সোমবার, অক্টোবর ১৪, ২০১৯

রমজান ও ডায়াবেটিস

রমজান ও ডায়াবেটিস

image_pdfimage_print

রোজা ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে অন্যতম স্তম্ভ। তাই রোজা রাখা প্রত্যেক প্রাপ্ত বয়স্ক মুসলমানদের জন্য অবশ্যকরনীয়। ডায়াবেটিস একটি বিপাক জনিত রোগ যার ফলে রক্তে শর্করার পরিমান বেড়ে যায়। বিশ্বের প্রায় ১৫৭ কোটি মুসলিম এর মধ্যে প্রতি বছর প্রায় ৫ কোটি ডায়াবেটিক রোগী রমজান মাসে রোজা পালন করেন। ১৩টি মুসলিম প্রধান দেশে রমজান মাসের রোজা পালন করেন। ১৩টি মুসলিম প্রধান দেশে জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে প্রায় ৮০ শতাংশ টাইপ ২ ডায়াবেটিসের রোগী নিয়মিত রোজা পালন করে থাকে। ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে যারা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া রোজা রাখেন তারা বেশ কিছু জটিলতার সম্মুখীন হন। এই আলোচনা থেকে একজন ডায়াবেটিস রোগী কিভাবে সুস্থ থেকে রোজা রাখতে পারবেন তা জানা যাবে।

 

ডায়াবেটিস রোগীরা রোজা রাখতে পারবেন কিনা এটা অনেকেরই জিজ্ঞাসা। ডায়াবেটিস রোগী রোজা রাখতে পারবেন। যাদের সামর্থ্য আছে তাদের ডায়াবেটিস এমন কোন বাধা নয়। প্রয়োজন রমজানের পূর্ব প্রস্তুতি। ডায়াবেটিস রোগীদের কমপক্ষে রমজানের ৩ মাস পূর্বে ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে রমজানের প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন। আধুনিক চিকিৎসায় রমজানে রোজা রাখা এখন সহজ এবং নিরাপদ। রোজা রাখার জন্য সব স্বাস্থ্যবিধি পালন করেও যদি স্বাস্থ্যহানী হওয়ার ভয় থাকে তবে তার জন্য রোজা সংগত নয়।

শৃংখলাই ডায়াবেটিস রোগীর জীবনকাঠি। রোজা মানুষকে সুশৃংখল জীবন যাপনে উদ্ভূদ্ধ করে। রমজান ডায়াবেটিস রোগীকে শৃংখলা পূর্ণ জীবন যাপন করার সুযোগ করে দেয়। বিভিন্ন গবেষনায় দেখা গেছে রোজা ওজন নিয়ন্ত্রন, কোলেষ্টেরল কমানো ও সুগার নিয়ন্ত্রনে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে।

 

রমজানে জীবন ধারার পরিবর্তন

রমজানে মানুষের জীবন ধারায় বেশ কিছুটা পরিবর্তন হয়ে থাকে। রমজান মাসে খাদ্যভাসে সকল মানুষের মধ্যে বিরাট একটি পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়ে থাকে। অন্য মাসে তিন বার খাবার গ্রহণের পরিবর্তে রমজান মাসে প্রধানতঃ দুইবার খাদ্য গ্রহণের অভ্যাস গড়ে ওঠে। রোজাদারদের নিকট প্রধান আকর্ষণীয় বিষয় হয়ে ওঠে মাগরীবের নামাজের সময় মুখরোচন ইফতার গ্রহণ। যা অন্য মাসের দুপরের খাবার অথবা রাত্রের খাবারের সমতুল্য হয়ে যায়। সামগ্রিক ভাবে মানুষ তাদের খাদ্যাভ্যাস সহ সকল অভ্যাস এবং বাধ্যবাধকতার প্রভাবে প্রভাবান্বিত হয়ে থাকেন। ফলে কেউ কেউ আছেন, যারা অন্য মাসের তুলনায় রমজান মাসে অতিরিক্ত খাধ্য গ্রহণের অভ্যাস গড়ে তোলেন এবং কেউ বা আবার খাদ্য গ্রহণ কম করে থাকেন। সুতরাং উপরোক্ত খাদ্যভ্যাসের দুটি পন্থাই রক্তের সুগার এর বড় ধরনের তারতম্যের কারণ হয়ে থাকে।

অপর দিকে কেউ কেউ রমজান মাসে আবশ্যকীয় কাজ কর্মের মধ্যে কিছুটা সময় কমিয়ে দেন এবং পরিবর্তন করে থাকেন। তাহারা রোজা থাকার কারণে কিছুটা কম সময় নড়াচড়া করে থাকেন। ফলে ওজন বেড়ে যায়, সুগারও বেড়ে যায়। রক্তের খারাপ কোলেষ্টেরলও বেড়ে যায়, ফলে হার্ট এর জটিলতার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়।

রোজা পালনে নিষেধ কখন

রমজান মাস শুরু হওয়ার অন্তত দুই থেকে তিন মাস আগেই পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি এবং আপনার চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করুন। প্রথমেই জেনে নিন আপনার রোজা পালনে কোন বাধা আছে কিনা। গত তিন মাসের মধ্যে হাইপোগ্লাইসেমিয়া (গ্লুকোজ কমে যাওয়া) এবং ডায়াবেটিস কমায় আক্রান্ত হওয়া ব্যক্তিদের ঝুঁকি থেকেই যায়। যাদের বার বার হাইপোগ্লাইসেমিয়া হওয়ার ইতিহাস আছে, যারা হাইপোগ্লাইসেমিয়া অসচেতন রোগী, যাদের রক্তে সুগার একেবারেই অনিয়ন্ত্রিত, যারা যকৃত, কিডনি, হৃদযন্ত্র ও অন্যান্য রোগে আক্রান্ত, ডায়ালাইসিস করেছেন, এমন রোগী, অত্যাধিক বয়স্ক রোগী এবং গর্ভবতী ডায়াবেটিসের রোগীরা রোজা থেকে বিরত থাকলেই ভালো। নিজের সম্পর্কে সঠিক ধারনা পেতে রমজানের দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে একটি সম্পূর্ণ চেকআপ করিয়ে নিন। এ সময় রক্তের সুগার, সুগারের গড় মাত্রা বা HbAlc, কিডনি ও লিভার পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া উচিত। এসব পরীক্ষার রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে আসন্ন রোজা পালনের পরিকল্পনা করুন।

অপরিকল্পিত রোজা রাখার কারণে সৃষ্টি সমস্যা সমূহ

১)      রক্তের মধ্যে গ্লুকোজের মাত্রা কমে যাওয়া (হাইপোগ্লাইসেমিয়া), যা কঠিন পর্যায়ে হতে পারে যে, রক্তে সুগার বা গ্লুকোজের মাত্রা কমে গিয়ে একেবারে শূণ্য পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছায়।

২)      রক্তের মধ্যে গ্লুকোজের মাত্রা অতিরিক্ত বা উচ্চ মাত্রায় হওয়া, সেই সাথে এসিটোন বেড়ে কঠিন বিপদজনক অবস্থায় গ্লুকোজের মাত্রাকে নিয়ে যেতে পারে।

৩)      রক্তের মধ্যে ফ্যাট বা চর্বি উচ্চ মাত্রায় বেড়ে যাওয়া।

৪)      অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহনের কারনে ওজন বেড়ে যাওয়া।

৫)      শরীর পানি শূণ্যতা যার ফলশ্রুতিতে থ্রম্বোসিস হওয়া।

রমজানে ডায়াবেটিক খাবার

         সেহরীর খাবার সেহেরীর শেষ সময়ে অল্প কিছুক্ষণ আগে খাওয়া।

        ইফতারের সময় অধিক পরিমাণে মিষ্টি ও চর্বি জাতীয় খাবার গ্রহণ না করা।

        ডায়াবেটিক রোগীদের পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি ও পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে যেন তারা পানি শূণ্যতায় না ভোগেন। ফলমূল, শাকসবজি, ডাল ও টক দই তালিকাভূক্ত করতে পারেন। ডাবের পানি পান করতে পারেন। ভাজা পোড়া খাবার যেমন পিঁয়াজু, বেগুনী, পুরি, পরোটা কাবাব অল্প পরিমাণে খেতে পারেন।

        খাদ্যের ক্যালরি ঠিক রেখে খাওয়ার পরিমাণ এবং ধরণ ঠিক করতে হবে। সঠিক সময়ে সঠিক পরিমাণ খাওয়া প্রয়োজন।

        রমজানের পূর্বে যে পরিমাণ ক্যালরি যুক্ত খাবার খেতের রমজানে ক্যালরির পরিমাণ ঠিক রেখে খাবার সময় এবং ধরণ বদলাতে হবে। ইফতারের সময় অতি ভোজন এবং শেষ রাতে অল্প আহার পরিহার করতে হবে।

ইফতার

        পানিশূণ্যতা রোধ এবং শরীরে বিপাকক্রিয়ার জন্য শরবত একটি অপরিহার্য পানীয়। বিকল্প চিনি নিয়ে ইসবগুলো, তোকমা, লেবু, কাঁচা আমা বে তেতুল শরবত করে খাওয়া যেতে পারে।

        ডাব ছাড়া অন্য মিষ্টি ফলের রসনা খাওয়াই শ্রেয়।

        টক ও মিষ্টি উভয় ধরনের ফল দিয়ে সালাদ করে খেলে যেমন উপাদেয় হবে, তেমনি এতে খনিজ লবন ও ভিটামিনের ঘাটতি পূরণ হবে।

        কাঁচা ছোলার সঙ্গে আদাকুচি, টমেটোকুচি, পুদিনাপাতা ও লবন মিশিয়ে খেলে বেশ সুস্বাদু হয়। কাঁচা ছোলা রক্তের কোলেষ্টেরল কমাতে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে।

        পানিশূণ্যতার দিকে লক্ষ রেখে প্রচুর পানি খাবেন।

সন্ধ্যারাত

        ডায়াবেটিস রোগীদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে, সন্ধ্যারাতের খাবার একেবারেই বাদ দেয়া উচিত নয়।

        অন্যান্য সময়ের রাতের খাবারের সমপরিমান হবে, সন্ধ্যারাতের খাবার।

        সন্ধ্যারাতে ভাত খাওয়া যাবে। তবে প্রত্যেকেই নিজ নিজ বরাদ্দ খাবারের পরিমানের দিকে খেয়াল রাখতে হবে।

        সন্ধ্যারাতে হালকা মসলায় রান্না করা যে কোন ছোট-বড় মাছ এবং সবজি থাকলে ভালো হয়।

সেহেরীর

        সেহেরীতে রুটি, ভাত রুচি অনুযায়ী গ্রহন করা যাবে।

        সেহেরীতে খেতে হবে অন্যান্য দিনের দুপুরের খাবারের সমপরিমান।

        মাংসের পরিবর্তে ডিম ও খাওয়া যেতে পারে।

        সেহেরীতে দুধ খেলে ডাল খাওয়া প্রয়োজন নেই।

রোজার ডায়াবেটিক রোগীর ব্যায়াম

দিনের বেলায় অধিক পরিশ্রম বা ব্যায়ম করা উচিত নয়। ইফতার বা রাতের খাবারের ১ ঘন্টা পর ব্যায়াম করা যেতে পারে। মনে রাখতে হবে, তারাবীর নামায ব্যায়ামের সমতুল্য বলে ধরা হয় এবং তারাবী পড়লে না হাটলেও চলে।

রোজায় ডায়াবেটিক রোগীর ঔষধ

        যারা দিনে ১ বার ডায়াবেটিসের ওষুধ খান, তারা ইফতারের শুরুতে (রোজা ভাঙ্গার সময়) ঐ ওষুধ একটু কম করে খাবেন।

        যারা দিনে একাধিক বার ডায়াবেটিসের ওষুধ খান তারা সকালের মাত্রাটি ইফতারের শুরুতে এবং রাতের মাত্রাটি অর্ধেক পরিমাণে সেহেরীর আধা ঘন্টা আগে খেতে পারেন।

        যে সকল রোগী ইনসুলিন গ্রহণ করেন, তাদের রমজানের পূর্বেই ইনসুলিনের ধরন ও মাত্রা ঠিক করে নেয়া উচিত। সাধারণত রমজানে দীর্ঘ মেয়াদী ইনসুলিন ইফতারের সময় বেশী এবং প্রয়োজনে শেষ রাখে অল্প মাত্রায় দেয়া উচিত।

        রমজানের কমপক্ষে তিনমাস পূর্বে ডায়াবেটিক রোগীর অবস্থা অনুসারে চিকিৎসকের পরামর্ম নিয়ে মুখে খাওয়ার ওষুধ এবং ইনসুলিন ঠিক করা উচিত।

রমজানে সুগার টেস্ট এবং রোজা ভাঙ্গা

বিম্বের বড় বড় ইসলামি চিন্তাবিদ ও শাস্ত্রবিদেরা আগেই রায় দিয়েছেন যে, রোজা রেখে রক্তে সুগার পরীক্ষা করালে তাতে রোজা ভেঙ্গে যায় না। রমজান মাসে বাড়িতে গ্লুকোমিটারে মাঝে মধ্যে নিজের রক্তের সুগার নিজে মেপে দেখুন। অন্তত সপ্তাহে এক বা দুই দিন সেহেরীর দুই ঘন্টা পর এবং ইফতারির অন্তত আধা ঘন্টা আগে এবং ইফতারের ২ ঘন্টা পর সুগার মাপুন। সেহেরীর পর সুগার আট মিলিমোল বা এর কম এবং ইফতারির আগে ছয় মিলিমোল বা এক কম থাকা বাঞ্ছনীয়। এর মধ্যে দিনের যে কোন সময় খারাপ  লাগলে অবশ্যই শরীর কাঁপলে, ঘেমে উঠলে, মাথা ফাঁকা লাগলে অবশ্যই সুগার মাপুন। দিনের যে কোন সময়ে সুগার ৩ দশমিক ৩ মিলিমোল বা তার কম এবং দিনের পূর্বেহ্নেই ৩ দশমিক ৯ মিলিমোল বা তার কম হয়ে গেলে সে দিন রোজা ভেঙ্গে ফেলতে হবে। দিনের যেকোনো সময় রক্তে সুগার ১৬ মিলিমোলের বেশী হলেও রোজা ভাঙতে হবে।

উপসংহারঃ

        রমজান মাস রহমত, বরকত, মাগফিরাত এবং নামাজের মাস।

        রমজান আত্মশুদ্ধির এবং আত্মপোলব্ধির মাস।

        রমজানের সুশৃংখল জীবন যাপন এবং ইবাদত বন্দেগী ডায়াবেটিক রোগীদের ওজন এবং সুগার কমাতে সহায়তা করে।

        ডায়াবেটিক রোগীরা রোজা রাখতে পারবেন। তবে ৩ মাস আগে থেকে ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রস্তুতি নিতে হবে।

        রোজার সময় নিজে ডায়াবেটিসের ঔষুধ সমন্বয় করবেন না, এতে মারাত্মক পরিণতি হতে পারে।

        রোজার সময় দিনে এবং রাতে সুগার মাপা উচিত, ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, এতে রোজার কোন ক্ষতি হয় না।

        সেহেরীর খাবার সেহেরীর শেষ সময়ের কিছু আগে খাওয়া উচিত। ইফতারের সময় বেশী চিনিযুক্ত খাবার খাবেন না।

        রোজার সময় দিনের বেলা ব্যায়াম করা উচিত নয়।

        রোজার সময় রাতের বেলা পর্যাপ্ত পরিমানে এবং পুষ্টিকর খাবার খাওয়া উচিত।

 

 

ডাঃ অজিত কুমার পাল

এমবিবিএস, এমডি, এমআরসিপিএস (গ্লাসগো)

এফএসিই, এফএসিপি (ইউএসএ)

মেডিসিন, ডায়াবেটিস ও হরমোন বিশেষজ্ঞ

সহযোগী অধ্যাপক

ময়নামতি মেডিকেল কলেজ, কুমিল্লা।

FavoriteLoadingপ্রিয় পোস্টের তালিকায় নিন।

About The Author

মন্তব্য করুন