শনিবার, অক্টোবর ২০, ২০১৮

অভিশাপ

অভিশাপ

ছোট বউ প্রেগন্যান্ট। ওমা বলে কি!!! ছোট বউ প্রেগন্যান্ট হোল কি করে!! বাড়ীর সবার মধ্যে কানাঘুষা আর গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। তিন বউ এর মধ্যে সব চেয়ে ছোট রাবেয়া। সুন্দরী, সদাহাস্যময়ী, চঞ্চল রাবেয়া বাড়ীতে সবার কাছেই খুব আদরের। বিশেষ করে শ্বশুর শ্বাশুরীর কাছে আদরের ছোট ছেলের বউ হিসেবে তার আদরের সীমা নেই। সেই শ্বাশুরীও রাবেয়াকে দেখে মুখ ঘুরিয়ে নিল। খুব কড়া কন্ঠে ছেলেকে বলে দিল একটা বিহিত করতে। ওর মত নষ্ট মেয়েকে সে আর এ বাড়ীতে দেখতে চায় না। রায়হান কোন কিছুই মিলাতে পারে না। কি করে সম্ভব! রাবেয়ার মত মেয়ে কিছুতেই খারাপ কিছু করতে পারে না এই বিশ্বাসের সাথে বাস্তবতার সংঘর্ষে রায়হানের মাথা ঘুরতে থাকে।

আলীম সাহেবের তিন ছেলে দুই মেয়ে। দুই মেয়েরই বিয়ে হয়ে গেছে। তাদের বাচ্চা কাচ্চাও হয়েছে। কিন্তু তিন ছেলের কারুরই কোন বাচ্চা নেই। শহরে গিয়ে ছেলেদের পরীক্ষা করিয়েছেন। তিনজনার বেলাতেই ডাক্তার একই কথা বলেছেন। বাচ্চা হওয়া সম্ভব নয়। গ্রামের রক্ষনশীল পরিবার। কেন তিন ছেলের কারুরই বাচ্চা হচ্ছে না, তিনজনার বেলাতেই বউদের সমস্যা না হবারই কথা। ছেলেদের নিয়ে গেলেন মাজার শরীফে। খাদেম স্পষ্ট বলে দিল যে পরিবারের প্রতি কোন অভিশাপের ফল, এই বংশের আর বংশ বৃদ্বি হবে না।

সময় অনেক গড়িয়ে গেছে। বউদেরও বয়স হয়ে গেছে। প্রাকৃতিক নিয়মেই বড় দুই বউ এর বাচ্চা হবার সম্ভাবনা শেষ। রাবেয়া এই ৩৮ বছর বয়সে কেমন করে প্রেগন্যান্ট হয়ে গেল নিজেরও বোধে আসে না। প্রেগন্যান্টইতো। শুধু যে মাসিক বন্ধ তাতো নয়। প্রচন্ড বমি বমি ভাবতো আছেই। কাজের ছেলেটাকে দিয়ে শহরের দোকান থেকে প্রেগন্যান্সি টেস্টের কিট আনায়।তাতেও প্রেগন্যান্সি পজিটিভ। রাবেয়ার দৃঢ় বিশ্বাস ঐসব অভিশাপ টভিশাপ কিচ্ছু না। আর ডাক্তারের ডায়াগোনোসিস ওতো ভুল হতে পারে। রায়হানকে কনভিন্স করার চেষ্টা করে। বোঝাতে চায় আল্লাহ্‌ যদি অভিশাপের জন্য বাচ্চা না দিয়ে থাকে আশির্বাদেতো দিতেও পারে। বিবি মরিয়মের হয়েছেনা?

রায়হান বিশ্বাস অবিশ্বাসের সংকটে সাত পাঁচ ভাবতে থাকে। বাসায় ১৮-২০ বছরের কাজের ছেলেটা ছাড়া আর কোন লোকের সংস্পর্শের সম্ভাবনা নেই। ভাবতেই অস্থির লাগে। রাবেয়ার কোন যুক্তিকেই বাবা মার কাছে দাড় করাতে সক্ষম হবেনা জেনে বাবা মা এবং পরিবারের সন্মান বাঁচাতে রাবেয়াকে বাবার বাড়ী পাঠিয়ে দেয়।

রাবেয়ার বাবা মা শহরে গিয়ে এই বাচ্চা নষ্ট করার কথা বলে। রাবেয়া রাজী হয়না। বাবা মা আশ্রয় না দিলে এই অবস্থায় কোথাও চলে যাবে বলে জানায়। বাধ্য হয়ে বাবা মা মেয়ের কথা মেনে নেয়।সময়ের সাথে সাথে রাবেয়ার শরীর খারাপ হতে থাকে। মাথা ব্যথা হতে থাকে। পেট যত বাড়ার কথা বাড়ে না। বমি কমে যাবার কথা হলেও বমি বাড়তে থাকে। কাশি এবং কাশির সাথে একটু রক্তও বের হতে দেখে। পাড়া প্রতিবেশীর জোড়াজোড়িতে রাবেয়াকে নিয়ে ওর বাবা মা শহরের ডাক্তারের কাছে গেল।

আল্ট্রাসনো করে কোন বাচ্চা পাওয়া গেল না। পাওয়া গেল ওভারীতে টিউমার। ডাক্তার বিভিন্ন পরীক্ষা নিরিক্ষার পরে জানাল কোরিওকারসিনোমা (ক্যান্সার) অব ওভারী। ব্লাডে বিটা এইচ সি জি লেভেল অনেক বেশী। ননজেস্টেশনাল বা জার্ম সেল টিউমার। যা অত্যন্ত বিরল। ছড়িয়ে গেছে ব্রেইনে, ফুসফুসে, লিভারে। কোরিওকারসিনোমা অত্যন্ত কেমো সেনসিটিভ ক্যানসার যার নিরাময় খুব ভাল। কিন্তু ননজেস্টেশনাল কোরিওকারসিনোমার ফলাফল তুলনামূলক ভাল নয়।

চিকিৎসা হোল। দুই ওভারী এবং জরায়ু অপারেশন করে ফেলে দিয়ে মাল্টিএজেন্ট কেমোথেরাপি শুরু হয়ে গেল। রাবেয়ার বাবা মা বার বার রায়হানকে খবর দিতে চাইল। টাকা পয়সাতেও কুলাতে পারছিল না। অভিমানী রাবেয়া কিছুতেই খবর জানাতে রাজী হোল না। রাবেয়া কেমো দিতে গিয়ে নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছিল। কেমো বন্ধ করা হোল। আবার চালু করা হোক। কিন্তু ওর শরীর কেমোর ধকল আর সহ্য করতে পারছিল না। একদিন সবছেড়ে অভিশপ্ত রাবেয়া তার আত্মবিশ্বাস, তার আত্মমর্যাদায় উঁচু মাথা নিয়ে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করল।
.
.
.
এ খবর শুনে রায়হানের পরিবারের কি প্রতিক্রিয়া ছিল জানা নেই।

image_print
FavoriteLoadingপ্রিয় পোস্টের তালিকায় নিন।

About The Author

মন্তব্য করুন