যেমন দুলতে থাকা, চুল মোচড়ানো
• কোন বিশেষ আচরনে (ধর্মীয় অথবা সামাজিক) জড়তা
• কোন বিশেষ বস্তুর উপর অতিরিক্ত মনযোগ
• বস্তুকে সারিবদ্ধ করে সাজানো
স্পর্সকাতর লক্ষন সমূহ
• অতিরিক্ত স্পর্শকাতরতা (স্বাদ, শব্দ)
• ব্যাথা অনূভুত না হওয়া
• অবি মাত্রায় সংবেদনশীল
• নিজ অংগচ্ছেদ (নিজ শরীরে ক্ষত তৈরী করা, কাটাছেঁড়া করা)
অটিজমের আগাম লক্ষন
• স্বাভাবিক বিকাশে ধীরগতি ( দেরীতে কথা বলা)
• শিশু সুলভ শব্দ উচ্চারন না করা প্রথম ১২ মাসে
• কোন দিকে না তাকানো প্রথম ১২ মাসে
• একক শব্দ যেমন মা বাবা উচ্চারন না করা ১৬ মাস
• দুই শব্দের বাক্য না উচ্চারন করা ২৪ মাস
• যে সমস্ত বাক্য বা ভাষা শিখে ফেলেছিল সেগুলি ভুলে যাওয়া
• রাগন্বিত হয়ে চিৎকার ও হাত পা ছোড়া
• অতিরিক্ত চঞ্চল

বিশেষ দক্ষতা, ক্ষমতা
সংগীত, অঙ্ক বা কোন শিল্প ক্ষেত্রে উৎকর্ষতা।
যে কোন এক ধরনের চিকিৎসা সব অটিস্টিক বাচ্চার জন্য প্রয়োগ করা সম্ভব নয়। কিন্তু সব ডাক্তার এ ব্যাপারে এক মত যে যত তাড়াতাড়ি চিকিৎসা শুরু করা যায় তত ভাল। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে এর চিকিৎসা থেরাপীর মাধ্যমে করা হয়। অবস্থাভেদে ডাক্তার ঔষধ ও দিয়ে থাকেন।

দেখা গেছে লম্বা সময় ধরে বিভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতীর সংমিশ্রেনে চিকিৎসায় ভাল ফল পাওয়া গেছে, নিবিড় পরিচর্যাই আসল এই রোগের ক্ষেত্রে। মা বাবা শিক্ষক, সাইকোলজিস্ট, স্পীচ প্যাথোলজিস্ট, মনোচিকিৎসক, অকুপেশনাল থেরাপিস্ট মিলিয়ে শিশুর চাহিদানুসারে এই পরিচর্যা টিম গঠন করতে হবে।

image_print
FavoriteLoadingপ্রিয় পোস্টের তালিকায় নিন।

About The Author

মন্তব্য করুন