বুধবার, আগস্ট ১৫, ২০১৮

আমাদের কথা

মিশেল ফুকোর শব্দের সন্ধানেঃ ‘মেডিক্যাল গেইজ’ মানে কী?

লেখক : মাসুদ রানা 

 

পিনাকী ভট্টাচার্য একজন প্রশিক্ষিত চিকিৎসক। কিন্তু দর্শনে তাঁর আগ্রহ অশেষ। দর্শনের প্রতি তাঁর আগ্রহ তাঁকে ফরাসী দার্শনিক রেনে দেকার্তের গ্রন্থ বাংলায় অনুবাদ করতে অনুপ্রাণিত করেছে। তাঁর অনুবাদ কেমন হয়েছে, তা দেখার সুযোগ আমার হয়নি। কারণ, বইটি যখন আমি ঢাকার একটি বইবিতানে ওঁর উপস্থিতিতেই দেখি, তখন আমার কাছে বাংলাদেশী টাকা ছিলো না কেনার।

পিনাকী ভট্টাচার্যের পাঠাভ্যাস ভালো। পঠন থেকে আহরিত জ্ঞানকে সাধারণ্যে উপস্থাপনার আগ্রহ থেকে তিনি প্রায়শঃ তাঁর পাঠের অংশ বিশেষ বাংলায় অনুবাদ করেন। কিন্তু তিনি নামমাত্র অনুবাদের তৃপ্ত থাকতে চান না। আমি মনে করি এই অতৃপ্তি উপকারী।
আজ আমার কাছে একটি ইংরজি শব্দের সঠিক অর্থ জানতে চেয়ে আমাকে দ্বিধায় ফেলেছিলেন পিনাকী ভট্টাচার্য। শব্দটি হচ্ছে ‘Gaze’, যা তিনি একটি অনলাই মেডিক্যাল ম্যাগাজিনের একটি আর্টিকেল পড়ে, তার বাংলা প্রতিশব্দ হিসেবে প্রার্থী করেছিলেন ‘দৃষ্টি’কে। কিন্তু তিনি নিজেই তৃপ্ত হননি এই ‘দৃষ্টি’তে। তাই, এর অর্থ কী হতে পারে জিজ্ঞেস করেছিলে আমাকে।

আমি ‘Gaze’ শব্দের মানে যা জানতাম, তাহলো ‘গভীর দৃষ্টিপাত’। কিন্তু এই শব্দটি তাৎক্ষণিকভাবে সরবরাহ না করে সময় চেয়ে নিলাম আমার প্রশ্নকর্তার কাছ থেকে। তিনি আর্টিকেলটির লিংক দিয়েই প্রশ্নটা করেছিলেন বলে ভবলাম, সঠিক শব্দের জন্যে আমি ইংরেজি-বাংলা অভিধান দেখবো না (পরে দেখেছি, ‘ঠাউর’), কারণ পিনাকী ভট্টাচার্য নিশ্চয় অভিধান দেখে তৃপ্ত না হয়েই আমার কাছে এসেছেন। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম, সমগ্র আর্টিকেলটা পড়ে এর মর্ম বুঝে আমার মাতৃভাষা বাংলার মর্ম থেকে অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা কররো।

আর্টিকেলটির শিরোনাম  ‘The Medical Gaze: What Do Foucault and the French Revolution Have to Do with Modern Medicine?’ যা প্রকাশিত হয়েছিলো ‘In-Training’ (http://in-training.org/medical-gaze-4170) নামের একটি অনলাইন মেডিক্যাল ম্যাগাজিনে। এর লেখক হচ্ছে যুক্তরাষ্টের অ্যালবানি মেডিক্যাল কলেজের ষ্টিভেন লেইঞ্জ ও এমিলিই লু। লেখাটি চমৎকার, যার  মূল কথা হচ্ছে এইঃ

আঠারো শতকের ফরাসী বিপ্লবের পর চিকিৎসা শাস্ত্রে দু’টি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেছে, যার পরিণতিতে তা একটি বিজ্ঞান হয়ে উঠেছে। প্রথমতঃ চিকিৎসগণ অভিজাতদের একান্ত সেবাদান থেকে মুক্ত হয়ে সাধারণের সেবায় নেমে এসে ক্লিনিক গড়ে তোলেন। দ্বিতীয়তঃ রোগ নির্ণয়ে সুপারন্যাচারাল বা অতিপ্রাকৃতিক শক্তির সংশ্লিষ্টতার ধারণা বাদ দিয়ে রোগীর অভিজ্ঞতার বিবরণ ও শারীরিক পর্যবেক্ষণকে মূখ্য বিবেচনা করতে শুরু করেন। প্রখ্যাত ফরাসী দার্শনিক মিশেল ফুকো চিকিৎসকদের এই অবস্থানগত পরিবর্তনের উল্লখ করে তাঁদের নতুন এ্যাপ্রৌচের নাম দিয়েছেন ‘Medical Gaze’, যা একটি দার্শনিক পরিবর্তনও বটে।

ফুকোর উদ্ভাবিত ‘মেডিক্যাল গেইজ” উল্লেখ করে লিখিত আর্টিকেলের অন্তর্নিহিত যুক্তি লক্ষ্য করলে এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে (যা আমি সেক্যুলারিজম সংক্রান্ত আমার নৌটে বলেছি) যে, গণতন্ত্র ও সেক্যুলারিজম হাতে হাত ধরে মানব সভ্যতায় আবির্ভূত হয়েছে। চিকিৎসকগণ যতোদিন পর্যন্ত সাধারণ্যের ধরা ছোঁয়ার বাইরে রাজন্যবর্গ ও অভিজাত শ্রেণীর সেবাদাস হয়ে ছিলেন, ততোদিন পর্যন্ত স্বাস্থ্য ও রোগকে অতিপ্রাকৃতিক সত্তার প্রভাব হিসেবেই দেখেছেন এবং চিকিৎসা শাস্ত্র একটি ঐশ্বরিক বিষয় হিসেবে বিবেচিত ও প্রত্যক্ষিত হয়েছে।

আমি মনে করি, ফরাসী বিপ্লবীগণ যখন উৎপীড়ক রাজতন্ত্র ও সামন্ততন্ত্র উচ্ছেদের নিয়োজিত হলেন, তখন তাঁদেরকে দুটি কর্ম করতে হয়েছিলো। তার একটি হচ্ছে সার্বভৌমত্বের ধারণায় পরিবর্তন এবং অন্যটি হচ্ছে জগত ও জীবনের ব্যাখ্যা থেকে অতিপ্রাকৃতিক সত্তার অপসারণ। এই দু’টি বিষয় করতে গিয়েই এসেছে গণতন্ত্র ও সেক্যুলারিজমের ধারণা।

গণতন্ত্র ও সেক্যুলারিজমের ধারণ ধারণা গড়ে ওঠার পেছনে কাজ করেছে সামন্তবাদী অর্থনীতির গর্ভ থেকে জন্ম নেওয়া নতুন পুঁজিবাদী অর্থনীতির বিকাশের তীব্র প্রেষণা। কারণ, পুঁজিবাদী বণিক শ্রেণীর (যাঁদেরকে ফরাসী ভাষায় বুর্জোয়াজি বলা হয়) পণ্য উৎপাদন ও তা বিক্রি করে মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে প্রয়োজন ছিলো মুক্ত শ্রমিক এবং অবাধ বাণিজ্য ব্যবস্থা।

কিন্তু যেহেতু তাদের কারখানায় শ্রম দিতে পারে এমন মানুষেরা ছিলেন রাজা ও অভিজাত শ্রেণীর সার্ফ বা ভূমিদাস, আর সমস্ত ভূমি ছিলো সম্রাটের নিয়ন্ত্রণাধীন, তাই বিকাশমান বুর্জোয়া বা বণিকশ্রেণী রাজতন্ত্র ও রাজতন্ত্র সমর্থনকারী বিশ্বদর্শনের বিকল্প হিসেবে গণতন্ত্র ও সেক্যুলারিজমকে নিয়ে লড়াইয়ে নামে।

বুর্জোয়াদের এই নতুন কথা যেহেতু অধিকাংশ মানুষের পক্ষে গেলো এবং সমাজের বৈষয়িক ও ভাবগত সমৃদ্ধির সহায়ক হিসেবে আবির্ভূত হলো, তাই জনসাধারণ ফরাসী বুর্জোয়া বিপ্লবে অংশগ্রহণ করে রাজতন্ত্র ও অভিজাততন্ত্রের কর্তৃত্বের প্রতীক প্যারিসের বাস্তিল দূর্গ আক্রমণ ও ধ্বংস করে এমন এক সুদূর প্রসারী বিপ্লবের সূচনা করলো, যা মানব সভ্যতায় মৌলিক পরিবর্তন নিয়ে এলো।

ফরাসী বিপ্লবই বিশ্বের বুকে এই ধারণা নিয়ে এলো, যে দেশের মালিক সমগ্র জনগণ, ঐশ্বরিক আনুকূল্য প্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি নয়। তাঁদের এই অস্বীকৃতি সঙ্গত কারণেই রাজতন্ত্র ও অভিজাততন্ত্রের সমর্থনকারী যাজকতন্ত্রের ও তাঁদের দেওয়া জগত ও জীবন সম্পর্কে অতিপ্রাকৃতিক দর্শন ও ব্যাখ্যাকেও চ্যালেইঞ্জ ও পরাজিত করলো।

যাহোক, প্রশ্ন হচ্ছেঃ মিশেল ফুকোর এই ‘মেডিক্যাল গেইজ’এর বাংলা কী হবে? চিকিৎসাবিজ্ঞান আমার ডিসিপ্লিন নয়। তবে সাইকোলজির ছাত্র ও শিক্ষক  হিসেবে আমাকে ফিজিওলজি, কোগনিশন, পার্সেপশন, ইত্যাদি পড়তে ও পড়াতেও হয়েছে। ফলে, আমার মনে হয়েছে, ফুকোর কথার মর্ম আমি বুঝতে পেরেছি। তাই আমার মিত্র পিনাকী ভট্টাচার্যকে আমি বলেছিঃ

“Gaze শব্দের অর্থ হবে বীক্ষণ। Medical Gaze শব্দবন্ধের অর্থ হবে স্বাস্থ্যবীক্ষণ বা চিকিৎসাবীক্ষণ। তবে ফুকোকে রেফার করে এই লেখক যে সেন্সে লিখেছেন, তাতে আমি স্বাস্থ্যবীক্ষণ প্রিফার করি। যাহোক, কখনও কখনও এটিকে রোগবীক্ষণ বলা যেতেও পারে। অর্থাৎ, আমি বলছি, বীক্ষণ হচ্ছে মেইন এ্যাকশন যার অবজেক্ট হতে পারে স্বাস্থ্য, রোগ, চিকিৎসা। আর, Gaze-এর মধ্য দিয়ে যে অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, তথ্য, তত্ত্ব ও প্রজ্ঞা গড়ে ওঠে তাকে বলবো বীক্ষা – স্বাস্থ্যবীক্ষা, চিকিৎসাবীক্ষা, রোগবীক্ষা – অর্থৎ, দ্য হৌল বডি অফ নোলেইজ। আশা করি বিষয়টি স্পষ্ট করতে পেরেছি।”