শুক্রবার, ডিসেম্বর ৭, ২০১৮

বংশ রক্ষা ২

বংশ রক্ষা ২

শ্বাশুড়ীর এই দ্বৈত চরিত্রে মানসী অবাক হয়ে যায়। শফিক যখন বলল, মা একটু আস্তে বল। ভাবী একটা উচ্চ শিক্ষিত মেয়ে। আত্মসন্মানী। শুনতে পেলে কি হবে বুঝতে পারছ? তারস্বরে চিল্লিয়ে উঠল, “বউএর আবার উচ্চ শিক্ষিত কি, এম এ পাশ বি এ পাশ কি, জজ ব্যারিষ্ট্রার কি? বউ বউ-ই।” অথচ এই শ্বাশুড়ীই মানুষদের ধরে ধরে বলত, বুঝেছ লুবনার মা আমার বউ মা এম এ ফার্স্ট ক্লাশ ফার্স্ট। মন্ত্রনালয়ে কত বড় চাকুরী করে। যুগ পাল্টে গেছে। এখন ছেলে মেয়েতে কোন তফাত নেই”। সেই শ্বাশুড়ীর কাছে মানসী এখন তুচ্ছ তাচ্ছিল্যের মানুষ!!

আজকাল উঠতে বসতে মানসীকে সে মানসিক নির্যাতন করে। কারন একটাই। ছ’ বছর হয়ে গেল মানসীর কোন বাচ্চা কাচ্চা হোল না। অনেক চিকিৎসা করিয়েছে। দেশের নামকরা ডাক্তার, নামকরা ক্লিনিক নিরাময় ফার্টিলিটি সেন্টারেও গিয়েছে কয়েকবার। স্পষ্ট বলে দিয়েছে হবে না। মিজানের টেস্টিকুলার ফেইলিউর। কোনক্রমেই তার বায়োলজিক্যাল বাবা হবার সম্ভাবনা নেই। মিজানের মা সেটা শুনেও কিছুতেই মানতে রাজী নন। আপনজনের মৃত্যু সংবাদ শুনে সংবাদ বহনকারীকে চপেটাঘাত করতে যেমন অনেকেই দ্বিধাবোধ করে না, মিজানের মা মানসীর মুখে মিজানের এই অপারগতার কথা শুনে মানসীকে কথার চপেটাঘাত করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করেনি। মানসীর উপর তার নির্যাতন বেড়েই চলছে দেখে মিজান নিজে মাকে কত বুঝিয়ে বলেছে যে মানসীর কোন দোষ নেই। কে শোনে কার কথা।

বাবা ছাড়া এই জীবনটাকে চার ছেলে নিয়ে মা চালিয়ে এসেছে।হাইস্কুলের একজন সহকারী শিক্ষিকা জীবনযুদ্বে হেরে না গিয়ে ছেলেদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করেছে। মিজান ইঞ্জিনিয়র। মায়ের পছন্দেই মানসীকে বিয়ে করেছে। একটি নাতী দেখার জন্য সেই মানসীকেই এমন নির্যাতন করবে মিজান ভেবেই খুব লজ্জা ও কষ্ট পায়। কিন্তু মাকে ছোট ভাইদের কাছে রেখে আলাদা হয়ে যেতেও ওর বিবেকে বাঁধে। মানসীর কাছে হাতজোড় করে মায়ের এই আচরনের জন্য ক্ষমা চায়। মানসী অনুধাবন করে। তাই চুপচাপ মেনে নেয়।

মেঝভাই শফিক নিরাময় ক্লিনিকে যায় রোগী সেজে। নিজের অবস্থান বুঝতে চায়। ভাইয়ের মত তারও কোন জটিল সমস্যা আছে কিনা। নিশ্চিত হয় কোন সমস্যা নেই। জানতে পারে চিকিৎসার বিভিন্ন অপশন সম্পর্কে। হঠাৎ মনে হোল ভাবী ডোনার স্পার্ম দিয়ে চিকিৎসা করলেইতো পারে। মানসীকে বলতেই সে ভীষন রেগে গেল।

অপয়া মুখ পারলে না আমার বংশ রক্ষা করতে শুনতে শুনতে মানসী ক্লান্ত হয়ে গেছে। ভেবে ভেবে রাজী হয়ে গেল ডোনার স্পার্ম দিয়ে চিকিৎসা করতে। কিন্তু কার স্পার্ম নিবে? তা ছাড়া নিরাময় ক্লিনিক কোন ডোনার গ্যামিট নিয়ে কাজ করে না। শফিকের সাথে আলাপ করল। মিজানের সম্মতিক্রমে শফিককেই মানসী প্রস্তাব দেয় স্পার্ম ডোনেট করার জন্য। শফিক মনে মনে এটা অনেক আগে থেকেই চাচ্ছিল। কারন নিরীহ ভাবীটাকে মায়ের কথার শুলে জর্জরিত হতে দেখেছে নিয়ত। কিন্তু নিরাময় ক্লিনিকের ডা. রোখসানার মানসীকে ভালভাবেই মনে আছে। শফিককে নিয়ে গেলে সেতো বুঝে ফেলবে। তাই দ্বিতীয় বিয়ের স্বামী পরিচয়েই সেখানে গেল।

পি এইচ ডি করতে তিনমাসের মধ্যেই দেশের বাইরে চলে যাবে বলে শফিক তাড়াতাড়ি কোন চিকিৎসা ব্যবস্থা আছে কিনা তাই চায়। শফিক আগেই চিকিৎসার ধাপ সম্পর্কে জানত বলে এই বুদ্বি আটে। ডা. রোখসানা আই ইউ আই করে দেয়।

প্রথম চেষ্টাতেই প্রেগন্যান্সি। শ্বাশুড়ী বউ এর পরিবর্তন লক্ষ্য করে। ছেলের কাছে জানতে পায় মানসীর প্রেগন্যান্সির কথা। মানসীকে ডেকে আবার কথার ঝাঁটা। খুবতো বলতে আমার ছেলের দোষ। তখনইতো বলতাম যদি আমার ছেলের দোষই হবে তাহলে রোজ ভোরে এত চুল শুকানো কেন? আমার ছেলেটাও হয়েছে। বউকে বাঁচাতে নিজের ঘাড়ে দোষ নিয়েছে।

মানসী মন থেকে এই ডোনারিজম নিতে পারেনি। তাই দু’ চোখ গড়িয়ে কান্নার জলে ভেসে শ্বাশুড়ীকে বলল, “মা আপনি কখনও আমার বুকে মাতৃত্ত্বের হাহাকার শুনতে পাননি, আপনার ছেলের সমস্যা জেনেও আপনি আমাকে স্বান্তনা না দিয়ে উল্টো কথা শুনিয়েছেন। আপনি একজন মা হয়েও বুঝতে চাননি মা না হবার কষ্ট কি!”

আমার ছেলের দোষ এই মিথ্যে বলে বলে আজও মিথ্যে!! না মা মিথ্যে বলিনি। আপনি না বংশ রক্ষা করতে চেয়েছেন। আপনার এক ছেলের সমস্যা থাকতে পারে, সবারতো আর সমস্যা নেই। তাই বংশ রক্ষা করলাম।

image_print
FavoriteLoadingপ্রিয় পোস্টের তালিকায় নিন।

About The Author

মন্তব্য করুন