বুধবার, আগস্ট ১৫, ২০১৮

আবিস্কারের মিথ্যা দাবি; বাংলাদেশী দুই চিকিৎসকের

আবিস্কারের মিথ্যা দাবি; বাংলাদেশী দুই চিকিৎসকের

বাণিজ্যিক লালসা না বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা

১৬ই এপ্রিল ২০১৬ বাঙলা ট্রিবিউন “হেপাটাইটিস বি-এর চিকিৎসায় দুই বাংলাদেশি চিকিৎসকের সাফল্য” শিরোনামে একটি সংবাদ ছাপে। সেখানে বলা হয়,

“হেপাটাইটিস বি-এর চিকিৎসায় ‘ন্যাসভ্যাক’ নামে নতুন ওষুধের সফল ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সম্পন্ন করেছেন বাংলাদেশি দুই চিকিৎসা বিজ্ঞানী ডা. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল) ও ডা. শেখ মোহাম্মদ ফজলে আকবর। এরই মধ্যে কিউবাতে শুরু হয়েছে তাদের উদ্ভাবিত নতুন এই ওষুধ।”

১৭ই সেপ্টেম্বর ২০১৬ যুগান্তর ছাপে আরেকটা নিউজ “হেপাটাইটিস বি’তে কারও মৃত্যু হবে না;বাংলাদেশী দুই বিজ্ঞানীর বিস্ময়কর সাফল্য।

সেখানে লেখা হয়;

“সম্পূর্ণ নতুন এক ওষুধ আবিষ্কারের মাধ্যমে ‘হেপাটাইটিস বি’ চিকিৎসায় বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করেছেন বাংলাদেশের দুই চিকিৎসা বিজ্ঞানী। স্বীকৃতি মিলেছে যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনসহ (এফডিএ) একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান থেকে। এ আবিষ্কারের ফলে ‘হেপাটাইটিস বি’র কারণে আর কাউকে মৃত্যুবরণ করতে হবে না বলে জানিয়েছেন ওই দুই চিকিৎসা বিজ্ঞানী।
যাদের হাত ধরে এ বিস্ময়কর অর্জন তারা হলেন- জাপান প্রবাসী বাংলাদেশী লিভার বিশেষজ্ঞ ডা. শেখ মোহাম্মদ ফজলে আকবর এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) হেপাটোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল)। এ দুই চিকিৎসা বিজ্ঞানী ৭৫ জন রোগীকে ১০ বার তাদের গবেষণালব্ধ ফর্মুলা ‘ন্যাসভ্যাক’ প্রয়োগ করে প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতির চেয়ে অধিকতর উন্নতি দেখতে পান।”

ইংরেজি ব্লগেও লেখা হয়েছে;

“NASVAC” (Novel Nasal Vaccine for Hepatitis B or NASVAC). The first New Drug Molecule invented by Bangladeshi doctors”

গত ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ প্রথমআলো “বাংলাদেশি বিজ্ঞানীর সাফল্য হেপাটাইটিস-বি চিকিৎসায় নতুন ওষুধ ” শিরোনামে একটি সংবাদ ছাপে।
সংবাদে বলা হয়;

শেখ মোহাম্মদ ফজলে আকবর গত ২৬ জানুয়ারি প্রথম আলোকে জানান ‘ হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে ওষুধ তৈরির পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করি জাপানে,১৯৮৭ সালে। উদ্ভাবিত ওষুধের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয় জাপান ও কিউবাতে ইঁদুরে ওপর। আমার কনসেপ্ট বা ধারণা এ রকম ছিল যে শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে দিতে হবে, যেন ভাইরাস নির্মূল হয়, আর নির্মূল না হলেও যেন নিয়ন্ত্রণে থাকে। এ ক্ষেত্রে ন্যাসভ্যাক সফল প্রমাণিত হয়েছে।

 

খুব স্পষ্ট করে সব জায়গায় বলা হয়েছে,  এই দুই বাংলাদেশী চিকিৎসক এই ওষুধ তারা  নিজেরা উদ্ভাবন করেছেন। শুনে আমার মনে ভরে উঠলো। আরো কিছু জানার জন্য সার্চ দিয়ে তো চক্ষু চড়কগাছ। এই ওষুধটা আসলে উদ্ভাবন করেছে কিউবান সেন্টার ফর জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড বায়োটেকনোলজি। ২০১৫ সালের ১১ই আগস্ট  কিউবান সরকারের মুখপাত্র, বিশ্বখ্যাত বিপ্লবী পত্রিকা গ্রানমা জানাচ্ছে;

“A Cuban medication to treat chronic hepatitis B, HeberNasvac, created by scientists at the Genetic Engineering and Biotechnology Center (CIGB), is currently undergoing clinical trials in collaboration with the French company Abivax.”

এটা কিউবান আবিষ্কার, কোনমতেই বাংলাদেশের নয়। গ্রানমাই জানাচ্ছে, এই ওষুধ আবিস্কারের জন্য যে সমস্ত কিউবানরা যুক্ত ছিলো তাঁরা কিউবান সরকারের একাডেমী অব সাইন্সের বার্ষিক পুরস্কার পেয়েছে। তাঁরা আরো জানাচ্ছে, এই ওষুধ নিয়ে তাঁরা দ্রুতই ফেইজ থ্রি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু করতে যাচ্ছে। সেখানেই যা লেখা আছে  তা হচ্ছে সেন্টার ফর জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড বায়োটেকনোলজি, জাপানের University of Ehim, বাংলাদেশের লিভার ফাউন্ডেশন ও লিভার রিসার্চ সোসাইটি, ফ্রান্সের পাস্তুর ইন্সটিটিউট, ভেনেজুয়েলান ইন্সটিটিউট অব সাইন্টিফিক রিসার্চ, জার্মানির হ্যানোভার ইউনিভার্সিটির সাথে কোলাবোরেশনে এই ভ্যক্সিনের উপরে ২০ টির অধিক রিসার্চ পেপার প্রকাশ করেছে। এই দুই বাংলাদেশী চিকিৎসক শুধু ফেইজ থ্রি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল করেছেন বাংলাদেশী রোগীদের উপরে, কোন ক্রমেই তারা ওষুধটার উদ্ভাবক বা আবিষ্কারক নন। এই ফিল্ডে কাজ করেন বলে তারা আগে ভাগে তথ্যটি পেয়েছেন ও ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে যুক্ত হয়েছেন।

কিউবান সরকার ২০১৬ সালে এই ভ্যাক্সিন তাঁদের বাজারে ব্যবহারের অনুমোদন দেয়। ১৯৯৮ সালে কিউবানেরা এই ভাক্সিনের পেটেন্ট করে। পেটেন্ট নাম্বার CU98/Dec.PCT/CU/99/00006
কিউবান সেন্টার ফর জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড বায়োটেকনোলজির একটি সাইটিফিক ব্রশিয়ার
তবে কেন বাংলাদেশী এই চিকিৎসকদ্বয় নিজেদের এই ওষুধের আবিস্কর্তা বলে দাবী করছে? এর কারণ পুরোটাই বানিজ্যিক। কিউবান সেন্টার ফর জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড বায়োটেকনোলজির সাথে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল করার সুবাদে এই দুই বাংলাদেশী চিকিৎসকের একটা সম্পর্ক তৈরি হয়। এই সম্পর্ককে বানিজ্যে রূপান্তরের লক্ষ্য থেকে তারা বাংলাদেশে এই ওষুধ বাজারজাত করার জন্য এদেশের বিকন ফার্মাসিউটিক্যালসের সাথে কিউবান ইন্সটিটিউটের একটি সমঝোতা তৈরি করে দেন বলে মনে হয়।

বাংলাদেশের প্রচলিত ওষুধ নিয়ন্ত্রণ আইন ও ড্রাগ পলিসিতে কোন ওষুধ যদি আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, জাপান বা জার্মানিতে নিবন্ধিত না হয় তাহলে তা বাংলাদেশে বাজারজাত করা যায়না। কিন্তু বাংলাদেশী আবিষ্কার হলে তখন কী হবে? যেহেতু এইধরনের কোন পরিস্থিতি কখনো সৃষ্টি হয়নি তাই বিশেষ বিবেচনায় ওষুধ প্রশাসন যেন এই ওষুধের নিবন্ধন দেয়, সেকারণেই এই বাংলাদেশী চিকিৎসকদ্বয়ের আবিস্কারের কাহিনী ফাঁদা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য হাসিলের জন্য এই প্রচারণা চালানো হয়েছে বেশ কিছুদিন ধরে।

আমি ওষুধ প্রশাসনের কয়েকজন অফিসারের সাথে কথা বলেছি তাঁদের সকলেরই ধারণা এই ওষুধটি বাংলাদেশী আবিষ্কার। তাহলে কল্পনা করে নিতে হবে, দুই বাংলাদেশী চিকিৎসক যাদের ওষুধ উদ্ভাবনের কোন দক্ষতা নেই তারা তাঁদের প্রাত্যহিক রোগী দেখার ফাঁকে ফাঁকে  তাদের  গোপন কোন ল্যাবে এই ওষুধ উদ্ভাবন করে ফেলেছেন। কেয়া বাত!!

এই ওষুধ বিকন ফার্মাসিউটিক্যালসের নামে বাংলাদেশে নিবন্ধনের জন্য জমা দেয়া হয়েছে। মিথ্যা উদ্ভাবনের ভাওতা দিয়ে বের করা নিবন্ধনের সুবিধা নিয়ে চালানো হবে একচেটিয়া ব্যবসা, যেহেতু বাংলাদেশে অনেকে হেপাটাইটিস বি রোগে ভোগেন।

যা আমরা আবিষ্কার করিনি তাকে নিজের আবিষ্কার বলে দাবী করা বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা। এই HEBERNASVAC উদ্ভাবন বা আবিষ্কারের গৌরব বাংলাদেশের নয়। বাংলাদেশী দুই চিকিৎসকেরও নয়। এই গৌরব কিউবান বিজ্ঞানী ও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের, আমরা এই আবিষ্কারের জন্য সমাজতান্ত্রিক কিউবাকে অভিনন্দন জানাই। একইসাথে আমরা বিচলিত বোধ করি যখন পুজিবাদী বাংলাদেশের অর্থলোভী কেউ এটা চুরি করতে উদ্যত হয়, বাণিজ্যের লালসায় অসাধু অন্ধকারে ঝাঁপ দেয়।

তাহলে এই ওষুধের ব্যবহারের সুবিধা বাংলাদেশের রোগীরা কি পাবেনা? নিশ্চয়ই পাবে। এই ওষুধ কিউবা থেকে নিয়ে আসার জন্য কোন বাধা নাই, এটা বলে ওষুধ প্রশাসন একটি প্রজ্ঞাপন জারি করলেই কাজ হয়ে যাবে। বাংলাদেশে অনেক মানুষ আছে, প্রতিষ্ঠান আছে যারা বাংলাদেশে হেপাটাইটিস-বি রোগীদের জন্য এটা আমদানী করবে বিনা বাধায়।

আর যদি এই ওষুধটা বাংলাদেশের এই চিকিৎসকদ্বয়ের আবিষ্কার হয়, তাহলে সরকারী ওষুধ কোম্পানী EDCL এ তারা ফর্মুলা দিয়ে দিক, সরকার EDCL এর মাধ্যমে এই মহৌষধ শুধু উৎপাদনই নয় সারা বিশ্বে এর পেটেন্ট এপ্লিকেশন করবে।

image_print
FavoriteLoadingপ্রিয় পোস্টের তালিকায় নিন।

About The Author

মন্তব্য করুন