মঙ্গলবার, নভেম্বর ১৯, ২০১৯

ডাক্তারকে গালি দেবার আগে ‘একটু ভাবুন’

ডাক্তারকে গালি দেবার আগে ‘একটু ভাবুন’

image_pdfimage_print

রক্ত আর পানির মধ্যে এখন আর কোন পার্থক্যই চোখে পড়ে না, শুধুমাত্র রঙ ছাড়া!

মেডিকেল কলেজের প্রথম দিকে ফিজিওলোজি প্রাক্টিক্যাল ক্লাসে আঙ্গুল ফুটো করে রক্ত নেওয়া দেখে মাথা ঘুরে প্রতিবছরই কেউ না কেউ পড়ে যায়! এটা বাংলাদেশের বেশিরভাগ মেডিকেল কলেজেই হয়। আর ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের মধ্যেই এই পড়ে যাওয়ার হার বেশি।

সেই মেয়েটিই যখন ৫ বছর এমবিবিএস/বিডিএস পড়ে ডাক্তার হয়, রক্তকে আর রক্ত মনেই হয় না তার কাছে। পানির মত সহজ বস্তু হয়ে যায় তখন রক্ত।

শুধু কি রক্ত? মানব শরীরের কোন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গই তখন আর আলাদা কোন অনুভূতি সৃষ্টি করে না। সবকিছুই জড়বস্তুর মত মনে হয়।

প্রথম বর্ষের এনাটমি ক্লাসের মৃতদেহ, মৃতদেহের বিভিন্ন অংশ যেমন হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস, যকৃৎ, বৃক্ক, অগ্ন্যাশয়, প্লীহা, জননাঙ্গ ইত্যাদি ঘাঁটাঘাঁটি করে মনটাকে এমনভাবে তৈরি করে নিয়েছি, হাজার চেষ্টা করলেও এখন আর এসবে কোন আলাদা অনুভূতি পাই না। নন-মেডিকেল কোন মানুষ যদি কয়েক ফোঁটা রক্ত দেখেন, তাহলে তার মাথা চক্কর দিয়ে ওঠে। অনেকের বমি পায়। গায়ের মধ্যে ঘাঁটা দেয়। অথচ ডাক্তারদের এসবে কিছুই হয় না! কি রোবোটিক!

ডাক্তাররা আসলেই বিশেষ কিছু। তারা আর যাই হোক, সাধারণ মানুষ না। সাধারণ মানুষের অনুভূতিগুলো মেডিকেল কলেজে ভর্তি হবার পরে খুব যত্নসহকারে মেরে ফেলা হয়। ৫ বছর যে পরিমাণ চাপে রাখা হয় তাদের, পরীক্ষার সময় যে পরিমাণ মানসিক কষ্ট দেওয়া হয়, এর পরে আর অনুভূতিগুলো আগের মত থাকে না।

অনেক রোগী অভিযোগ করে, ডাক্তাররা কেন তাদের দুঃখে দুঃখিত হন না।

তাদের উত্তরে বলতে হয়, ডাক্তারদের জীবনটাই এমন। আপনার যখন রোগ হয়, তখনই শুধুমাত্র আপনি রোগীপূর্ণ হাসপাতালে যান। কিন্তু ডাক্তারদের সারাটা জীবন কাটে হাসপাতালে রোগীদের সাথে, রোগের সাথে যুদ্ধ করে। রোগীর দুঃখে দুঃখিত হলে তাদের সারা জীবন দুঃখ করেই কাটাতে হবে। আর এত দুঃখের মধ্যে থেকে আস্তে আস্তে দুঃখের অনুভূতিটাও ভোঁতা হয়ে যায়। তাই, তাদেরকে আপনি আপনার সাথে তুলনা করতে পারেন না।

এমনকি আপনি কোন ডাক্তার এর সম্পর্কে না জেনে না বুঝে কোন মন্তব্যও করতে পারেন না। আপনি জানেন না, এই অবস্থানে আসতে তাকে কি কি করতে হয়েছে।

আপনি যখন বিকালে বন্ধুদের সাথে হাফ প্যান্ট পরে ফুটবল খেলতে বের হয়েছেন, তখন আজকের এই ডাক্তার বিকালের খেলা বাদ দিয়ে বই নিয়ে পড়া মুখস্থ করেছে।

আপনি যখন ঠোঁটে সিগারেট, হাতে বাইক নিয়ে গার্লস স্কুল, কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে মেয়ে পছন্দ করেছেন; তখন আজকের এই ডাক্তারকে চোখে চশমা আর কাঁধে ব্যাগ নিয়ে নিয়মিত স্কুল-কোচিং দৌড়াদৌড়ি করতে হয়েছে।

আপনি যখন আপনার স্ত্রীর বাহুতে সুখনিদ্রায় মগ্ন ছিলেন- ডাক্তারকে তখন তার স্ত্রীকে বাসায় একা রেখে এসে আপনার মত রোগীদের রাত জেগে চিকিৎসা করতে হয়েছে।

এখন আপনি তাদের গাড়ি বাড়ি দেখে হিংসায় জ্বলেন, আপনি কেন এসবের মালিক হতে পারলেন না। তার কারণ কোনদিন খুঁজেছেন কি?

খোঁজ নিয়ে জেনেছেন কি, কত বছর অমানুষিক পরিশ্রমের পরে একজন ডাক্তার এই বাড়ি-গাড়ির মালিক হতে পেরেছেন?

হ্যাঁ। এভাবেই একজন ডাক্তার বড় ডাক্তার হয়ে ওঠেন। তার এই ত্যাগের কি কোনই মূল্য নেই?

ডাক্তারকে গালি দেবার আগে নিজের অবস্থানটা একবার ভেবে নিবেন। তিনি গালি খাবার যোগ্য কি না, তা ভাবার চেয়ে আপনি তাকে গালি দেবার যোগ্য কি না, এটাই বেশি ভাবতে হবে।

FavoriteLoadingপ্রিয় পোস্টের তালিকায় নিন।

About The Author

Dr. Sujon Paul

ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব অফথ্যালমোলজি এন্ড হসপিটাল

মন্তব্য করুন