বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ১২, ২০১৯

স্বেতীরোগ/ভিটিলিগো

স্বেতীরোগ/ভিটিলিগো

image_pdfimage_print

হায় হায় তোমারতো স্বেতী হইছে! এল্লা কি উপায়?

নাহ, স্বেতী ক্যান্সার অথবা ছোয়াঁচে না! ইংরাজীতে ভিটিলিগো (Vitiligo) কয় এই অবস্থা রে, এতে শরীরের স্বাভাবিক রং হারায়, এই স্বাবভাবিক রং রে পিগমেন্ট (Pigment) বা মেলানিন (Melanin) য় যার পিছনে ‘মেলানসাইটিস’ Melanocytes নামের এক ধরনের কোষের অবদান ।

যাদের এই ভিটিলিগো হয় তাদের বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই ত্বকের স্বভাবিক রং এর কোষ গুলি মশৃণ সাদা ইরেগুলার বর্ডার বা অসমান প্রান্ত সহ ছোপ ছোপ দাগ দেখা যায়। এই বিবর্ন ছোপ ছোপ দাগ শরীরের যেকোন একজায়গায় অথবা ৫০ ভাগ পর্যন্ত হইতে পারে।

এই দাগ গুলি প্রধানতঃ শরীরের যেই অংশ গুলি সূর্যের আলো লাগে সেইখানেই দেখা যায়, যেমন হাত, চেহারা, বাহু ও পাতের পাতা তবে শরীরের নিম্নাঞ্চলে / যৌনাংগেও দেখা যাইতে পারে। আক্রান্ত রোগীর গড় বয়স দেখা গেছে ২১ বছরের নিচে। আর এইটা সারাজীবনই থাকে সারতে চায় না।

ভিটিলিগোর চিকিৎসা আছে কিন্তু নিরাময় নাই। এইটা একটা সারাজীবন নিয়ন্ত্রন করার ব্যবস্থা করতে হয়। এইটা ছোঁয়াচে না, এর কোন ব্যথা বেদনা নাই, এটা প্রাণঘাতী কিছু না, ছেলে আর মেয়ে সাদা আর কালো যে কারো হইতে পারে। এই বর্ণহীনতা রে ইংরাজীতে ‘ডিজপিগ্মেন্টেশন’ বলে যাদের ত্বকের রং গাঢ় তাদের টাই চোখে পরে।

ইংল্যান্ডের National Institute of Arthritis and Musculoskeletal and skin Diseases (NAIMS) এর মতে “ভিটিলিগো মূল কারণ এখনো জানা যায় নাই”। বিশেষজ্ঞ্যরা মনে করেন এইটা একটা ‘অটোইম্যুউন ডিজিজ’। তার মানে নিজ শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিজ শরীরের কোষ গুলিরেই আক্রমণ করে, এই ক্ষেত্রে তা আক্রমন করে শরীরের মেলাওসিটিস কোষ গুলিরে তাই তা স্বাভাবিক রং হারায়।

এইটা ছোঁয়াচে না হইলেও বংশানুক্রমিক, দেখা গেছে প্রায় ৩০% রোগীর পরিবারের কারো না কারো এই ভিটিলিগো ছিল। ভিটিলিগো বা স্বেতী র সাথে এ্যালোপিসিয়া এ্যরিয়াটা (Alopecia Areata) , হাইপারথায়রোডিজম (Hyperthyroidism) , এ্যাডিসন’স ডিজিজ (Addison’s Disease) অ জেনেটিক অসুস্থতা পেরনিসিওয়াস এ্যানেমিয়া (Pernicious Anemia) র ভুগে যোগসূত্র দেখা গেছে।

এই রোগের লক্ষন সমূহের প্রধান ত্বকের স্থানে স্থানে তার স্বাভাবিক রং হারায়, ফোকাল প্যাটার্নেঃ অল্প কিছু অংশে ত্বক তার রং হারায়।

সেগমেন্টাল প্যাটার্নেঃ শরীরে একপাশে ডিপিগ্মেন্টেশন হয়।

আর জেনারালাইজড প্যাটার্নে শরীরে দুই পাশের একই অংগে এই মেলানিন হারায় আর তার মিলও থাকে প্যাটার্নে। এইটাই বেশী দেখা যায়। চেহারা, বাহু বগলতলা, পা হাত পায়ের পাতা ঠোট ও কুচকি( যৌনাংগ সহ) আক্রান্ত হইতে পারে, মুখের তালুতে , মাথায় চাঁদিতে, কিছু চুল সহ, ভ্রূ চোখের পাঁপড়িতেও এর আক্রমন দেখা গেছে।

ডাক্তার মাম্মার কাছে গেলে পারিবারিক ইতিহাস, আর তোমার ত্বক পরীক্ষা কইরা নিশ্চিত হইবার আগে তোমার রক্তে ভিটামিন বি১২ ও থায়রয়েড ফাংশন পরীক্ষা কইরা দেখতে পারেন। দেখা গেছে ওভারএ্যাক্টিভ থায়রয়েড আর রক্তে ভিটামিন বি১২ শুন্যতা ভিটিলিগোর কারন হইছে।

পুরা ঝামেলার মইধ্যে সুখের ব্যাপারটা হইল এইটা প্রাণঘাতী রোগ না, এর কোন শাররীক ব্যাথা বেদনা নাই। হ্যা মানসিক দুঃচিন্তার যথেস্ট কারণ হয়। ভিটিলিগো চিকিৎসার উদ্দেশ্য হইল মেলানিন হারানো ত্বকে তার স্বাভাবিক রং ফিরায়ে আনা, লম্বা সময় ধইরা চলে এর চিকিৎসা, চিকিৎসার ফল দেখতে কয়েক মাসও লাইগা যাইতে পারে।

কয়েকটা চিকিৎসা পদ্ধতি আছে। মনে রাখতে হইব আমি কাউরে প্রেস্ক্রিপশন দিতাছি না, আমি ডাক্তার না আমার যোগ্যতা নাই। আমি শুধু প্রচলিত পদ্ধতির আলাপ করতাছি।

স্টেরয়েড (Steroids) – ত্বকে লাগানোর স্টেরয়েড সমৃদ্ধ ক্রীম ত্বকে তার  স্বাভাবিক পিগমেন্টেশন ফিরায়া আনতে ব্যবহার হয়, শিশু ও পূর্নবয়স্করা সবাই এটা ব্যবহার করতে পারে। প্রতিদিন নিয়মিত প্রেস্ক্রিপশনানুযায়ী মলম লাগাইতে হয় মাস তিনেক একটানা। স্টেরয়েড ক্রীমের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে, এইটা চামড়া পাতলা কইরা দেয় ও ত্বকে বিভিন্ন রংএর দাগ ফালাইয়া দিতে পারে।

ইম্যিউনোমডুলেটরস (Immunomodulators) – ভিটিলিগো চিকিৎসায় এই ইম্যিউনোমডুলেটরস ও ব্যবহার হয়, এতে ট্যাক্রোলিমুস (Tracolimus) অথবা পিমেক্রলিমুস (Pimecrolimus) নামে অষুধ থাকে, বিখ্যাত মেয়ো ক্লিনিকের (Mayo Clinic) মতে যাদের চেহারা আর ঘাড়ে অল্প জায়গায় ভিটিলিগো আছে তারা উপকৃত হয়।

অতিবেগুনী রশ্মি ( Ultra Violet Ray) – কোন কোন রোগীর ক্ষেত্রে আল্ট্রাভায়লেট রে প্রয়োগে উপকার পাওয়া গেছে, বেশীভাগ ক্ষেতেই রোগীকে আরে সোরালেন (Psoralen) নামের একটা অষুধ খাইতে দেওয়া হয় যা ত্বকরে আরো বেশী আলোর প্রতি স্পর্শকাতর কইরা তোলে।

সোরালেন মলম অথবা ট্যবলেট আকারে পাওয়া যায়, সোরালেন আর ইউভিএ বা আল্ট্রা ভায়োলেট রে র সন্মিলিত চিকিৎসাতে পিইউভিএ (PUVA) কয়, এইটা চামড়ার স্বাভাবিক রং ফিরাইয়া দেয়, ডাক্তারের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে সপ্তাহে কয়েকবারই নেওয়া যায় এই চিকিৎসা, তবে যেহেতু সোরালেন ত্বকের স্পর্শকাতরতা বাড়ায়া দেয় তাই রোদে যাওয়া যাইব না, আর আক্রান্ত জায়গা ছাড়া বাকী অংগ সান স্ক্রীন দিয়া ঢাইকা নেওয়া উচিত।

ডিপিগমেন্টেশনঃ যদি শরীরে অর্ধেকের বেশী অংশে দেখা যায়, ও উপরের চিকিৎসা ব্যর্থ হয় তাইলে এইটা করা যাইতে পারে। মানে বাঁইচা যাওয়া অংশের রংও বদলাইয়া ফেলা, মনোবেনজোণ (Monobenzone) নামের একটা অষুধ লাগানো হয় যা শরীরে রং হালকা কইরা দেয়। এই অষুধ রোগীর গায়ে লাগানোর পরে কমপক্ষে দুই ঘন্টা রোগীর সংস্পর্শে না আসাই ভালো নইলে তোমার গায়ে মনো বেনজোন লাইগ্যা গেলে তোমার চামড়ার রং ও ব্লিচ হইয়া যাইব।

সার্জারীঃ হইতাছে শেষ চিকিৎসা, যদি উপরের কোনটাই কোন কামে না দেয় তাইলে নিজ শরীরের অন্য স্বাভাবিক অংশের চামড়া আইনা আক্রান্ত স্থানে লাগানো হয়। সমস্যা বেশী, যেমন ত্বকে দাগ থাইকা যায়, অত্যন্ত ব্যায় বহুল আর কষ্ট সাধ্যতো বটেই।

আগেই কইছি এই রোগ শাররীক ব্যাথা বেদনার চাইতে মানসিক বেদনার কারণ। সবাই সন্দেহের চোখে দেখে, না জানি কি হইছে, আর রোগী সবসময় তারে আর সবার মত দেখায় না এই হীণমন্যতায় ভোগে। এই রোগ ছোঁয়াচে না তাই শংকিত হবার কিছু নাই। অবশ্যই অভিজ্ঞ্য ডাক্তার মাম্মা (ডার্মাটোলজিস্ট/চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ্য) র কাছে যাইতে হইব, আর আশে পাশের মানুষ আত্মীয় স্বজন বন্ধুবান্ধব রোগী মনোবল বাড়াইতে ঠিক রাখতে সাহায্য করতে পার।

এই লেখাতে ব্যবহৃত ছবির মেয়ে টার নাম উইনি হারলো, সে একজন প্রতিষ্ঠিত সুপার মডেল! সে তা

র ভিটিলিগো নিয়া গৃহবন্ধী হয় নাই। এমন আরো বিখ্যাত ব্যাক্তিত্ব সমাজে বর্তমান যাদের কাছে এই কসমেটিক সমস্যা কোন সমস্যাই না। তারা জীবনে আগে বাইড়া গেছে, প্রয়াত মাইকেল জ্যাকশন এর ভিটিলিগো ছিল কিন্তু তাকে এই সমস্যা গ্রাস করছিল যার জন্য সে ডিপিগমেন্টশন কইরা শরীরের দৃশ্যমান অংশের চামড়ার রং বদলাইছিল। আরেকজন সফল মিডিয়া ব্যাক্তিত্ব আছেন রিচার্ড হ্যমন্ড, বিবিসির ‘টপ গিয়ার’ খ্যাত তাদের শাররীক সমস্যা তাদের সাফল্যের প্রতিবন্ধকতা তৈরী করে নাই।

 

 

 

*** সংবিধিবদ্ধ সতর্কবানীঃ আমি ডাক্তার না, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞ্যতা আর ইন্টারনেট আমার ভরসা, আমার উদ্দেশ্য সচেতনতা তৈরী করা। আউলা কিছু কইয়া থাকি তাইলে ডাক্তার মাম্মালোগ একটা ধমক দিয়া শুধরাইয়া দিও।**

সুত্রঃ www. aad.org
www.mayoclinic.com
www.healthline.com

NAIMS.
George Krucik, MD. MBA

ছবিঃ গুগল

 

FavoriteLoadingপ্রিয় পোস্টের তালিকায় নিন।

About The Author

মন্তব্য করুন