বুধবার, জুন ১৯, ২০১৯

ঢাকা মেডিকেলে সোয়া মাস -৪

ঢাকা মেডিকেলে সোয়া মাস -৪

হাসপাতাল হলো খাঁটি একটা অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ জায়গা, যেখানে সবাই কৃত্রিমতা ঝেড়ে একেবারে ঈশ্বরের মানুষ হয়ে ওঠে।

পাশের রোগীটি হিন্দু না মুসলিম এ নিয়ে কারো কোনো কথা নেই, একে-অপরকে সাহায্য করছে; যে ডাক্তার-নার্স-ওয়ার্ডবয়রা সেবা দিচ্ছে সে হিন্দু না মুসলমান, নারী না পুরুষ তা নিয়ে কারো ভাবনা নেই, নির্দ্বিধায় সেবা নিচ্ছে; বাথরুম-বেসিন সবাই একসাথে ব্যবহার করছে; একই গামলা থেকে বেড়ে দেওয়া ভাত-তরকারী থালা পেতে নিচ্ছে, কে দিচ্ছে না-দিচ্ছে কোনো প্রশ্ন নেই।

কতরকম যে রোগী! একটা রোগীর সারা শরীর পোড়া। জানলাম আগুনে নয়, ওষুধের প্রতিক্রিয়ায় এমন হয়েছে। পাশের নারীটি ওই পোড়া শরীর ধরে কদিন থেকে বসে আছে।

একজন কালো বোরকা, হাতমোজা আর পামোজা পরে তার স্বামীকে নিয়ে আমাদের মতোই বারান্দার বিছানায় উঠলো। কিন্তু আশপাশে ক্যাথেটার-ডায়াপার, বমি-পায়খানা আর প্রায় উলঙ্গ সব রোগীর মাঝে নিজের রোগীকে সামলে কতক্ষণ এসব সম্ভব? পরদিন দেখলাম তাকে শুধু নাকের উপর একটা ওড়না পেঁচিয়ে চলতে। এর পরদিন সেটাও উঠে গেল।

ওপাশের রোগীকে একটা মেয়ে কি যে যত্ন করছে! রোগীটি বারবার বাড়ী যেতে চাইছে। সে তাকে শিশুর মতো ভোলাচ্ছে, বাইরে তো হরতাল, গাড়ী চলছে না, যাবেন কেমনে? জিজ্ঞেস করলাম, কে হয়? মেয়েটি বললো, শ্বশুর!

ডানহাতের রোগীর সাথে যে নারী, সে একা। সাহায্য করার কেউ নেই। একটু আসেন তো ভাই – এমনভাবে ডাকলো যেন কতদিনের চেনা। আমি গিয়ে রোগীর মাথাটা চেপে ধরলাম। ডাক্তার নাক দিয়ে খাবার নল ঢোকালেন। তার ছেলেটা আসলে ডেকে বললেন, সালাম দাও তোমার আঙ্কেলকে।

দরজার বাইরে একজন রোগী পড়ে আছে ক’দিন থেকে। কেউ নেই। কে রেখে গেছে! তার স্ত্রী নাকি তাকে ত্যাগ করেছে, তাই ষ্ট্রোক করেছে। কষ্ট করে মরে গেল।

আটরশির মুরিদ এক রোগী। সঙ্গের নারীর কানে পাঁচটি করে গহনা। পানবাটা সাথে। খাচ্ছে আর গান গাচ্ছে। বুঝি আমার চুলটা একটু লম্বা দেখে আলাপ জুড়ে দিলো। কোন মেঘনার চরে বাড়ি। নাম্বার-ঠিকানা দিয়ে গেল যাওয়ার জন্য।

কোণার বিছানায় হাত-পা চিকোন প্রতিবন্ধী ধরণের চার ফুটের একটা মানুষ। বিছানায় কি সুন্দর একটা মেয়ে শুয়ে। জিজ্ঞেস করলাম। বললো, আব্বা। পরে মেয়েটার মা এলো। বুঝতে পারলাম। স্বামীর প্রসাব-পায়খানা দিনের পর দিন পালটে চলেছে। খুব তেজ রোগীর। নাকি অনেক সহায়-সম্পত্তি।

চোখের সামনে একজনকে দেখলাম, জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে। পাশ থেকে দেখি আত্মীয়স্বজন সব বাইরে চলে যাচ্ছে। আমি তাকিয়েই আছি। দেখতে দেখতে সারা শরীর হলুদ হয়ে গেল। মাকে জিজ্ঞেস করলাম, উনার কি হলো! মা বললো, মরে গেল তো! আমি চমকে উঠলাম।

এরকমভাবে চোখের সামনে কাউকে মরে যেতে দেখিনি। কাঁদলে সিষ্টাররা রাগ করবে এজন্য নাকি সবাই বাইরে চলে গেছে।

পাশের বিছানায় ইয়াং হাঁফপ্যাণ্ট-টিশার্ট পরা একটা রোগী এলো। কাশি-সর্দি অনেক বছর। সে বিসিএস পরীক্ষার্থী ইত্যাদি বলে প্রতিদিন আলাপ জুড়ে দেয়। কথা প্রসঙ্গে বললো, দীপন (প্রকাশক) অনেক সাহসী, সে অভিজিতের বই কেন বের করতে গেল? বললাম, তাই তাকে মেরে ফেলতে হবে? বললো, না, কিন্তু আপনি তার লেখা পড়ে দেখেছেন? পড়লে কোনো মুসলমানের মাথা ঠিক থাকবে না। বললাম, তুমি কোরাণ শরীফ পড়েছো? বললো, না। বললাম, আমি পড়েছি। তো তুমি কোরাণ না পড়ে অভিজিৎ পড়তে গেছো কেন? একদিন সেও চলে গেল। যাওয়ার আগে আমার নাম্বার চেয়েছিল, এড়িয়ে গেছি। মা বললো, ছেলেটা তার নাম্বার রেখে গেছে। মানুষের মন! (৩০শে জানুয়ারী ২০১৭)

প্রথম অংশের লিংক
দ্বিতীয় অংশের লিংক
তৃতীয় অংশের লিংক

image_print
FavoriteLoadingপ্রিয় পোস্টের তালিকায় নিন।

About The Author

মন্তব্য করুন